রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বুদ্ধ ধর্মে অনুশীলনের গুরুত্ব।


সমাজে অনেকে নিজেকে পন্ডিত বলে মনে করেন। তাঁরা বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করে বা গবেষণা করে তাঁদের পন্ডিত বলে ধারণা আসতে পারে। কিন্তু বুদ্ধের সেই আসল গবেষণায় পৌঁছতে হলে বা আসল পন্ডিত হতে হলে তাঁকে অবশ্যই ব্যবহারিক জ্ঞান সহ শাস্ত্র জ্ঞানে পারদর্শী হতে হবে। তাহলেই তিনি পন্ডিত হতে পারবেন। বিদর্শন ভাবনা সঠিক আচার্যের মাধ্যমে শুদ্ধ আচরণ করলে তাঁর প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হবে। প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হরে সংস্কার নিরোধ হবে। সংস্কার নিরোধ হলে নামরূপ পরিচ্ছদ জ্ঞান ও উদয় ব্যয় জ্ঞান ইত্যাদি ষোল প্রকার জ্ঞান উৎপন্ন সহ মার্গ পথে পদার্পণ করবেন। এ বিষয়ে পরিপূণূ জ্ঞান অর্থাৎ বিদর্শন ভাবনা শুদ্ধ আচরনের মাধ্যমে মার্গ পথে বিচরণ না করে অন্য বিদর্শনাচার্যের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করলে উপবাদ অন্তরায় হতে পারে। তাই বিদর্শন জ্ঞানের নীতি সোপান তথা নির্বাণ পথের জ্ঞান হয় একমাত্র বিদর্শন ভাবনা আচরণের মাধ্যমে, শাস্ত্র গবেষণার নয়। এ প্রসংঙ্গে এখানে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যাক-
শ্রাবস্তীর দুই বন্ধু তথাগত বুদ্ধের উপদেশ শুনে ভিক্ষুব্রত গ্রহণ করেন। পাঁচ বৎসরকাল গুরুর নিকট অবস্থান করে বিবিধ কর্তব্য বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে একজন উপদিষ্ট শিক্ষায় সাধনায় সিদ্ধি লাভ করলেন। অপরজন ত্রিপিটক অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা কাজে নিযুক্ত রইলেন। চরম বিমুক্তি তাঁর অধিগত হল না বুদ্ধ এ বিষয়ে অবগত হয়ে পান্ডিত্য অপেক্ষা আচরনই বিশেষ ফলপ্রদ বলে নিম্মের গাথাদ্বয় আবৃত্তি করলেন-
“বাহুম্পি সে সহিতং ভাসমানো ন তক্করো হোতি নরো পমত্তো,
গোপো বা গাবো গমাং পায়েসং ন ভাগবা সামঞ্ঞস্স হোতি।”
-বহু শাস্ত্র জ্ঞান যার বহু অধ্যয়ন, অথচ সে শাস্ত্র মতে চলে না কখন।
শ্রামণ্য ফলের ভাগী হয় না সেজন, গোপ (রাখাল) যথা পর গাভী লাভেনা কখন।”

অপ্পম্পিচে সহিতং ভাসমানো, ধম্মস্স হোতি অনুধম্মচারি,
রাগঞ্চ দোসঞ্চ পবায মোহং সম্মপ্পজানো সুবিমুত্ত চিত্তো,
অনুপাদিসনো ইধ বা হুরং বা, স ভাগবা সামঞ্ঞস্স হোতি।
-অল্প শাস্ত্র জানে কিন্তু শাস্ত্রের মতন, পালে ধর্ম রাগ, দ্বেষ মোহ হীন জন।
সম্পজ্ঞানী মুক্তচিত্ত উপাদান ত্যাগী, উভলোক হন তিনি শ্রামণের ভাগী।
যে প্রমত্ত ব্যক্তি ধর্মচার্যের নিকট বহুল পরিমাণ বুদ্ধের ধর্ম অধ্যয়ন করেও যথাযথ আচরণে বিরত থাকেন, সে ব্যক্তি রাখালের সহিত তুলনীয় হন। অর্থাৎ রাখাল যখন সারাদিন গরুর সেবা যত্ন করেও গব্যরসের অধিকারী হতে সমর্থ হয় না, সেরূপ বুদ্ধ বচন প্রচুর আবৃত্তি করলেও সেই ধর্মের রস পানের অধিকারী হতে পারে না। অপর পক্ষে অপ্রমত্তভাবে যিনি অল্প পরিমাণেও বুদ্ধের বাণী অধ্যয়ন করেন, তারা সুন্দর রূপে আচরণ করেন, নব লোকোত্তর ধর্মের অনুকূল ধর্মার্থ অবগত হয়ে কাম প্রবৃত্তি দমন করেন এবং মনে প্রাণে মুক্তি অভিসরী হন, তিনিই বিদর্শন ভাবনা বলে কাম-দ্বেষ-মোহকে সর্বতোভাবে পরাভূত করে মুক্তি পারের সন্ধান লাভ করেন এবং কাম, দৃষ্টি, শীলব্রত ও আত্মবাদ ভেদের চারিটি উপাদান সমূলে উৎপাদিত করে অরহত্ব ফল লাভের পর ভববন্ধন মুক্ত হন। তখন তিনি ইহাকল ও পরকালের শ্রামণের ভাগী হতে পারেন। ধর্মের সত্যিকারের দায়ক নির্বাণ লাভী এবং ধর্মের ধারক ও বাহক হতে পারেন।
ভগবান বুদ্ধ অনেক গবেষণা করে নির্বাণ লাভের জন্য একটি পথই আবিষ্কার করে গেছেন আমাদের জন্য দুটি পথ নয়। আর সে পথ হলো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথে আচরণ এবং এ পথে আচরণে মুক্তি লাভ সম্ভব। অন্যভাবে আচরণ বৃথা হবে, বুদ্ধের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যায় বা উপদেশে শুধু বিমুক্তিই উদ্দেশ্যেই ভাবিত ও দেশিত হয়েছে। তাই ইহাকে মহা সমুদ্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মহাসমুদ্রের জল যেখান থেকেই নেওয়া হোক না কেন সবখানেই লোনা। তদ্রুপ বুদ্ধের ধর্ম দর্শন সবখানেই বিমুক্তি রসে পরিপূর্ণ। বুদ্ধ বলেছেন-
মগ্গষ্ঠাঙ্গিকো সটটেঠা, সচ্চানং চতুরাপদা,
বিরাগো সেটঠ ধর্মানং দ্বি পদানঞ্চ চক্ষুমা।
এসোব মগগো নত্থঞ্ঞ, দস্সনস্স বিসুদ্ধিযা
এতঞহি তুমেহ পটিপজ্জথ মারসসেতং পমোহনং।
মার্গমাঝে অষ্টাঙ্গিক, সত্য মাঝে সত্য চতুষ্টয়,
ধর্মেতে বিরাগ শ্রেষ্ট চক্ষুমান মানবে নিশ্চয়।
এ মার্গ বিনা অন্য কোন মার্গ নাই,
দর্শন শুদ্ধির তবে করতে যাচাই।
তাই এ আষ্টমার্গ সবে অনুস্মর,
এ মার্গে মার রাজ্যে সম্মোহিতে পার।

একবার বুদ্ধ ভগবান ভিক্ষু সংঘে কিছুদিন জনপদ ভ্রমণ করে পুররায় জেতবনে ফিরে এসেছেন। একদিন বুদ্ধের সঙ্গে ভ্রমণকারী সে ভিক্ষুগণ অতিথি শালায় গিয়ে তাঁদের ভ্রমণ পথের সুগমতা ও দুর্গমতা সম্বন্ধে আলোচনা করছেন। বুদ্ধ তাঁদের আলোচনা শুনে লৌকিক পথ সম্বন্ধে চিন্তা না করে আধ্যাত্মিক সাধনায় রত হয়ে আর্য মার্গের সন্ধান করতে উপদেশ দিলেন। মুক্তি লাভের জন্য যদিও অনেকে মনে করেন বিবিধ প্রকার পথের নির্দেশ আছে। আসলেই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই একমাত্র পথ।

চক্রবালের বা একত্রিশ লোকভূমির প্রাণীগণ সর্বদা মুক্তি লাভের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করে, অথচ সমস্ত কাজ মুক্তির নয়। কিছু পাপ, কিছু পুণ্য ও কিছু পরমার্থ কাজ। তন্মধ্যে পাপ কাজ ও পুণ্য কাজ বিপাক সৃষ্টি করে। কিন্তু পরমার্থ কাজের বিপাক সৃষ্টি হয় না। অধিকন্তু পরমার্থ কাজের দ্বারা জমাকৃত বিপাক কায়দ্বারে, বাক্যদ্বারে ও মনদ্বারে নিরোধ হয়। এটাই হলো বিদর্শন ভাবনা।

পাপ কাজের কর্মপথ দশটি। যেমন হত্যা, চুরি, মিথ্যা বাক্য, পিশুন বাক্য, (ভেদ বাক্য) পরুষ (কর্কশ) বাক্য, সম্প্রলাপ (অর্থহীন) বাক্য, অভিদ্যা (লোভ), ব্যাপাদ (দ্বেষ) ও ভ্রান্ত ধারণা (মিথ্যা দৃষ্টি)। এ সমস্ত কর্মপথে কাজ করলে জন্মে জন্মে চারি অপায় গমন, যেমন-তির্যক , প্রেত, অসুর ও নিরয় কুলে উৎপন্ন হয়ে অসীম দুঃখ ভোগ করতে হয়। আবার পুণ্য কাজের কর্মপথ দশটি। যেমন- দান, শীল, ভাবনা (শমথ), সেবা, সম্মান, পুণ্যদান, পুণ্যদানানুমোদন, ধর্মশ্রবণ, ধর্মদেশনা ও দৃষ্টি ঋজু কর্ম (সত্য পথ আচরণ) এ সমস্ত কর্ম পথে কাজ করলে মৃত্যুর পর সুগতি লাভ হয়। যেমন মানুষ স্বর্গ ও ব্রহ্মলোকে জন্ম প্রতিসন্ধি গ্রহণ করে সুখ লাভ করে। পাপ কর্মর্জিত দুঃখ এবং পুণ্যকর্মার্জিত দুঃখ উভয়ই অস্থায়ী। এ গুলো ভোগের পর পুনঃ প্রতিসন্ধি বা জন্ম নিতে হয়। আর জন্ম দুঃখ বলে বুদ্ধ আখ্যায়িত করেছেন। ২৫৯৭ বৎসরের মধ্যে একটি মাত্র জ্ঞানী বা ‍বুদ্ধ যিনি জীব জগতের এ দুঃখ অবলোকন করে তাহা নিরোধের জন্য মার্গ বা পথ আবিষ্কার করেছেন। তাহাই বিদর্শন ভাবনা। সে বিদর্শন ভাবনা আচরণ ক্ষেত্রে অনেকের ধারণা শমথ ভাবনা আগে করতে হবে, না হয়তো বিদর্শন ভাবনা লাভ হবে না। আবার অনেকে শমথ ভাবনা করে সরাসরি নির্বাণ লাভ হবে বলে মনে করেন, আবার অনেকে শমথ বা বিদর্শন যে কোন ভাবনা করলে নির্বাণ লাভ হবে বলে মনে করেন। এখন সে আলোচনায় আসা যাক-
“চানমার য়ৈকত ভাবনা কেন্দ্র” ইয়াঙ্গুন, মায়ানমার-এর অধ্যক্ষ সেয়াদ উ জনকাভিংসো বর্ণনা করেছেন, একবার বুদ্ধ উত্তরীয় নামক রুগ্ন ভিক্ষুকে বলেছেন “আরম্ভ যদি বিশুদ্ধ হয় হবে সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে নির্বাণ সাক্ষাৎ হবে।”

তাই বুদ্ধের এ একটি বাক্য থেকে বুঝা যায় বিদর্শন ভাবনার যদি মুক্তির একমাত্র পথ হয় তাহলে আরম্ভ শমথ ভাবনা দিয়ে করলে বিশুদ্ধভাবে আরম্ভ হলো কি? মুক্তি মার্গ বা নির্বাণ লাভ হবে কি? আবার যারা শমথ ভাবনার মাধ্যমে শুরু করে মুক্তি পেতে চান, তাঁদের জন্যও সে সময় অতীত হয়ে গেছে। অর্থাৎ পটিসম্ভিদা মার্গসহ অর্হত্ব ফলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর এক হাজার বৎসর পার হয়ে ২৫৫২ বৎসরে পৌঁছেছে। কাজের বুদ্ধের বিভিন্ন সময়ের উক্তি থেকে জানা যায় সরাসরি শমথ ভাবনা করেও নির্বাণ লাভ সম্ভব নয় এবং প্রথমে শমথ দিয়ে আরম্ভ করে পুনঃ বিদর্শনে আসা দুরুহ ব্যাপার। সে আলোচনার পরে আসা যাবে।

কুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করার পর মহর্ষি ভার্গব- এর আশ্রমে উপস্থিত হলেন। বিস্তীর্ণ বনরাজি, বিভিন্ন গাছগাছড়ার ভরা এ আশ্রম। সুনিবিড় এ একান্ত তপোবনে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন রকম শারীরিক অবস্থায় বেশ কয়েকজন অসাধারণ কষ্টে কৃচ্ছ সাধনায় ব্রত। তিনি ঘুরে ফিরে দেখলেন, কয়েক রাত অবস্থান করলেন এবং বুঝতে পারলেন এ সমস্ত আচরণে মনুষ্যে জন্মে বা স্বর্গে জন্ম গ্রহণ করা যায়। কিন্তু পুনরায় অপায়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়নি। কাজেই ইহা আচরণে দুঃখ মুক্তি স্থায়ীভাবে হচ্ছে না জেনে ঐ আশ্রম ত্যাগ করলেন। ঘুরে ঘুরে তিনি ঋষি আরাড় কালামের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। আশ্রম প্রধানের সাথে আলোচনা করে জানতে চাইলেন জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, শোক, সংক্লেশ ইত্যাদি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার স্থায়ী কোন পথ আছে কিনা। ঋষি তাঁকে সমস্ত আশ্রম ঘুরে ঘুরে দেখালেন, বুঝালেন এবং আচরণ করতে বললেন। কুমার সিদ্ধার্থ এখানে আচরণে প্রবৃত্ত হয়ে সব চাইতে উন্নততর ব্রহ্মলোকের আকিঞ্চানায়তন ধ্যান লাভ করলেন। এ আকিঞ্চানায়তন থেকে চ্যুত হয়ে পুনরায় কর্মপ্রবাহে প্রতিসন্ধি হবে তাই তিনি তাঁর এ লদ্ধ ধর্ম জ্ঞানে তৃপ্তি লাভ করতে পারলেন না। কেননা ইহা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অতীত কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে না মানুষকে। তিনি বুঝতে পারলেন এ ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞাতার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। তাই তিনি অনাসক্তভাবে আশ্রম থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ক্রমে তিনি কোশল রাজ্যের রাজধানী শ্রাবস্তীতে এসে পড়লেন। সেখানে ঋষি রামপুত্র রুদ্রকের কথা জানতে পেরে তাঁর আশ্রমে উপস্থিত হলেন এ আশ্রমে যা কিছু কর্মকান্ড আছে সবই তিনি ধীরে ধীরে আয়ত্ব করে নিলেন। তারপর ঋষির নিকট জিজ্ঞাসা করেলেন আর আছে কিনা। ঋষি বললেন এর অধিক কিছু নেই। এখানে সব চাইতে বেশী কিছু লাভ হল একত্রিশ লোকভূমির সর্বোপরি স্থান, আনেঞ্জা সংস্কার, ৮৪ হাজার কল্পকাল সুখ ভোগকারী আরূপ ব্রহ্মলোকের “নৈবসংজ্ঞানাসজ্ঞায়তন”। তার উপরে অধিক সুখ ভোখকারী অন্যা কোন স্থান চক্রবালে আর নেই। অথচ সে অরূপব্রহ্মলোক থেকে চ্যুত হয়ে আবরও অপায়ে প্রতিসন্ধি যোগ আছে। এখন রাজ কুমার সিদ্ধার্থ জানতে পারলেন যে, এখানে (নৈবসংজ্ঞানাসজ্ঞায়তন) ও উপধি নির্মূল হয় না, তা যতই সুক্ষ্ণ হোক না কেন উপধি থাকলেই তা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অধীন হবে। সুতরাং এ ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞাতার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। কাজেই এখানে থেকেই কোন লাভ নেই। তাই তিনি রামপুত্র রুদ্রকের আশ্রম থেকে বেড়িয়ে পড়লেন নির্বাণ লাভের পথ অম্বেষণে।

রাজকুমার সিদ্ধার্থ শমথ ভাবনা আচরণ করে বুঝতে পারলেন যে, এ সমস্ত আচরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখলে জন্মতা বিফলে যাবে। কৃচ্ছ সাধন ও শমথ ভাবনা আচরণে নিজের শরীর এবং সময় নষ্ট হয়ে গেল অনুভব করে আসল দুঃখ মুক্তির পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। এখানে শমথ ভাবনা কি এবং তার আচরণটা কি রকম তা একটু আলোচনা করা যাক।
শমথ ভাবনা চল্লিশ প্রকার, যথা, দশ প্রকার কৃৎস্ন, দশ অশুভ, দশ অনুস্মৃতি, চারি অপ্রমেয়, এক সংজ্ঞা, এক ব্যবস্থান এবং চারি অরূপ ধ্যান স্তর।

দশ কৃৎস্ন- পৃথিবী কৃৎস্ন, আপ কৃৎস্ন, তেজ কৃৎস্ন, বায়ু কৃৎস্ন, নীল কৃৎস্ন, পীত কৃৎস্ন, লোহিত কৃৎস্ন, অবদাত কৃৎস্ন, আকাশ কৃৎস্নও আলোক কৃৎস্ন।
দশ অশুভ- উদ্ধস্ফীত, বিনীলক, পূঁজপূর্ণ, ছিদ্রীকৃত, বিখাদিত, বিক্ষিপ্ত, কর্তিত-বিক্ষিপ্ত, রক্তাক্ত, কীটপূর্ণ ও অস্তিপূঞ্জ।
দশ অনুস্মৃতি- বৃদ্ধানুস্মৃতি, ধর্ম্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি, উপশমানুস্মৃতি, মরনানুস্মৃতি, কায়গতানুস্মৃতি ও আনাপান স্মৃতি (শ্বাস প্রশ্বাস)।
চারি অপ্রমেয়- মৈত্রী, করুণা, মুদিতাও উপেক্ষা।
এক সংজ্ঞা- ভক্ষ্য দ্রব্যের ঘৃণাকর পরিণতি সম্বন্ধে জ্ঞান।
এক ব্যবস্থান- দেহস্থ কঠিন, তরল, উষ্ণ ও বায়বীয় সম্বন্ধে জ্ঞান ও অশুচি ভাবনা।
চারি অরূপ- আকাশানান্তায়তন, বিজ্ঞানান্তয়াতন, অকিঞ্চানায়তন ও নৈবসংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন।
এরূপে চল্লিশ প্রকার শমথ ভাবনার চল্লিশটি কর্ম্মস্থান। চল্লিশটি কর্ম্মস্থানের মধ্যে চরিত ভেদে বিভিন্ন কর্ম্মস্থানের উপযোগিত বিদ্যমান। যেমন-
() রাগ চরিত পক্ষে- দশ অশুভ ও কায়গতানুস্মৃতি নামক কোষ্ঠাংশ ভাবনা।
() দ্বেষ চরিতের পক্ষে- নীলাদি চারিবর্ণ, কৃৎস্ন এবং চারি অপ্রমেয়।
() মোহ চরিত ও বিতর্ক চরিতের পক্ষে- আনাপান স্মৃতি।
() শ্রদ্ধা চরিতের পক্ষে- বুদ্ধানুস্মৃতি ইত্যাদি ছয় অনুস্মৃতি।
() বুদ্ধি চরিতের পক্ষে- মরনানু, উপশমানু, সংজ্ঞা, ব্যবস্থানাদি অনুকুল ভাবনা।
() মোহ চরিত ও ক্ষুদ্রাকার বিতর্ক চরিতের পক্ষে- কৃৎস্ন মন্ডলের নির্বাচনে পৃথুল (স্থুল) উপযোগী।
অবশিষ্ট কর্ম্মস্থান সকলের পক্ষে উপযোগী।
চল্লিশটি কর্ম্মস্থানে পরিকর্ম ভাবনা লাভ করা যায়। বৃদ্ধানুস্মৃতি, ধর্ম্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি, উপশমানুস্মৃতি, মরনানুস্মৃতি, আহার অশুভ সংজ্ঞা এবং ধাতু ব্যবস্থান এই দশটি কর্মস্থানে উপাচার ভাবনা লাভ করা যায়। অবশিষ্ট ত্রিংশ কর্মস্থানে অর্পনা ভাবনা লাভ করা যায়।
আবার দশ অশুভ ও কায়গতানুস্মৃতি ভাবনা দ্বারা প্রথম ধ্যান লাভ হয়।
মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা দ্বারা চতুর্থ ধ্যান লাভ হয়।
দশ কৃৎস্ন, আনাপান ও উপেক্ষা ভাবনা দ্বারা পঞ্চম ধ্যান লাভ হয়।
চারি অরূপ ধ্যান ও দশ উপাচার ধ্যান ব্যতীত বাকী ছাব্বিশটি কর্মস্থান রূপলোকের ধ্যান উৎপন্ন করে। এ সমস্ত গুলি শমথ ধ্যানের লাভ, নিবৃত্তি বা নির্বাণের লাভ এতে নেই।
যদি কেহ শমথ ভাবনার মাধ্যমে শুরু করে নির্বাণ লাভ করতে চেষ্টা করেন তবে উপরোক্ত ত্রিংশ কর্মস্থানের যে কোন একটা কর্মস্থানে ভাবনার দ্বারা প্রথম থেকে পঞ্চম ধ্যানিক কর্মস্থানের কাজ সমাপনান্তে পুনরায় বিদর্শন ভাবনার নিমজ্জিত হও। ভাবনার দ্বারা হয়ত অরহত নয়তোবা অনাগামী লাভ হয়। যার নাম প্রতিসম্ভিদা মার্গ যা বর্তমানে লাভ সম্ভব নয়। প্রতিসম্ভিদা জ্ঞান লাভ হয় বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর এক হাজার (১০০০) বৎসর পর্যন্ত। বর্তমানে বুদ্ধের পরিনির্বাণ হয়েছে আড়াই হাজার (২৫০০) বৎসর অতীত হয়ে গেছে। সে হিসেবে বুদ্ধের নিয়মে তৃষ্ণা ক্ষয় করে মার্গফল লাভ করার যথেষ্ট সুযোগ বিদ্যমান।
ভগবান বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর প্রথম বারাণসীর নিকটবর্তী ঋষিপতন মৃগদাবে পঞ্চ বর্গীয় শিষ্য কৌন্ডিণ্য , বপ্প, ভদ্দিয়, মহানাম ও অশ্বজিতকে উপদেশ সহকারে দেশনার বলেছিলেন,হে ভিক্ষুগণ নির্বাণকামী ব্রতচারী দুই অন্তের অনুশীলন করবে না, প্রথম কাজে কম সুখোদ্রেকের প্রতি অনুরক্তি, যা হীন, গ্রাম্য, ইতর সাধারণের সেবা, অনার্য জনোচিত ও অনর্থকর, দ্বিতীয়/ আত্ম নিগ্রহে অনুরক্তি যা দুঃখ দায়ক, নিকৃষ্ট ও অনর্থকর। এ দুই অন্ত বর্জন করে তথাগত মধ্যম প্রতিপদ বা মধ্যমপন্থা, অভিসম্ভোদি জ্ঞান লাভ করেছেন যা চক্ষুকরনী ও জ্ঞান করনী এবং যা উপশমা অভিজ্ঞ, সম্ভোদি ও নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গিই সে মধ্যম প্রতিপদ। যথা সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি।
এ দেশনার পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের মধ্যে কৌন্ডিণ্য ধর্ম চক্ষু লাভ করেন। অর্থাৎ মার্গফল লাভ করেন, জগতে প্রথম স্রোতাপন্ন মানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সে দেশনায় আঠার কোটি দেব, ব্রহ্মা ধর্ম চক্ষু লাভ করেন। মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাতে অন্য কিছুই প্রয়োজন হয়নি। এখনও এরকম মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। আবার অন্তিম সময়ে অর্থাৎ বুদ্ধের পরিনির্বাণের সময় কুশীনগরে মল্লদের শালবনে পরিব্রাজক সুভদ্রকে বললেন, হে সুভদ্র! যে ধর্ম বিনয়ে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গেই উপলদ্ধি নেই (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নেই) প্রথম শ্রমণও তথায় নেই, দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, এবং থাকতে পারেনা। সুভদ্র! যে ধর্ম বিনয়ে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের উপলদ্ধি আছে, (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ আছে) প্রথম শ্রমণও তথায় আছে, তথায় দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রমণও আছে, তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমণও আছে, চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমণও আছে। হে সুভদ্র! ঊনত্রিশ বৎসর বয়সে আমি সর্বজ্ঞাতা জ্ঞান লাভ করার জন্য প্রব্রজিত হয়েছিলাম। যখন আমি প্রব্রজিত হই, সেদিন হতে এখন পর্যন্ত ৫১ বৎসর পর্যন্ত আমি আর্য মার্গ ধর্মের প্রদেশে বিদর্শন মার্গ প্রবর্তন করেছি। ইহার মধ্যে প্রথম শ্রমণ (স্রোতপন্ন) আছে, ‍দ্বিতীয় শ্রমণ (সকৃদাগামী) আছে, তৃতীয় শ্রমণ (অনাগামী) আছে এবং চতুর্থ শ্রমণ (অর্হৎ) আছে। ভগবান বুদ্ধের এ অন্তিম বাণীতেই আছে যে, ‍বিদর্শন মার্গ ছাড়া অন্য কোন মার্গ নেই মুক্তি লাভের জন্য। তাহলে আমরা কেন অন্য পথে যাওয়ার চেষ্টা করব? বুদ্ধত্ব লাভ করার পূর্বে সিদ্ধার্থ কৃচ্ছ সাধন, শমথ ভাবনা ইত্যাদি অনেক কিছু দেখেছেন ও আচরণ করেছেন। তা সবই ত্যাগ করে নির্বাণ লাভ করার পথ আবিস্কার করেছেন। প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রেও পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন একমাত্র আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথের নির্বাণ লাভ হবে। অন্য কোন বিকল্প পথ নেই। ইহা ছাড়া বুদ্ধের ধর্ম আচরণ করা, ধর্মে উন্নত হওয়া ও সাফল্য অর্জন করা- স্থান, কাল, পাত্রভেদে অকালিক।

ফ্যাসিবাদ।

 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে...