---------------------------------------
‘মার’ শব্দটি ত্রিপিটক সাহিত্যের বহুল প্রচলিত নাম। মার বলতে একটি রুপক অর্থে বুঝায়। মারের স্থায়ী কোন আকার, আকৃতি, অস্তিত্ব ও অবস্থা আমাদের দৃষ্টিগোচর নয়। সত্ত্বের চিন্তা-চেতনা ও কাজকর্মের উপর প্রভাব বিস্তারই এর স্বভাব। আমরা বৌদ্ধ সাহিত্য অধ্যয়ন করলে দেখতে পাই, সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনের প্রথম থেকেই বুদ্ধত্ব লাভ করা পর্যনন্ত এমনকি বুদ্ধত্ব লাভ করার পর থেকে মহাপরিনির্বাণের পর মুর্হুত মারের অশুভ শক্তি লক্ষ্য করা যায়। তার শিষ্যমন্ডলীদের জীবন কাহিনীতেও এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও মারের একটি অশুভ শক্তি লক্ষ্য করা যায়। মানুষ একটি শুভ কাজে অগ্রসর হলে অখবা ধ্যান সমাধিতে নিবিষ্ট হলে মার বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনে দেখতে পাই, মার বলতে সকল প্রকার অশুভ শক্তির অধার, উন্নতির অন্তরায়, সাফল্যের প্রতিবন্ধক এবং মুক্ত, সুস্থ ও সুন্দর চিন্তা বিরোধক শক্তি। মারের শক্তি দুর্দমনীয় ও পরাক্রমশালী। আভিধানিক অর্থে মার হল অকুশল মনোবৃত্তি কিংবা রিপুসমূহের অপশক্তি। ত্রিপিটক সাহিত্য উল্লেখ আছে, রতি, আরতি তৃষ্ণা নামে তিন কন্যা এবং কাম, ক্ষুধা, পিপাসা, প্রভৃতি কার অগণিত সৈন্য সামন্ত ছিল। মানুষ কল্যাণ পথে অথবা ধ্যান ও মার্গ পথে অগ্রসর হলেই প্রথমে যে মারসেনা আক্রমন করে তা হল কাম ভোগের বাসনা। সাধক যদি এই ধাপকে অতিক্রম করে সম্মুখ অগ্রসর হয় তারপরে আত্ক্রমন করে আরতি সেনা। পর্যাযক্রমিক ক্ষুধা-পিপাসা সেনা, বাসনা বা তৃষ্ণা সেনা, তন্দ্রা ও আলস্য সেনা, ভয়-ভীতি সেনা, সংশয় বা সন্দেহ সেনা, মান-অভিমান, লাভ-সৎকার, পূজা প্রভৃতি সেনা একটির পর একটি এসে উপস্থিত হয়। এই সেনারা সাধককে পরাস্ত করতে সর্ব অশুভ শক্তি নিয়োগ করে। এসব মার সেনাকে অতিক্রম করতে না পারলে বোধি বা বুদ্ধত্ব লাল কখনও সম্ভব নয়। কুমার সিদ্ধার্থ এ সকল মারসেনাকে পরাজিত করে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়েছিলেন।
আমরা বুদ্ধ বলতে মহাজ্ঞানী সর্বোত্তম জ্ঞানের অধিকারীকে বুঝি। যিনি সকল বন্ধনহীন এবং দুঃখ, দুঃখ কারণ, দুঃখ নিরোধ, দুঃখ নিরোধের উপায় –এই চতুরার্য সত্য আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামক শ্রেষ্ঠ মার্গ অনুশীলন করে বিশুদ্ধ জীবন যাপন করেন। ‘যার জয়-পরাজয় পর্যবসিত হয়না, যার জয় রিপু জগতে কিছুমাত্র অনুসরণ করেনা, সেই রিপুজয়ী সর্বদর্শী বুদ্ধকে তোমরা কোন উপায়ে বিচলিত করবে’? ভগবান বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভ করে একসময় নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থ বৃক্ষের ছায়ায় বসে মুক্তির নির্মল আনন্দ অনুভব করেছিলেন। এমনি সময় তার চিত্তে অন্য এক চেতনা জাগ্রত হল তার মনে হল এই মুক্তি হয়ত সত্যিকারের মুক্তি নয়। বিশুদ্ধ মুক্তি ও পরিশুদ্ধ জীবন যাপনের জন্য এ পথ পরিত্যাগ করা উচিত এই চেতনা প্রবাহের সূচনাতেই বুদ্ধ উপলব্দি করলেন আমি অশুভ শক্তির ছায়ামুক্ত হয়ে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়েছে, হে মার! তুমি আমার চিত্ত বিভ্রান্তি ঘটাতে পারবেনা। আমি তোমাকে চিনেছি এই পাপমতি মার।
বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য পাচ ধরণের মারের কথা বলা হয়েছে।
১. ক্লেশমার,
২. অভিসংস্কার বা ভোগ-চেতনা মার,
৩.দেবপুত্র মার,
৪, স্কন্ধ মার,
৫. মৃত্যূমার
১. ক্লেশমারঃ ক্লেশ পালি কিলেস শব্দের অর্থ দাঁড়ায় চিত্তের কালিমা আমরা জানি চিত্ত বা মন স্বভাবতঃ স্বচ্ছ আযনার মত নিরমল। স্বচ্ছ আয়না যেমন ধুলো-বালি দ্বারা আচ্ছন্ন হয় সেরুপ চিত্ত বা মনও লোভ, দ্বেষ,মোহনামক কালিমা দ্বারা আবৃত হয়। চিত্তে বা মনে ক্লেশ উৎপন্ন হলে মানুষ শুভাশুভ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মানুষ ক্লেশের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সর্বদা বিভিন্ন প্রকার পাপকর্মে লিপ্ত হয়।
২. অভিসংস্কার মারঃ এই মারকে ভোগ-চেতনা মারও বলে। অভিসংস্কার মারকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।
ক) পুঞ্ঞাভিসঙ্খারা,
খ) অপুঞ্ঞাভিসঙ্খারা,
গ) আনঞ্ঞভিসঙ্খারা
আমরা জানি জন্মের কারণ হচ্ছে সংস্কার। এজন্য সংস্কারকে জন্মের হেতু সৃষ্টিকারী বলে। এ মারও মানুষকে ভূল পথে পরিচালিত করে নিবার্ণ লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পুঞ্ঞাভিসঙ্খারা দ্বারা সত্ত্বগণ কামলোক, রুপলোক ও অরুপলোকে জন্মগ্রহন করে। কিন্তু সত্ত্বগণ সমূলে তৃষ্ণা ক্ষয় করতে না পারলে ভব থেকে ভবান্তরে বারবার জন্মগ্রহন করে। সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনে রামপুত্র রুদ্রক এর নিকট অবগত হয়েছিলেন অরুপ ধ্যানভূমি থেকেও সত্ত্বগণ পুনরায় গর্ভাশয়ে জন্মগ্রহন করেন। অন্যদিকে সত্ত্বগণ যেন পুণ্যকর্মদ্বারা পুণ্য সঞ্চয় করে মাররাজ্যে অতিক্রম না করতে পারে সেজন্য অপুঞ্ঞাভিসঙ্খারা মারের প্রভাব সত্ত্বগণের মধ্যে বিদ্যামান থাকে। এ মারের প্রভাবে সত্ত্বগণ জন্মজন্মান্তরব্যাপী দুঃখ ভোগ করে। তারা এ মারের প্রভাবে প্রভাবিত হয় বলে নিবার্ণ লাভে সমর্থ হয়না। অন্যদিকে আনঞ্ঞভিসঙ্খারা হল উৎপন্ন সংস্কারসমূহকে চিত্তের মধ্যে বদ্ধমূল স্থায়ী করে নেওয়া। বৌদ্ধধর্মে ও দশর্নে কোন ব্যক্তি বা মানুষকে চিরমুক্তি পেতে হলে পুণ্য ও অপুণ্যের অতীত হতে হবে। অথার্ৎ সংস্কার যাতে তাকে স্পর্শ করতে না পারে। যাদের পুরাতণ বীজ ক্ষীণ হয়েছে, নুতন কর্ম উৎপাদনের হেতু বিদ্যমান নেই এবং যাদের ভবিষ্যৎ জন্মের আসক্তিও নেই সেই কর্মবীজ ক্ষয়প্রাপ্ত সৎপুরুষগণ নির্বাপিত প্রদীপের ন্যায় নিবার্ণপ্রাপ্ত হন।
৩. দেবপুত্র মারঃ বৌদ্ধ দর্শনে ৩১ প্রকার লোকভূমি রয়েছে। এর মধ্যে চার অপায় ভূমি যেমনঃ তির্য্যক, প্রেত, অসুর, নিরয়। এখানে সত্ত্বগণ জন্ম হয় লোভ, দ্বেষ, মোহ কারণে। সত্ত্বের চিত্তে লোভ উৎপন্ন হলে প্রেত যোনিতে, দ্বেষ উৎপন্ন হলে নিরয়ে, মোহ উৎপন্ন হলে তির্য্যককুলে এবং ক্রোধ উৎপন্ন হলে অসুরকূলে সত্ত্বগণ জন্মগ্রহন করে। অপায় ভূমির উর্দ্ধে হল মনুষ্য ভূমি। মনুষ্য জন্ম লাভ করা অতীব দুলর্ভ। তবে ধ্যান সমাধি করার জন্য মনুষ্যলোকই উত্তম। তাই সিদ্ধার্থ মনুষ্য ভুমিতে আর্বিভূত হয়ে বুদ্ধত্ব লাভ করেন।
এই মনুষ্যভূমি উর্দ্ধে ছয়টি স্বর্গভূমি যথাঃ চর্তুমহারাজিক, ত্রয়তিংশ, যাম, তুষিত, নিমার্ণরতি ও পরিনির্মিত বশবর্তী। এরপর ষোলটি রুপভূমি রয়েছে। ব্রহ্ম পারিষদ, ব্রহ্মপুরোহিত, মহাব্রহ্মা, পরিত্তাভ, অপ্রমাণাভ, আভাস্বর, পরিত্তশুভ, অপ্রমাণশুভ, শুভাকীর্ণ, বৃহৎফল, অসঞ্জসত্ত্ব, অবহা, অতপ্ত, সুদর্শন, সুদর্শী, আকনিষ্ঠ। অরুপ ভূমি চারটি যথা আকাশানন্তায়ন, বিজ্ঞানানন্তায়ন, আকিঞ্চনায়তন ও নৈব সংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন। দেবলোকে অবস্থানরত দেবপুত্রগণের অনেক অলৌকিক ঋদ্ধিশক্তির কথা ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে। তারা মারের আবেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আকারের রুপ ধারন করে। পরনির্ম্মিত বশবর্তী দেবলোকের দেবপুত্রগণ মাররুপে আর্বিভূত হয়ে নানান অলৌকিক শক্তির কার্য সম্পাদন করে। দেবপুত্র মারগণ সাধকদের জন্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়ায়। পরনির্ম্মিত বশবর্তী দেবপুত্র মার সম্রাট অশোকের ৩য় সংগীতিতে অকুশল শক্তি প্রয়োগ করেছিল। সেজন্য দেবপুত্র মারকে দমন করার জন্য অহর্ৎ উপগুপ্তকে সংঘ দায়িত্ব দিয়েছিল। উপগুপ্ত স্থবির বিভিন্ন প্রকার ঋদ্ধিশক্তির সাহায্যে মারের উপদ্রব বন্ধ করেন।
৪ স্কন্ধ মারঃ পঞ্চস্কন্ধ সমন্বয়ে জীবের জীবন গঠিত সেই পঞ্চস্কন্ধ হল রুপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান। পঞ্চস্কন্ধ প্রধানত নাম ও রুপ নিয়ে বিভক্ত বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান হল নাম আর রুপ হল ৩২ প্রকার অশুচি পদার্থ। লোম, নখ, দন্ত, ত্বক প্রভৃতি। এই পঞ্চস্কন্ধ সমন্বিত দেহ অনিত্য দুঃখ ও অনাত্ন। মিথ্যাদৃষ্টিবশতঃ আমরা এই দেহকে কত গর্ব করি। অথচ এই দেহে নিত্য সারবস্তু বলতে কিছুই নেই। অবিদ্যার কারণে সত্ত্বগণ জীবজগতে কিংবা এই সংসারে বারবার আসা যাওয়া করছে। অনুপাদিসেস নিবার্ণ লাভের মাধ্যমে মানুষের পঞ্চস্কন্ধ দেহমার ধ্বংস হয়। সোপাদিসেস নিবার্ণ প্রাপ্তির মাধ্যমে সিদ্ধার্থ গৌতম তৃষ্ণা লোভ, দ্বেষ, মোহরুপ মারকে পরাস্ত করলেও স্কন্ধ মার বিদ্যমান ছিল। বুদ্ধত্বলাভের পর আশি বছর বয়সে তিনি অনুপাদিসেস নিবার্ণের মাধ্যমে ক্লেশমারকে ধ্বংস করেন।
৫. মৃত্যুমারঃ পঞ্চস্কন্ধ দেহধারী জীবমাত্রই মৃত্যুর অধীন। অর্থাৎ সংস্কার মাত্রই অনিত্য। মৃত্যু কারো কাম্য নয়। তবুও জীবের মৃত্যু আসে। চ্যুতি চিত্তের বা মনের উদয়ে পঞ্চস্কন্ধ বা নাম-রুপ বা দেহ-মনের বিচ্ছিন্নতাকে বৌদ্ধদর্শনে মৃত্যু বলে। কালমৃত্যু ও অকালমৃত্যু ভেদে দুপ্রকার। দেহ মনের পরিবর্তনশীলতাকে কালমৃত্যু। ভববন্ধনে আবদ্ধ প্রাণির মৃত্যু অকালমৃত্যু। আর বন্ধনছিন্নকারীর মৃত্যু হল সমুচ্ছেদ মৃত্যু। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, মুর্খ-পন্ডিত ভেদাভেদ রীতিনীতি মৃত্যুতে নেই। সুতরাং, মার সর্বদা সজাগ সজীব ও তৎপর থাকে। অথার্ৎ সত্য সুন্দর ও পবিত্রতার পরিপস্থি এক অশুভ মায়াময় প্রভাবই মারের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। একমাত্র ধ্যান, সমাধি প্রজ্ঞা ও স্মৃতি অনুশীলনের মাধ্যমেই এই মায়াচ্ছন্ন আবেশ হতে কিংবা জগত হতে মানুষ মুক্ত হতে পারেন।
‘মার’ শব্দটি ত্রিপিটক সাহিত্যের বহুল প্রচলিত নাম। মার বলতে একটি রুপক অর্থে বুঝায়। মারের স্থায়ী কোন আকার, আকৃতি, অস্তিত্ব ও অবস্থা আমাদের দৃষ্টিগোচর নয়। সত্ত্বের চিন্তা-চেতনা ও কাজকর্মের উপর প্রভাব বিস্তারই এর স্বভাব। আমরা বৌদ্ধ সাহিত্য অধ্যয়ন করলে দেখতে পাই, সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনের প্রথম থেকেই বুদ্ধত্ব লাভ করা পর্যনন্ত এমনকি বুদ্ধত্ব লাভ করার পর থেকে মহাপরিনির্বাণের পর মুর্হুত মারের অশুভ শক্তি লক্ষ্য করা যায়। তার শিষ্যমন্ডলীদের জীবন কাহিনীতেও এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও মারের একটি অশুভ শক্তি লক্ষ্য করা যায়। মানুষ একটি শুভ কাজে অগ্রসর হলে অখবা ধ্যান সমাধিতে নিবিষ্ট হলে মার বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনে দেখতে পাই, মার বলতে সকল প্রকার অশুভ শক্তির অধার, উন্নতির অন্তরায়, সাফল্যের প্রতিবন্ধক এবং মুক্ত, সুস্থ ও সুন্দর চিন্তা বিরোধক শক্তি। মারের শক্তি দুর্দমনীয় ও পরাক্রমশালী। আভিধানিক অর্থে মার হল অকুশল মনোবৃত্তি কিংবা রিপুসমূহের অপশক্তি। ত্রিপিটক সাহিত্য উল্লেখ আছে, রতি, আরতি তৃষ্ণা নামে তিন কন্যা এবং কাম, ক্ষুধা, পিপাসা, প্রভৃতি কার অগণিত সৈন্য সামন্ত ছিল। মানুষ কল্যাণ পথে অথবা ধ্যান ও মার্গ পথে অগ্রসর হলেই প্রথমে যে মারসেনা আক্রমন করে তা হল কাম ভোগের বাসনা। সাধক যদি এই ধাপকে অতিক্রম করে সম্মুখ অগ্রসর হয় তারপরে আত্ক্রমন করে আরতি সেনা। পর্যাযক্রমিক ক্ষুধা-পিপাসা সেনা, বাসনা বা তৃষ্ণা সেনা, তন্দ্রা ও আলস্য সেনা, ভয়-ভীতি সেনা, সংশয় বা সন্দেহ সেনা, মান-অভিমান, লাভ-সৎকার, পূজা প্রভৃতি সেনা একটির পর একটি এসে উপস্থিত হয়। এই সেনারা সাধককে পরাস্ত করতে সর্ব অশুভ শক্তি নিয়োগ করে। এসব মার সেনাকে অতিক্রম করতে না পারলে বোধি বা বুদ্ধত্ব লাল কখনও সম্ভব নয়। কুমার সিদ্ধার্থ এ সকল মারসেনাকে পরাজিত করে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়েছিলেন।
আমরা বুদ্ধ বলতে মহাজ্ঞানী সর্বোত্তম জ্ঞানের অধিকারীকে বুঝি। যিনি সকল বন্ধনহীন এবং দুঃখ, দুঃখ কারণ, দুঃখ নিরোধ, দুঃখ নিরোধের উপায় –এই চতুরার্য সত্য আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামক শ্রেষ্ঠ মার্গ অনুশীলন করে বিশুদ্ধ জীবন যাপন করেন। ‘যার জয়-পরাজয় পর্যবসিত হয়না, যার জয় রিপু জগতে কিছুমাত্র অনুসরণ করেনা, সেই রিপুজয়ী সর্বদর্শী বুদ্ধকে তোমরা কোন উপায়ে বিচলিত করবে’? ভগবান বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভ করে একসময় নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থ বৃক্ষের ছায়ায় বসে মুক্তির নির্মল আনন্দ অনুভব করেছিলেন। এমনি সময় তার চিত্তে অন্য এক চেতনা জাগ্রত হল তার মনে হল এই মুক্তি হয়ত সত্যিকারের মুক্তি নয়। বিশুদ্ধ মুক্তি ও পরিশুদ্ধ জীবন যাপনের জন্য এ পথ পরিত্যাগ করা উচিত এই চেতনা প্রবাহের সূচনাতেই বুদ্ধ উপলব্দি করলেন আমি অশুভ শক্তির ছায়ামুক্ত হয়ে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়েছে, হে মার! তুমি আমার চিত্ত বিভ্রান্তি ঘটাতে পারবেনা। আমি তোমাকে চিনেছি এই পাপমতি মার।
বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য পাচ ধরণের মারের কথা বলা হয়েছে।
১. ক্লেশমার,
২. অভিসংস্কার বা ভোগ-চেতনা মার,
৩.দেবপুত্র মার,
৪, স্কন্ধ মার,
৫. মৃত্যূমার
১. ক্লেশমারঃ ক্লেশ পালি কিলেস শব্দের অর্থ দাঁড়ায় চিত্তের কালিমা আমরা জানি চিত্ত বা মন স্বভাবতঃ স্বচ্ছ আযনার মত নিরমল। স্বচ্ছ আয়না যেমন ধুলো-বালি দ্বারা আচ্ছন্ন হয় সেরুপ চিত্ত বা মনও লোভ, দ্বেষ,মোহনামক কালিমা দ্বারা আবৃত হয়। চিত্তে বা মনে ক্লেশ উৎপন্ন হলে মানুষ শুভাশুভ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মানুষ ক্লেশের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সর্বদা বিভিন্ন প্রকার পাপকর্মে লিপ্ত হয়।
২. অভিসংস্কার মারঃ এই মারকে ভোগ-চেতনা মারও বলে। অভিসংস্কার মারকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।
ক) পুঞ্ঞাভিসঙ্খারা,
খ) অপুঞ্ঞাভিসঙ্খারা,
গ) আনঞ্ঞভিসঙ্খারা
আমরা জানি জন্মের কারণ হচ্ছে সংস্কার। এজন্য সংস্কারকে জন্মের হেতু সৃষ্টিকারী বলে। এ মারও মানুষকে ভূল পথে পরিচালিত করে নিবার্ণ লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পুঞ্ঞাভিসঙ্খারা দ্বারা সত্ত্বগণ কামলোক, রুপলোক ও অরুপলোকে জন্মগ্রহন করে। কিন্তু সত্ত্বগণ সমূলে তৃষ্ণা ক্ষয় করতে না পারলে ভব থেকে ভবান্তরে বারবার জন্মগ্রহন করে। সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনে রামপুত্র রুদ্রক এর নিকট অবগত হয়েছিলেন অরুপ ধ্যানভূমি থেকেও সত্ত্বগণ পুনরায় গর্ভাশয়ে জন্মগ্রহন করেন। অন্যদিকে সত্ত্বগণ যেন পুণ্যকর্মদ্বারা পুণ্য সঞ্চয় করে মাররাজ্যে অতিক্রম না করতে পারে সেজন্য অপুঞ্ঞাভিসঙ্খারা মারের প্রভাব সত্ত্বগণের মধ্যে বিদ্যামান থাকে। এ মারের প্রভাবে সত্ত্বগণ জন্মজন্মান্তরব্যাপী দুঃখ ভোগ করে। তারা এ মারের প্রভাবে প্রভাবিত হয় বলে নিবার্ণ লাভে সমর্থ হয়না। অন্যদিকে আনঞ্ঞভিসঙ্খারা হল উৎপন্ন সংস্কারসমূহকে চিত্তের মধ্যে বদ্ধমূল স্থায়ী করে নেওয়া। বৌদ্ধধর্মে ও দশর্নে কোন ব্যক্তি বা মানুষকে চিরমুক্তি পেতে হলে পুণ্য ও অপুণ্যের অতীত হতে হবে। অথার্ৎ সংস্কার যাতে তাকে স্পর্শ করতে না পারে। যাদের পুরাতণ বীজ ক্ষীণ হয়েছে, নুতন কর্ম উৎপাদনের হেতু বিদ্যমান নেই এবং যাদের ভবিষ্যৎ জন্মের আসক্তিও নেই সেই কর্মবীজ ক্ষয়প্রাপ্ত সৎপুরুষগণ নির্বাপিত প্রদীপের ন্যায় নিবার্ণপ্রাপ্ত হন।
৩. দেবপুত্র মারঃ বৌদ্ধ দর্শনে ৩১ প্রকার লোকভূমি রয়েছে। এর মধ্যে চার অপায় ভূমি যেমনঃ তির্য্যক, প্রেত, অসুর, নিরয়। এখানে সত্ত্বগণ জন্ম হয় লোভ, দ্বেষ, মোহ কারণে। সত্ত্বের চিত্তে লোভ উৎপন্ন হলে প্রেত যোনিতে, দ্বেষ উৎপন্ন হলে নিরয়ে, মোহ উৎপন্ন হলে তির্য্যককুলে এবং ক্রোধ উৎপন্ন হলে অসুরকূলে সত্ত্বগণ জন্মগ্রহন করে। অপায় ভূমির উর্দ্ধে হল মনুষ্য ভূমি। মনুষ্য জন্ম লাভ করা অতীব দুলর্ভ। তবে ধ্যান সমাধি করার জন্য মনুষ্যলোকই উত্তম। তাই সিদ্ধার্থ মনুষ্য ভুমিতে আর্বিভূত হয়ে বুদ্ধত্ব লাভ করেন।
এই মনুষ্যভূমি উর্দ্ধে ছয়টি স্বর্গভূমি যথাঃ চর্তুমহারাজিক, ত্রয়তিংশ, যাম, তুষিত, নিমার্ণরতি ও পরিনির্মিত বশবর্তী। এরপর ষোলটি রুপভূমি রয়েছে। ব্রহ্ম পারিষদ, ব্রহ্মপুরোহিত, মহাব্রহ্মা, পরিত্তাভ, অপ্রমাণাভ, আভাস্বর, পরিত্তশুভ, অপ্রমাণশুভ, শুভাকীর্ণ, বৃহৎফল, অসঞ্জসত্ত্ব, অবহা, অতপ্ত, সুদর্শন, সুদর্শী, আকনিষ্ঠ। অরুপ ভূমি চারটি যথা আকাশানন্তায়ন, বিজ্ঞানানন্তায়ন, আকিঞ্চনায়তন ও নৈব সংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন। দেবলোকে অবস্থানরত দেবপুত্রগণের অনেক অলৌকিক ঋদ্ধিশক্তির কথা ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে। তারা মারের আবেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আকারের রুপ ধারন করে। পরনির্ম্মিত বশবর্তী দেবলোকের দেবপুত্রগণ মাররুপে আর্বিভূত হয়ে নানান অলৌকিক শক্তির কার্য সম্পাদন করে। দেবপুত্র মারগণ সাধকদের জন্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়ায়। পরনির্ম্মিত বশবর্তী দেবপুত্র মার সম্রাট অশোকের ৩য় সংগীতিতে অকুশল শক্তি প্রয়োগ করেছিল। সেজন্য দেবপুত্র মারকে দমন করার জন্য অহর্ৎ উপগুপ্তকে সংঘ দায়িত্ব দিয়েছিল। উপগুপ্ত স্থবির বিভিন্ন প্রকার ঋদ্ধিশক্তির সাহায্যে মারের উপদ্রব বন্ধ করেন।
৪ স্কন্ধ মারঃ পঞ্চস্কন্ধ সমন্বয়ে জীবের জীবন গঠিত সেই পঞ্চস্কন্ধ হল রুপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান। পঞ্চস্কন্ধ প্রধানত নাম ও রুপ নিয়ে বিভক্ত বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান হল নাম আর রুপ হল ৩২ প্রকার অশুচি পদার্থ। লোম, নখ, দন্ত, ত্বক প্রভৃতি। এই পঞ্চস্কন্ধ সমন্বিত দেহ অনিত্য দুঃখ ও অনাত্ন। মিথ্যাদৃষ্টিবশতঃ আমরা এই দেহকে কত গর্ব করি। অথচ এই দেহে নিত্য সারবস্তু বলতে কিছুই নেই। অবিদ্যার কারণে সত্ত্বগণ জীবজগতে কিংবা এই সংসারে বারবার আসা যাওয়া করছে। অনুপাদিসেস নিবার্ণ লাভের মাধ্যমে মানুষের পঞ্চস্কন্ধ দেহমার ধ্বংস হয়। সোপাদিসেস নিবার্ণ প্রাপ্তির মাধ্যমে সিদ্ধার্থ গৌতম তৃষ্ণা লোভ, দ্বেষ, মোহরুপ মারকে পরাস্ত করলেও স্কন্ধ মার বিদ্যমান ছিল। বুদ্ধত্বলাভের পর আশি বছর বয়সে তিনি অনুপাদিসেস নিবার্ণের মাধ্যমে ক্লেশমারকে ধ্বংস করেন।
৫. মৃত্যুমারঃ পঞ্চস্কন্ধ দেহধারী জীবমাত্রই মৃত্যুর অধীন। অর্থাৎ সংস্কার মাত্রই অনিত্য। মৃত্যু কারো কাম্য নয়। তবুও জীবের মৃত্যু আসে। চ্যুতি চিত্তের বা মনের উদয়ে পঞ্চস্কন্ধ বা নাম-রুপ বা দেহ-মনের বিচ্ছিন্নতাকে বৌদ্ধদর্শনে মৃত্যু বলে। কালমৃত্যু ও অকালমৃত্যু ভেদে দুপ্রকার। দেহ মনের পরিবর্তনশীলতাকে কালমৃত্যু। ভববন্ধনে আবদ্ধ প্রাণির মৃত্যু অকালমৃত্যু। আর বন্ধনছিন্নকারীর মৃত্যু হল সমুচ্ছেদ মৃত্যু। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, মুর্খ-পন্ডিত ভেদাভেদ রীতিনীতি মৃত্যুতে নেই। সুতরাং, মার সর্বদা সজাগ সজীব ও তৎপর থাকে। অথার্ৎ সত্য সুন্দর ও পবিত্রতার পরিপস্থি এক অশুভ মায়াময় প্রভাবই মারের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। একমাত্র ধ্যান, সমাধি প্রজ্ঞা ও স্মৃতি অনুশীলনের মাধ্যমেই এই মায়াচ্ছন্ন আবেশ হতে কিংবা জগত হতে মানুষ মুক্ত হতে পারেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন