শনিবার, ১২ আগস্ট, ২০১৭

বুদ্ধ ধর্মের প্রভাব:প্রেক্ষিত ইন্দোনেশিয়া।


লিখেছেনঃ প্রফেসর ড. জিনবোধি ভিক্ষু
বুদ্ধধর্মের প্রভাব : প্রেক্ষিত ইন্দোনেশিয়া
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় শতাব্দী। রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্ম,সংসারত্যাগ,ষড়বৎসর কঠোর তপস্যা,বুদ্ধ জ্ঞানপ্রাপ্তি এবং মানবকল্যাণে তাঁর লব্ধজ্ঞানের সদ্ধর্মবাণীর প্রচার ও প্রসার সত্যিই অভিনব এবং বিস্ময়কর বিষয়। মানবতা,মানবপ্রেম এবং মনুষ্যত্বের নবতম জাগরণের মাধ্যমে গৌতম বুদ্ধ সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে অভূতপূর্বভাবে সাড়া জাগিয়ে ছিলেন। আধ্যাত্মিক জ্ঞানসাধনা এবং মানবতাবাদের উন্মেষে রাজা,মহারাজা,শ্রেষ্ঠী,ধনী,মধ্যবিত্ত,সাধারণ এবং অতিসাধারণ বিশেষত সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এই শতাব্দীতে ভারতের পারিবারিক,সামাজিক,রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয়ভাবে পরিবর্তন সূচিত হয়। এ মহাজাগরণ শুধুমাত্র সমগ্র ভারতবর্ষকে প্রভাবিত করেননি বহির্ভারতকেও বিপুলভাবে আলোড়িত করে।
তথাগত বুদ্ধের জীবদ্দশাতে তাঁর বাণীর ব্যাপক প্রচার ঘটে মহামতি ধার্মিক রাজা বিম্বিসার, রাজা প্রসেনজিৎ,কোশল রাজা,উদয়ন রাজা,রাজা অজাতশত্রু,বৎসরাজ,অবন্তিরাজ,রাজা প্রদ্যেৎ,গান্ধাররাজ,শাক্যরাজ শুদ্ধোধন,শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক,ধনঞ্জয় শ্রেষ্ঠী,বিশাখা প্রমুখ অসংখ্য আত্মত্যাগী,উদার ও মহৎপ্রাণ ব্যক্তিবর্গের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতায়। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মৌর্য সম্রাট অশোক খ্রিষ্টপূর্ব (পৃ. ২৭৩-২৩২) তাঁর পরাক্রমশালী পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত এবং পিতা বিন্দুসারের অর্জিত সুবিস্তৃত রাজ্য লাভ করে উক্ত রাজকার্য পরিচালনা করতে সচেষ্ট ছিলেন। তথাগত বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের ২১৮ বৎসর পর মহামতি অশোকের রাজ্য লাভ ও বুদ্ধধর্ম গ্রহণ সত্যিই একটি অভূতপূর্ব পরিবর্তন সূচিত হয়। অশোক তথাগত বুদ্ধের বহুজন হিতায়,বহুজন সুখায় এ মহান অহিংস ও মানবকল্যাণজনক সদ্ধর্ম বাণীকে সমগ্র ভারতবর্ষে ও বহির্বিশ্বে প্রচার করতে উদ্যোগী হন। বলা বাহুল্য বুদ্ধের অপ্রমেয় মৈত্রীর মূল বাণী তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পৃথিবীতে অন্যতম ধর্মরূপে প্রচারিত হয়। তাঁর (অশোকের) এই মহৎ কার্যক্রমের প্রভাবে সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে মহামতি সম্রাট অশোকের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে এবং থাকবে। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে অনুশাসন লিপিগুলো পাঠ করলে অবগত হওয়া যায় যে,বুদ্ধের ধর্ম গ্রহণ করেই ধর্মযাজকরূপে তিনি সর্বপ্রথম বুদ্ধের বাণী প্রচারে রত হন (বুদ্ধধর্মের ইতিহাস,ড. মনি কুন্তলা হালদার (দে) মহাবোধি সোসাইটি,কলকাতা ১৯৯৬ পৃ. ৩৬১)। সিংহলী ইতিবৃত্ত দীপবংশ ও মহাবংশে বর্ণিত আছে যে,তাঁর সময়কালেই তৃতীয় বৌদ্ধ মহাসংগীতি আহ্বান করা হয় এবং সংগীতির পরিসমাপ্তির পর সভাপতি মহামোগ্গলিপুত্ত তিস্সের পরামর্শে বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি (অশোক) নয়টি স্থানে ধর্মদূত প্রেরণ করেন। (দীপ,৮ম পৃ. ১-১৩,মহা ১২শ,পৃ. ৩-১০)। বস্তুত সম্রাট অশোক বুদ্ধের ধর্ম পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃতির জন্য তাঁর সর্বস্ব সমর্পণ করেছিলেন। এ ছাড়াও গুপ্ত,কুষান,কনিষ্ক এবং পাল যুগের রাজাদের বদান্যতাও ছিল যথেষ্ট। পাল রাজাদের সমকালকে বুদ্ধধর্মের জাগরণের সুবর্ণ যুগ বলা হয়। বঙ্গদেশে এবং অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন জ্ঞানতীর্থ ও স্থাপত্য শিল্পকলা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের অসংখ্য বিদ্যার্থীদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান চর্চার সুযোগ প্রদান করে বিরল ভূমিকা রেখেছিলেন। যা বিশ্বের সভ্যতার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় অমর স্মৃতি বহন করে আছে। আলোচনার সুবিধার্থে বহির্বিশ্বে বুদ্ধের ধর্মের বিস্তারের ইতিহাসকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। যথা : (ক) দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বুদ্ধের ধর্মের ইতিহাস ও (খ) উত্তর ও উত্তর পূর্ব এশিয়ার বুদ্ধের ধর্মের ইতিহাস। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য,বুদ্ধধর্ম যেরূপে দক্ষিণে সিংহল (শ্রীলংকা),ব্রহ্মদেশ (মায়ানমার),শ্যামদেশ (থাইল্যান্ড),কম্বোডিয়া (কম্পুচিয়া),চম্পা (ভিয়েতনাম),ইন্দোনেশিয়া (জাভা,সুমাত্রা,বালি ও বার্ণিও) ইত্যাদি দেশের নাম উল্লেখযোগ্য)। উত্তর অর্থাৎ মধ্য এশিয়া (কাশগড়,কুছ,টারফান,খাটান) তিব্বত,চীন,কোরিয়া,জাপান,মঙ্গোলিয়া ইত্যাদিতে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
* মধ্যন্তিক স্থবিরকে-কাশ্মীর গান্ধার (কাশ্মীর অঞ্চল),গ্রীকবাসী মহারক্ষিত স্থবিরকে গ্রীকদেশে (সিরিয়া,মিশর,কাইরিনি,ম্যাসিডোনিয়া,ইপাইরাস প্রভৃতি),মধ্যম স্থবিরকে হিমালয়ের পার্বত্য দেশসমূহে,গ্রীক অধিবাসী ধর্মরক্ষিত স্থবিরকে অপরান্তিক রাজ্যে,মহাধর্মরক্ষিত স্থবির মহারাষ্ট্রে,মহাদেব স্থবিরকে মহিশূর অঞ্চলে,রক্ষিত স্থবিরকে কানাডা বা কর্ণাটক রাজ্যে,সোন ও উত্তর স্থবিরকে সুবর্ণভূমি বা বর্তমান মায়ানমারে এবং মহেন্দ্র ও সংঘমিত্রাকে তাম্রপর্ণি বা বর্তমান শ্রীলংকায় (বুদ্ধধর্মের ইতিহাস,প্রাগুপ্ত,পৃ. ৩৬১)।
* এ ছাড়াও অপরাপর অনুশাসনগুলো হতে জানা যায় যে,চোলদেশে (মাদ্রাস),পান্ডা (মাদুরাই),সত্যপুরা (সাতপুর পর্বত শ্রেণী),কেরল (ত্রিবাংকুর),সিরিয়ার গ্রীকরাজ এন্টিয়োকাসের রাজ্যেও সমগ্র ভারতবর্ষ ও আফগানিস্তান,বেলুচিস্তান,দক্ষিণ হিন্দুকূশ প্রভৃতি রাজ্য সম্রাট আশোকের সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল (বৌদ্ধ,পৃ. ৩৬২)। তাঁর ধর্মদূতগণ মিশর,এপিরণ,মেসিডন ও সিরিণের গ্রীক নৃপতিগণের নিকটেও গিয়েছিলেন (ঐ,৩৬২)।
বর্তমান নিবন্ধে ইন্দোনেশিয়ার বুদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার ইতিবৃত্ত উল্লেখ করলে তন্মধ্যে জাভা,সুমাত্রা,বালিও বোর্ণিও-এর পরিচিতিকে বাদ দেয়া যায় না বরং সেইগুলো আরো গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা প্রয়োজন।
ইন্দোনেশিয়ার আর এক নাম ছিল ইনসুলিন্দা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট-বড় প্রায় তিন সহস্র দ্বীপ অর্থাৎ অন্যতম বৃহৎ দ্বীপ-পুঞ্জ নিয়ে এই দ্বীপরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেকের মতে ইন্দোনেশিয়াকে সাগরকন্যা নামে অভিহিত করা হয়। জাভা,সুমাত্রা,বালিও বোর্ণিও প্রভৃতি দ্বীপ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া গঠিত। প্রাচীনকালে ভারতের সাথে এ দ্বীপগুলোর বাণিজ্যিক,রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় যোগাযোগ ছিল খুবই নিবিড়। ফলে ভারতীয় সংস্কৃতির অধিক প্রভাব পড়ে। তাই এ দ্বীপগুলোকে দ্বীপময় ভারত বলা হয়। ইন্দোনেশিয়ার আয়তন ১৯,২২,৫৭০ বর্গ কি.মি.,লোকসংখ্যা ২১,৯৮,৮৩,০০০ জন। এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটেনিকা থেকে জানা যায় ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের লোক গণনা অনুযায়ী বৌদ্ধদের সংখ্যা ২৩,৩৩,০০০ জন (শতকরা ৩ জন)। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের গণনা অনুসারে বৌদ্ধদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ মিলিয়ন। বর্তমানে এর সংখ্যা আরও অধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরক্ষরেখার উভয় পাশে মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে অবস্থিত ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপপুঞ্জ। পূর্ব-পশ্চিমে ৫,০১২ কিলোমিটার বিস্তৃত। তিন সহস্রাধিক ক্ষুদ্র ও বৃহৎ দ্বীপ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া রাষ্ট্র গঠিত। বৃহৎ দ্বীপগুলোর মধ্যে সুমাত্রা,জাভা,বালি,সেলিবিস,মাদুরা, লম্বক, দক্ষিণ বোনিও এবং পশ্চিম তিমুর অন্যতম। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর-এর প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে বৃহত্তর মুসলিম রাষ্ট্র।
ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতে খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতকে ভারতীয়রা এখানে বসতি স্থাপন করে। বৌদ্ধ প্রখ্যাত গ্রন্থ ‘মিলিন্দ প্রশ্নে’বাণিজ্যের জন্য সুবর্ণ ভূমি যাওয়ার কথা আছে। কাশ্মীরের রাজা মিলিন্দ বা মিনান্দার ছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতকের লোক। তিনি বুদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কারো মতে সুবর্ণ ভূমি বার্মা হলেও রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতে সুমাত্রা,জাভা (যাভা) বোর্ণিও প্রভৃতি দেশই সুবর্ণভূমি (সুবর্ণদ্বীপ)। প্রথমে এখানে মূল সর্বাস্তিবাদ ও সস্মিতীয় মতবাদ প্রচারিত হয়েছিল,পরে মহাযানী মতবাদ প্রাধান্য পায়।
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন এবং ভিন্ন মতবাদ ইন্দোনেশিয়ায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীতে ইন্দোনেশিয়া বুদ্ধের ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়। সপ্তম শতাব্দীতে নালন্দার প্রখ্যাত শিক্ষাগুরু ধর্মপাল দক্ষিণ ভারতের ভিক্ষু বম্রবোধি তাঁর শিষ্য সমোক ইন্দোনেশিয়ায় পরিভ্রমণ করেন। অষ্টম শতাব্দীর শেষ দিকে ইন্দোনেশিয়ায় মহাযান বৌদ্ধমতের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত হয় এবং তা হয় শৈলেন্দ্র রাজাদের (যাঁরা এই দ্বীপের অধিকাংশ শাসন করেছিলেন) পৃষ্ঠপোষকতা। তাঁদের রাজত্বকালে তারাদেবীকে উৎসর্গ কৃত কালসন (৭৭৯ খ্রি.) নির্মিত হয়। শৈলেন্দ্ররা কেন্দ্রীয় জাভার বরবুদুর বিশাল স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। তারা নাগাপটন এবং নালন্দায়ও বিহার নির্মাণ করান। ইন্দোনেশিয়ার যে সব এলাকায় বুদ্ধের ধর্ম প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল সে সম্পর্কে ও সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়া সমীচীন মনে করি।
জাভা : ইন্দোনেশিয়া যে সব দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত তন্মধ্যে জাভা অন্যতম একটি দ্বীপ নামে অভিহিত। গ্রীক পর্যটক টলেমি যাঁর সময়কার খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী বলা হয়,তিনি জাভাকে ভারতীয় নামে যথা,জবডিয়ান বা যবদ্বীপ বলে উল্লেখ করেছেন (Hindu coloniesin the for east p.22)| কথিত আছে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর পরে জাভায় বুদ্ধের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত স্থানে পঞ্চম শতাব্দীর চারটি সংস্কৃত লিপি পাওয়া গিয়েছে যাতে প্রাচীনকাল হতেই পশ্চিম জাভায় হিন্দু বসবাসকারীদের উল্লেখ রয়েছে (Ibid p.22)| মধ্য জাভাতেও অপর হিন্দু ও ঔপনিবেশের উল্লেখ পাওয়া যায় যা চীনা বিষয়গুলোতে জো-লিংবা কলিঙ্গ বলে বর্ণিত (Ibid)| উপরন্তু বিভিন্ন জাভায় বর্ণনাগুলো হতে জানা যায় যে উক্ত স্থানে বুদ্ধধর্ম প্রথম বিস্তার লাভ করে চতুর্থ শতাব্দীতে বা এরও পরবর্তী অব্দে (BIA.P.211)| অপরদিকে পঞ্চম শতকে প্রখ্যাত চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদের জাভাতে হিন্দুধর্মের প্রাধান্যের কথাই বর্ণনা করেছেন যদিও বুদ্ধধর্মের ক্ষীণ প্রচলনের কথাও তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে উল্লেখ আছে। (Ibid.p.212)| অতঃপর ইৎসিং-এর জাভা পরিভ্রমণের অল্প কিছুকাল পরেই কাশ্মীরের (কি-পিন) রাজপুত্র গুণবর্মণ জাভাতে গমন করে তথায় অবস্থান করেন অর্থাৎ তিনি রাজবংশের সন্তান ছিলেন। কথিত আছে গুণবর্মণ ত্রিশ বৎসর বয়সে সিংহলে গমন করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ ও বুদ্ধের ধর্ম দর্শন শিক্ষা করেছিলেন। পরবর্তীকালে ভারতে প্রত্যাবর্তন করে নিজ মাতাকে বুদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেন (Ibid, p.212)| যা হোক,গুণবর্মণের এই দ্বীপ পরিভ্রমণে এসে তারই প্রভাবে ক্রমশ জাভার রাজা,রাজমাতা ও তথাকার জনসাধারণও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হয়ে পড়েন। গুণবর্মণের খ্যাতি বুদ্ধধর্মের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকরূপে চীনদেশ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। চীনা বিবরণীতে পাওয়া যায় যে,চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অনুরোধে চীনা সম্রাট গুণবর্মণকে নিজরাজ্যে আমন্ত্রণ জানান এবং গুণবর্মণও ৪৩১ অব্দে জাভা হতে চীন দেশের নরকিনে গমন করেন (Ibid, 212)| গুণবর্মণ মূল সর্বাস্তিবাদ-সমপ্রদায়ের প্রচারক ছিলেন এবং জাভাতে তার উদ্যোগেই মূল সর্বাস্তিবাদ অত্যন্ত শক্তিশালী ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে (ibid 2500 years p. 94)| তাঁর কঠোর প্রচেষ্টায় এই মতবাদ জাভা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে তীব্র প্রভাব বিস্তার চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন পঞ্চম শতাব্দীতে তাম্রলিপ্ত হয়ে জাভায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে বুদ্ধধর্মের প্রভাব লক্ষ করেছিলেন। তৎকালে বঙ্গদেশের তাম্রলিপ্ত বন্দর ছিল বুদ্ধধর্মের কেন্দ্র। এ বন্দর দিয়েই ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ চলত। মালয়ের অন্তর্গত ওয়েলেসরি ও কেডাতে প্রাপ্ত তাম্রশাসন থেকে জানা যায় চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দীতে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা গিয়ে মারা উপদ্বীপে বুদ্ধধর্ম প্রচার করেন। তাম্রশাসনে বুদ্ধগুপ্তের নাম উল্লেখ আছে। তিনি সম্ভবত গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাটই হবেন। যা হোক,বলা বাহুল্য যে গুণবর্মণের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বুদ্ধধর্ম সমগ্র জাভায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় (Ibid;Ibid)| পরবর্তীকালে মধ্য ও পশ্চিম জাভা শ্রী বিজয়ের শৈলেন্দ্র বংশীয় রাজাগণ অধিকার করলে সমগ্র দেশে মহাযান বুদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে। কারণ শৈলেন্দ্রগণ একনিষ্ঠ মহাযান ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন (Ibid)| তথায় প্রথমে সর্বাস্তিবাদ এবং পরে মহাযান ধর্মমত প্রতিষ্ঠিত হয়। সুমাত্রা দ্বীপে প্রাচীনকাল থেকেই বুদ্ধধর্মের অস্তিত্ব ছিল (2500 years. p.94)| সুমাত্রা যা বিদেশি বিবরণে পালেমবাং নামে সুপরিচিত ছিল তা প্রধানত শ্রী বিজয়ের শৈলেন্দ্রবংশীয় রাজগণের প্রভাবেই বৌদ্ধরাষ্ট্রেরূপ লাভ করে। পালেবমাং এ ৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দের একখানি লেখ আবিষ্কৃত হয়েছে যে স্থলে জয়নাম নামক শ্রীবিজয়ের এক শাসনের নামোল্লেখ রয়েছে যিনি ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন বলে জানা যায় Ibid.p.94| অষ্টম শতাব্দীতে সুবর্ণদ্বীপে বুদ্ধধর্ম নূতন আঙ্গিকে এর বিজয় ঘোষণা করে প্রবল পরাক্রান্ত শৈলেন্দ্র রাজার উত্থানে। বিশেষভাবে সুমাত্রাই তাদের প্রধান শাসনকেন্দ্র ছিল এবং কয়েক শতাব্দী ধরেও তাদের আধিপত্য বিস্তৃত ছিল। শৈলেন্দ্র রাজারা বৌদ্ধ মহাযান মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। সে সময় অনেক সুন্দর সুন্দর অভিনব মন্দির ও মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭৮২ খ্রিষ্টাব্দে শৈলেন্দ্র বংশীয় রাজা তিলইন্দ্রের রাজত্বকালে গৌড়ের অধিবাসী রাজগুরু কুমারঘোষ সুবর্ণদ্বীপে গিয়ে এক মঞ্জুশ্রীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। সুমাত্রার রাজধানী শ্রীবিজয় বুদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। তখন পৃথিবীর প্রায় দেশের সাথে এর বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল এবং বণিকেরা এদের কৃষ্টি ও সভ্যতায় প্রভাবিত হত (প্রবন্ধসম্ভার,সলিল বিহারী বড়ুয়া,চট্টগ্রাম,১৯৯৮,পৃ. ৬৮)। অপরদিকে,চীনা পরিব্রাজক ইৎসিং দু’বার সুমাত্রা দ্বীপ পরিভ্রমণে গিয়ে তথায় বুদ্ধধর্মের জনপ্রিয়তা ও প্রসারতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। কেবলমাত্র তা নহে তিনি দক্ষিণ ভারতীয় মহাসাগরের অপর দশটি দ্বীপেও বুদ্ধধর্মের জনপ্রিয়তার কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন যে,থেরবাদ বা হীনযান সমপ্রদায়ের প্রাধান্যই দ্বীপগুলোতে বেশি ছিল। কিন্তু সুমাত্রা ও শ্রী বিজয়ের ছিল মহাযান ধর্মের প্রভাব (Ibid-p.94)| উপরন্তু তিনি বর্ণনা করেছেন যে,তিনি শ্রী বিজয়ের অবস্থান করে বুদ্ধধর্ম গ্রন্থ শিক্ষা করেছিলেন (Ibid p.94)|
সুমাত্রার বুদ্ধধর্মের ইতিহাসের অপর উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল,তথায় বহু বোধিসত্ত্বের মূর্তির আবিস্কার। এগুলো সুমাত্রায় মহাযান বুদ্ধধর্মের অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ। যদিও তথায় সংস্কৃতে রচিত বহু হীনযান বৌদ্ধগ্রন্থও পাওয়া গিয়েছে (Takakusu,pp-10-11)| যা প্রমাণ করে যে সুমাত্রায় হীনযানও একদা অস্তিত্বশীল ছিল। এই উভয় মতবাদের প্রভাব তখন খুব সামান্য ছিল,যা পরবর্তীকালে বিশেষত ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সূচিত হয়েছিল। এর প্রভাব এখনও বিদ্যমান আছে।
বোর্ণিও : ইন্দোনেশিয়ার সকল দ্বীপগুলোর মধ্যে বোর্ণিও হলো সর্বাপেক্ষা বৃহৎ দ্বীপ এবং দৃষ্টিনন্দন দ্বীপ। উক্ত স্থানেও বুদ্ধধর্মের নিশ্চিত বিস্তারের কথা জানা যায়। বোর্ণিওতে কয়েকটি স্থানে কতগুলো বুদ্ধমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। যথা : বোর্ণিওর কোটি জেলার কোটা বনগ্রাম নামক স্থানে গুপ্তযুগের একটি ব্রোঞ্জের মনোহর বুদ্ধমূর্তি পাওয়া গিয়েছে যা নিশ্চিতভাবে গুপ্ত শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন বহন করে (Takakusu,pp-10-11)| অপরদিকে,কোমবেং গুহার উল্লেখ করা যায়,যা ‘মুয়ারাকমন’নামক স্থানের উত্তরে অবস্থিত ছিল। উক্ত গুহাটি দুইটি কক্ষবিশিষ্ট ছিল। এর একটি কক্ষে বেলেপাথরের তৈরি একটি বুদ্ধমূর্তি পাওয়া গেছে (BIA-p.212 তুল : HSEA.P44)| (বোর্ণিও দ্বীপেও গুপ্তযুগে বুদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটেছিল) কিন্তু পরবর্তীকালে হিন্দুধর্মের বহুল প্রচারের সাথেই বোর্ণিওতে বুদ্ধধর্মের ক্ষীণভাব দেখা যায় (Hcfe.p.25)|
বালিদ্বীপ : জাভার পূর্বদিকের দ্বীপ বালিওতে বহু প্রাচীন কাল থেকেই হিন্দু উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। লিয়াং বংশীয় চৈনিক ইতিবৃত্ত হতে তা স্পষ্টত-ই প্রমাণিত হয় যে,বালি (যা চীনা নাম ছিল পো-লি) অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী ও সুসভ্য রাজ্য ছিল। উক্ত স্থানে হিন্দুরাজ বংশের পাশাপাশি বুদ্ধধর্মেরও অস্তিত্ব ছিল বলে বিভিন্ন উপাদানগুলোতে উল্লেখিত আছে। (Ibid.p.25)| ইৎসিং এও বর্ণনা করেছেন যে,কেবলমাত্র বালিতেই মূল সর্বাস্তিবাদ নিকায় বা সমপ্রদায়টি সর্বসাধারণের দ্বারা গৃহীত হয়েছিল (BIA.P.213)| চীনা বিষয়গুলোতে ষষ্ঠ শতাব্দীতে বালিদ্বীপে বুদ্ধধর্মের অস্তিত্ব উল্লেখ রয়েছে। উক্ত স্থানে লিপিবদ্ধ রয়েছে যে,এ বালিদ্বীপ থেকে ৫১৮ খ্রিষ্টাব্দে চীনরাজ্যে দূত প্রেরণ করা হয়েছিল। (HCFE.p.27)| ইন্দোনেশিয়ার বুদ্ধধর্মের ইতিহাস প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে,উক্ত স্থানে পঞ্চম শতাব্দী হতেই বুদ্ধধর্ম অন্যতম ধর্মরূপে পরিগণিত হয়েছিল এবং সপ্তম শতাব্দী হতে দশম শতাব্দী পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলো বুদ্ধধর্মের প্রসারতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্ররূপে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে,নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ধর্মপাল,দক্ষিণ ভারতীয় বৌদ্ধ আচার্যগণ যথা : বম্রবোধি,তাঁর শিষ্য সমোক সপ্তম শতাব্দীতে ইন্দোনেশিয়া গমন করেছিলেন। পুনরায় অষ্টম শতাব্দীর শেষার্ধ্বে রাজা শৈলেন্দ্রবংশীয়দের পৃষ্ঠপোষকতায় ইন্দোনেশিয়া বা সাধারণত সুবর্ণদ্বীপ বলে খ্যাত ছিল। তথায় বাঙালি জাতি তথা বৌদ্ধদের প্রখ্যাত দার্শনিক অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান প্রথম জীবনে এগার শতাব্দীতে সুবর্ণদ্বীপের সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিতাচার্য চন্দ্রকীর্তির নিকট ১২ বছর বুদ্ধধর্ম শিক্ষা করার জন্য গমন করেছিলেন (HCFE.p.27)| জাভার পূর্বদিকে বালিদ্বীপেও বুদ্ধধর্মের প্রসার ঘটেছিল। অতঃপর শৈলেন্দ্রবংশীয় রাজাদিগের উল্লেখ করা যায়,যারা ইন্দোনেশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলের রাজত্ব করেছিলেন। তাঁরা বুদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের রাজত্বকালে নির্মিত বিশালাকার বোরোবুদুরের মন্দির,কলসান,চণ্ডীমেণ্ডুল ইত্যাদি স্থাপত্য কলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো পাওয়া যায়। সেই সময় শৈলেন্দ্র রাজবংশের তথা সমগ্র ইন্দোনেশিয়ার সাথে ভারতবর্ষের অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বলপুত্রের শৈলেন্দ্ররাজ বলপুত্রদের বুদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবশত নালন্দায় ও নাগাপটন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বসবাসের নিমিত্তে যথাক্রমে পালরাজা ও চোল রাজদিগের রাজত্বকালে বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এর ভরণ-পোষণের জন্য তৎকালীন পালরাজ দেবপালকে পাঁচটি গ্রাম দান করার অনুরোধ করেন। দেবপাল সেই অনুরোধ রক্ষা করেন। বাংলার পাল রাজাদের সঙ্গে শৈলেন্দ্র রাজাদের নিবিড় যোগসূত্র ছিল। এ বিষয়ে অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাস জানার জন্য দুইটি মূল্যবান মহাযান গ্রন্থের উল্লেখ করা যায়,যথা : সং হ্যাং কমহয়নন মন্ত্রনয় (sang hyang kamahayanan Mantranaya) এবং সংহ্যা কমহয়নিকন (HCFE. 27. Sang hyang kamahayanikan)| উপর্যুক্ত মূল গ্রন্থ দুইটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত এবং তথায় বাংলাদেশির বুদ্ধধর্ম বা তান্ত্রিক বুদ্ধধর্ম নিয়ে আলোচনা রয়েছে (2500 years p.95276)|
শেষোক্ত গ্রন্থটিতে জাভার তান্ত্রিক রাজা কৃতনগরের ১২৫৪-৯২ অব্দ) বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে (2500 years P.95)|
ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিক পুণ্যতীর্থ হলো ‘‘বোরোবুদুর বুদ্ধ মন্দির’’। ইন্দোনেশিয়ার যোগযাকার্তায় ৪২ কি.মি. উত্তর পশ্চিমে এবং মাগেলাং ৫ কি.মি. দূরে দক্ষিণ গোলার্ধের সবচেয়ে বড় মনুষ্য নির্মিত বৌদ্ধ ধর্মীয় কীর্তি ‘বোরোবুদুর বুদ্ধ মন্দির’অবস্থিত। এ কীর্তিস্তম্ভটি ছয়টি চতুষ্কোণ প্লাটফরম হতে নির্মিত এবং উপরিভাগে পুনরায় তিনটি গোলাকার প্লাটফরম রয়েছে। ২৬৭২টি রিলিপ প্যানেল দ্বারা সজ্জিত ও ৫০৪টি বুদ্ধমূর্তি এখানে স্থাপন করা আছে। বোরোবুদুর বুদ্ধ মন্দির একটি টিলার উপর নির্মিত স্তূপ। এর নয়টি স্তর রয়েছে। এদের মধ্যে সর্বনিু স্তরের বিস্তার ৩৯৫ ফুট। শীর্ষে স্তূপটি রয়েছে। শীর্ষে উঠার জন্য চারিদিকে চারিটি সিঁড়ি রয়েছে। সেই সিঁড়ির মাঝে মাঝে তোরণ রয়েছে। উপরের তিনটি স্তরের ভূমি গোলাকার। শীর্ষ ধাতুচৈত্য স্তূপের ব্যাস ৫২ ফুট নিম্নের অন্যান্য স্তরের মধ্যে প্রত্যেকটি স্তরের পর এক একটি প্রদক্ষিণ পথ বা বারান্দা বা চংক্রমণ পথ রয়েছে। সব প্রদক্ষিণ পথ ঘুরে শীর্ষে উঠার দূরত্ব তিন মাইলেরও অধিক। পথের দু’ধারে রয়েছে দেয়াল। এই দেয়ালগুলোতে অসংখ্য পাথুরে বৌদ্ধ ভাস্কর্য রয়েছে। ডাচ্ পণ্ডিতেরা খোদিত চিত্রের প্রতিলিপি ডাচ্ ভাষায় ছাপিয়ে এদের ভূমিকাও বর্ণনা দিয়েছেন। এই সব দেয়ালে অঙ্কিত আছে বুদ্ধজীবনের ঘটনা,জাতকের কাহিনী,ললিত বিস্তার গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী খোদিত চিত্র ও ভাস্কর্য। এ ছাড়া প্রদক্ষিণ পথের মাঝে মাঝে দেয়ালের কুলঙ্গীতে বহু বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্ব মূর্তি রয়েছে। উপরের গোলাকার তিনটি স্তরে প্রত্যেকটির মাঝামাঝি স্তূপ রয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটির ভিতরে একটি করে ধ্যানাসনে উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। এই চৈত্যগুলোর গায়ে রুইতল তাসের আকারে ছোট ছোট ফাঁক রয়েছে। এই ফাঁকের মধ্যদিয়ে ভেতরে উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি দেখা যায়। সমগ্র স্তূপে বুদ্ধমূর্তির সংখ্যা হবে সুনীতি কুমার চট্টোপধ্যায় এর মতে ৫০০ এর উপর (দীপময় ভারত),নির্মল কুমার ঘোষের মতে ৪৩২টি (ভারত শিল্প,প্রবন্ধ সম্ভার- সলিল বিহারী বড়ুয়া,চট্টগ্রাম,১৯৯৯,পৃ: ৭৭)।
প্রধান গম্ভুজটি সবচেয়ে উঁচু প্লাটফরমে এবং স্তূপের ভিতর ৭২টি বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। প্রথম ১৬০টি খোদিত প্যানেলে চিত্রিত করে বর্ণনা করা হয়েছে,কামধাতু অর্থাৎ মানবের কামনা বাসনা,হাঁসি কান্না। পরবর্তী পাঁচটি স্তরে ১২০০টি খোদিত ভাস্কর্যের মাধ্যমে বুদ্ধের জীবনী ও ৪০টি বোধিসত্ত্বের জীবনীর মাধ্যমে পার্থিব কামনা বাসনা ও মোহ মুক্তির উপায় সম্বন্ধে বিশদভাবে রূপধাতুকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। সর্বোপরি তিনটি গোলাকার সমতল ছাঁদে ৭২টি স্তূপের প্রতিটিতে একটি করে বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। দেশি-বিদেশি তীর্থ যাত্রীদের উপরে উঠার সিঁড়ির ধাপ,বারান্দা,দেওয়াল,রেলিং ও স্তম্ভ ১৪৬০টি বর্ণনামূলক রিলিপ প্যানেল দ্বারা সজ্জিত। পূর্বদিকের প্রধান ফটক হতে প্রধান স্তূপ পর্যন্ত তীর্থ যাত্রীদের পাঁচ কি.মি. পথ অতিক্রম করার পথে বুদ্ধ ও বুদ্ধবাণীর ১৫০০টি রিলিপ প্যানেল রয়েছে (প্রবন্ধ সম্ভার,ডা: অনিল বড়ুয়া,চট্টগ্রাম,২০০৯,পৃ. ৩৮)। বোরোবুদুর স্তূপটি চতুর্ভূজ আকারবিশিষ্ট সমতল হতে উত্থিত হয়ে উপরিভাগ স্তূপাকৃতি। এর ভেতরে খালি স্থান নেই,উপরিভাগ আচ্ছাদনবিহীন,চতুর্দিক ও উপরিভাগ আকাশের দিকে উন্মুক্ত। নিুভাগের মেঝ চতুষ্কোণ ও প্রতিটি ভাগ ৩৭০ ফিট লম্বা। দ্বিতীয় ভাগ ২৩ (তেইশ) ফিট। এতে ৫টি ধাপ রয়েছে। প্রতিটি ধাপের আকার নীচ থেকে উপরের দিকে ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে গেছে। নিম্নের দিকে মানবের প্রতিদিনকার নিয়মিত ঘটনাবলী চিত্রাদিও ভাস্কর্য সম্বলিত। ‘ল অব কর্ম’বা কর্মফলকে বর্ণনামূলক চিত্রও ভাস্কর্য দিয়ে প্রতিফলিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে বুদ্ধের পূর্বজন্মের ঘটনাবলী সম্বলিত জাতকের গল্প ও সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবনীর উপর ১২০টি ভাস্কর্য (প্রবন্ধ সম্ভার,ডা: অনিল বড়ুয়া,চট্টগ্রাম,২০০৯,পৃ. ৩৯)।
এ বোরোবুদুর বৌদ্ধ স্থাপত্য ও শিল্পকলার ইতিহাসে বিস্ময়কর নয়নাভিরাম শিল্পকর্ম। বুদ্ধধর্মের একান্ত পৃষ্ঠপোষক শৈলেন্দ্র রাজাদের অবিস্মরণীয় শ্রেষ্ঠকীর্তি ‘বোরোবুদুর বুদ্ধ মন্দির’। আনুমানিক ৭৬০-৮৩০ খ্রিষ্টাব্দ এর নির্মাণকাল। এটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল কমপক্ষে আনুমানিক ৭৫ বছর। মধ্য জাভার শৈলেন্দ্র রাজবংশের সময় এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং শ্রী বিজায়ান মহারাজা সমুদ্রগুপ্তের শাসনামলে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়।
বোরোবুদুরের শিল্প সাধনার উৎকর্ষ হয়ে ও ভক্তির অপরূপ নিদর্শন দেখে বিভিন্ন মনীষী আবেগে আপ্লুত হয়েছে। বাংলা ভাষার গবেষক ও সাহিত্যিক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথসহ বোরোবুদুর দর্শন করে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখলেন,‘‘বোরোবুদুরের’’মতন বিরাট শিল্প নিকেতনের সৌন্দর্য সম্ভারের মধ্যে প্রাচীন ভারতের জীবন্ত প্রাণের স্পন্দনে সৃষ্ট এই অবিনশ্বর কীর্তির আবেষ্টনের মধ্যে দণ্ডায়মান ভারতের শ্রেষ্ঠ রসস্রষ্টাদের মধ্যে অন্যতম রবীন্দ্রনাথ;যে ভারতের বুদ্ধের সাধনায় অনুপ্রেরণার ফল এই বরবুদুর। এই শিল্পসম্ভার দেখে ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছিলেন ‘‘এই চৈত্যের শিল্পসম্ভার আর মোহনীয় গাম্ভীর্য আমাদের বৈচিত্রময় আর জটিলতাময় জীবনের মধ্যে বুদ্ধ আইডিয়া বা বুদ্ধ ভাবকেই প্রকাশ করছে’’(দ্বীপময় ভারত) তাই এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কবি লিখেছেন স্মরণীয় কবিতা বোরোবুদুর এখনও যা আমাদের প্রেরণার বিষয় হয়ে অন্তরে বিরাজ করছে। Dr. Vogel বলেছে ÔÔFrom an artistic point of view the Borobudur is invaluable on account of its sculptures which are aunsureassed in the east of their profusion and beautyÕÕ. বোরোবুদুরের এ অপূর্ব স্থাপত্য ও ভাস্কর্য কীর্তি শিল্পের জগতে পৃথিবীর মধ্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন ‘‘মূর্তিগুলোর সুঠাম গঠন গম্ভীর ভাব দ্যোতক গতিভঙ্গি ভারত শিল্পেও দুর্লভ।’’ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র বলেন “When we remember that the structure is nearly 400feet square and that its successive galleries are full of scultures and images of Buddha exhiviting the highest skill and workmanship we may well understand why Borobudur is referred to the eighth wonder of the world.” কুমার স্বামী লিখলেন,‘‘নিবাত আকাশের নিচে বোরোবুদুর যেন একটি সুপক্ক ফল,বিরাটত্বের মহিমা অপেক্ষা এর নিজস্ব সত্তার ঐশ্বর্যের প্রকাশই প্রধান (ভারত শিল্প)।” স্বামী সদানন্দ বলেন “This temple is wellknown for fine architectural beauty that hundreds of tourosts from all over the world visit Java simply to see the temple. It is one of the first temple ever constructed any country of the world.” আর ভারতের ইনফরমেশন-এ ব্রডকাস্টিং বিভাগের পরিচালক কর্তৃক প্রকাশিত The Way of Buddha বইতে মন্তব্য করা হয়েছে। The greatest of all Javanese monuments is however the Borabudur Stupa one of the wonders of the religious art of Asia’’ উন্মুক্ত আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা অনুপম সৌন্দর্য ও শিল্পকর্মের প্রতীক বোরোবুদুর এখনও সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে তার গুণ ও রূপ মহিমা প্রকাশ করছে। অতুলনীয় শিল্পকর্মের মাঝে বুদ্ধভাব প্রকাশ করলেও ইহা স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের জগতে এক অনুপম কীর্তি (প্রবন্ধ সম্ভার,১ম খণ্ড,সলিল বিহারী বড়ুয়া,চট্টগ্রাম,১৯৯৯,পৃ. ৭৭-৭৮)।
অতীব গৌরবের বিষয় শৈলেন্দ্র রাজবংশের রাজারা বুদ্ধের ও বুদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন। তাঁদের সময়ে নির্মিত বিশালাকার বোরোবুদুরের মন্দির,কলসান ও চণ্ডী মেণ্ডুত ইত্যাদি শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন। বোরোবুদুরের ঐতিহাসিক কীর্তিকলাপের সঙ্গে শৈলেন্দ্র রাজাদের অবদানমণ্ডিত গৌরবগাথা চির অম্লান হয়ে আছে যা প্রজন্মকে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা ও উৎসাহ যোগাবে সন্দেহাতীতভাবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ক্রমে ক্রমে বুদ্ধধর্মের প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে। তের শতকের শেষের দিকে সুমাত্রায় ও ষোল শতকে জাভায় মুসলিম প্রভাব-প্রতিপত্তি পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। চৌদ্দ থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে ইন্দোনেশিয়ায় বুদ্ধধর্ম অনেকটা ম্লান হয়। ঐতিহাসিক বোরোবুদুর বুদ্ধ মন্দির শত শত বৎসর জঙ্গল ও আগ্নেয়গিরির ভস্মে আবৃত ছিল। জাভা ১৮১১ খ্রিষ্টাব্দে শাসনাধীনে চলে যায় লেপটেন্যান্ট গভর্ণর জেনারেল ষ্টামফোর্ড রাফেলস ছিলেন জাভার গভর্ণর। তিনি জাভা পরিদর্শনকালে স্থানীয় অধিবাসীদের নিকট জানতে পারলেন,জঙ্গলের মধ্যেকার এই বোরোবুদুরের বুদ্ধ মন্দিরের বিবরণী। তিনি এইচ. সি. কর্ণেলিয়াস নামক এক ডাচ্ ইঞ্জিনিয়ারকে এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করার জন্য নিয়োগ করলেন। কর্ণেলিয়াস প্রায় দুই’শ লোক নিয়ে জঙ্গল পরিস্কার ও মাটি অপসারণ করে ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে এই দুর্লভ বোরোবুদুর মন্দির বা স্তূপ আবিষ্কার করেন এবং মানচিত্র ও অঙ্কিত চিত্রাদির মাধ্যমে গভর্ণরের নিকট বিবরণী পেশ করেন। এই কীর্তিস্তম্ভের আবিষ্কারের খবর বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই অঞ্চলের তখন শাসনকর্তা ছিলেন হ্যার্টম্যান। তাঁরই আন্তরিক সহযোগিতায় ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে কর্ণেলিয়াস সম্পূর্ণ স্তূপটি উদ্ধার করেন। উল্লেখ করেন যে,তিনি এক অত্যাশ্চার্য স্থাপত্য শিল্পও প্রধান স্তূপের বুদ্ধমূর্তিটি উদ্ধারে সক্ষম হয়েছেন। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে হ্যার্টম্যান প্রধান গম্বুজ উদ্ধারের ভূমিকা রাখেন তৎপর ডাচ্ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এফ,সি,উইলসনকে এ ব্যাপারে বিশদ তথ্যানুসন্ধানের জন্য নিয়োজিত করেন। তিনি ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে এক বিরাট বুদ্ধমূর্তি উদ্ধার করেন,যা অন্যান্য শতাধিক বুদ্ধমূর্তি সমান এই বিবরণী মোতাবেক সরকার ব্রহ্মাণ্ড নামক বিশেষজ্ঞকে স্তূপটি সম্পর্কে গবেষণাকাজের জন্য নিয়োগ দান করেন। তিনি ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে এই কাজ সমাপ্ত করেন (প্রবন্ধ সম্ভার,ডা. অনিল বড়ুয়া,চট্টগ্রাম,২০০৯,পৃ. ৩৯-৪০)। সরকার পুনরায় গ্রোয়েন ডেল্ট নামক এক প্রত্নতত্ত্ববিদকে দিয়ে সম্ভাব্যতা রিপোর্টের ভিত্তিতে কীর্তিস্তম্ভটিকে যথাযথ অবস্থায় রেখে নবরূপদানের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে অতীত ঐতিহ্য আবার মাথা তুলে দাঁড়াল। প্রকৃতপক্ষে ১৯০২ সালে ডাচ্ ইঞ্জিনিয়ার থোমাস বেন আরপ দ্বারা বৌদ্ধ সংস্কৃতির রেনেসাঁ শুরু হয়েছিল। বোরোবুদুরের সুবিখ্যাত ভাস্কর্য আবার মূর্ত হয়ে উঠল। নেদারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত তি,বোন,এন (অসীন জীনরক্ষিত) ইন্দোনেশিয়ায় বুদ্ধধর্ম পুনর্জাগরণের পথ প্রদর্শক ছিলেন। তিনি বার্মায় মহাসী সেয়াদের কাছে গিয়ে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। তিনি বার্মা থেকে এসে গ্রামে গিয়ে ত্রিশরণের মন্ত্রের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার বৌদ্ধ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৫৪ সালে মজলিস বুদ্ধসান ইন্দোনেশিয়া (MBI) নামে একটি বৌদ্ধ সংস্থা গঠিত হয়। এর পরিচালনায় হীনযান মহাযান ও তন্ত্রযান শিক্ষা দেয়া হয়। ১৯৫৯ সালে মাননীয় মহাসি সেয়াদ ভদন্ত জিনপুত্ত,ভদন্ত জিনপ্রিয়সহ বিদেশের ১৪জন ভিক্ষু ও ইন্দোনেশীয় ভিক্ষুদের নিয়ে “Sanghs Agung Indonesia” নামে অপর একটি সংস্থা গঠিত হয়। এ প্রতিষ্ঠান ইন্দোনেশিয়ায় বুদ্ধধর্ম প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে (প্রবন্ধ সম্ভার,১ম খণ্ড,সলিন বিহারী বড়ুয়া,চট্টগ্রাম,১৯৯৯,পৃ. ৬৯)। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ইন্দোনেশিয়া সরকার,জাতিসংঘের ইউনেস্কোর সাহায্যে ‘সেভ বোরোবুদুর কেমপেইন’এই শ্লোগানের মাধ্যমে কাজ শুরু করে। প্রায় বিশ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২৭টি দেশের পেশাদার লোকের সহায়তায় সুদীর্ঘ ১৫ (পনের) বছর কাজ করে নিু সমতল স্থানটির প্রতিটি প্রস্তর খণ্ড আবরণ মুক্ত করে পুন সংযোজনের কাজ সমাপ্ত করে। এই সময়ে প্রায় ১০ (দশ) লক্ষ প্রস্তর খণ্ড পরিস্কার ও আর্দ্রতারোধক ব্যবস্থা করার পর পুন স্থাপন করা হয়। ১,৫০০ খোদিত প্যানেলকেও এ সময়ে পুন সংযোজন করা হয়। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পূজা অর্চনা ও তীর্থযাত্রীদের জন্য সীমিতভাবে উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ৯ (নয়) টি বোমা বিস্ফোরণে ৯ (নয়) টি স্তূপ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে ২৭ মে এর ভূমিকম্পে ঐ অঞ্চলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ‘বোরোবুদুর বুদ্ধ মন্দির’অক্ষত থাকে (প্রবন্ধ সম্ভার,ডা. অনিল বড়ুয়া,চট্টগ্রাম,২০০৯,পৃ. ৩৯-৪০)। আরও স্মরণীয় যে,১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সকল বৌদ্ধ মতবাদের উপর ভিত্তি করে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় একটি বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা আন্তর্জাতিকভাবে বৌদ্ধবিশ্ব তথা ঐতিহাসিক এবং গবেষকদের সঙ্গে নূতন করে সংযোগ স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে আশা করি। অদূর ভবিষ্যতেও বুদ্ধধর্ম,সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্পের আরো বিস্তৃতি লাভ করবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় যে,ইন্দোনেশিয়ায় বুদ্ধধর্মের অনেক উত্থান পতন ঘটেছে। কখনো কখনো দেখা গেছে কোন কোন স্থানে বুদ্ধধর্মেও কয়েক শতাব্দীব্যাপী মহিমান্বিত রূপ,আবার কয়েক শতাব্দীব্যাপী অবদমিত রূপ। কিন্তু কখনই কোন স্থান থেকে বুদ্ধধর্মের অবলুপ্তি ঘটেনি। উপরন্তু বুদ্ধধর্মকেই ভিত্তি করে দেশ-বিদেশে যুগোপযোগী শিক্ষা,মুক্ত সংস্কৃতি,সভ্যতা,শিল্পকলা স্থাপত্য ও নানা অভিনব ভাস্কর্য গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় স্থবিরবাদ ও মহাযান বৌদ্ধ সমপ্রদায় মহামানব বুদ্ধের মহান আদর্শ ধর্মবাণীর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। এখানেই বুদ্ধের জীবনের সফলতা বলা যায়। দেশে ও বিদেশে বুদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসার সত্যিই অভিনব এবং শিল্পকলা স্থাপত্যের বিকাশেও ব্যাপকত্ব লাভ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার বুদ্ধধর্ম এরই ধারাবাহিকতায় এক অনন্যসাধারণ কীর্তি বহন করে চলেছে।
Reference books :
1. Hindu colonics in the Forest.
2. Buddhist india Rhys Davids T.W. Delhi-1971. London-1939
3. A History of South East Asia-D.a.Well London.1961.
4. Advance History of india- R.C.Mazumder
5. Buddhism-Christmas Humphreys-
6. Ancient india-Vidyadhar Mohajan.
7. The way of Buddha- Published by the Ministry of information and Broadcasting Govt. of India.
8. Bapat. P. V. (cd)-2500 years of Buddhism, Dclhi-1956
9. History of Indian and Indonesian Art-Coomarswamy.A.K. London-1927
10. Takakusu.J.A.(tr) A Record of the Buddhist Religion as practiced in India and the Malay Archipelago, (AD 671-695) by I-tsing, London-1904
11. Prabonda Samber, by- Salil Bihari Barua, Chittagong-1999
12. Prabonda Samber, by- Dr. Anil Barua, Chittagnog-2009
লেখকঃ প্রফেসর ড. জিনবোধি ভিক্ষু, অধ্যাপক,প্রাচ্য ভাষা বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,চট্টগ্রাম।

শুক্রবার, ১১ আগস্ট, ২০১৭

বৌদ্ধ মেয়েদের হিন্দু ও মুসলিম আসক্তি: কারণ ও প্রতিকার।


উপমহাদেশে হিন্দু ধর্ম পুনঃপ্রতিস্ঠা এবং ইসলাম ধর্ম বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার বৌদ্ধ মেয়ে বিবাহ এবং ধর্ষণ। ছলে-বলে-কৌশলে নিজ ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা তাদের সকল উদ্দেশ্য সাধনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। অতীতে রাজ্যহারা পরাধীন বৌদ্ধগণ জান-মালের ভয়ে, অস্ত্বিত্ব ও জীবন রক্ষার্থে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হত অথবা নির্যাতন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন বা মৃত্যুকে স্বীকার করে নিত। বর্তমানে দ্বিতীয় ঘটনাটার পুনরাবৃত্তি মাঝে মাঝেই ঘটে। কিন্তু অবাক হতে হয়, বৌদ্ধ ছেলে-মেয়েরা তাদের নিজেদের ধর্ম বা ইসলামও হিন্দু ধর্ম কোনটা সম্পর্কেই সুস্পষ্ট ধারণা না রেখেই স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হচ্ছে। কি সেই আকর্ষণ আর কেনই বা বৌদ্ধ মেয়েরা মুসলিম ও হিন্দু ছেলেদের প্রতি এত আকৃষ্ট হচ্ছে?
কারণঃ কেন আসক্ত হচ্ছে?
১. ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জ্ঞান শূন্যতা
নিজের ধর্ম সম্পর্কে বৌদ্ধ যুবক-যুবতীগণ একেবারেই অজ্ঞ। তাদের পরিবার থেকে যথাযথ ধর্মীয় জ্ঞান তাদের দেওয়া হয় না। বৌদ্ধ ধর্মীয় শুদ্ধ জ্ঞান লাভের উৎসেরও অভাব রয়েছে। নিজের ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে বিধর্মীদের সমালোচনার কোন সদুত্তর তারা দিতে পারে না। একসময় সত্যিই নিজের ধর্মকে ভ্রান্ত বা অর্থহীন মনে করতে দ্বিধা করে না।
২. মানসিক ধর্ষনের স্বীকার
একটি বৌদ্ধ ছেলে কিংবা মেয়ে নিজ পরিবারের মা-বাবা সহ পরিবারের সকল বয়েজ্যৈষ্ঠদের কাছ থেকে শিখে ভাল আর মন্দের পার্থক্য গুলি, যেমন ভাল মানুষ ও মন্দ মানুষ। শিখে সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। কিন্তু শিখে না যেটা বেশী দরকার তাহল এরা প্রথমে বৌদ্ধ ও তারপর মানুষ। শিখে না এরা সংখ্যা লগু সম্প্রদায়ে জন্ম এবং বড় হয়ে প্রতিটি পদে পদে বঞ্চনা ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে। অপর দিকে একটি মুসলিম সম্প্রদায়ের শিশু শিখে সে প্রথমে মুসুলমান পরে মানুষ। সে আরো শিখে সে নিজে মুসুলমান আর অন্যেরা বিধর্মী এ ধরনের পার্থক্যগুলি। ফলে যে কোন বৌদ্ধ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে সহসাথীদের নিকট শুনতে হয় ঐ বৌদ্ধ ধর্ম বাতিল ধর্ম , শিকদের নিকট শুনতে হয় তোমরা অবিশ্বাসী এবং বুদ্ধ ধর্ম কোন ধর্ম নায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে বৌদ্ধ শিশুরা মানসিক ধর্ষনের শিকার হতে থাকে এবং ধর্ষনের এধারা কোন বৌদ্ধ শিশুর বয়ঃ বৃদ্ধির সাথে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। পাশাপাশি পাঠ্য বইয়ে হিন্দু ও মুসলমান রাজা মহারাজার অতিরঙ্জিত ইতিহাস পড়নো এবং হর্ষবর্ধণ,বখতিয়ার খিলজির মত হিন্দু, মুসলিম রাজা বাদশা ও লুটেরাদেরকে বীর হিসাবে উল্লেখ্য করা হয়। এগুলো পড়ে হীনমন্যতায় ভোগে। একই সাথে তাবলীগ জামাত ও ইসলাম ধর্মের দাওয়াতকারীদের গুনকীর্তন বৌদ্ধ শিক্ষার্থীদের মানসিক ধর্ষনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। একসময় বৌদ্ধ ছেলে মেয়েরা নিজস্ব পরিচয় ভুলে যায় এবং বৃহত্তর সমাজে মিসে যেতে চায়।
৩. মিডিয়ার প্রভাব
বৌদ্ধদের কাছে মুসলিম ও হিন্দু সংস্কৃতি একেবারেই ভিন্নতর ও অজানা। অজানার বাহ্যিক চাকচিক্যের আকর্ষণ রয়েছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে পাশাপাশি বাস করা মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের একটা আর্কষণ তৈরি হয়।তাছাড়াও হিন্দুদের পূজাগুলোতে ছেলে মেয়েরা যেভাবে মদ খেয়ে যেভাবে নাচানাচি করে তা বৌদ্ধ ছেলে মেয়য়েদের কাছে খুব আর্ষণীয় বলে মনে হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সেক্যুলারবাদী খুল্লাম খুল্লা টিভি চ্যানেল ও ইসলামপন্থী টিভি চ্যানেল, সংবাদপত্র ও চলচ্চিত্রের কাহিনীতে ভারতে হিন্দু এবং বাংলাদেশে মুসলমান চরিত্রগুলোকে বীর ও মহৎ গুণের অধিকারী রূপে দেখানো হয়। সাধারণ বৌদ্ধদের কোন মহৎ এবং সফল চরিত্রগুলোকে দেখানো হয় না। এই মিডিয়াগুলো উঠতি বয়সী যুবক-যুবতীদের মনে দারুন প্রভাব ফেলে। মুসলিম ধর্মে এবং হিন্দুধর্মের মানবাধিকারের কথা যতটা ফলাও করে প্রচার করা হয় বুদ্ধ ধর্মের শান্তি ও মানবতার সেই সাপেক্ষে উল্লেখ করা হয়না বললেই চলে।
৪. যৌন চাহিদা
বৌদ্ধ মেয়েরা বিশেষত: টিনেজারদের কাছে সাধারণত সেক্স একটা অজানা জগত। আমাদের দেশে কিশোর-কিশোরীদের যৌন শিক্ষা প্রচলিত না থাকায় তারা এই অজানা বিষয়ে খুবই আকর্ষণ বোধ করে। মুসলমান পরিবারে একটি মেয়ে অল্প বয়স থেকেই খুব ভালভাবে বুঝতে শেখে যে- সে একটা মেয়ে। তার কাছের ও দূরের আত্মীয় সম্পর্কের পুরুষদের কাছ থেকে পুরুষ মানুষ কি জিনিস তার খুব ভাল পরিচয় পেয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় চাচাতো, খালাতো, মামাতো, ফুফাতো ভাই অথবা কাছের বা দূরের সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে সেক্স করার সুযোগ তাদের ঘটে। তাদের ভোগবাদী জীবনদর্শন, খাদ্যাভ্যাস ও জীবন প্রণালী এই কর্মে উৎসাহী করে। অন্যদিকে সাধারণত বৌদ্ধ সমাজে দূর সম্পর্কের ভাই হলেও সে একটা মেয়েকে আপন বোনের মতই দেখে ও শ্রদ্ধা করে। বৌদ্ধ ছেলে ও মেয়ে উভয়ের মধ্যেই তুলনামূলক বেশি নৈতিক মূল্যবোধ কাজ করে। ফলে বৌদ্ধ পরিবারের মেয়েগুলো সেক্স বিষয়ে হিন্দুও মুসলিমদের তুলনায় অজ্ঞ থাকে। আর কোন মেয়ে যদি তার উঠতি বয়সে বা যৌবনে বিবাহের পূর্বে সেক্স বিষয়ে আগ্রহী হয়, তবে তার চাহিদা পূরণের জন্য সাধারণত কোন সুযোগ থাকে না। এই সুযোগটা অনেকেত্রেই গ্রহণ করে মুসলিম যুবকগণ। আর যেখানে মুসলিমদের সংখ্যাই অধিক সেখানে এই ঘটনা আরও বেশি ঘটে।
৫. প্রেম: মরণ ফাঁদ
বৌদ্দদের ধর্মান্তরের প্রধান মাধ্যম হলো প্রেম। মুসলিম যুবকগণ বৌদ্ধ মেয়েদের প্রতি যেন একটু বেশিই আকর্ষণ বোধ করে। আর অজ্ঞানী মেয়েগুলোও খুব সহজেই এই মোহে আক্রান্ত হয়। তাছাড়া মুসলিম ও হিন্দু বন্ধুর সাথে মিশতে মিশতে ভাল সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেলে বা কারও প্রতি মুগ্ধ হয়ে গেলে মেয়েরা ফাঁদে পড়ে যায়। এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকা যুবকের অনুরোধ উপেক্ষা করা অনেক ক্ষেত্রেই আর সম্ভব হয়ে ওঠে না।
৬. খৎনাকরণ:
অনেকের ধারণা খৎনা করলে পুরুষাঙ্গের যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ও অনেক মরণঘাতী রোগ হতে সুরক্ষা হয়। এ বিষয়ে বৌদ্ধ মেয়েরা অনেকেই আকর্ষণ বোধ করে। মুসলিম পরিবারের এত বেশি ভাঙন কেন? খৎনা করা পুরুষের যদি এতই ক্ষমতা থাকে তবে মুসলিম স্ত্রীদের অভিসার ও ব্যভিচারের কেন এই আধিক্য? পরপুরুষের হাত ধরে স্বামীসন্তানের মায়া ফেলে পালায় কেন? এ সংক্রান্ত প্রশ্ন গুলি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেনা আমাদের মেয়েগুলি।
৭. পবিত্রতা :
বৌদ্ধ মেয়েরা নিজেদের দেহকে পবিত্র মনে করে। একবার মোহবশত: কোন মুসলিম ছেলের সাথে শারীরিক মিলন হলে তারা আর ফিরে আসতে চায় না। তারা নিজেদের তখন অপবিত্র মনে করে।
৮. প্রলোভন
পুণ্য ও বেহেশ্ত প্রাপ্তির আশায় মুসলিম নারী ও পুরুষ উভয়েই উদগ্রীব থাকে। যে কোন মুসলিম ছেলে অন্যধর্মের মেয়েকে বিয়ে করে ধর্মান্তরিত করলে পরিবারের সবাইতে তাকে এ কাজে সহায়তা করে এজন্যে যে এর সওয়াব পরিবারের সকলে ভোগ করবে। ফলে মুসলিম ছেলেটি উৎসাহ পায়। একই ভাবে মুসলিম মেয়ে বৌদ্ধ ছেলে শিকার করতে উৎসাহী ও উদ্ধগ্রীব হয় । ফলে মুসলিম ছেলে ও মেয়েদের কুমন্ত্রণা ও প্রলোভন বৌদ্ধ মেয়ে ছেলেদের ধর্মান্তরের জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।
৯. পারিবারিক হুমকি ও নীরব অত্যাচার
বিশেষত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বৌদ্ধদের জমি, সম্পত্তি ও নারীদের ওপর দুর্বৃত্তদের নজর পড়ে বেশি। বৌদ্ধদের ওপরে নীরব অত্যাচার একটি সাধারণ ঘটনা। জীবন, সম্পত্তি, সুখ-শান্তি ও সম্মান রক্ষার্থে অনেক সময়ই বৌদ্ধ মেয়েদের উৎসর্গ করতে হয় মুসলিমের হাতে।
১০. সেক্যুলারইজমঃ
বৌদ্ধদের জন্য অভিশাপ এই শব্দটা যেন ব্যবহারিকভাবে বৌদ্ধদের জন্যই একমাত্র প্রযোজ্য। সবাই এর কথা বলে কিন্তু এর বলি হয় শুধুমাত্র বৌদ্ধ সম্প্রদায়। ভারতে অসাম্প্রদায়িকতা মানে হিন্দুদের সাথে বৈবাহিক সর্ম্পক স্হাপন করা আর বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িককতা মানে মুসলিম বিয়ে করে মুসলিম হওয়া।বৌদ্ধ বাবু এবং ভিক্ষু ব্যক্তিত্ব, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীগণ নিজেদের সেক্যুলার, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে প্রমাণ করতে মুসলিম তোষণ ও করেন এবং মুসলিম বিবাহের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করেন না। তাতে ইসলামেরই জয় হয়। কারণ বৌদ্ধকেই তার ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম অথবা হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে হয়। বিপরীতটা ঘটতে দেখা যায় না। এরই নাম তথাকথিত সেক্যুলারইজম।
১১. শিক্ষিত মেয়েদের অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষালয়ের বৌদ্ধ ছাত্রীগণ প্রথমত ক্লাসমেট বৌদ্ধ ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে বিব্রত বোধ করে। মনে করে, যদি প্রেম হয়ে যায়? হয়ত বড়ুয়া,চাকমা,মারমা,মুরং,ত্রিপুরা এসব ভাগাভাগির কারণে মা-বাবা ও সমাজ মেনে নেবেন না- এই ভয় কাজ করে। ফলে অন্যান্য ধর্মের ছেলেদের সাথে ভাল বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। একসময় নিজের অজ্ঞাতেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে; মনে করে, এই সম্পর্ক হতে সে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং বিয়ে পর্যন্ত গড়াবে না। কিন্তু যখন ভুল বুঝতে পারে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়, ফেরার উপায় থাকে না। আর নিজের ধর্মজ্ঞান না থাকার ফলে হিন্দু ও মুসলিম বন্ধুদের উদার বাণীগুলোও তাকে মুগ্ধ করে রাখে। তাদের অভিসন্ধি বোঝার ক্ষমতা থাকে না। তখন মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন কারোর বন্ধনই আর আটকে রাখতে পারে না।
১১. তথাকথিত স্মার্টনেস
স্মার্ট ও সুন্দরী বৌদ্ধ মেয়েগুলো মনে করে তাদের বন্ধু বা প্রেমিক হওয়ার যোগ্য ছেলে বৌদ্ধ সমাজে নেই। মুসলিম ও হিন্দু ছেলেদের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে, তাদের গুণাবলি বিচার না করে,তাদের সম্পর্কে তথ্য না জেনে। তাদের চাকচিক্যের প্রতিই এরা বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে। মুসলিম ও হিন্দু যুবকরাও এই সুযোগটার সদ্ব্যবহার করে।
পরিণতি
বিবাহের সুখ ও যৌনতার মোহ খুব বেশিদিন থাকে না। প্রেমঘটিত বিয়ের পর মুসলিম ও হিন্দু পরিবারে বৌদ্ধ স্ত্রীগণকে বাস্তব জীবনের কষাঘাতে পদে পদে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হতে হয়। সঙ্গী হয় সারা জীবনের কানড়বা। মুসলমান ঘরে তাকে শুনতে হয় মালাওন,আর হিন্দু ঘরে তাকে শুনতে হয়য় অপায়া,নাস্তিক।
• মুসলমানের ও হিন্দু সমাজে প্রথমে বৌদ্ধ স্ত্রীদেরকে প্রথমত সাদরে গ্রহণ করা হলেও খুব শীঘ্রই তাদের উপর ইসলামী ও হিন্দু উগ্রপিতৃতান্ত্রিক বিধানগুলো কাল হয়ে আসে। একাকী বের হওয়া যাবে না, ছবি তোলা ও চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ, বোরখা পরতে বাধ্য হওয়া, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, ব্যক্তি-স্বাধীনতার অনুপস্থিতি ও গরুর মাংসের নিয়মিত বিড়ম্বনা তখন নিত্য সঙ্গী হয়।হিন্দু জাত প্রথায় বৌদ্ধদের নিন্মবর্ণ হিসেবে ধরা হয়,তাছাড়া বৌদ্ধরা পূজার তত্ত্ব সাজালে প্রবিত্রতা নস্ট হয়,বৌদ্ধ থেকে আসা মেয়ের পূজা দেবতা গ্রহন করবেন না,শুচি-অশুচির বেড়াজালে পড়ে মেয়েটির জীবন নরকে পরিনত হয়। শাশুড়ি বা ননদের এমনকি স্বামীর অত্যাচারের স্বীকার হলেও প্রতিবাদ করার উপায় থাকে না। কারণ স্বামী খুব সহজেই তাকে ‘তালাক’ দিতে পারে। এমনকি সন্তানসহ তালাকও দিতে পারে। তখন বৌদ্ধ স্ত্রীর পায়ের নিচে আর কোন মাটি থাকে না। এককথায় স্বামীর সংসারে তাকে দাসী হয়ে জীবনটা কাটাতে হয়।
• বৌদ্ধ মেয়েরা কিংবা ছেলেরা মুসলিম কিংবা হিন্দু নারী- পুরুষ বিয়ে করলে সাধারণত তার নিজের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন হতে ত্যাজ্য হয়ে যায়। একমাত্র স্বামী ছাড়া সে নিরাশ্রয় হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে সকল অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে হয়।
• মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি এসে বাবার বাড়ির অহংকার করে থাকে। গল্প করে থাকে। তার বিপদে-আপদে বাবা-ভাইয়েরা এগিয়ে আসবে -এই বিশ্বাসটুকু তাদের থাকে। কোন কারণে শ্বশুরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হলে মাথা গোঁজার ঠাই বা আশ্রয়টুকু তার থাকবে- এই ভরসা থাকে। কিন্তু কেউ ধর্মান্তরিত হলে তার পরিণতি মানসী বড়ুয়া বা ইতি চাকমার মতই হতে পারে।
• শ্বশুরবাড়িতে শ্বশুর-শাশুরি, ননদ, জা এবং আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক প্রায়শ: ‘মালাউনের মেয়ে’ বলে গালি শুনতে হয়। এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী সে ‘মালাউনের মেয়ে’ গালী শুনতে হয়। দুঃখের বিষয় মাঝে মাঝে আদরের সন্তানই ‘মালাউন মাগী’ বলে গালি দেয়। এটা স্বাভাবিক ঘটনা। আমি যে মুসলমান বন্ধুর সাথে একটু আগে হাসিমুখে কথা বললাম, আড়ালে হয়ত সেও আমাকে মালাউনের বাচ্চা বলে গালি দেয়।
• মুসলিম মতে তিন তালাক বললেই সম্পর্ক শেষ। যৌন আকর্ষণ বিয়ের পর খুব বেশিদিন থাকে না। তারপর শুরু হয় বাস্তÍবতা। একজন পুরুষের একইসাথে চারটি পর্যন্ত বিয়ে করা বৈধ। একজন স্ত্রীর প্রতি মোহ কমে গেলে বা নতুন কোন নারীর প্রতি আসক্ত হলে খুব সহজেই তিন তালাক দিয়ে নতুন বিয়ে করতে ইসলামে কোন বাধা নেই। মুসলিম পরিবারে নিজের পুত্রবধু থেকে শুরু করে দাসী পর্যন্ত যথাক্রমে নিকাহ্ বা ভোগ করা বৈধ। ইসলামে স্ত্রীদের শষ্যেক্ষেত্রের সাথে তুলনা করা হয় এবং পুরুষ সেখানে স্বেচ্ছাচারী যেমন খুশি গমন করতে পারে এবং স্ত্রীরা এক্ষেত্রে বাধ্য। প্রয়োজনে প্রহার করাও বৈধ। এক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় কি না?হিন্দু সমাজে নারীদের মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হয় না,সেখানে মানবাধিকারে কোন প্রশ্নই নেই।নারীদের থাকতে হয় দাসী হিসেবে।হিন্দুরা যে নারীদের প্রতি কত নিষ্ঠুর তা ভারতের ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়।
• গ্রামের দিকে খোঁজ নিয়ে দেখুন, যে সকল মেয়ে মুসলিম হয়েছে, যৌবনের জৌলুস কমার সাথে সাথে তালাক হয়ে গেছে, ফলে ভিক্ষা করতে হয়। গ্রামের যথেষ্ট ভিক্ষুকের মধ্যে অনেক গুলিই কনভার্ট হওয়া বৌদ্ধ মেয়ে পাওয়া যাবে। পতিতালয়ে গিয়ে দেখুন, ওখানে পাবেন কনভার্ট হয়ে যাওয়া বৌদ্ধ মেয়ে যে যৌবনের প্রথম প্রতুষ্যে সুখের লাগিয়া বাঁধিয়াছে ঘর মুসলিম কিংবা প্রেমিকের তরে, ঠাঁই হইয়াছে শেষে পতিতালের অন্ধকার ঘরে।
• সবচেয়ে বড় সত্য হলো মুসলিম ও হিন্দু পরিবারে ধর্মান্তরিত বৌদ্ধ স্ত্রীগণ কেউই প্রকৃতপক্ষে সুখে নেই।
সুতরাং প্রত্যেক অবিবাহিত বৌদ্ধ যুবক যুবতী ও নারী পূরুষের সর্তক হওয়া উচিত এবং পরিবারের সকল শিশু কিশোর কিশোরী সদস্যাদের প্রতিদিনই এতদ বিষয়ে সর্তক করা উচিত।

Bangla Buddhist Dhammapada By By S. Lokajit Thero

The Discourse to Mallikā (on Karma

One day, Queen Mallikā went to see The Buddha, to ask Him four questions about the workings of kamma:
1) Why some women are ugly, poor, and without influence.
The Buddha explained that the past kamma of being angry and irritable has made them ugly; the past kamma of not making offerings, of being stingy, has made them poor; and the past kamma of envying others their gain and honour has made them uninfluential.
2) Why some women are ugly, yet are rich and have great influence.
The Buddha explained that the past kamma of being angry and irritable has made them ugly, whereas making offerings, generosity,has made them rich, and not envying others their gain and honour (experiencing sympathetic joy(mūditā)) has made them influential.
3) Why some women are beautiful, yet are poor and uninfluential.
The Buddha explained that the past kamma of not being angry and irritable has made them beautiful, whereas stinginess has made them poor, and envy has made them uninfluential.
4) Why some women are beautiful, rich, and of great influence.
The Buddha explained that the past kamma of not being angry and irritable has made them beautiful, generosity has made them rich, and non-envy has made them influential.
After The Buddha's teaching, Queen Mallikā vowed never again to be angry and irritable, always to make offerings, and never to envy others their gain and honour.
And she took refuge in The Buddha.
(Ref:Anguttara Nikaya 4.197/2:202-205)
(Mallikā. Chief queen of Pasenadi, king of Kosala. She was the daughter of the chief garland maker of Kosala, and was very good and beautiful. When she was sixteen she was, one day, on her way to the garden with some companions, carrying with her three portions of sour gruel in a basket. Meeting the Buddha, she offered them to him and worshipped him. The Buddha, seeing her wrapt in joy, smiled, and, in answer to Ananda's question, said she would be chief queen of Kosala.)

ফ্যাসিবাদ।

 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে...