বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম।

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম
** সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম যে কোন ব্যক্তি, পরিবার তথা সমাজ ও রাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে অপরিহার্য নীতি আলোচনা কর?

উত্তর ঃ সুচনা ঃ সুত্তপিটকের অর্ন্তগত দীর্ঘনিকায়ের অর্থকথা সুমঙ্গল বিলাসীনি গ্রন্থে পূরাণ বর্জ্জিদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ভগবান যখন গৃধ্রকুট পর্বতে অবস্থান করতে ছিলেন। তখন রাজা অজাতশত্রু কর্তৃক প্রেরিত বর্ষকার মন্ত্রীর উক্তিকে বুদ্ধ বর্জ্জিদের সম্পকে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম সম্পর্কে অবগত করেছিলেন। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হল ঃ

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম ঃ ভগবান বুদ্ধ বৈশালীর সারন্দদ চৈত্যে অবস্থান করার সময় বৃজিদের জাতীয় কল্যাণে যে সাতটি উপদেশ প্রদান করেছিলেন সে গুলোকে বৌদ্ধ সাহিত্যে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মরুপে আখ্যায়িত। এই সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মের মধ্যে নিহিত রয়েছে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপন করার অমূল্য উপদেশ। যে কোন ব্যক্তি বা পরিবার তথা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি এতে নিহিত রয়েছে। সে গুলো হল ঃ
১.    তাঁরা যেন সদা সর্বদা অভিন্ন হৃদয়ে সাধারণ সভায় সম্মিলিত হয়। অথার্ৎ বর্জ্জিগণ সর্বদা সম্মিলিত হন; সর্বদা সুম্মিলিত হতে অথার্ৎ গতকল্য সম্মিলিত হয়েছি পরশু ও পূনঃ অদ্য কেন সম্মিলিত হব, তারা এরুপ বলে না। এভাবে একতা ও সংহতি নিহিত আছে।
২.    তাঁরা যেন সকলে একমত হয়ে সংঘবদ্ধ ভাবে সভায় উপস্থিত হয় ও সভা ত্যাগ এবং একমতে সাধারণ কর্তব্য কার্য সম্পাদন করে। অর্থাৎ- বর্জ্জিগণ সম্মিলিত হওয়ার সংকেত পেলে তাদের মধ্যে কেউ এখনতো আমার কাজ আছে বা আমি তো মাঙ্গলিক কাজে ব্যাপৃত আছি এরুপ কোন আপত্তি না করে যে যেভাবে থাকুক না কেন যথা সময়ে সকলে সম্মিলিত হয়ে থাকেন ও কার্য্যাদি সকলে একমত হয়ে সম্পাদন করতঃ এক সঙ্গে বৈঠক হতে উঠে থাকেন এবং এক জনের রোগ, দুঃখ অভাবাদি ঘটলে সকলে মিলিত হয়ে তা প্রতিকার করেন। একের কার্য হলেও তা সকলে সম্পাদন করেন। এখানেও ঐক্য ও সংহতি ও সমাজ পরিচালনার নীতি নিহিত আছে।
৩.    তাঁরা যেন হঠাৎ অবিহিত বিধি ব্যবস্থা গ্রহন না করে বিহিত বিধি ব্যবস্থার উচ্ছেদ না করে এবং যথা বিহীত প্রাচীন বিধি ব্যবস্থা সমূহ পালন করেন। অর্থাৎ- বর্জ্জিগণ পূর্বে যেরুপ বিধি ধর্মতঃ ব্যবস্থাপিত হয়নি এমন কোন বিধি বর্তমানে ব্যবস্থাপিত সুনীতি গুলো ও লংঘন করেনা, পৌরানিক বজ্জীরাজ ধর্মে বিচারাদি সম্পর্কে যে রুপ ব্যবস্থা আছে তার অনুবর্তী হয়ে চলেন। এতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নিহিত আছে।
৪.    বায়োবৃদ্ধ ও জ্ঞান বৃদ্ধদের প্রতি সম্মান প্রর্দশন করে ও তাঁদের উপদেশ মেনে চলে। অর্থাৎ-বর্জ্জিগণ তাদের মধ্যে যাঁরা বৃদ্ধ তাঁদের প্রতি সৎকার গৌরব সম্মান ও পূজা করেন এবং তাঁদের হিতোপদেশ মেনে চলেন। এতে ঐক্য সংহতি ও সৎজীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।
৫.    তাঁরা যেন কুলবধ ুও কুলকমারীদের প্রতি কুব্যবহার বা কোন প্রকার জবর দস্তি না করে। অর্থাৎ, বর্জ্জিগণ কুলবধু ও কুলকুমারিদের প্রতি কুব্যবহার বা বলপূর্বক ধরে এনে স্বীয় গৃহে বাস করান না বা বলাৎকার করেন না। এতে সৎ জীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।
৬.    বর্জ্জিদেশের অভ্যন্তরে ও বর্হিভাগে বর্জ্জিদের প্রতিষ্ঠিত যত চৈত্য আছে, সেগুলো পূজার্চ্চানাদি দ্বারা সম্মান প্রর্দশন করে এবং তাদের প্রাপ্য রাজস্বাদি আতœসাৎ না করে। অর্থাৎ বর্জ্জিগণ তাঁদের স্বীয় নগরে ও বর্হিনগরে বর্জ্জীদের যে সমস্ত চৈত্য আছে তৎসমুদয় সৎকার গেীরব, সম্মান, পূজা যথাবিহিত ভাবে করে থাকেন এবং পূর্বে যে সমস্ত রাজস্ব দেশ সেবার্থে প্রদত্ত তা ফেরত নেয় না ও পূর্বকৃত ধর্ম্মত পূজার পরিহানি করে না।
৭.    তাঁরা যেন বর্জ্জি রাজ্যে অর্হৎদের রক্ষণাবেক্ষন ও ভরণ পোষনের সুব্যবস্থা করে যাতে তদ্দেশাস্থিত অর্হৎতেরা নিবিঘেœ ও শান্তিতে বসবাস করতে পারে এবং ভিন্ন দেশের অর্হৎতেরা ও তাঁদের রাজ্য আগমন করে শান্তি বাস করতে পারে। এতে সৎ জীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপনের জন্য অমূল্য উপদেশ। যা শিক্ষা করে আমাদের সমাজ, জাতি তথা পরিবারকে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপনের জন্য গড়ে তুলতে পারি। 

ভবচক্র।

বুদ্ধমতে ভবচক্রের (wheel of existence) দ্বাদশ নিদান:
.
(১) অবিদ্যা (ignorance) : অবিদ্যা হলো সকল দুঃখের মূল কারণ। অবিদ্যা মানে অজ্ঞান। এখানে অবিদ্যা অভাব-বাচক নয়, বরং বিরোধ-বাচক অর্থে প্রতিপাদন হয়েছে। অর্থাৎ অবিদ্যা মানে জ্ঞানশূন্য নয়, জ্ঞানের বিপক্ষ। যেমন যে বস্তু অবাস্তবিক তাকে বাস্তবিক ভাবা, সে বস্তু দুঃখময় তাকে সুখময় ভাবা, যে বস্তু আত্মা নয় (অনাত্মা, non-self) তাকে আত্মা ভাবা হচ্ছে অবিদ্যার প্রতীক। অবিদ্যা হলো সত্যের সম্যক জ্ঞানের অভাব। অবিদ্যার প্রভাবে আমরা অনিত্য সংসারকে নিত্য বলে মনে করি। বস্তুর যথার্থ স্বরূপকে না জানার কারণ অবিদ্যা প্রতিফলিত হয়ে সংস্কারকে উৎপন্ন করে। অর্থাৎ এই অবিদ্যাজনিত কামনা ও বাসনা থেকে উদ্ভূত হয় আমাদের সংস্কার।
.
(২) সংস্কার (impression) : সংস্কার হলো আমাদের অতীত জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ। অর্থাৎ পূর্বজন্মের কর্মাবস্থাই সংস্কার। পূর্বজন্মের কর্ম ও অনুভবের দরুন উৎপন্ন সূক্ষ্ম ও বাসনাময় বস্তু হলো সংস্কার। সংস্কারের কারণ হচ্ছে অবিদ্যা। অবিদ্যাজনিত কর্ম একপ্রকার শক্তি উৎপন্ন করে। এই শক্তি আবার কর্মের ফল সৃষ্টি করে। এক জীবনের সংস্কার পরের জীবনের চিন্তা ও কর্মকে উৎপন্ন করে। ফলে পূর্বজন্মের সংস্কার থেকেই পরজন্মের বিজ্ঞান বা চেতনা উদ্ভূত হয়।
.
(৩) চেতনা বা বিজ্ঞান (consciousness) : আমাদের বিজ্ঞান বা চেতনার কারণ হলো অতীত জীবনের সংস্কার। চেতনা থাকে বলেই এই জীবদেহ মাতৃগর্ভে দিন দিন বাড়তে থাকে, এই বিজ্ঞানের দরুনই শিশুর শরীর ও মন বিকশিত হয়। অর্থাৎ পূর্বজন্মের সংস্কার চৈতন্যরূপে মাতৃজঠরে আবির্ভূত হয় এবং জীবদেহ গঠন করে। কাজেই চেতনা থেকে উদ্ভূত হয় জীবদেহ বা নামরূপ।
বৌদ্ধদর্শন মতে এই বিজ্ঞান হচ্ছে প্রতিসন্ধি (জন্ম) স্কন্ধ। প্রতিসন্ধি ক্ষণে বা উপপত্তি ক্ষণে গর্ভস্থ পাঁচটি স্কন্ধ (রূপ, বিজ্ঞান, বেদনা, সংজ্ঞা ও সংস্কার) হচ্ছে বিজ্ঞান বা চেতনা। উল্লেখ্য, ভূতব্যতিরিক্ত অমূর্ত তত্ত্বকে বৌদ্ধগণ স্কন্ধ বলেন।
.
(৪) নামরূপ (mind body organism) : দৃশ্যমান শরীর ও মনের সংবলিত সংস্থানবিশেষ হচ্ছে নামরূপ। সোজা কথায় দেহ-মনের সংগঠন। নামরূপের কারণ হলো চেতনা বা বিজ্ঞান। এই নামরূপ থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের ষড়ায়তন বা ছয়টি ইন্দ্রিয়। ইন্দ্রিয়গুলোর নিবাস শরীরে ও মনে। পাঁচ বাহ্যেন্দ্রিয় শরীরে থাকে বলে মনে করা হয় এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মন হচ্ছে আন্তর। নামরূপের অস্তিত্ব না থাকলে এই ছয়টি ইন্দ্রিয় উদ্ভূত হতো না।
.
(৫) ষড়ায়তন (six sense organs) : ষড়ায়তন হলো বিশেষ বিশেষ বিষয়যুক্ত পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও মনের সঙ্কলন। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক হচ্ছে বাহ্য পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মন হচ্ছে আন্তর ইন্দ্রিয়। এই ছয়টি ইন্দ্রিয়ই বিষয়ের সাথে সম্পর্ক গ্রহণ করে। ইন্দ্রিয়ের প্রাদুর্ভাবকাল হতে ইন্দ্রিয়, বিষয় ও চেতনা বা বিজ্ঞানের সন্নিপাতকাল পর্যন্ত হচ্ছে ‘ষড়ায়তন’। এই ছয়টি ইন্দ্রিয় আছে বলেই স্পর্শ সম্ভব হয়। কাজেই ষড়ায়তন থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের স্পর্শ।
.
(৬) স্পর্শ (sense contact) : স্পর্শ হলো আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সাথে তাদের বিষয়ের সংযোগ। যদি বিষয়ের সাথে ইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক না হতো তবে ইন্দ্রিয়ানুভূতি (বেদনা) উদ্ভূত হতো না। সুখ-দুঃখাদির কারণ জ্ঞানের শক্তি উৎপন্ন হবার পূর্ব অবস্থা হচ্ছে স্পর্শ। এই স্পর্শ থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের অনুভূতি বা বেদনা।
.
(৭) বেদনা বা অনুভূতি (sense experience) : আমাদের বেদনা বা অনুভূতির কারণ হলো স্পর্শ। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা উৎপন্ন অনুভবই বেদনা। বুদ্ধমতে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা জীবের সুখাত্মক অনুভূতি হয় (যা জীবের তৃষ্ণাকে মৈথুনের পূর্বে যে-যাবৎ মৈথুনরাগের সমুদাচার না হয় সে-যাবৎ অবস্থা), তাকে ‘বেদনা’ সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এই বেদনা থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের তৃষ্ণা বা ভোগ-বাসনা।
.
(৮) তৃষ্ণা বা ভোগবাসনা (craving) : শব্দ, স্পর্শ, রূপ ইত্যাদি বিষয়ের বা ভোগ্যবস্তুকে ভোগ করার বাসনাই হলো তৃষ্ণা। অর্থাৎ তৃষ্ণা হচ্ছে বিষয়লাভের তীব্র ইচ্ছা। তৃষ্ণার কারণে জীব সাংসারিক বিষয়ের পশ্চাতে অন্ধের মতো দৌঁড়ায়। ভোগ ও মৈথুনের কামনাকারী জীবের অবস্থাই হচ্ছে তৃষ্ণা। রূপাদি কামগুণ ও মৈথুনের প্রতি রাগের সমুদাচার তৃষ্ণার অবস্থা। এর অন্ত হয় যখন এই রাগের প্রভাব থেকে জীব ভোগের পর্যেষ্টি আরম্ভ করে। এই তৃষ্ণা থেকেই উদ্ভূত হয় উপাদান বা বিষয়ের প্রতি অনুরাগ।
.
(৯) উপাদান বা বিষয়ানুরাগ (mental clinging) : উপাদান হলো জাগতিক বিষয়ের প্রতি অনুরাগ বা আসক্তি। যে জীব ভোগের পর্যেষ্টিতে দৌঁড়-ঝাঁপ করে তার সেই অবস্থা হচ্ছে উপাদান। এই উপাদানের কারণ হলো তৃষ্ণা এবং এই উপাদান থেকে উদ্ভূত হয় ভব বা পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রস্তুতি।
.
(১০) ভব (tendency to be born) : ভব কথার অর্থ হলো পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি বা ব্যাকুলতা। মানুষ বা জীবের মধ্যে জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি বিদ্যমান থাকায় তাকে জন্ম গ্রহণ করতে হয়। এই প্রবৃত্তি জীবকে জন্ম নিতে প্রেরিত করে। উপাদানবশে জীব কর্ম করে, যার ফল হচ্ছে অনাগত ভব। ‘ভব’ হচ্ছে কর্ম যার দরুন জন্ম হয়। এ হচ্ছে কর্মভাব। যে অবস্থায় জীব কর্ম করে তা হচ্ছে ভব। যেহেতু ভব থেকে উদ্ভূত হয় জাতি বা জন্ম, কাজেই পুনর্জন্মের কারণ হলো ভব।
.
(১১) জাতি (rebirth) : জাতি শব্দের অর্থ হচ্ছে জন্ম। এ হচ্ছে পুনঃ প্রতিসন্ধি (জন্ম), অর্থাৎ পুনর্জন্ম। মরণান্তর প্রতিসন্ধি কালে পঞ্চস্কন্ধ হচ্ছে জাতি। প্রত্যুৎপন্নভবের আলোচনায় যে অঙ্গকে ‘বিজ্ঞান বা চেতনা’ নাম দেয়া হয় তাকে অনাগত ভবের সমীক্ষায় ‘জাতি’ বলা হয়। (সংশ্লিষ্ট দার্শনিক পরিভাষায় বিষয়টা অনুধাবনে যে জটিল আকার ধারণ করে বাস্তবে তা এতো জটিল নয়; প্রথম আর্যসত্য দ্রষ্টব্য)। সোজা কথায়, জীব যদি জন্মগ্রহণ না করতো বা শরীর ধারণ না করতো তাহলে তাকে জরামরণের অধীন হতে হতো না। কাজেই জীবের জরামরণের কারণ হলো জাতি বা জন্ম।
.
(১২) জরামরণ (old age and death) : জরামরণ মানে জরা ও মরণ। আক্ষরিক অর্থে বার্ধক্য ও মৃত্যু। বৌদ্ধদর্শনে ‘জরামরণ’ বলতে রোগ, শোক, নিরাশা ইত্যাদি সাংসারিক সমস্ত দুঃখকেই বুঝানো হয়েছে। জীবের জরামরণ উদ্ভূত হয় তার জাতি বা জন্মের কারণে। তাই জরামরণাদি হলো সকল দুঃখের কারণ।
 .
এই বারোটি নিদানের মধ্যে প্রথম দুটি পূর্ববর্তী জীবনে, পরের আটটি বর্তমান জীবনে এবং শেষ দুটি ভবিষ্যৎ জীবনে কার্যকরী হয়। এখানে মূল কারণ অবিদ্যা। অবিদ্যার কারণে জীব বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না বলে তৃষ্ণা থেকে মুক্ত হতে পারে না এবং বার বার জন্মচক্রে পতিত হয়ে দুঃখ থেকেও মুক্ত হতে পারে না। এই অবিদ্যা থেকেই অন্য নিদানগুলি আবির্ভূত হয়ে ‘ভবচক্র’ অর্থাৎ অস্তিত্বের বৃত্তকে বারবার আবর্তিত করছে। তাই এই চক্রটির আবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে-
 .
[ অতীত জীবন বা পূর্বজন্ম ]
> ১.অবিদ্যা > ২.সংস্কার >
[ বর্তমান জীবন বা এ জন্ম ]
> ৩.চেতনা বা বিজ্ঞান > ৪.নামরূপ > ৫.ষড়ায়তন > ৬.স্পর্শ > ৭.বেদনা > ৮.তৃষ্ণা > ৯.উপাদান >
[ ভবিষ্যৎ জীবন বা পরজন্ম ]
> ১০.ভব > ১১.জাতি > ১২.জরামরণ > (১.অবিদ্যা)
.
উপরিউক্ত কারণ শৃঙ্খল থেকে বোঝা যায় যে, কার্যের দিক থেকে যেমন দুঃখ সর্বশেষ উৎপন্ন কার্য, তেমনি কারণের দিক থেকে অবিদ্যা সর্বপ্রথম কারণ।
সংগ্রহে : ভদন্ত জ্ঞানবংশ স্থবির।

সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৭

জাতি,জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয়তাবাদী।


ইংরেজি ভাষায় যেমন নেশনেলিজম বলতে আইডলজি অফ নেশনহুড বুঝায় [১]  তেমনি বাংলা ভাষায় জাতীয়তাবাদ কথাটা (জাতি+ঈয় = জাতীয়) ‘জাতি সম্মন্ধীয়’ মতবাদকে বুঝায়। [২] কোন ব্যক্তি বা সমষ্টির আত্ম-পরিচয়কে বাদ দিয়ে যেমন তাদের আত্ম-স্বার্থ ঠিক করা যায় না, তেমনি কোন জাতীয়তাবাদ তার জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থ চিন্তাকে বাদ দিয়ে গড়ে উঠতে পারে না। এই জন্য জাতীয়তাবাদীদের জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থকে শান দিয়ে আগে বাড়তে দেখা যায়।

১.২. জাতি ও নেশন

বাংলা ভাষায় জাতীয়তাবাদের মত জাতি শব্দটা কিন্তু কেবল তৎসম বা খাস সংস্কৃত থেকে নেওয়া নয়; এর একটা আলাদা ফারসি শিকড়ও আছে। সংস্কৃতে জাতি (জন্ [জনন, উৎপত্তি] + তি = জাতি) হল ‘জন্মগত ভাবে ভিন্ন প্রানী’ [৩] বা ইংরেজিতে যাকে বলে স্পিসিস। আর এই অর্থে বর্নাশ্রম ধর্মের চতুর্বর্ন ও তাদের নানা উপ-বর্নের প্রত্যেকটা মানব গোষ্ঠিকে জাতি বলা হয়। অন্যদিকে ফারসিতে জাতি (জাত + বি = জাতি) হল জন্ম নয়, ‘গুন কিংবা কর্মবিভাগ হেতু মনুষ্যবিভাগ’। [৪] যেমন, হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, ইহুদি, ইংরেজ, রাশিয়ান ইত্যাদি। বাংলা জবানে সংস্কৃত ও ফারসি এই দুই অর্থেই জাত ও জাতি কথা দুটার ব্যবহার রয়েছে। [৫] বাংলাভাষিদের মধ্যে নেশনের তরজমা রুপে জাতি কথাটাকে এই দুই আলাদা অর্থে পড়া হয়ে থাকে। বুঝে কিংবা না বুঝে কে কোন অর্থে পড়বেন তা মূলত নির্ভর করে তার কসমোলজি বা জগতদৃষ্টি ও আত্ম-পরিচয়ের উপর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ইংরেজী ঐ (নেশন) শব্দের দ্বারা যে অর্থ প্রকাশ করা হয় সে অর্থ ইহার আগে আমরা ব্যবহার করি নাই।’ এই ব্যবহারিক বোধির হেরফের এড়াবার জন্য যদিও তিনি ‘নেশন কথাটাকে তর্জমা না করিয়া ব্যবহার করাই ভাল’ বলে মত দেন, কিন্তু নেশন কি তা বর্ননা করতে গিয়ে নিজেই আবার বলেন, ‘যাদের মধ্যে জন্মগত বন্ধনের ঐক্য আছে তাহারাই নেশন।’ [৬] আরও পরে তিনিই আবার ‘মহাজাতি সদনের নামকরনের মাধ্যমে সর্বভারতীয় জাতীয় ঐক্যের দ্যোতক “মহাজাতি” শব্দটি আমাদের দিয়ে গেছেন।’ [৭] রবীন্দ্রনাথের এই ঘুরপাক উপরে উল্লেখ করা জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থকে শান দিয়ে আগে বাড়ার জাতীয়তাবাদী প্রবনতার নমুনা মাত্র।

বাংলা ভাষায় দুই ভাবে জাতি কথাটাকে বুঝার কিংবা নেশনের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঘুরপাকের কারন যাই হউক না কেন, এখানে খেয়াল করার ব্যাপার হল ফারসির মত ইংরেজিতেও জন্মগত বন্ধনের ঐক্যের বাইরে নেশন রুপি একটা সংহত মানব গোষ্ঠির ধারনার চল এবং অন্যখানে একই লেবল আটা মানব গোষ্ঠির বেলায় নেশন কথাটার ব্যবহারিক অর্থ বদলে যাওয়া অসম্ভব নয়।

১.৩. নেশনের ধারনা

শুরুতে ইংরেজিতে লেটিন ক্রিয়াপদ নাসসি (Naci) থেকে নেশন কথাটা আসে। এটা শুধু মাত্র অন্য আরেকটা অপরিচিত এলাকার লোকদের বেলায় ব্যবহার করা হত। বিশেষ করে মধ্য যুগের শেষ দিকে ইউরোপের নানা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসা এক একটা অপরিচিত রাজ্য কিংবা অঞ্চলের ছাত্রদের বেলায় তা ব্যবহার করা হত। [৮] অন্যদিকে ১৮ শতকের শেষ দিকে ফ্রান্সে ডালাও ভাবে দেশের সব মানুষকে বুঝাতে নেশন কথাটার ব্যবহার শুরু হয়। নবুলমেন ও যাজক শ্রেনির আর্থিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য মূলক প্রাধান্য দূর করে দেশের শাসন ব্যবস্থাকে ‘যুক্তি ভিত্তিক’ করে সমাজকে ‘আধুনিক’ করতে চান এমন ‘লিবারেল রিপাবলিকানগন’ নেশন কথাটার এই নয়া অর্থ চালু করেন। ফরাসি বিপ্লব ও পহেলা মহা যুদ্ধের মাঝের সময়টাতে ইউরোপের প্রায় সব রাজ বংশের পতন ঘটলে নেশনের নয়া ও পুরানা অর্থ দুইটা এক হয়ে আপন ও অপর উভয়ের বেলায় ব্যবহার হতে থাকে এবং অনেক রাষ্ট্রের নাগরিকগন তথা নেশনকে সভারিন বা সার্বভৌম বলে ঘোষনা করা হয়। [৯]

প্রায় একই সময়ে পশ্চিম ইউরোপের ওই ‘গনতান্ত্রিকক বিপ্লব’-এর পাশাপাশি আরেকটা লিবারেল রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়। এতে দাবি করা হয়, আদতে সারা দুনিয়া নানা নেশনে ভাগ হয়ে আছে এবং বাইরের বাধাবিঘ্ন ছাড়া প্রত্যেক নেশনের নিজ ‘অন্তরাত্মার’ আইন মত চলার ও রাষ্ট্র গড়ার অধিকার রয়েছে। একমাত্র এই অধিকারকে মানার ভিতর দিয়ে দুনিয়ায় শান্তি আসতে পারে। [১০] আর এভাবে বিশেষ করে আন্ত-রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পরিভাষায় নেশন ও স্টেইট কথা দুইটার অর্থ একাকার হয়ে যায়; হাইফেন ওয়ালা নেশন-স্টেইট কথাটার ব্যবহার চালু হয়। কিন্তু শব্দ দুইটার অর্থকে আলাদা না রাখলে নেশোনেলিজমকে বুঝা যাবে না। [১১] কারন, নিজেদের রাষ্ট্র্র গড়ার ইচ্ছা ও তৎপরতার ভিতর দিয়ে বেশির ভাগ নেশোনেলিজমের উৎপত্তি, উদ্ভাবনা ও বিকাশ ঘটে।

এই ব্যাপারে আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার। যেহেতু নেশনের ধারনা, প্রত্যেকটা নেশনের সহজাত সার্বভৌমত্ব ও আজাদ হওয়ার অধিকারের মতবাদের জন্ম আধুনিক যুগে, তাই সত্তা হিসাবে নেশন ও নেশোনেলিজম উভয়কে মডার্ননিটি বা আধুনিকতার সংগে জড়িয়ে ফেলার এক ধরনের অনৈতিহাসিক ও ইউরোসেন্ট্রিক [১২] ঝোক দেখা যায়।

ধারনা হিসাবে নেশন ও নেশোনেলিজমের উৎপত্তি আধুনিক যুগের পশ্চিম ইউরোপে হলেও, সামাজিক, রাজনৈতিক সত্তা হিসাবে তাদেরকে আধুনিক কিংবা পশ্চিম ইউরোপিয়ান মনে করা যায় না। যা নতুন তা হল মধ্য যুগের দুনিয়া জুড়ে ডায়নেস্টিক স্টেইটস-এর প্রাধান্যের জায়গায় আধুনিক যুগের ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে নেশন-স্টেইটস-এর ধারনাগত প্রাধান্য।    
 ১.৪. এথনি, ধর্ম, ভাষা, কৃষ্টি ও নেশন

নেশোনেলিজমের স্কলারদের প্রায় সবাই একমত যে, নেশন হল মূলত অনাত্মীয় কিন্তু দড় সংহতিধারি একটা তুলনা মূলক ভাবে বড় মানব গোষ্ঠি। [১৩] প্রশ্ন হল, নেশন যদি একটা সংহত মানব গোষ্ঠি হয়, তা হলে পরিবার, গোত্র, বর্ন, ধর্ম, কৃষ্টি, ভাষা, এথনি [১৪] কিংবা ইচ্ছা ভিত্তিক এসোসিয়েশনের আওতাধীন মানব সমষ্টির সংগে নেশনের তফাতটা কোথায়?

জায়গা বিশেষে ধর্মীয়, ভাষাভাষিক কিংবা এথনিক মানব গোষ্ঠির মত বড় না হলেও, অন্যান্য সংহত মানব সমষ্টির চেয়ে নেশন সাধারনত আকারে অনেক বড় হয়ে থাকে। তাছাড়া, তুলনা মূলক ভাবে নেশনের একটা সবল ‘সম্মিলিত ইতিহাস চেতনা’ থাকে। আর এই চেতনা থেকে তারা আশে পাশের অন্যান্য মানব গোষ্ঠি থেকে নিজেদের আলাদা মনে করে। [১৫] এই সচেতনতা ও স্বাতন্ত্রত্বোধ আবার তাদের সমষ্টিগত স্বার্থ নির্ধারন করে। ইতিহাস সচেতনতা, স্বাতন্ত্রত্বোধ ও স্বার্থের ভেদাভেদ আশে পাশের নেশনের সাথে এক ধরনের আবছা বিরুপতা, রেষারেষি ও বিরুদ্ধতারই শুধু জন্ম দেয় না, সময় সময় সরাসরি যুদ্ধ ফসাদ সৃষ্টি করতে পারে। [১৬] ফরাসি বিপ্লবের পরে ইউরোপে রাজায় রাজায় যুদ্ধের জায়গায় মানব গোষ্ঠিতে মানব গোষ্ঠিতে যুদ্ধের যে উৎপত্তি হয়, [১৭] তা এর একটা বড় আলামত।

যেহেতু এই আমরা/ওরা আবেগময় বাচবিচার ও রেষারেষি ছাড়া নেশন হয় না, তাই অন্য মানব গোষ্ঠি থেকে বিচ্ছিন্ন ও যোগাযোগশূন্য কোন মানব গোষ্ঠির নেশন হওয়ার নজির মিলে না। [১৮]

কিন্তু বড় লোকবল ও মিলিত ইতিহাস চেতনা নেশন হওয়ার জন্য জরুরি হলেও, পর্যাপ্ত নয়। নেশন হওয়ার জন্য সবচে বড় যে উপাদানের দরকার হয় তা হল, একটা আলাদা কিংবা আলগ করার মত ভূখন্ড; যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ, স্বকীয়তা ও অস্থিত্ব বজায় রাখতে পারার মত রাষ্ট্র গড়েছে কিংবা গড়তে পারে। [১৯]
খেয়াল করার বিষয়, এই শেষ উপাদানটা নেশনকে এথনি থেকে আলাদা বিশিষ্টতা দেয়। এদিক থেকে নেশনকে যেমন বিশেষ ভূখন্ডে একত্রিত এথনি, [২০] অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক কমিউনিটিও [২১] বলা যেতে পারে।

১.৫. নেশন ও নেশোনেলিটি

দুনিয়া জুড়ে যেমন বহু নেশেন রয়েছে, তেমনি আত্ম-সচেতনতা, স্বার্থের হেরফের ও স্বাতন্ত্রবোধ রয়েছে, অথচ সভারিন রাষ্ট্র গড়ার মত পর্যাপ্ত লোকবল কিংবা আলগ করার মত ভূখন্ড ছাড়া অনেক মানব গোষ্ঠি দুনিয়ার প্রায় সব খানে রয়েছে। নেশন-স্টেইটের তাত্বিক ছকের মধ্যে এরকম মানব গোষ্ঠির অস্থিত্বকে কবুল করার ও তাদের জন্য কোন রাজনৈতিক স্পেইস বরাদ্দ করার সুযোগ নাই। কিন্তু ধারনাগত বাধা বাস্তবতাকে এড়াতে পারে না।

বাংলাদেশ হওয়ার কয়েক মাসের ভিতর বের হওয়া একটা গবেষনা রিপোটে দেখা যায় জাতিসংঘের তখনকার ১৩৫ টা তথাকথিত নেশন-স্টেইটের শতকরা ৮৮ টাই খাস নেশন ছাড়াও এক বা একাধিক সংখ্যালঘু এথনি অথবা ধর্মীয় কিংবা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠি নিয়ে গঠিত। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যায় ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯২ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ২০টিরও কম নেশন-স্টেইট। [২২] একই বাস্তবতা বাংলাদেশেরও। এখানেও একাধিক সংখ্যালঘু এথনি অথবা ধর্মীয় কিংবা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠি রয়েছে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা এসব নেশন-স্টেইটের আওতাধীন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠিকে হয় এথনিক মাইনরিটি বা মাইনরিটি অথবা সাব নেশোনেলিটি বা নেশোনেলিটি বলে থাকেন।

উপরে বলা হয়েছে নেশনের প্রাথমিক বুনিয়াদ হল দড় সংহতিবোধ। প্রশ্ন উঠবে, এই সংহতি বোধের মূলে কি কোন বিশেষ ধরনের অবজেকটিভ ফেক্টার বা বাস্তত উপাদান কাজ করে?

সাধারনত ভাষা ও ধর্মের মত ফেক্টারকে নেশনের সংহতির বড় রকমের মাধ্যম মনে করা হয়। এই ব্যাপারে কেবল লিবারেল স্কলারগনই নন, এংগেলস ও লেলিনের মত আদি মার্কসিস্ট তাত্বিকরাও [২৩] এক মত। যদিও পরে স্টেলিন জাতি গঠনে ধর্মের ভূমিকাকে পুরাপুরি অবান্তর বলে মত দেন, [২৪] ‘বহু মার্কসিস্ট প্রিন্সিপুলের মত এটাও তখনকার রাজনৈতিক অবস্থার সাথে অংগাংগিভাবে জড়িত ছিল।’ এর পিছনে তার বড় উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার বামপহ্নী বুন্ড দলের আলাদা জুইশ নেশোনেলিটির যৌক্তিকতা ও স্বায়ত্বশাসনের দাবিকে প্রতিহত করা। [২৫]
সে যাই হউক, বাস্তবে দেখা যায় ভাষা কিংবা ধর্ম বহু জায়গায় সংহতির বড় বাহন হলেও, আরও অনেক অনেক জায়গায় হয় নাই। [২৬] আসলে আগে থেকে ঠিক করা এক বা একাধিক সংহতি গড়ার উপাদানের ভিত্তিতে নেশনকে চিহ্নিত করা অসম্ভব। [২৭] কারন, কোথায় নেশনের কোন কোন সংহতির উপাদান গুরুত্ব পাবে, তা মূলত নির্ভর করে নেশোনেলিস্টদের ‘আমরা/ওরা’র ‘ওরা’ রুপি মানব গোষ্ঠির পরিচয়ের বাস্তব কিংবা বানোয়াট তফাতের দাবির উপর।

এই জন্য হালে স্কলারদের মধ্যে নেশনকে অবজেকটিভ নয়, সোসিয়েলি কন্সট্রাকটেড সাবজেকটিভ সত্তা রুপে দেখার একটা চল শুরু হয়েছে। এসব স্কলারদের বিবেচনায় নেশন হল এক ধরনের কল্পনা আশ্রয়ী ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’। [২৮] আগে যেখানে নানা রকম হাছামিছা মিথের সাহায্যে কালচার ও কিংডমকে সাবুদ করা হত, আজকাল তেমনি কোন বিশেষ মানব গোষ্ঠির জাতিগত মর্যাদা ও ভূখন্ডের উপর কর্তৃত্বের দাবিকে জাইজ কিংবা নাজাইজ করার জন্য হাছামিছা মিথ ব্যবহার করা হয়। [২৯] মশহুর মার্কসিস্ট স্কলার এরিক হবসবাম (Eric Hobsbawm)-এর জবানিতে নেশন হল এই ধরনের ‘বানোয়াট ট্রেডিশনগুলার’ মধ্যে সবচে বড়। [৩০]

১.৫. নেশোনেলিজম ও নেশোনেলিস্টস

মোটকথা, নেশনের উদ্ভব, উদ্ভাবনায় সহায়ক সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার দরকার হলেও নেশোনেলিস্টস অর্থাত নেশোনেলিজমের আইডলগদের প্রচেষ্টা ছাড়া সেই সম্ভাবনা বাস্তব রুপ নিতে পারে না। [৩১] অন্যদিকে, নোশোনেলিস্টদের গোষ্ঠি, শ্রেনি কিংবা অন্যান্য পরিচয়, স্বার্থ ও অভিজ্ঞতা জনিত প্রতিক্রিয়া তাদের নেশোনেলিজমের চরিত্র ও প্রকৃতি ঠিক করতে বড় রকমের ভূমিকা রাখে।

সালো ব্যারন (Salo Baron) দেখিয়েছেন, প্রটেস্টানটইজম, কথোলিসিজম, অর্থডক্স সিজারও-পাপালইজম ও জুডাইজম পশ্চিম ইউরোপের নানা দেশের নোশোনেলিস্টদের চিন্তা চেতনার রুপ দেয়। দেখতে সেখানকার নোশোনেলিস্ট মতবাদ গুলা যতই সেকুলার রুপ নিয়ে থাকুক না কেন, ঐসব ধর্মীয় বুনিয়াদের কথা বাদ দিয়ে তাদের চরিত্র ও প্রকৃতির বাস্তব ব্যবধানকে বুঝা যাবে না। [৩২]
অন্যদিকে হিউ ট্রেভর-রুপার (Hugh Trevor-Roper) হবসবার্গ সাম্রাজ্যের চেক, পোলিশ ও জুইশ ‘দুসরা ধারার’ নোশোনেলিস্টদের জামআন, ইতালিয়ান ও হাংগেরিয়ান ‘মূল ধারার’ নেশোনেলিজমের ধ্যান, ধারনা ও পদ্ধতি থেকে ধার নেওয়ার ও অনুকরন করার বিষয়টা তুলে ধরেছেন। যেখানে মূল ধারার নোশোনেলিস্টদের উদ্দেশ্য ছিল তাদের অনুমিত একই ভাষাভাষী পাশাপাশি প্রিন্সিপালিটি গুলাকে এক করা, সেখানে  দুসরা ধারার নেশোনেলিজমের লক্ষ্য হয় পড়ে ভাষা ও কালচারের ব্যবধানের ভিত্তিতে বড় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেংগে দিয়ে আলাদা হওয়া। [৩৩]

একই ভাবে এরিক হবসবাম নেশোনেলিজমকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একদিকে ফরাসি বিপ্লব অনুসারী সিভিক, গনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক এবং অন্যদিকে জারমান রোমান্টিক ধারার এথনিক, ভাষা ও কালচার ভিত্তিক নেশোনেলিজম। পহেলটার উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে ১৮৩০-৭০ সালের মধ্যে। লক্ষ্য ছিল জনগনকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের মাঝে জড় করে বাড়ন্ত অর্থনীতির পরিপূরক বড় বাজার তৈরি করা। অন্যদিকে অপরটার উৎপত্তি ও বিকাশ হয় ১৮৭০-১৯১৪ সালের মধ্যে। এর প্রকৃতি, প্রবনতা ছিল বড় রাজনৈতিক ইউনিটকে এথনিক ও ভাষাগত ব্যবধানের ভিত্তিতে ভেংগে দিয়ে বাড়ন্ত পুজিবাদি অর্থনীতির ইঞ্জিন নতুন টেকনোলজি ও উৎপাদন ব্যবস্থার আঘাত থেকে নিজেদের ট্রেডিশনেল কমিউনিটির জন্য স্বস্তি পাওয়ার পথ করা। এখানে এলিনেইটেড বা বিরাগী বুদ্ধিজীবিরাই হন এথনো-লিংগুস্টিক নেশোনেলিজমের বড় উমেদদার। [৩৪]

এলি কেদৌরি (Elie Kedourie) পশ্চিম ইউরোপে জাতীয়তাবাদী ধ্যান ধারনার শিকড় নির্দেশ করেছেন একদিকে ডেস্কাট থেকে কান্ট ও ফিক্টের দার্শনিক ঐতিহ্য ও ফিওরের জওয়াসিম, ফ্রান্সিসকান স্পিরুচিয়েলস ও মুনস্টারের এনাবেপ্টিস্টদের হেটেরোডক্স খৃশ্চিয়ান মিলেনিয়েলিজমের আর অন্যদিকে জার্মান ভাষাভাষী বুদ্ধিজীবিদের এলিনেশনের মাঝে। ফরাসি বিপ্লব এবং জার্মান রোমান্টিক্সদের আদর্শ ভেংগে পড়া ট্রেডিশনেল কমিউনিটির বিরাগী তরুনদের সবল কমিউনিটি অন্বেষী মনে দাগ কাটে এবং তারা পরিতৃপ্তি খুজে নেশনের নয়া সংহতি ও সহমর্মিতার মাঝে।

অন্যদিকে এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিগুলাতে পাশ্চাত্যের অনুকরনের সাথে তাদেরকে পাশ্চাত্যের সামাজিক ভাবে বর্জন জনিত রাগ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবিদের নেশোনেলিজমের মূল নিয়ামক হয়ে উঠে। কিন্তু নিজেদের ‘কাল্ট অফ দ্যা ডার্ক গডস’-এ ফিরে গেলেও, তারা ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবিদের হিস্টোরিসিজমকেই শুধু নয়, এমন কি তাদের নিখুত দুনিয়া গড়ার সাম্ভাব্যতায় (যার শিকড় খৃশ্চিয়ান মিলেনিয়েলিজম-এর মাঝে পুতা) বিশ্বাসের অনুকরন করে চলেন। [৩৫]

পশ্চিম ইউরোপের নেশোনেলিস্টদের কর্মকান্ডের পটভূমি ছিল প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে রাজতন্ত্রের ও সুবিধাভোগী নবুলমেন ও যাজক শ্রেনির উৎখাত করে গনতান্ত্রিক বিপ্লব ও আম মানুষের ইচ্ছা মাফিক শাসন কায়েম ও সামাজিক অগ্রগতির পথ করা। এসব নোশোনেলিস্টরা ছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেনির লোক। অন্যদিকে পুর্ব ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিয়েল শাসনের অধীন দেশ গুলাতে নোশোনেলিস্টরা হন মূলত পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত অথচ পুরানা সুবিধাভোগী শ্রেনির লোক। এই ব্যবধানের কারনে সেখানে নেশনের ধারনা ও নেশোনেলিজমের প্রকৃতি আলাদা রুপ নেওয়া অস্বাভাবিক ছিল না; এবং আদতে তাই হয়েছে। [৩৬]
১.৬. নেশোনেলিজমের প্রকৃতি বিভাগ

যেহেতু প্রত্যেকটা নেশোনেলিজম স্থান, কাল ও নেশোনেলিস্ট আইডলগ নির্ভর, তাই যে কোন নেশোনেলিজমকে বুঝতে হলে এক মাত্র ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা ও পর্যালোচনা করা ছাড়া আর কোন পথ নাই। অন্যদিকে নেশোনেলিজমকে যদি গবেষকের বানানো ধারনা মনে না করে জড়িত মানুষজনের প্রচেষ্টা ও সমর্থনের ফসল বলে মেনে নেওয়া হয়, তা হলে স্থান ও কাল নির্ভর প্রত্যেকটা নেশোনেলিজমের গতি প্রকৃতি থেকে নেশোনেলিজমের একটা স্থান কাল উত্তীর্ন ধারনা কিংবা চরিত্র প্রকৃতি ঠিক করা যাবে না। ফলে, ধারনা হিসাবে নেশোনেলিজমের পর্যাপ্ত ও সর্বসম্মত ডেফিনেশন মিলবে না। [৩৭] এতে নেশোনেলিজম কথাটা বর্তমান রাজনৈতিক ও বিশ্লেষন ধর্মী চিন্তার ব্যাপারে ব্যবহার করা সবচে আবছা ও ডিলাডেলা ধারনা গুলার মধ্যে অন্যতম [৩৮] রয়ে যাবে।

এই আন্ধাগলি থেকে বের হওয়ার জন্য দরকার নেশেনেলিজমের একটা পর্যাপ্ত অথচ সুনিদ্রিষ্ট ডেফিনেশন ঠিক করা এবং যে কোন নেশোনেলিজকে তুলনামূলক দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করার মত এই ডেফিনেশন থেকে সরাসরি বের করা একটা প্রকৃতি বিভাগ নিয়ে নানা নেশোনেলিজমের চরিত্র ও প্রকৃতির বিশ্লেষনের কাজ শুরু করা।

আদর্শ চরিত্র-প্রকৃতির ব্যবধানের ভিত্তিতে নেশোনেলিজমের একটা প্রকৃতি বিভাগ সম্ভবত পহেলা কার্লটন হেইজ (Carlton Hayes) বানান। এই গুলা ছিল মানবিক, ট্রেডিশনেল, জেকোবিন, লিবারেল এবং ইকোনমিক ও ইনট্রিগেল নেশোনেলিজম। [৩৯] যদিও হেইজের প্রকৃতি বিভাগ নেশোনেলিস্ট আদর্শের জটিলতা তুলে ধরতে সহায়ক, এর পটভূমিতে এক ধরনের ভাল মন্দের বাচ বিচারের উপস্থিতি রয়েছে, যা বস্তুনিষ্ট বিচার বিশ্লেষনের জন্য কাম্য নয়। [৪০]

তিন যুগেরও বেশি পরে একই আদর্শ চরিত্র-প্রকৃতির বিবেচনায় হ্যান্স কুন (Hans Kohn) নেশোনেলিজমকে দুই ভাগে ভাগ করেন, যথা পশ্চিমা ঐচ্ছিক (উপ-বিভাগ: ব্যক্তিবাদি ও সমষ্টিবাদি) ও পূবের অর্গেনিক টাইপ। [৪১] নৈতিক উদ্বেগ ছাড়াও, তার নিজের অন্যান্য লেখায় [৪২] তার প্রকৃতি বিভাগের ঘাটতি ধরা পড়ে। উদাহরন হিসাবে বলা যায়, তিনি যেখানে নেশন ও নেশোনেলিজমকে পুরাপুরি আধুনিক ব্যাপার বলে মনে করেন, সেখানে তার নিজের লেখায় প্রাক আধুনিক মটিফ এবং নেশোনেল আবেগ অনুভূতি ও চেতনার ভূমিকা বের হয়ে আসে। [৪৩]

লুই স্নাইডার (Louis Snyder) তার পহেলা দিকের লেখায় নেশোনেলিজমের সময় অনুক্রমিক পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিয়ে চারটা টাইপ নির্দেশ করেন। এগুলা হল ইনট্রিগেটিভ (১৮১৫-১৮৭১), ডিজরাপটিভ (১৮৭১-১৯০০), এগ্রেসিভ (১৯০০-১৯৪৫) ও কন্টেম্পরারি (১৯৪৫-?)। [৪৪] তিনি তার পরের লেখায় একটা ভূগোল ভিত্তিক প্রকৃতি বিভাগও পেশ করেন। এগুলা হল ফিসিফরাস ইউরোপিয়ান, রেসিয়েল বণ্ঢ্যাক আফ্রিকান, পলিটো-রিলিজিয়াস মিডুল ইস্টার্ন, মেসিয়ানিক রাশিয়ান, মার্কিন মেলটিং পট, এশিয়ান এনটি-কলোনিয়েল ও লেটিন আমেরিকান পপুলিস্ট নেশোনেলিজম । [৪৫] তার এই প্রকৃতি বিভাগ নেশোনেলিজমকে যতটা না, তারচে বেশি এর দুনিয়া জুড়ে প্রসারকে বুঝতে সহায়ক। তা সত্বেও, এটা ছিল আগেকার ইউরোসেন্ট্রিক প্রকৃতি বিভাগ এড়াবার একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

হালে বহুল ব্যবহৃত একটা প্রকৃতি বিভাগ হল হিউ সিটন-ওয়াটসন (Hugh Seton-Watson)-এর ওল্ড কন্টিনিউয়াস ও নিউ নেশনস (উপ-বিভাগ সেসেশনিস্ট, ইররিডেন্টিশ ও নেশন-বিলডিং) নেশোনেলিজম। এর খেয়াল করার মত দিকটা হল, আইডোলজির বদলে প্রক্রিয়ার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া। [৪৬]

অন্যদিকে জন ব্রুইলি (John Breuilly) নেশোনেলিজমকে মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যবধানের পটভূমিকায় গড়ে উঠা রাজনৈতিক বিরোধীতা রুপে দেখে নেশোনেলিস্ট বিরোধীতাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলা হল, সেসেশন, ইউনিফিকেশন এবং রিফর্ম মুভমেন্ট। এদের প্রত্যেকটা আবার পুরানা সাম্রাজ্য কিংবা তাদের কলোনিতে অথবা নেশন স্টেইট কিংবা নেশন স্টেইট দাবি না করা রাষ্ট্রে পাওয়া যেতে পারে। [৪৭]

এই ধারার আরেকটা প্রকৃতি বিভাগ পেশ করেছেন মাইকেল হেক্টার (Michael Hechter)। তার বিভাগ গুলা হল, পেরি-ফেরিয়েল, ইররিডেন্টিশ ও ইউনিফিকেশন নেশোনেলিজম। [৪৮]

উপরের পর্যালোচনার আলোকে আমরা বলতে পারি;

১.         নেশন বা জাতি বলতে বুঝায় এমন একটা মানব গোষ্ঠি যারা

(ক) অনাত্মীয় হলেও সংহত ও (খ) আশেপাশের অন্য মানব গোষ্ঠির চেয়ে আলাদা সম্মিলিত ইতিহাস সচেতনতা, স্বতন্ত্রতা ও স্বার্থজ্ঞান সম্পন্ন এবং যাদের (গ) নিজেদের সমষ্টি স্বার্থ, স্বকীয়তা ও অস্থিত্ব বজায় রাখার আকুতি (ঘ) আর তার জন্য স্বশাসিত রাষ্ট্র গড়ার মত ভূখন্ড ও (ঙ ) পর্যাপ্ত লোকবল রয়েছে। অন্য কথায় নেশন এমন একটা এথনি বা স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র্য সম্পন্ন জনগোষ্ঠি যার স্বশাসিত রাষ্ট্র পাওয়ার তাগিদই শুধু নয়, তা গড়ার মত ভূখন্ড ও জনবল রয়েছে।

২.        নেশোনেলিটি বা মাইনোরিটি কমিউনিটি বলতে বুঝবো কোন রাষ্ট্রে বসবাস রত এথনি যারা চাইলেও স্বশাসিত রাষ্ট্র গড়ার মত ভূখন্ড নাই।

৩.        নেশোনেলিজম বলতে বুঝবো কোন মানব গোষ্ঠির তরফ থেকে স্বাদেশিকতার স্বক্রিয় মতবাদকে।

৪.         নেশোনেলিস্ট বলতে বুঝবো নেশোনেলিজমের প্রবক্তা ও প্রয়াসীদেরকে।

বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

বাংলার বৌদ্ধদের ইতিহাস।


নশ্বর সুজয়

  আমরা আজ যে অবস্থায় বুদ্ধের ধর্মকে পেয়েছি তার ইতিহাস বিশাল ও ব্যপক। পৃথিবীর বুকে আর অন্যকোন ধর্ম নেই এমন ইতিহাস বহুল। এ ইতিহাস শুধু উত্ত্বানের নয় , পতনেরও। যুগে যুগে কালে কালে বুদ্ধ ও বৌদ্ধ সভ্যতার ধন আত্মসাৎ করে ধন্য হয়েছে নানা অকৃতজ্ঞ জনেরাই।তার বিনিময়ে দিয়েছি নানা অকৃতজ্ঞার পরিচয়। মাটি নিচেই সেই সাক্ষ্য সুপ্ত হয়ে আছে,  যা হাজার বছর কাল বৌদ্ধদের গৌরবগাথা বহন করে চলছে।
আজ থেকে ২০০ বছর আগের ইতিহাস দেখুন তো বড়ুয়া জাতিটি কোন সংজ্ঞায়  আত্ম পরিচয় বহন করত?
আমরা নিজেদেরকে বৌদ্ধ বৌদ্ধ বলে যে শোল্গান দিচ্ছি তার মূলে কে?
ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধ ও বৌদ্ধধমর্ের হাজারো উত্থান পত্তনের মধে্যও কে বৌদ্ধধর্মকে এ পর্যন্ত বহন করে এনেছে?
সিংহল বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস -"শাসনবংশ"গ্রন্থটি পড়লে বিবেকবাণ মাত্রই একবার উপলব্ধি করতে পারবেন কিভাবে ভিক্ষুরা বৌদ্ধধর্মকে প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করেছিলেন।
খ্রিস্টীয় একাদশ শতক থেকে বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিষ্ঠুর অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্বীয় প্রাণ ও ধর্ম রক্ষার্থে আরাকান শাসনাধীন চট্টগ্রামে এসে শেষ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তার কারণ ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকানের বৌদ্ধ রাজাগণ চট্টগ্রাম শাসন করেছেন।

যদিও বুদ্ধ ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন। অশোকের শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। দিকে দিকে শুধু বুদ্ধেরই জয়ধ্বনী হয়েছিল।  তবে কালক্রমে এমন আনুকূল্য বেশিদিন টিকেনি, আর শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমল থেকে শাসনযন্ত্র ধীরে ধীরে হিন্দুত্বের প্রভাবে ফিরে যায়। পঞ্চম শতাব্দির চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক ও তীর্থযাত্রী ফেক্সিয়ান ভারত সফরের সময় স্থানীয় মহায়ন বৌদ্ধ-তত্ত্বে মৌলিক দুর্বলতা দেখতে পান। সেখানে বুদ্ধাদর্শ বজ্জিত ব্রাম্মণরা ঈশ্বররূপী বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বগণের নাম মিলিয়ে যাগযজ্ঞ দিয়ে প্রচার করত মহাবিশ্বের অগণিত স্তরগুলোতে তারা বসবাসরত, দান যজ্ঞের মাধ্যমে তাদের সান্নিধ্য লাভ
সম্ভব। – ঐ হিন্দু ব্রাম্মণ তত্ত্বগুলো বৌদ্ধ তত্ত্বের এতটাই কাছাকাছি ছিল যে অনেকেই এই দু’ধর্মের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পেতেন না।
প্রথম সহস্রাব্দীর দ্বিতীয় অংশে বৌদ্ধদের অবস্থা সম্পর্কে আমরা যা জানি তা মূলত এসেছে সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক বৌদ্ধ পদব্রাজক হিউয়েন সাং ভ্রমনবৃত্তান্ত থেকে। যদিও কিছু জায়গাতে বৌদ্ধদের সমৃদ্ধ হতে দেখেছেন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি বৌদ্ধবাদকে দেখেছেন জৈন ও ব্রাহ্মণ শক্তির কাছে পরাভূত মৃতপ্রায় সত্তা হিসেবে। বিহারে (প্রাচীন মগধ – বুদ্ধের মৃত্যুস্থান) কয়েকটি বিশেষ বৌদ্ধ স্থানে তিনি মারাত্মকভাবে ক্ষয়িষ্ণু হাতেগোনা কিছু ভক্ত দেখেছেন – ঐদিকে আবার দেখেছেন হিন্দু ও জৈনদের রমরমা অবস্থা। বাংলা, কামরূপ ও আসামেও তিনি অপেক্ষাকৃত স্বল্প সংখ্যক বৌদ্ধ দেখেছেন; কন্যাধাতে কোনো বৌদ্ধ পাননি, আর তামিল, গুজরাট ও রাজস্থানে দেখছেন গুটিকয়েক বৌদ্ধ। চালুক্যদের রাজত্বকালে হিউয়েন সাং লিখেছেন, চালুক্যদের শাসনামলে অন্ধ্র আর পল্লব শাসকদের অনুকুল্যে গড়ে ওঠা অনেক বৌদ্ধ স্তুপ মন্দির পরিত্যাক্ত কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই অঞ্চলগুলো বৈষ্ণব-পূর্ব চালুক্যদের শাসনাধীনে আসে, যারা বৌদ্ধদের প্রতি বৈরী ছিলেন। সাং এর বাংলা ভ্রমণকালে গোঁড়া হিন্দু শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার শাসক। তিনি শশাঙ্ককে একজন “বিষাক্ত গৌড় সাপ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন – যিনি বাংলার বৌদ্ধ স্তুপ -মন্দিরগুলো ধ্বংস করেন আর তার রাজ্যের একেক বৌদ্ধ সন্তদের মাথার জন্যে একশ স্বর্ণমুদ্রা করে পুরস্কার ঘোষণা করেন। হিউয়েন সাং-সহ অনেক বৌদ্ধ সূত্রগুলোতে থানেসরের বৌদ্ধ রাজা রাজ্যবর্ধনের হত্যার জন্যে শশাঙ্ককে দায়ী করা হয়। হিউয়েন সাং লিখেছেন, বোধ গোয়ার বোধি বৃক্ষ কাটা ছাড়াও ওখানকার বৌদ্ধ মূর্তিগুলোকে শিবলিঙ্গ দ্বারা প্রতিস্থাপন করেন।

অন্যদিকে নানা পথ ও মতের সমন্বয়ের চেষ্টায় রত হিন্দুত্বের সর্বদেবতার আলয়ে গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে আত্মস্থ করে নেয়া হয়। হিন্দু ধর্মের মধ্যে থেকেই তাই একজন ভক্ত বুদ্ধকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতে পারত। হিন্দুধর্ম তাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো – “নানা মতের বিশ্বাসীদের জন্যে আস্থা ও সন্তুষ্টির কেন্দ্র।”
অষ্টম শতকের বিখ্যাত হিন্দু দার্শনিক শঙ্কর বুদ্ধকে জনতার শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি নিজেই বৌদ্ধবাদের আদলেই আশ্রম বিধি জারি করেন আর বৌদ্ধ ধর্ম থেকে অনেক দর্শন ধার করেন। বৌদ্ধ সংঘের আদলে শঙ্কর যখন অষ্টম শতকে সন্যাস ও আশ্রম বিধি জারি করেন – ঠিক তখনই বৌদ্ধ বৈরী প্রচারণাও ছিল উত্তুঙ্গে। তাকে বৌদ্ধবাদের কড়া সমালোচক হিসেবে যেমনভাবে অভিনন্দিত করা হয় – ঠিক তেমনিভাবে তাকেই ভারতবর্ষে বৌদ্ধবাদের অবলুপ্তির প্রধান কারিগর হিসেবেও দেখা হয়। একই সময়ে তাকে ছদ্মবেশী বৌদ্ধ হিসেবেও দেখা হয়।

সে সময় নিপীড়িত পলাতক ভিক্ষুদের অধিকাংশ আশ্রয় নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য এক বিহার হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে।
চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ত্রয়োদশ শতকে সেনরাজবংশের শাসনামলে (১১০০-১২৬০ খ্রিস্টাব্দে)। এ সময়কালে বাংলায় বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো নানা রাজনৈতিক দুর্যোগের কারণে ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সেন ও বর্মন রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিরূপ। তাদের শাসনামলে বৌদ্ধদের উপহাস ও বিদ্রুপ করা হতো এবং ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদেরকে পাষণ্ডী ও নাস্তিক বলে নিন্দা করতো। বৌদ্ধ বিহারগুলোতে বুদ্ধ মূর্তি সরিয়ে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘শংকর বিজয় ও শুন্য পুরাণ’ গ্রন্থে ব্রাহ্মণদের বৌদ্ধ নির্যাতনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। শুন্য পুরাণ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের বিষয় সম্পত্তি কেড়ে নিত এবং তাদের সর্বদা অত্যাচার নির্যাতন করত। বৌদ্ধ বিহারগুলো হিন্দু ব্রাহ্মণদের দখলে চলে যায় এবং বিপুল সংখ্যক বৌদ্ধ হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এছাড়া অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু দেশ ত্যাগ করে তিব্বত, নেপাল, উড়িষ্যা, কামরূপ, আরাকান ইত্যাদি অঞ্চলের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। এ সমস্ত কারণে বৌদ্ধধর্ম ত্রয়োদশ শতকের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বলতে গেলে বাংলায় তখন সেনবংশের নিয়ন্ত্রণাধীন হিন্দু রাজত্বের রমরমা অবস্থা।
লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী বাংলা আক্রমণ করেন। এ আক্রমণে বাংলায় অবশিষ্ট বৌদ্ধ সভ্যতার যা ছিল তাও সমূলে উৎপাটন হয়ে গেল। ভাগ্যান্বেষণে আগত তুর্কীবীর বখতিয়ার বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মনে করেছিলেন ব্রাহ্মণদের দুর্গ। এ ভ্রান্ত ধারণায় বাংলার বৌদ্ধবিহার, সংঘারাম ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বখতিয়ারের তরবারি ও অশ্বক্ষুরের আঘাতে একের পর এক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বিহারভিত্তিক বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরী মহাবিহারগুলো একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, নিহত হল অধিকাংশ বৌদ্ধ ভিক্ষু। বিহারে রক্ষিত ধন-সম্পদ লুট করা হল। আগুনে পুড়ে সবকিছুই ছাই হয়ে যাবার পর বখতিয়ার খিলজী জানতে পারলেন এগুলো ব্রাহ্মণদের দুর্গ নয়, এগুলো সুসমৃদ্ধ বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়। এভাবে তুর্কী সৈন্যদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেল বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপনা।

এ প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন ণ্ডযাঁরা তুর্কী বীরদের অস্ত্রাঘাত হতে কোনরকমে প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হলেন তাঁরা অতিকষ্টে হাতের কাছে পাওয়া কয়েকটি পুথি, ছোট ছোট মূর্তি প্রতিমা এবং সূত্রোৎকীর্ণ মাটি বা শিলাফলক নিয়ে পালিয়ে গেলেন তিব্বত, নেপাল, উড়িষ্যা, কামরূপ, আরাকান, পেঁগু, পগান বা আরও দূরদেশে। একই প্রসঙ্গে নলিনীনাথ দাশগুপ্ত লিখেছেনণ্ডমগধের বিহারগুলোতে তুর্কীদের এরূপ জঘন্যতম অত্যাচার কাহিনী শুনে বাংলার সোমপুর, জগদ্দল প্রভৃতি বিহারবাসী শ্রমণগণ অত্যাবশ্যকীয় কিছু পুথিপত্র সঙ্গে নিয়ে আত্মরক্ষার্থে যে যেদিকে পারে পালিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন ণ্ড দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণে প্রথমে মগধ ও পরে ভারতের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাংলার বৌদ্ধবিহার ও সংঘরামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৌদ্ধধর্ম গ্রাস করার ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণে প্রতিকূল শক্তির মোকাবেলায় বিধ্বস্ত বৌদ্ধধর্ম বাংলা থেকে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেল।
বাংলার সুলতানী আমলে ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে ফখর উদ্দিন মোবারক শাহ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয় এবং চট্টগ্রামে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তখন থেকে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে জামাল খাঁ পন্নীর সময়কাল চট্টগ্রামে মুসলিম শাসন বলবৎ ছিল। সুলতানী আমলে চট্টগ্রাম মুসলিম অধিকারে চলে আসলে চট্টগ্রামেও বৌদ্ধরা নির্যাতিত হতে থাকে। হয়তো এ সময়ে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহারও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি এবং এ সময়েই চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার থেকে ভিক্ষুরা দলে দলে তিব্বত, নেপালের দিকে ছুটে যেতে থাকে। পরবর্তীতে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগলরা আরাকান রাজকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। চট্টগ্রাম দখলের এ ভয়াবহ যুদ্ধে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় বলে ধারণা করা যায়। এ যুদ্ধে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার ধ্বংস, ধর্মগ্রন্থ বিনষ্ট, বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ নিহত হন বা পলায়ন করেন। চট্টগ্রাম থেকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা (মগরা) পালিয়ে আরাকানে আশ্রয় নেয়। অবশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর নেমে আসে অমানিশার যুগ। মোগল সম্রাট বা শাসকরা এদেশে বৌদ্ধধর্ম নামে কোন ধর্ম ছিল, মনে হয় তা জানতেনই না। কারণ মোগল শাসনামলের কোন পুথিপত্র বা গ্রন্থে বৌদ্ধধর্ম বা বৌদ্ধদের কোন কথা পাওয়া যায় না। সত্যিকার অর্থে তখন বাংলায় বৌদ্ধদের কোন অস্তিত্বই ছিল না।
শিহাব উদ্দিন তালিশ বিরচিত ‘ফতিয়া-ই-ইব্রিয়া’ গ্রন্থে, দেয়াঙ পাহাড়স্থ প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দর, দেয়াঙ কারাগার, বদরশাহের দরগাহসহ মোগল-আরাকানীদের ভয়াবহ যুদ্ধের বর্ণনা থাকলেও পণ্ডিতবিহার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তাতে ধারণা করা হয় যে, পণ্ডিতবিহারের সেই জৌলুস তখন ছিল না।

চট্টগ্রামের কৃতীসন্তান পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাস ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে কয়েকবার তিব্বতে গিয়ে প্রাচীন পুঁথিপত্র এনে ব্যাপক গবেষণা করেও চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহারের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারেন নি। তবে তিনি চট্টগ্রাম শহরের দেবপাহাড় এলাকায় এর অবস্থান ছিল বলে মনে করেন।

 চলবে..-...
* কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি লেখাটিতে যেসকল ইতিহাসবিদগণের শ্রমের সহযোগিতা নিয়েছি।

মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭

কালামের হাতে হেসেছিলেন বুদ্ধ।

১১ মে, ১৯৯৮৷ বাতাসে আপেক্ষিক আদ্রতা সেদিন একটু বেশীই ছিল বোধহয়৷ দেশের অন্তরেও জমছিল উদ্বেগ৷  ১৯৭৪-এর পর সেই আবার দেশের পরমাণু শক্তির পরীক্ষা হবে৷ শুধু তো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি নয়, ছিল রাজনৈতিক ঘূর্ণিপাকও৷ সে সব সামলে নিয়েই সেবার দেশের শক্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা গিয়েছিল৷ কিন্তু সর্বক্ষণ চলছে আমেরিকান উপগ্রহের নজরদারি৷ তা এড়িয়েই বিশ্বের কাছে দেশীয় পারমাণবিক শক্তির বার্তা দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল যাঁর উপর, তিনি ডঃ এপিজে আব্দুল কালাম৷ বুদ্ধ পূর্ণিমার রাত ছিল সেদিন৷ সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে, আমেরিকার নজরদারি এড়িয়ে, পরমাণু পরীক্ষায়  সাফল্য পৌঁছেছিলেন ডঃ কালাম৷১৯৯২ থেকে ৯৯ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিজ্ঞান উপদেষ্টার পদে নিযুক্ত ছিলেন ডঃ কালাম৷  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ১৯৯৬ সালেই  পরমাণু শক্তির পরীক্ষার কথা ভেবেছিলেন৷ কিন্তু রাজনৈতির চাপের কাছে নতিস্বীকার করেন৷ ১৯৯৮-এ আর পিছু ফিরে তাকাননি৷ প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে সবুজ সংকেত গিয়েছিল ডঃ কালামের কাছে৷ পোখরান-২ পরমাণু পরীক্ষার সুপারভাইজারের দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর উপর৷ সফলভাবে পাঁচটি পরমাণু বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছিল৷ তারমধ্যে চারটি ছিল ফিসন বোম, একটিই ফিউশন বোম৷ মোট ৫৮ জন ইঞ্জিনিয়ারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল সে কাজের জন্য৷
গোপনীয়তা ছিল চরম মাত্রায়৷ এল সাফল্য৷ পরমাণু শক্তি হিসেবে সেদিন নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছিল ভারত৷ আর পুরো প্রক্রিয়াটির নেপথ্য নায়ক ছিলেন ডঃ কালাম৷ প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সেদিন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আমেরিকার উপগ্রহের নজরদারি এড়ানো৷ ডঃ কালামের পরিকল্পনামতোই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সময়ের হেরফেরে বোকা বানাতে পেরেছিল উপগ্রহটিকে৷ সফল হয়েছিল দেশের পরমাণু পরীক্ষা৷ ১৯৯৮-এর এই পরীক্ষার সাফল্যকে সিআইএ-র ( সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্সি এজেন্সি, আমেরিকা) সবথেকে ব্যর্থতা বলেও ধরা হয়৷ ভাবা অ্যাটোমিক রিসার্চ সেন্টারের তরফ থেকে ডঃ কালামকে একটি স্মারক সম্মান দেওয়া হয়, যেখানে বুদ্ধ মূর্তির নীচে লিখে দেওয়া হয়েছিল, ‘দ্য বুদ্ধ হ্যাজ স্মাইলড’৷ বস্তুত গোটা দেশই সেদিন স্বস্তির হাসি হেসেছিল৷

শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৭

মানবের পরাজয়ের কারণ

মানব জীবনে পরাজয়ের কারণ কি?
=========================

ভগবান গৌতম বুদ্ধ দায়কদের বলেছেন:-

০১| যে ব্যক্তি অজ্ঞানী ও অধার্মিক তাঁর পরাজয় হয়৷

০২| যে ব্যক্তি অসৎ ব্যক্তিকে প্রিয় ও  সৎ ব্যক্তিকে অপ্রিয়  মনে করে এবং মিথ্যাদৃষ্টির আশ্রয় গ্রহণ করে তাঁর পরাজয় হয়৷

০৩| যে ব্যক্তি অলস, নিদ্রালু, উদ্যমহীন ও ক্রোধী এবং বাজে গল্পে সময় নষ্ট করে তাঁর পরাজয় হয়৷

০৪| যে ব্যক্তি সক্ষম হয়েও মাতাপিতার ভরণ পোষন করেনা সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৫| যে ব্যক্তি নিষ্পাপ ভান্তে, শ্রামণ কিংবা যাচককে মিথ্যা কথায় প্রবঞ্চনা করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৬| যে ব্যক্তি প্রভূত বিষয় সম্পত্তির অধিকারী হয়েও অন্যেকে দান করেনা সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৭| যে ব্যক্তি জাতি, ধন, গোত্র, বিষয়ে অহংঙ্কারী এবং গরীব আত্মীয়দের ঘৃনা করে সে ব্যক্তি পরাজয় হয়৷

০৮| যে ব্যক্তি পরস্ত্রীতে আসক্ত, সুরাপায়ী ও জুয়ারি যার ফলে অর্জিত ধন সম্পত্তি নষ্ট করে ফেলে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৯| যে স্বীয় স্ত্রীতে অসন্তুুষ্ট এবং গণিকা ও পরদ্বারে আসক্ত সে ব্যক্তি পরাজয় হয়৷

১০| যে ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে তরুনী ভার্যা বিবাহ করে, তার অক্ষমতা বিধায় তাঁর স্ত্রী বা ভার্যা ব্যভিচারে রত হয় সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

১১| যে ব্যক্তি সংসার পরিচালনার ভার প্রমত্ত ও উৎশৃংঙ্খল স্ত্রী বা পুরুষের উপর অর্পণ করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

১২| যে ব্যক্তি সামান্য সম্পদের অধিকারী রাজত্ব লাভের দূরাশা পোষণ করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

সত্যকে জানুন, মিথ্যাকে দূর করুন৷ পড়তে উৎসাহিত হোন, বেশী বেশী লাইক,কমেন্ট, শেয়ার করে অন্যেকে পড়ার সুযোগ করে দিন এতে  আপনার এবং সবার পূণ্যে ও মঙ্গল হবে৷৷

রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বুদ্ধ ধর্মে অনুশীলনের গুরুত্ব।


সমাজে অনেকে নিজেকে পন্ডিত বলে মনে করেন। তাঁরা বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করে বা গবেষণা করে তাঁদের পন্ডিত বলে ধারণা আসতে পারে। কিন্তু বুদ্ধের সেই আসল গবেষণায় পৌঁছতে হলে বা আসল পন্ডিত হতে হলে তাঁকে অবশ্যই ব্যবহারিক জ্ঞান সহ শাস্ত্র জ্ঞানে পারদর্শী হতে হবে। তাহলেই তিনি পন্ডিত হতে পারবেন। বিদর্শন ভাবনা সঠিক আচার্যের মাধ্যমে শুদ্ধ আচরণ করলে তাঁর প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হবে। প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হরে সংস্কার নিরোধ হবে। সংস্কার নিরোধ হলে নামরূপ পরিচ্ছদ জ্ঞান ও উদয় ব্যয় জ্ঞান ইত্যাদি ষোল প্রকার জ্ঞান উৎপন্ন সহ মার্গ পথে পদার্পণ করবেন। এ বিষয়ে পরিপূণূ জ্ঞান অর্থাৎ বিদর্শন ভাবনা শুদ্ধ আচরনের মাধ্যমে মার্গ পথে বিচরণ না করে অন্য বিদর্শনাচার্যের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করলে উপবাদ অন্তরায় হতে পারে। তাই বিদর্শন জ্ঞানের নীতি সোপান তথা নির্বাণ পথের জ্ঞান হয় একমাত্র বিদর্শন ভাবনা আচরণের মাধ্যমে, শাস্ত্র গবেষণার নয়। এ প্রসংঙ্গে এখানে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যাক-
শ্রাবস্তীর দুই বন্ধু তথাগত বুদ্ধের উপদেশ শুনে ভিক্ষুব্রত গ্রহণ করেন। পাঁচ বৎসরকাল গুরুর নিকট অবস্থান করে বিবিধ কর্তব্য বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে একজন উপদিষ্ট শিক্ষায় সাধনায় সিদ্ধি লাভ করলেন। অপরজন ত্রিপিটক অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা কাজে নিযুক্ত রইলেন। চরম বিমুক্তি তাঁর অধিগত হল না বুদ্ধ এ বিষয়ে অবগত হয়ে পান্ডিত্য অপেক্ষা আচরনই বিশেষ ফলপ্রদ বলে নিম্মের গাথাদ্বয় আবৃত্তি করলেন-
“বাহুম্পি সে সহিতং ভাসমানো ন তক্করো হোতি নরো পমত্তো,
গোপো বা গাবো গমাং পায়েসং ন ভাগবা সামঞ্ঞস্স হোতি।”
-বহু শাস্ত্র জ্ঞান যার বহু অধ্যয়ন, অথচ সে শাস্ত্র মতে চলে না কখন।
শ্রামণ্য ফলের ভাগী হয় না সেজন, গোপ (রাখাল) যথা পর গাভী লাভেনা কখন।”

অপ্পম্পিচে সহিতং ভাসমানো, ধম্মস্স হোতি অনুধম্মচারি,
রাগঞ্চ দোসঞ্চ পবায মোহং সম্মপ্পজানো সুবিমুত্ত চিত্তো,
অনুপাদিসনো ইধ বা হুরং বা, স ভাগবা সামঞ্ঞস্স হোতি।
-অল্প শাস্ত্র জানে কিন্তু শাস্ত্রের মতন, পালে ধর্ম রাগ, দ্বেষ মোহ হীন জন।
সম্পজ্ঞানী মুক্তচিত্ত উপাদান ত্যাগী, উভলোক হন তিনি শ্রামণের ভাগী।
যে প্রমত্ত ব্যক্তি ধর্মচার্যের নিকট বহুল পরিমাণ বুদ্ধের ধর্ম অধ্যয়ন করেও যথাযথ আচরণে বিরত থাকেন, সে ব্যক্তি রাখালের সহিত তুলনীয় হন। অর্থাৎ রাখাল যখন সারাদিন গরুর সেবা যত্ন করেও গব্যরসের অধিকারী হতে সমর্থ হয় না, সেরূপ বুদ্ধ বচন প্রচুর আবৃত্তি করলেও সেই ধর্মের রস পানের অধিকারী হতে পারে না। অপর পক্ষে অপ্রমত্তভাবে যিনি অল্প পরিমাণেও বুদ্ধের বাণী অধ্যয়ন করেন, তারা সুন্দর রূপে আচরণ করেন, নব লোকোত্তর ধর্মের অনুকূল ধর্মার্থ অবগত হয়ে কাম প্রবৃত্তি দমন করেন এবং মনে প্রাণে মুক্তি অভিসরী হন, তিনিই বিদর্শন ভাবনা বলে কাম-দ্বেষ-মোহকে সর্বতোভাবে পরাভূত করে মুক্তি পারের সন্ধান লাভ করেন এবং কাম, দৃষ্টি, শীলব্রত ও আত্মবাদ ভেদের চারিটি উপাদান সমূলে উৎপাদিত করে অরহত্ব ফল লাভের পর ভববন্ধন মুক্ত হন। তখন তিনি ইহাকল ও পরকালের শ্রামণের ভাগী হতে পারেন। ধর্মের সত্যিকারের দায়ক নির্বাণ লাভী এবং ধর্মের ধারক ও বাহক হতে পারেন।
ভগবান বুদ্ধ অনেক গবেষণা করে নির্বাণ লাভের জন্য একটি পথই আবিষ্কার করে গেছেন আমাদের জন্য দুটি পথ নয়। আর সে পথ হলো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথে আচরণ এবং এ পথে আচরণে মুক্তি লাভ সম্ভব। অন্যভাবে আচরণ বৃথা হবে, বুদ্ধের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যায় বা উপদেশে শুধু বিমুক্তিই উদ্দেশ্যেই ভাবিত ও দেশিত হয়েছে। তাই ইহাকে মহা সমুদ্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মহাসমুদ্রের জল যেখান থেকেই নেওয়া হোক না কেন সবখানেই লোনা। তদ্রুপ বুদ্ধের ধর্ম দর্শন সবখানেই বিমুক্তি রসে পরিপূর্ণ। বুদ্ধ বলেছেন-
মগ্গষ্ঠাঙ্গিকো সটটেঠা, সচ্চানং চতুরাপদা,
বিরাগো সেটঠ ধর্মানং দ্বি পদানঞ্চ চক্ষুমা।
এসোব মগগো নত্থঞ্ঞ, দস্সনস্স বিসুদ্ধিযা
এতঞহি তুমেহ পটিপজ্জথ মারসসেতং পমোহনং।
মার্গমাঝে অষ্টাঙ্গিক, সত্য মাঝে সত্য চতুষ্টয়,
ধর্মেতে বিরাগ শ্রেষ্ট চক্ষুমান মানবে নিশ্চয়।
এ মার্গ বিনা অন্য কোন মার্গ নাই,
দর্শন শুদ্ধির তবে করতে যাচাই।
তাই এ আষ্টমার্গ সবে অনুস্মর,
এ মার্গে মার রাজ্যে সম্মোহিতে পার।

একবার বুদ্ধ ভগবান ভিক্ষু সংঘে কিছুদিন জনপদ ভ্রমণ করে পুররায় জেতবনে ফিরে এসেছেন। একদিন বুদ্ধের সঙ্গে ভ্রমণকারী সে ভিক্ষুগণ অতিথি শালায় গিয়ে তাঁদের ভ্রমণ পথের সুগমতা ও দুর্গমতা সম্বন্ধে আলোচনা করছেন। বুদ্ধ তাঁদের আলোচনা শুনে লৌকিক পথ সম্বন্ধে চিন্তা না করে আধ্যাত্মিক সাধনায় রত হয়ে আর্য মার্গের সন্ধান করতে উপদেশ দিলেন। মুক্তি লাভের জন্য যদিও অনেকে মনে করেন বিবিধ প্রকার পথের নির্দেশ আছে। আসলেই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই একমাত্র পথ।

চক্রবালের বা একত্রিশ লোকভূমির প্রাণীগণ সর্বদা মুক্তি লাভের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করে, অথচ সমস্ত কাজ মুক্তির নয়। কিছু পাপ, কিছু পুণ্য ও কিছু পরমার্থ কাজ। তন্মধ্যে পাপ কাজ ও পুণ্য কাজ বিপাক সৃষ্টি করে। কিন্তু পরমার্থ কাজের বিপাক সৃষ্টি হয় না। অধিকন্তু পরমার্থ কাজের দ্বারা জমাকৃত বিপাক কায়দ্বারে, বাক্যদ্বারে ও মনদ্বারে নিরোধ হয়। এটাই হলো বিদর্শন ভাবনা।

পাপ কাজের কর্মপথ দশটি। যেমন হত্যা, চুরি, মিথ্যা বাক্য, পিশুন বাক্য, (ভেদ বাক্য) পরুষ (কর্কশ) বাক্য, সম্প্রলাপ (অর্থহীন) বাক্য, অভিদ্যা (লোভ), ব্যাপাদ (দ্বেষ) ও ভ্রান্ত ধারণা (মিথ্যা দৃষ্টি)। এ সমস্ত কর্মপথে কাজ করলে জন্মে জন্মে চারি অপায় গমন, যেমন-তির্যক , প্রেত, অসুর ও নিরয় কুলে উৎপন্ন হয়ে অসীম দুঃখ ভোগ করতে হয়। আবার পুণ্য কাজের কর্মপথ দশটি। যেমন- দান, শীল, ভাবনা (শমথ), সেবা, সম্মান, পুণ্যদান, পুণ্যদানানুমোদন, ধর্মশ্রবণ, ধর্মদেশনা ও দৃষ্টি ঋজু কর্ম (সত্য পথ আচরণ) এ সমস্ত কর্ম পথে কাজ করলে মৃত্যুর পর সুগতি লাভ হয়। যেমন মানুষ স্বর্গ ও ব্রহ্মলোকে জন্ম প্রতিসন্ধি গ্রহণ করে সুখ লাভ করে। পাপ কর্মর্জিত দুঃখ এবং পুণ্যকর্মার্জিত দুঃখ উভয়ই অস্থায়ী। এ গুলো ভোগের পর পুনঃ প্রতিসন্ধি বা জন্ম নিতে হয়। আর জন্ম দুঃখ বলে বুদ্ধ আখ্যায়িত করেছেন। ২৫৯৭ বৎসরের মধ্যে একটি মাত্র জ্ঞানী বা ‍বুদ্ধ যিনি জীব জগতের এ দুঃখ অবলোকন করে তাহা নিরোধের জন্য মার্গ বা পথ আবিষ্কার করেছেন। তাহাই বিদর্শন ভাবনা। সে বিদর্শন ভাবনা আচরণ ক্ষেত্রে অনেকের ধারণা শমথ ভাবনা আগে করতে হবে, না হয়তো বিদর্শন ভাবনা লাভ হবে না। আবার অনেকে শমথ ভাবনা করে সরাসরি নির্বাণ লাভ হবে বলে মনে করেন, আবার অনেকে শমথ বা বিদর্শন যে কোন ভাবনা করলে নির্বাণ লাভ হবে বলে মনে করেন। এখন সে আলোচনায় আসা যাক-
“চানমার য়ৈকত ভাবনা কেন্দ্র” ইয়াঙ্গুন, মায়ানমার-এর অধ্যক্ষ সেয়াদ উ জনকাভিংসো বর্ণনা করেছেন, একবার বুদ্ধ উত্তরীয় নামক রুগ্ন ভিক্ষুকে বলেছেন “আরম্ভ যদি বিশুদ্ধ হয় হবে সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে নির্বাণ সাক্ষাৎ হবে।”

তাই বুদ্ধের এ একটি বাক্য থেকে বুঝা যায় বিদর্শন ভাবনার যদি মুক্তির একমাত্র পথ হয় তাহলে আরম্ভ শমথ ভাবনা দিয়ে করলে বিশুদ্ধভাবে আরম্ভ হলো কি? মুক্তি মার্গ বা নির্বাণ লাভ হবে কি? আবার যারা শমথ ভাবনার মাধ্যমে শুরু করে মুক্তি পেতে চান, তাঁদের জন্যও সে সময় অতীত হয়ে গেছে। অর্থাৎ পটিসম্ভিদা মার্গসহ অর্হত্ব ফলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর এক হাজার বৎসর পার হয়ে ২৫৫২ বৎসরে পৌঁছেছে। কাজের বুদ্ধের বিভিন্ন সময়ের উক্তি থেকে জানা যায় সরাসরি শমথ ভাবনা করেও নির্বাণ লাভ সম্ভব নয় এবং প্রথমে শমথ দিয়ে আরম্ভ করে পুনঃ বিদর্শনে আসা দুরুহ ব্যাপার। সে আলোচনার পরে আসা যাবে।

কুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করার পর মহর্ষি ভার্গব- এর আশ্রমে উপস্থিত হলেন। বিস্তীর্ণ বনরাজি, বিভিন্ন গাছগাছড়ার ভরা এ আশ্রম। সুনিবিড় এ একান্ত তপোবনে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন রকম শারীরিক অবস্থায় বেশ কয়েকজন অসাধারণ কষ্টে কৃচ্ছ সাধনায় ব্রত। তিনি ঘুরে ফিরে দেখলেন, কয়েক রাত অবস্থান করলেন এবং বুঝতে পারলেন এ সমস্ত আচরণে মনুষ্যে জন্মে বা স্বর্গে জন্ম গ্রহণ করা যায়। কিন্তু পুনরায় অপায়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়নি। কাজেই ইহা আচরণে দুঃখ মুক্তি স্থায়ীভাবে হচ্ছে না জেনে ঐ আশ্রম ত্যাগ করলেন। ঘুরে ঘুরে তিনি ঋষি আরাড় কালামের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। আশ্রম প্রধানের সাথে আলোচনা করে জানতে চাইলেন জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, শোক, সংক্লেশ ইত্যাদি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার স্থায়ী কোন পথ আছে কিনা। ঋষি তাঁকে সমস্ত আশ্রম ঘুরে ঘুরে দেখালেন, বুঝালেন এবং আচরণ করতে বললেন। কুমার সিদ্ধার্থ এখানে আচরণে প্রবৃত্ত হয়ে সব চাইতে উন্নততর ব্রহ্মলোকের আকিঞ্চানায়তন ধ্যান লাভ করলেন। এ আকিঞ্চানায়তন থেকে চ্যুত হয়ে পুনরায় কর্মপ্রবাহে প্রতিসন্ধি হবে তাই তিনি তাঁর এ লদ্ধ ধর্ম জ্ঞানে তৃপ্তি লাভ করতে পারলেন না। কেননা ইহা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অতীত কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে না মানুষকে। তিনি বুঝতে পারলেন এ ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞাতার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। তাই তিনি অনাসক্তভাবে আশ্রম থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ক্রমে তিনি কোশল রাজ্যের রাজধানী শ্রাবস্তীতে এসে পড়লেন। সেখানে ঋষি রামপুত্র রুদ্রকের কথা জানতে পেরে তাঁর আশ্রমে উপস্থিত হলেন এ আশ্রমে যা কিছু কর্মকান্ড আছে সবই তিনি ধীরে ধীরে আয়ত্ব করে নিলেন। তারপর ঋষির নিকট জিজ্ঞাসা করেলেন আর আছে কিনা। ঋষি বললেন এর অধিক কিছু নেই। এখানে সব চাইতে বেশী কিছু লাভ হল একত্রিশ লোকভূমির সর্বোপরি স্থান, আনেঞ্জা সংস্কার, ৮৪ হাজার কল্পকাল সুখ ভোগকারী আরূপ ব্রহ্মলোকের “নৈবসংজ্ঞানাসজ্ঞায়তন”। তার উপরে অধিক সুখ ভোখকারী অন্যা কোন স্থান চক্রবালে আর নেই। অথচ সে অরূপব্রহ্মলোক থেকে চ্যুত হয়ে আবরও অপায়ে প্রতিসন্ধি যোগ আছে। এখন রাজ কুমার সিদ্ধার্থ জানতে পারলেন যে, এখানে (নৈবসংজ্ঞানাসজ্ঞায়তন) ও উপধি নির্মূল হয় না, তা যতই সুক্ষ্ণ হোক না কেন উপধি থাকলেই তা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অধীন হবে। সুতরাং এ ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞাতার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। কাজেই এখানে থেকেই কোন লাভ নেই। তাই তিনি রামপুত্র রুদ্রকের আশ্রম থেকে বেড়িয়ে পড়লেন নির্বাণ লাভের পথ অম্বেষণে।

রাজকুমার সিদ্ধার্থ শমথ ভাবনা আচরণ করে বুঝতে পারলেন যে, এ সমস্ত আচরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখলে জন্মতা বিফলে যাবে। কৃচ্ছ সাধন ও শমথ ভাবনা আচরণে নিজের শরীর এবং সময় নষ্ট হয়ে গেল অনুভব করে আসল দুঃখ মুক্তির পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। এখানে শমথ ভাবনা কি এবং তার আচরণটা কি রকম তা একটু আলোচনা করা যাক।
শমথ ভাবনা চল্লিশ প্রকার, যথা, দশ প্রকার কৃৎস্ন, দশ অশুভ, দশ অনুস্মৃতি, চারি অপ্রমেয়, এক সংজ্ঞা, এক ব্যবস্থান এবং চারি অরূপ ধ্যান স্তর।

দশ কৃৎস্ন- পৃথিবী কৃৎস্ন, আপ কৃৎস্ন, তেজ কৃৎস্ন, বায়ু কৃৎস্ন, নীল কৃৎস্ন, পীত কৃৎস্ন, লোহিত কৃৎস্ন, অবদাত কৃৎস্ন, আকাশ কৃৎস্নও আলোক কৃৎস্ন।
দশ অশুভ- উদ্ধস্ফীত, বিনীলক, পূঁজপূর্ণ, ছিদ্রীকৃত, বিখাদিত, বিক্ষিপ্ত, কর্তিত-বিক্ষিপ্ত, রক্তাক্ত, কীটপূর্ণ ও অস্তিপূঞ্জ।
দশ অনুস্মৃতি- বৃদ্ধানুস্মৃতি, ধর্ম্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি, উপশমানুস্মৃতি, মরনানুস্মৃতি, কায়গতানুস্মৃতি ও আনাপান স্মৃতি (শ্বাস প্রশ্বাস)।
চারি অপ্রমেয়- মৈত্রী, করুণা, মুদিতাও উপেক্ষা।
এক সংজ্ঞা- ভক্ষ্য দ্রব্যের ঘৃণাকর পরিণতি সম্বন্ধে জ্ঞান।
এক ব্যবস্থান- দেহস্থ কঠিন, তরল, উষ্ণ ও বায়বীয় সম্বন্ধে জ্ঞান ও অশুচি ভাবনা।
চারি অরূপ- আকাশানান্তায়তন, বিজ্ঞানান্তয়াতন, অকিঞ্চানায়তন ও নৈবসংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন।
এরূপে চল্লিশ প্রকার শমথ ভাবনার চল্লিশটি কর্ম্মস্থান। চল্লিশটি কর্ম্মস্থানের মধ্যে চরিত ভেদে বিভিন্ন কর্ম্মস্থানের উপযোগিত বিদ্যমান। যেমন-
() রাগ চরিত পক্ষে- দশ অশুভ ও কায়গতানুস্মৃতি নামক কোষ্ঠাংশ ভাবনা।
() দ্বেষ চরিতের পক্ষে- নীলাদি চারিবর্ণ, কৃৎস্ন এবং চারি অপ্রমেয়।
() মোহ চরিত ও বিতর্ক চরিতের পক্ষে- আনাপান স্মৃতি।
() শ্রদ্ধা চরিতের পক্ষে- বুদ্ধানুস্মৃতি ইত্যাদি ছয় অনুস্মৃতি।
() বুদ্ধি চরিতের পক্ষে- মরনানু, উপশমানু, সংজ্ঞা, ব্যবস্থানাদি অনুকুল ভাবনা।
() মোহ চরিত ও ক্ষুদ্রাকার বিতর্ক চরিতের পক্ষে- কৃৎস্ন মন্ডলের নির্বাচনে পৃথুল (স্থুল) উপযোগী।
অবশিষ্ট কর্ম্মস্থান সকলের পক্ষে উপযোগী।
চল্লিশটি কর্ম্মস্থানে পরিকর্ম ভাবনা লাভ করা যায়। বৃদ্ধানুস্মৃতি, ধর্ম্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি, উপশমানুস্মৃতি, মরনানুস্মৃতি, আহার অশুভ সংজ্ঞা এবং ধাতু ব্যবস্থান এই দশটি কর্মস্থানে উপাচার ভাবনা লাভ করা যায়। অবশিষ্ট ত্রিংশ কর্মস্থানে অর্পনা ভাবনা লাভ করা যায়।
আবার দশ অশুভ ও কায়গতানুস্মৃতি ভাবনা দ্বারা প্রথম ধ্যান লাভ হয়।
মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা দ্বারা চতুর্থ ধ্যান লাভ হয়।
দশ কৃৎস্ন, আনাপান ও উপেক্ষা ভাবনা দ্বারা পঞ্চম ধ্যান লাভ হয়।
চারি অরূপ ধ্যান ও দশ উপাচার ধ্যান ব্যতীত বাকী ছাব্বিশটি কর্মস্থান রূপলোকের ধ্যান উৎপন্ন করে। এ সমস্ত গুলি শমথ ধ্যানের লাভ, নিবৃত্তি বা নির্বাণের লাভ এতে নেই।
যদি কেহ শমথ ভাবনার মাধ্যমে শুরু করে নির্বাণ লাভ করতে চেষ্টা করেন তবে উপরোক্ত ত্রিংশ কর্মস্থানের যে কোন একটা কর্মস্থানে ভাবনার দ্বারা প্রথম থেকে পঞ্চম ধ্যানিক কর্মস্থানের কাজ সমাপনান্তে পুনরায় বিদর্শন ভাবনার নিমজ্জিত হও। ভাবনার দ্বারা হয়ত অরহত নয়তোবা অনাগামী লাভ হয়। যার নাম প্রতিসম্ভিদা মার্গ যা বর্তমানে লাভ সম্ভব নয়। প্রতিসম্ভিদা জ্ঞান লাভ হয় বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর এক হাজার (১০০০) বৎসর পর্যন্ত। বর্তমানে বুদ্ধের পরিনির্বাণ হয়েছে আড়াই হাজার (২৫০০) বৎসর অতীত হয়ে গেছে। সে হিসেবে বুদ্ধের নিয়মে তৃষ্ণা ক্ষয় করে মার্গফল লাভ করার যথেষ্ট সুযোগ বিদ্যমান।
ভগবান বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর প্রথম বারাণসীর নিকটবর্তী ঋষিপতন মৃগদাবে পঞ্চ বর্গীয় শিষ্য কৌন্ডিণ্য , বপ্প, ভদ্দিয়, মহানাম ও অশ্বজিতকে উপদেশ সহকারে দেশনার বলেছিলেন,হে ভিক্ষুগণ নির্বাণকামী ব্রতচারী দুই অন্তের অনুশীলন করবে না, প্রথম কাজে কম সুখোদ্রেকের প্রতি অনুরক্তি, যা হীন, গ্রাম্য, ইতর সাধারণের সেবা, অনার্য জনোচিত ও অনর্থকর, দ্বিতীয়/ আত্ম নিগ্রহে অনুরক্তি যা দুঃখ দায়ক, নিকৃষ্ট ও অনর্থকর। এ দুই অন্ত বর্জন করে তথাগত মধ্যম প্রতিপদ বা মধ্যমপন্থা, অভিসম্ভোদি জ্ঞান লাভ করেছেন যা চক্ষুকরনী ও জ্ঞান করনী এবং যা উপশমা অভিজ্ঞ, সম্ভোদি ও নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গিই সে মধ্যম প্রতিপদ। যথা সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি।
এ দেশনার পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের মধ্যে কৌন্ডিণ্য ধর্ম চক্ষু লাভ করেন। অর্থাৎ মার্গফল লাভ করেন, জগতে প্রথম স্রোতাপন্ন মানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সে দেশনায় আঠার কোটি দেব, ব্রহ্মা ধর্ম চক্ষু লাভ করেন। মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাতে অন্য কিছুই প্রয়োজন হয়নি। এখনও এরকম মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। আবার অন্তিম সময়ে অর্থাৎ বুদ্ধের পরিনির্বাণের সময় কুশীনগরে মল্লদের শালবনে পরিব্রাজক সুভদ্রকে বললেন, হে সুভদ্র! যে ধর্ম বিনয়ে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গেই উপলদ্ধি নেই (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নেই) প্রথম শ্রমণও তথায় নেই, দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, এবং থাকতে পারেনা। সুভদ্র! যে ধর্ম বিনয়ে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের উপলদ্ধি আছে, (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ আছে) প্রথম শ্রমণও তথায় আছে, তথায় দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রমণও আছে, তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমণও আছে, চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমণও আছে। হে সুভদ্র! ঊনত্রিশ বৎসর বয়সে আমি সর্বজ্ঞাতা জ্ঞান লাভ করার জন্য প্রব্রজিত হয়েছিলাম। যখন আমি প্রব্রজিত হই, সেদিন হতে এখন পর্যন্ত ৫১ বৎসর পর্যন্ত আমি আর্য মার্গ ধর্মের প্রদেশে বিদর্শন মার্গ প্রবর্তন করেছি। ইহার মধ্যে প্রথম শ্রমণ (স্রোতপন্ন) আছে, ‍দ্বিতীয় শ্রমণ (সকৃদাগামী) আছে, তৃতীয় শ্রমণ (অনাগামী) আছে এবং চতুর্থ শ্রমণ (অর্হৎ) আছে। ভগবান বুদ্ধের এ অন্তিম বাণীতেই আছে যে, ‍বিদর্শন মার্গ ছাড়া অন্য কোন মার্গ নেই মুক্তি লাভের জন্য। তাহলে আমরা কেন অন্য পথে যাওয়ার চেষ্টা করব? বুদ্ধত্ব লাভ করার পূর্বে সিদ্ধার্থ কৃচ্ছ সাধন, শমথ ভাবনা ইত্যাদি অনেক কিছু দেখেছেন ও আচরণ করেছেন। তা সবই ত্যাগ করে নির্বাণ লাভ করার পথ আবিস্কার করেছেন। প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রেও পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন একমাত্র আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথের নির্বাণ লাভ হবে। অন্য কোন বিকল্প পথ নেই। ইহা ছাড়া বুদ্ধের ধর্ম আচরণ করা, ধর্মে উন্নত হওয়া ও সাফল্য অর্জন করা- স্থান, কাল, পাত্রভেদে অকালিক।

ফ্যাসিবাদ।

 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে...