বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

বাংলার বৌদ্ধদের ইতিহাস।


নশ্বর সুজয়

  আমরা আজ যে অবস্থায় বুদ্ধের ধর্মকে পেয়েছি তার ইতিহাস বিশাল ও ব্যপক। পৃথিবীর বুকে আর অন্যকোন ধর্ম নেই এমন ইতিহাস বহুল। এ ইতিহাস শুধু উত্ত্বানের নয় , পতনেরও। যুগে যুগে কালে কালে বুদ্ধ ও বৌদ্ধ সভ্যতার ধন আত্মসাৎ করে ধন্য হয়েছে নানা অকৃতজ্ঞ জনেরাই।তার বিনিময়ে দিয়েছি নানা অকৃতজ্ঞার পরিচয়। মাটি নিচেই সেই সাক্ষ্য সুপ্ত হয়ে আছে,  যা হাজার বছর কাল বৌদ্ধদের গৌরবগাথা বহন করে চলছে।
আজ থেকে ২০০ বছর আগের ইতিহাস দেখুন তো বড়ুয়া জাতিটি কোন সংজ্ঞায়  আত্ম পরিচয় বহন করত?
আমরা নিজেদেরকে বৌদ্ধ বৌদ্ধ বলে যে শোল্গান দিচ্ছি তার মূলে কে?
ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধ ও বৌদ্ধধমর্ের হাজারো উত্থান পত্তনের মধে্যও কে বৌদ্ধধর্মকে এ পর্যন্ত বহন করে এনেছে?
সিংহল বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস -"শাসনবংশ"গ্রন্থটি পড়লে বিবেকবাণ মাত্রই একবার উপলব্ধি করতে পারবেন কিভাবে ভিক্ষুরা বৌদ্ধধর্মকে প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করেছিলেন।
খ্রিস্টীয় একাদশ শতক থেকে বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিষ্ঠুর অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্বীয় প্রাণ ও ধর্ম রক্ষার্থে আরাকান শাসনাধীন চট্টগ্রামে এসে শেষ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তার কারণ ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকানের বৌদ্ধ রাজাগণ চট্টগ্রাম শাসন করেছেন।

যদিও বুদ্ধ ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন। অশোকের শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। দিকে দিকে শুধু বুদ্ধেরই জয়ধ্বনী হয়েছিল।  তবে কালক্রমে এমন আনুকূল্য বেশিদিন টিকেনি, আর শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমল থেকে শাসনযন্ত্র ধীরে ধীরে হিন্দুত্বের প্রভাবে ফিরে যায়। পঞ্চম শতাব্দির চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক ও তীর্থযাত্রী ফেক্সিয়ান ভারত সফরের সময় স্থানীয় মহায়ন বৌদ্ধ-তত্ত্বে মৌলিক দুর্বলতা দেখতে পান। সেখানে বুদ্ধাদর্শ বজ্জিত ব্রাম্মণরা ঈশ্বররূপী বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বগণের নাম মিলিয়ে যাগযজ্ঞ দিয়ে প্রচার করত মহাবিশ্বের অগণিত স্তরগুলোতে তারা বসবাসরত, দান যজ্ঞের মাধ্যমে তাদের সান্নিধ্য লাভ
সম্ভব। – ঐ হিন্দু ব্রাম্মণ তত্ত্বগুলো বৌদ্ধ তত্ত্বের এতটাই কাছাকাছি ছিল যে অনেকেই এই দু’ধর্মের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পেতেন না।
প্রথম সহস্রাব্দীর দ্বিতীয় অংশে বৌদ্ধদের অবস্থা সম্পর্কে আমরা যা জানি তা মূলত এসেছে সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক বৌদ্ধ পদব্রাজক হিউয়েন সাং ভ্রমনবৃত্তান্ত থেকে। যদিও কিছু জায়গাতে বৌদ্ধদের সমৃদ্ধ হতে দেখেছেন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি বৌদ্ধবাদকে দেখেছেন জৈন ও ব্রাহ্মণ শক্তির কাছে পরাভূত মৃতপ্রায় সত্তা হিসেবে। বিহারে (প্রাচীন মগধ – বুদ্ধের মৃত্যুস্থান) কয়েকটি বিশেষ বৌদ্ধ স্থানে তিনি মারাত্মকভাবে ক্ষয়িষ্ণু হাতেগোনা কিছু ভক্ত দেখেছেন – ঐদিকে আবার দেখেছেন হিন্দু ও জৈনদের রমরমা অবস্থা। বাংলা, কামরূপ ও আসামেও তিনি অপেক্ষাকৃত স্বল্প সংখ্যক বৌদ্ধ দেখেছেন; কন্যাধাতে কোনো বৌদ্ধ পাননি, আর তামিল, গুজরাট ও রাজস্থানে দেখছেন গুটিকয়েক বৌদ্ধ। চালুক্যদের রাজত্বকালে হিউয়েন সাং লিখেছেন, চালুক্যদের শাসনামলে অন্ধ্র আর পল্লব শাসকদের অনুকুল্যে গড়ে ওঠা অনেক বৌদ্ধ স্তুপ মন্দির পরিত্যাক্ত কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই অঞ্চলগুলো বৈষ্ণব-পূর্ব চালুক্যদের শাসনাধীনে আসে, যারা বৌদ্ধদের প্রতি বৈরী ছিলেন। সাং এর বাংলা ভ্রমণকালে গোঁড়া হিন্দু শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার শাসক। তিনি শশাঙ্ককে একজন “বিষাক্ত গৌড় সাপ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন – যিনি বাংলার বৌদ্ধ স্তুপ -মন্দিরগুলো ধ্বংস করেন আর তার রাজ্যের একেক বৌদ্ধ সন্তদের মাথার জন্যে একশ স্বর্ণমুদ্রা করে পুরস্কার ঘোষণা করেন। হিউয়েন সাং-সহ অনেক বৌদ্ধ সূত্রগুলোতে থানেসরের বৌদ্ধ রাজা রাজ্যবর্ধনের হত্যার জন্যে শশাঙ্ককে দায়ী করা হয়। হিউয়েন সাং লিখেছেন, বোধ গোয়ার বোধি বৃক্ষ কাটা ছাড়াও ওখানকার বৌদ্ধ মূর্তিগুলোকে শিবলিঙ্গ দ্বারা প্রতিস্থাপন করেন।

অন্যদিকে নানা পথ ও মতের সমন্বয়ের চেষ্টায় রত হিন্দুত্বের সর্বদেবতার আলয়ে গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে আত্মস্থ করে নেয়া হয়। হিন্দু ধর্মের মধ্যে থেকেই তাই একজন ভক্ত বুদ্ধকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতে পারত। হিন্দুধর্ম তাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো – “নানা মতের বিশ্বাসীদের জন্যে আস্থা ও সন্তুষ্টির কেন্দ্র।”
অষ্টম শতকের বিখ্যাত হিন্দু দার্শনিক শঙ্কর বুদ্ধকে জনতার শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি নিজেই বৌদ্ধবাদের আদলেই আশ্রম বিধি জারি করেন আর বৌদ্ধ ধর্ম থেকে অনেক দর্শন ধার করেন। বৌদ্ধ সংঘের আদলে শঙ্কর যখন অষ্টম শতকে সন্যাস ও আশ্রম বিধি জারি করেন – ঠিক তখনই বৌদ্ধ বৈরী প্রচারণাও ছিল উত্তুঙ্গে। তাকে বৌদ্ধবাদের কড়া সমালোচক হিসেবে যেমনভাবে অভিনন্দিত করা হয় – ঠিক তেমনিভাবে তাকেই ভারতবর্ষে বৌদ্ধবাদের অবলুপ্তির প্রধান কারিগর হিসেবেও দেখা হয়। একই সময়ে তাকে ছদ্মবেশী বৌদ্ধ হিসেবেও দেখা হয়।

সে সময় নিপীড়িত পলাতক ভিক্ষুদের অধিকাংশ আশ্রয় নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য এক বিহার হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে।
চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ত্রয়োদশ শতকে সেনরাজবংশের শাসনামলে (১১০০-১২৬০ খ্রিস্টাব্দে)। এ সময়কালে বাংলায় বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো নানা রাজনৈতিক দুর্যোগের কারণে ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সেন ও বর্মন রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিরূপ। তাদের শাসনামলে বৌদ্ধদের উপহাস ও বিদ্রুপ করা হতো এবং ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদেরকে পাষণ্ডী ও নাস্তিক বলে নিন্দা করতো। বৌদ্ধ বিহারগুলোতে বুদ্ধ মূর্তি সরিয়ে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘শংকর বিজয় ও শুন্য পুরাণ’ গ্রন্থে ব্রাহ্মণদের বৌদ্ধ নির্যাতনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। শুন্য পুরাণ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের বিষয় সম্পত্তি কেড়ে নিত এবং তাদের সর্বদা অত্যাচার নির্যাতন করত। বৌদ্ধ বিহারগুলো হিন্দু ব্রাহ্মণদের দখলে চলে যায় এবং বিপুল সংখ্যক বৌদ্ধ হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এছাড়া অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু দেশ ত্যাগ করে তিব্বত, নেপাল, উড়িষ্যা, কামরূপ, আরাকান ইত্যাদি অঞ্চলের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। এ সমস্ত কারণে বৌদ্ধধর্ম ত্রয়োদশ শতকের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বলতে গেলে বাংলায় তখন সেনবংশের নিয়ন্ত্রণাধীন হিন্দু রাজত্বের রমরমা অবস্থা।
লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী বাংলা আক্রমণ করেন। এ আক্রমণে বাংলায় অবশিষ্ট বৌদ্ধ সভ্যতার যা ছিল তাও সমূলে উৎপাটন হয়ে গেল। ভাগ্যান্বেষণে আগত তুর্কীবীর বখতিয়ার বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মনে করেছিলেন ব্রাহ্মণদের দুর্গ। এ ভ্রান্ত ধারণায় বাংলার বৌদ্ধবিহার, সংঘারাম ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বখতিয়ারের তরবারি ও অশ্বক্ষুরের আঘাতে একের পর এক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বিহারভিত্তিক বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরী মহাবিহারগুলো একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, নিহত হল অধিকাংশ বৌদ্ধ ভিক্ষু। বিহারে রক্ষিত ধন-সম্পদ লুট করা হল। আগুনে পুড়ে সবকিছুই ছাই হয়ে যাবার পর বখতিয়ার খিলজী জানতে পারলেন এগুলো ব্রাহ্মণদের দুর্গ নয়, এগুলো সুসমৃদ্ধ বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়। এভাবে তুর্কী সৈন্যদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেল বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপনা।

এ প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন ণ্ডযাঁরা তুর্কী বীরদের অস্ত্রাঘাত হতে কোনরকমে প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হলেন তাঁরা অতিকষ্টে হাতের কাছে পাওয়া কয়েকটি পুথি, ছোট ছোট মূর্তি প্রতিমা এবং সূত্রোৎকীর্ণ মাটি বা শিলাফলক নিয়ে পালিয়ে গেলেন তিব্বত, নেপাল, উড়িষ্যা, কামরূপ, আরাকান, পেঁগু, পগান বা আরও দূরদেশে। একই প্রসঙ্গে নলিনীনাথ দাশগুপ্ত লিখেছেনণ্ডমগধের বিহারগুলোতে তুর্কীদের এরূপ জঘন্যতম অত্যাচার কাহিনী শুনে বাংলার সোমপুর, জগদ্দল প্রভৃতি বিহারবাসী শ্রমণগণ অত্যাবশ্যকীয় কিছু পুথিপত্র সঙ্গে নিয়ে আত্মরক্ষার্থে যে যেদিকে পারে পালিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন ণ্ড দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণে প্রথমে মগধ ও পরে ভারতের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাংলার বৌদ্ধবিহার ও সংঘরামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৌদ্ধধর্ম গ্রাস করার ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণে প্রতিকূল শক্তির মোকাবেলায় বিধ্বস্ত বৌদ্ধধর্ম বাংলা থেকে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেল।
বাংলার সুলতানী আমলে ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে ফখর উদ্দিন মোবারক শাহ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয় এবং চট্টগ্রামে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তখন থেকে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে জামাল খাঁ পন্নীর সময়কাল চট্টগ্রামে মুসলিম শাসন বলবৎ ছিল। সুলতানী আমলে চট্টগ্রাম মুসলিম অধিকারে চলে আসলে চট্টগ্রামেও বৌদ্ধরা নির্যাতিত হতে থাকে। হয়তো এ সময়ে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহারও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি এবং এ সময়েই চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার থেকে ভিক্ষুরা দলে দলে তিব্বত, নেপালের দিকে ছুটে যেতে থাকে। পরবর্তীতে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগলরা আরাকান রাজকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। চট্টগ্রাম দখলের এ ভয়াবহ যুদ্ধে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় বলে ধারণা করা যায়। এ যুদ্ধে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার ধ্বংস, ধর্মগ্রন্থ বিনষ্ট, বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ নিহত হন বা পলায়ন করেন। চট্টগ্রাম থেকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা (মগরা) পালিয়ে আরাকানে আশ্রয় নেয়। অবশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর নেমে আসে অমানিশার যুগ। মোগল সম্রাট বা শাসকরা এদেশে বৌদ্ধধর্ম নামে কোন ধর্ম ছিল, মনে হয় তা জানতেনই না। কারণ মোগল শাসনামলের কোন পুথিপত্র বা গ্রন্থে বৌদ্ধধর্ম বা বৌদ্ধদের কোন কথা পাওয়া যায় না। সত্যিকার অর্থে তখন বাংলায় বৌদ্ধদের কোন অস্তিত্বই ছিল না।
শিহাব উদ্দিন তালিশ বিরচিত ‘ফতিয়া-ই-ইব্রিয়া’ গ্রন্থে, দেয়াঙ পাহাড়স্থ প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দর, দেয়াঙ কারাগার, বদরশাহের দরগাহসহ মোগল-আরাকানীদের ভয়াবহ যুদ্ধের বর্ণনা থাকলেও পণ্ডিতবিহার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তাতে ধারণা করা হয় যে, পণ্ডিতবিহারের সেই জৌলুস তখন ছিল না।

চট্টগ্রামের কৃতীসন্তান পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাস ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে কয়েকবার তিব্বতে গিয়ে প্রাচীন পুঁথিপত্র এনে ব্যাপক গবেষণা করেও চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহারের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারেন নি। তবে তিনি চট্টগ্রাম শহরের দেবপাহাড় এলাকায় এর অবস্থান ছিল বলে মনে করেন।

 চলবে..-...
* কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি লেখাটিতে যেসকল ইতিহাসবিদগণের শ্রমের সহযোগিতা নিয়েছি।

মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭

কালামের হাতে হেসেছিলেন বুদ্ধ।

১১ মে, ১৯৯৮৷ বাতাসে আপেক্ষিক আদ্রতা সেদিন একটু বেশীই ছিল বোধহয়৷ দেশের অন্তরেও জমছিল উদ্বেগ৷  ১৯৭৪-এর পর সেই আবার দেশের পরমাণু শক্তির পরীক্ষা হবে৷ শুধু তো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি নয়, ছিল রাজনৈতিক ঘূর্ণিপাকও৷ সে সব সামলে নিয়েই সেবার দেশের শক্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা গিয়েছিল৷ কিন্তু সর্বক্ষণ চলছে আমেরিকান উপগ্রহের নজরদারি৷ তা এড়িয়েই বিশ্বের কাছে দেশীয় পারমাণবিক শক্তির বার্তা দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল যাঁর উপর, তিনি ডঃ এপিজে আব্দুল কালাম৷ বুদ্ধ পূর্ণিমার রাত ছিল সেদিন৷ সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে, আমেরিকার নজরদারি এড়িয়ে, পরমাণু পরীক্ষায়  সাফল্য পৌঁছেছিলেন ডঃ কালাম৷১৯৯২ থেকে ৯৯ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিজ্ঞান উপদেষ্টার পদে নিযুক্ত ছিলেন ডঃ কালাম৷  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ১৯৯৬ সালেই  পরমাণু শক্তির পরীক্ষার কথা ভেবেছিলেন৷ কিন্তু রাজনৈতির চাপের কাছে নতিস্বীকার করেন৷ ১৯৯৮-এ আর পিছু ফিরে তাকাননি৷ প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে সবুজ সংকেত গিয়েছিল ডঃ কালামের কাছে৷ পোখরান-২ পরমাণু পরীক্ষার সুপারভাইজারের দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর উপর৷ সফলভাবে পাঁচটি পরমাণু বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছিল৷ তারমধ্যে চারটি ছিল ফিসন বোম, একটিই ফিউশন বোম৷ মোট ৫৮ জন ইঞ্জিনিয়ারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল সে কাজের জন্য৷
গোপনীয়তা ছিল চরম মাত্রায়৷ এল সাফল্য৷ পরমাণু শক্তি হিসেবে সেদিন নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছিল ভারত৷ আর পুরো প্রক্রিয়াটির নেপথ্য নায়ক ছিলেন ডঃ কালাম৷ প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সেদিন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আমেরিকার উপগ্রহের নজরদারি এড়ানো৷ ডঃ কালামের পরিকল্পনামতোই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সময়ের হেরফেরে বোকা বানাতে পেরেছিল উপগ্রহটিকে৷ সফল হয়েছিল দেশের পরমাণু পরীক্ষা৷ ১৯৯৮-এর এই পরীক্ষার সাফল্যকে সিআইএ-র ( সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্সি এজেন্সি, আমেরিকা) সবথেকে ব্যর্থতা বলেও ধরা হয়৷ ভাবা অ্যাটোমিক রিসার্চ সেন্টারের তরফ থেকে ডঃ কালামকে একটি স্মারক সম্মান দেওয়া হয়, যেখানে বুদ্ধ মূর্তির নীচে লিখে দেওয়া হয়েছিল, ‘দ্য বুদ্ধ হ্যাজ স্মাইলড’৷ বস্তুত গোটা দেশই সেদিন স্বস্তির হাসি হেসেছিল৷

শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৭

মানবের পরাজয়ের কারণ

মানব জীবনে পরাজয়ের কারণ কি?
=========================

ভগবান গৌতম বুদ্ধ দায়কদের বলেছেন:-

০১| যে ব্যক্তি অজ্ঞানী ও অধার্মিক তাঁর পরাজয় হয়৷

০২| যে ব্যক্তি অসৎ ব্যক্তিকে প্রিয় ও  সৎ ব্যক্তিকে অপ্রিয়  মনে করে এবং মিথ্যাদৃষ্টির আশ্রয় গ্রহণ করে তাঁর পরাজয় হয়৷

০৩| যে ব্যক্তি অলস, নিদ্রালু, উদ্যমহীন ও ক্রোধী এবং বাজে গল্পে সময় নষ্ট করে তাঁর পরাজয় হয়৷

০৪| যে ব্যক্তি সক্ষম হয়েও মাতাপিতার ভরণ পোষন করেনা সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৫| যে ব্যক্তি নিষ্পাপ ভান্তে, শ্রামণ কিংবা যাচককে মিথ্যা কথায় প্রবঞ্চনা করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৬| যে ব্যক্তি প্রভূত বিষয় সম্পত্তির অধিকারী হয়েও অন্যেকে দান করেনা সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৭| যে ব্যক্তি জাতি, ধন, গোত্র, বিষয়ে অহংঙ্কারী এবং গরীব আত্মীয়দের ঘৃনা করে সে ব্যক্তি পরাজয় হয়৷

০৮| যে ব্যক্তি পরস্ত্রীতে আসক্ত, সুরাপায়ী ও জুয়ারি যার ফলে অর্জিত ধন সম্পত্তি নষ্ট করে ফেলে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৯| যে স্বীয় স্ত্রীতে অসন্তুুষ্ট এবং গণিকা ও পরদ্বারে আসক্ত সে ব্যক্তি পরাজয় হয়৷

১০| যে ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে তরুনী ভার্যা বিবাহ করে, তার অক্ষমতা বিধায় তাঁর স্ত্রী বা ভার্যা ব্যভিচারে রত হয় সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

১১| যে ব্যক্তি সংসার পরিচালনার ভার প্রমত্ত ও উৎশৃংঙ্খল স্ত্রী বা পুরুষের উপর অর্পণ করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

১২| যে ব্যক্তি সামান্য সম্পদের অধিকারী রাজত্ব লাভের দূরাশা পোষণ করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

সত্যকে জানুন, মিথ্যাকে দূর করুন৷ পড়তে উৎসাহিত হোন, বেশী বেশী লাইক,কমেন্ট, শেয়ার করে অন্যেকে পড়ার সুযোগ করে দিন এতে  আপনার এবং সবার পূণ্যে ও মঙ্গল হবে৷৷

রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বুদ্ধ ধর্মে অনুশীলনের গুরুত্ব।


সমাজে অনেকে নিজেকে পন্ডিত বলে মনে করেন। তাঁরা বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করে বা গবেষণা করে তাঁদের পন্ডিত বলে ধারণা আসতে পারে। কিন্তু বুদ্ধের সেই আসল গবেষণায় পৌঁছতে হলে বা আসল পন্ডিত হতে হলে তাঁকে অবশ্যই ব্যবহারিক জ্ঞান সহ শাস্ত্র জ্ঞানে পারদর্শী হতে হবে। তাহলেই তিনি পন্ডিত হতে পারবেন। বিদর্শন ভাবনা সঠিক আচার্যের মাধ্যমে শুদ্ধ আচরণ করলে তাঁর প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হবে। প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হরে সংস্কার নিরোধ হবে। সংস্কার নিরোধ হলে নামরূপ পরিচ্ছদ জ্ঞান ও উদয় ব্যয় জ্ঞান ইত্যাদি ষোল প্রকার জ্ঞান উৎপন্ন সহ মার্গ পথে পদার্পণ করবেন। এ বিষয়ে পরিপূণূ জ্ঞান অর্থাৎ বিদর্শন ভাবনা শুদ্ধ আচরনের মাধ্যমে মার্গ পথে বিচরণ না করে অন্য বিদর্শনাচার্যের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করলে উপবাদ অন্তরায় হতে পারে। তাই বিদর্শন জ্ঞানের নীতি সোপান তথা নির্বাণ পথের জ্ঞান হয় একমাত্র বিদর্শন ভাবনা আচরণের মাধ্যমে, শাস্ত্র গবেষণার নয়। এ প্রসংঙ্গে এখানে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যাক-
শ্রাবস্তীর দুই বন্ধু তথাগত বুদ্ধের উপদেশ শুনে ভিক্ষুব্রত গ্রহণ করেন। পাঁচ বৎসরকাল গুরুর নিকট অবস্থান করে বিবিধ কর্তব্য বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে একজন উপদিষ্ট শিক্ষায় সাধনায় সিদ্ধি লাভ করলেন। অপরজন ত্রিপিটক অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা কাজে নিযুক্ত রইলেন। চরম বিমুক্তি তাঁর অধিগত হল না বুদ্ধ এ বিষয়ে অবগত হয়ে পান্ডিত্য অপেক্ষা আচরনই বিশেষ ফলপ্রদ বলে নিম্মের গাথাদ্বয় আবৃত্তি করলেন-
“বাহুম্পি সে সহিতং ভাসমানো ন তক্করো হোতি নরো পমত্তো,
গোপো বা গাবো গমাং পায়েসং ন ভাগবা সামঞ্ঞস্স হোতি।”
-বহু শাস্ত্র জ্ঞান যার বহু অধ্যয়ন, অথচ সে শাস্ত্র মতে চলে না কখন।
শ্রামণ্য ফলের ভাগী হয় না সেজন, গোপ (রাখাল) যথা পর গাভী লাভেনা কখন।”

অপ্পম্পিচে সহিতং ভাসমানো, ধম্মস্স হোতি অনুধম্মচারি,
রাগঞ্চ দোসঞ্চ পবায মোহং সম্মপ্পজানো সুবিমুত্ত চিত্তো,
অনুপাদিসনো ইধ বা হুরং বা, স ভাগবা সামঞ্ঞস্স হোতি।
-অল্প শাস্ত্র জানে কিন্তু শাস্ত্রের মতন, পালে ধর্ম রাগ, দ্বেষ মোহ হীন জন।
সম্পজ্ঞানী মুক্তচিত্ত উপাদান ত্যাগী, উভলোক হন তিনি শ্রামণের ভাগী।
যে প্রমত্ত ব্যক্তি ধর্মচার্যের নিকট বহুল পরিমাণ বুদ্ধের ধর্ম অধ্যয়ন করেও যথাযথ আচরণে বিরত থাকেন, সে ব্যক্তি রাখালের সহিত তুলনীয় হন। অর্থাৎ রাখাল যখন সারাদিন গরুর সেবা যত্ন করেও গব্যরসের অধিকারী হতে সমর্থ হয় না, সেরূপ বুদ্ধ বচন প্রচুর আবৃত্তি করলেও সেই ধর্মের রস পানের অধিকারী হতে পারে না। অপর পক্ষে অপ্রমত্তভাবে যিনি অল্প পরিমাণেও বুদ্ধের বাণী অধ্যয়ন করেন, তারা সুন্দর রূপে আচরণ করেন, নব লোকোত্তর ধর্মের অনুকূল ধর্মার্থ অবগত হয়ে কাম প্রবৃত্তি দমন করেন এবং মনে প্রাণে মুক্তি অভিসরী হন, তিনিই বিদর্শন ভাবনা বলে কাম-দ্বেষ-মোহকে সর্বতোভাবে পরাভূত করে মুক্তি পারের সন্ধান লাভ করেন এবং কাম, দৃষ্টি, শীলব্রত ও আত্মবাদ ভেদের চারিটি উপাদান সমূলে উৎপাদিত করে অরহত্ব ফল লাভের পর ভববন্ধন মুক্ত হন। তখন তিনি ইহাকল ও পরকালের শ্রামণের ভাগী হতে পারেন। ধর্মের সত্যিকারের দায়ক নির্বাণ লাভী এবং ধর্মের ধারক ও বাহক হতে পারেন।
ভগবান বুদ্ধ অনেক গবেষণা করে নির্বাণ লাভের জন্য একটি পথই আবিষ্কার করে গেছেন আমাদের জন্য দুটি পথ নয়। আর সে পথ হলো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথে আচরণ এবং এ পথে আচরণে মুক্তি লাভ সম্ভব। অন্যভাবে আচরণ বৃথা হবে, বুদ্ধের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যায় বা উপদেশে শুধু বিমুক্তিই উদ্দেশ্যেই ভাবিত ও দেশিত হয়েছে। তাই ইহাকে মহা সমুদ্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মহাসমুদ্রের জল যেখান থেকেই নেওয়া হোক না কেন সবখানেই লোনা। তদ্রুপ বুদ্ধের ধর্ম দর্শন সবখানেই বিমুক্তি রসে পরিপূর্ণ। বুদ্ধ বলেছেন-
মগ্গষ্ঠাঙ্গিকো সটটেঠা, সচ্চানং চতুরাপদা,
বিরাগো সেটঠ ধর্মানং দ্বি পদানঞ্চ চক্ষুমা।
এসোব মগগো নত্থঞ্ঞ, দস্সনস্স বিসুদ্ধিযা
এতঞহি তুমেহ পটিপজ্জথ মারসসেতং পমোহনং।
মার্গমাঝে অষ্টাঙ্গিক, সত্য মাঝে সত্য চতুষ্টয়,
ধর্মেতে বিরাগ শ্রেষ্ট চক্ষুমান মানবে নিশ্চয়।
এ মার্গ বিনা অন্য কোন মার্গ নাই,
দর্শন শুদ্ধির তবে করতে যাচাই।
তাই এ আষ্টমার্গ সবে অনুস্মর,
এ মার্গে মার রাজ্যে সম্মোহিতে পার।

একবার বুদ্ধ ভগবান ভিক্ষু সংঘে কিছুদিন জনপদ ভ্রমণ করে পুররায় জেতবনে ফিরে এসেছেন। একদিন বুদ্ধের সঙ্গে ভ্রমণকারী সে ভিক্ষুগণ অতিথি শালায় গিয়ে তাঁদের ভ্রমণ পথের সুগমতা ও দুর্গমতা সম্বন্ধে আলোচনা করছেন। বুদ্ধ তাঁদের আলোচনা শুনে লৌকিক পথ সম্বন্ধে চিন্তা না করে আধ্যাত্মিক সাধনায় রত হয়ে আর্য মার্গের সন্ধান করতে উপদেশ দিলেন। মুক্তি লাভের জন্য যদিও অনেকে মনে করেন বিবিধ প্রকার পথের নির্দেশ আছে। আসলেই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই একমাত্র পথ।

চক্রবালের বা একত্রিশ লোকভূমির প্রাণীগণ সর্বদা মুক্তি লাভের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করে, অথচ সমস্ত কাজ মুক্তির নয়। কিছু পাপ, কিছু পুণ্য ও কিছু পরমার্থ কাজ। তন্মধ্যে পাপ কাজ ও পুণ্য কাজ বিপাক সৃষ্টি করে। কিন্তু পরমার্থ কাজের বিপাক সৃষ্টি হয় না। অধিকন্তু পরমার্থ কাজের দ্বারা জমাকৃত বিপাক কায়দ্বারে, বাক্যদ্বারে ও মনদ্বারে নিরোধ হয়। এটাই হলো বিদর্শন ভাবনা।

পাপ কাজের কর্মপথ দশটি। যেমন হত্যা, চুরি, মিথ্যা বাক্য, পিশুন বাক্য, (ভেদ বাক্য) পরুষ (কর্কশ) বাক্য, সম্প্রলাপ (অর্থহীন) বাক্য, অভিদ্যা (লোভ), ব্যাপাদ (দ্বেষ) ও ভ্রান্ত ধারণা (মিথ্যা দৃষ্টি)। এ সমস্ত কর্মপথে কাজ করলে জন্মে জন্মে চারি অপায় গমন, যেমন-তির্যক , প্রেত, অসুর ও নিরয় কুলে উৎপন্ন হয়ে অসীম দুঃখ ভোগ করতে হয়। আবার পুণ্য কাজের কর্মপথ দশটি। যেমন- দান, শীল, ভাবনা (শমথ), সেবা, সম্মান, পুণ্যদান, পুণ্যদানানুমোদন, ধর্মশ্রবণ, ধর্মদেশনা ও দৃষ্টি ঋজু কর্ম (সত্য পথ আচরণ) এ সমস্ত কর্ম পথে কাজ করলে মৃত্যুর পর সুগতি লাভ হয়। যেমন মানুষ স্বর্গ ও ব্রহ্মলোকে জন্ম প্রতিসন্ধি গ্রহণ করে সুখ লাভ করে। পাপ কর্মর্জিত দুঃখ এবং পুণ্যকর্মার্জিত দুঃখ উভয়ই অস্থায়ী। এ গুলো ভোগের পর পুনঃ প্রতিসন্ধি বা জন্ম নিতে হয়। আর জন্ম দুঃখ বলে বুদ্ধ আখ্যায়িত করেছেন। ২৫৯৭ বৎসরের মধ্যে একটি মাত্র জ্ঞানী বা ‍বুদ্ধ যিনি জীব জগতের এ দুঃখ অবলোকন করে তাহা নিরোধের জন্য মার্গ বা পথ আবিষ্কার করেছেন। তাহাই বিদর্শন ভাবনা। সে বিদর্শন ভাবনা আচরণ ক্ষেত্রে অনেকের ধারণা শমথ ভাবনা আগে করতে হবে, না হয়তো বিদর্শন ভাবনা লাভ হবে না। আবার অনেকে শমথ ভাবনা করে সরাসরি নির্বাণ লাভ হবে বলে মনে করেন, আবার অনেকে শমথ বা বিদর্শন যে কোন ভাবনা করলে নির্বাণ লাভ হবে বলে মনে করেন। এখন সে আলোচনায় আসা যাক-
“চানমার য়ৈকত ভাবনা কেন্দ্র” ইয়াঙ্গুন, মায়ানমার-এর অধ্যক্ষ সেয়াদ উ জনকাভিংসো বর্ণনা করেছেন, একবার বুদ্ধ উত্তরীয় নামক রুগ্ন ভিক্ষুকে বলেছেন “আরম্ভ যদি বিশুদ্ধ হয় হবে সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে নির্বাণ সাক্ষাৎ হবে।”

তাই বুদ্ধের এ একটি বাক্য থেকে বুঝা যায় বিদর্শন ভাবনার যদি মুক্তির একমাত্র পথ হয় তাহলে আরম্ভ শমথ ভাবনা দিয়ে করলে বিশুদ্ধভাবে আরম্ভ হলো কি? মুক্তি মার্গ বা নির্বাণ লাভ হবে কি? আবার যারা শমথ ভাবনার মাধ্যমে শুরু করে মুক্তি পেতে চান, তাঁদের জন্যও সে সময় অতীত হয়ে গেছে। অর্থাৎ পটিসম্ভিদা মার্গসহ অর্হত্ব ফলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর এক হাজার বৎসর পার হয়ে ২৫৫২ বৎসরে পৌঁছেছে। কাজের বুদ্ধের বিভিন্ন সময়ের উক্তি থেকে জানা যায় সরাসরি শমথ ভাবনা করেও নির্বাণ লাভ সম্ভব নয় এবং প্রথমে শমথ দিয়ে আরম্ভ করে পুনঃ বিদর্শনে আসা দুরুহ ব্যাপার। সে আলোচনার পরে আসা যাবে।

কুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করার পর মহর্ষি ভার্গব- এর আশ্রমে উপস্থিত হলেন। বিস্তীর্ণ বনরাজি, বিভিন্ন গাছগাছড়ার ভরা এ আশ্রম। সুনিবিড় এ একান্ত তপোবনে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন রকম শারীরিক অবস্থায় বেশ কয়েকজন অসাধারণ কষ্টে কৃচ্ছ সাধনায় ব্রত। তিনি ঘুরে ফিরে দেখলেন, কয়েক রাত অবস্থান করলেন এবং বুঝতে পারলেন এ সমস্ত আচরণে মনুষ্যে জন্মে বা স্বর্গে জন্ম গ্রহণ করা যায়। কিন্তু পুনরায় অপায়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়নি। কাজেই ইহা আচরণে দুঃখ মুক্তি স্থায়ীভাবে হচ্ছে না জেনে ঐ আশ্রম ত্যাগ করলেন। ঘুরে ঘুরে তিনি ঋষি আরাড় কালামের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। আশ্রম প্রধানের সাথে আলোচনা করে জানতে চাইলেন জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, শোক, সংক্লেশ ইত্যাদি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার স্থায়ী কোন পথ আছে কিনা। ঋষি তাঁকে সমস্ত আশ্রম ঘুরে ঘুরে দেখালেন, বুঝালেন এবং আচরণ করতে বললেন। কুমার সিদ্ধার্থ এখানে আচরণে প্রবৃত্ত হয়ে সব চাইতে উন্নততর ব্রহ্মলোকের আকিঞ্চানায়তন ধ্যান লাভ করলেন। এ আকিঞ্চানায়তন থেকে চ্যুত হয়ে পুনরায় কর্মপ্রবাহে প্রতিসন্ধি হবে তাই তিনি তাঁর এ লদ্ধ ধর্ম জ্ঞানে তৃপ্তি লাভ করতে পারলেন না। কেননা ইহা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অতীত কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে না মানুষকে। তিনি বুঝতে পারলেন এ ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞাতার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। তাই তিনি অনাসক্তভাবে আশ্রম থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ক্রমে তিনি কোশল রাজ্যের রাজধানী শ্রাবস্তীতে এসে পড়লেন। সেখানে ঋষি রামপুত্র রুদ্রকের কথা জানতে পেরে তাঁর আশ্রমে উপস্থিত হলেন এ আশ্রমে যা কিছু কর্মকান্ড আছে সবই তিনি ধীরে ধীরে আয়ত্ব করে নিলেন। তারপর ঋষির নিকট জিজ্ঞাসা করেলেন আর আছে কিনা। ঋষি বললেন এর অধিক কিছু নেই। এখানে সব চাইতে বেশী কিছু লাভ হল একত্রিশ লোকভূমির সর্বোপরি স্থান, আনেঞ্জা সংস্কার, ৮৪ হাজার কল্পকাল সুখ ভোগকারী আরূপ ব্রহ্মলোকের “নৈবসংজ্ঞানাসজ্ঞায়তন”। তার উপরে অধিক সুখ ভোখকারী অন্যা কোন স্থান চক্রবালে আর নেই। অথচ সে অরূপব্রহ্মলোক থেকে চ্যুত হয়ে আবরও অপায়ে প্রতিসন্ধি যোগ আছে। এখন রাজ কুমার সিদ্ধার্থ জানতে পারলেন যে, এখানে (নৈবসংজ্ঞানাসজ্ঞায়তন) ও উপধি নির্মূল হয় না, তা যতই সুক্ষ্ণ হোক না কেন উপধি থাকলেই তা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অধীন হবে। সুতরাং এ ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞাতার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। কাজেই এখানে থেকেই কোন লাভ নেই। তাই তিনি রামপুত্র রুদ্রকের আশ্রম থেকে বেড়িয়ে পড়লেন নির্বাণ লাভের পথ অম্বেষণে।

রাজকুমার সিদ্ধার্থ শমথ ভাবনা আচরণ করে বুঝতে পারলেন যে, এ সমস্ত আচরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখলে জন্মতা বিফলে যাবে। কৃচ্ছ সাধন ও শমথ ভাবনা আচরণে নিজের শরীর এবং সময় নষ্ট হয়ে গেল অনুভব করে আসল দুঃখ মুক্তির পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। এখানে শমথ ভাবনা কি এবং তার আচরণটা কি রকম তা একটু আলোচনা করা যাক।
শমথ ভাবনা চল্লিশ প্রকার, যথা, দশ প্রকার কৃৎস্ন, দশ অশুভ, দশ অনুস্মৃতি, চারি অপ্রমেয়, এক সংজ্ঞা, এক ব্যবস্থান এবং চারি অরূপ ধ্যান স্তর।

দশ কৃৎস্ন- পৃথিবী কৃৎস্ন, আপ কৃৎস্ন, তেজ কৃৎস্ন, বায়ু কৃৎস্ন, নীল কৃৎস্ন, পীত কৃৎস্ন, লোহিত কৃৎস্ন, অবদাত কৃৎস্ন, আকাশ কৃৎস্নও আলোক কৃৎস্ন।
দশ অশুভ- উদ্ধস্ফীত, বিনীলক, পূঁজপূর্ণ, ছিদ্রীকৃত, বিখাদিত, বিক্ষিপ্ত, কর্তিত-বিক্ষিপ্ত, রক্তাক্ত, কীটপূর্ণ ও অস্তিপূঞ্জ।
দশ অনুস্মৃতি- বৃদ্ধানুস্মৃতি, ধর্ম্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি, উপশমানুস্মৃতি, মরনানুস্মৃতি, কায়গতানুস্মৃতি ও আনাপান স্মৃতি (শ্বাস প্রশ্বাস)।
চারি অপ্রমেয়- মৈত্রী, করুণা, মুদিতাও উপেক্ষা।
এক সংজ্ঞা- ভক্ষ্য দ্রব্যের ঘৃণাকর পরিণতি সম্বন্ধে জ্ঞান।
এক ব্যবস্থান- দেহস্থ কঠিন, তরল, উষ্ণ ও বায়বীয় সম্বন্ধে জ্ঞান ও অশুচি ভাবনা।
চারি অরূপ- আকাশানান্তায়তন, বিজ্ঞানান্তয়াতন, অকিঞ্চানায়তন ও নৈবসংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন।
এরূপে চল্লিশ প্রকার শমথ ভাবনার চল্লিশটি কর্ম্মস্থান। চল্লিশটি কর্ম্মস্থানের মধ্যে চরিত ভেদে বিভিন্ন কর্ম্মস্থানের উপযোগিত বিদ্যমান। যেমন-
() রাগ চরিত পক্ষে- দশ অশুভ ও কায়গতানুস্মৃতি নামক কোষ্ঠাংশ ভাবনা।
() দ্বেষ চরিতের পক্ষে- নীলাদি চারিবর্ণ, কৃৎস্ন এবং চারি অপ্রমেয়।
() মোহ চরিত ও বিতর্ক চরিতের পক্ষে- আনাপান স্মৃতি।
() শ্রদ্ধা চরিতের পক্ষে- বুদ্ধানুস্মৃতি ইত্যাদি ছয় অনুস্মৃতি।
() বুদ্ধি চরিতের পক্ষে- মরনানু, উপশমানু, সংজ্ঞা, ব্যবস্থানাদি অনুকুল ভাবনা।
() মোহ চরিত ও ক্ষুদ্রাকার বিতর্ক চরিতের পক্ষে- কৃৎস্ন মন্ডলের নির্বাচনে পৃথুল (স্থুল) উপযোগী।
অবশিষ্ট কর্ম্মস্থান সকলের পক্ষে উপযোগী।
চল্লিশটি কর্ম্মস্থানে পরিকর্ম ভাবনা লাভ করা যায়। বৃদ্ধানুস্মৃতি, ধর্ম্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি, উপশমানুস্মৃতি, মরনানুস্মৃতি, আহার অশুভ সংজ্ঞা এবং ধাতু ব্যবস্থান এই দশটি কর্মস্থানে উপাচার ভাবনা লাভ করা যায়। অবশিষ্ট ত্রিংশ কর্মস্থানে অর্পনা ভাবনা লাভ করা যায়।
আবার দশ অশুভ ও কায়গতানুস্মৃতি ভাবনা দ্বারা প্রথম ধ্যান লাভ হয়।
মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা দ্বারা চতুর্থ ধ্যান লাভ হয়।
দশ কৃৎস্ন, আনাপান ও উপেক্ষা ভাবনা দ্বারা পঞ্চম ধ্যান লাভ হয়।
চারি অরূপ ধ্যান ও দশ উপাচার ধ্যান ব্যতীত বাকী ছাব্বিশটি কর্মস্থান রূপলোকের ধ্যান উৎপন্ন করে। এ সমস্ত গুলি শমথ ধ্যানের লাভ, নিবৃত্তি বা নির্বাণের লাভ এতে নেই।
যদি কেহ শমথ ভাবনার মাধ্যমে শুরু করে নির্বাণ লাভ করতে চেষ্টা করেন তবে উপরোক্ত ত্রিংশ কর্মস্থানের যে কোন একটা কর্মস্থানে ভাবনার দ্বারা প্রথম থেকে পঞ্চম ধ্যানিক কর্মস্থানের কাজ সমাপনান্তে পুনরায় বিদর্শন ভাবনার নিমজ্জিত হও। ভাবনার দ্বারা হয়ত অরহত নয়তোবা অনাগামী লাভ হয়। যার নাম প্রতিসম্ভিদা মার্গ যা বর্তমানে লাভ সম্ভব নয়। প্রতিসম্ভিদা জ্ঞান লাভ হয় বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর এক হাজার (১০০০) বৎসর পর্যন্ত। বর্তমানে বুদ্ধের পরিনির্বাণ হয়েছে আড়াই হাজার (২৫০০) বৎসর অতীত হয়ে গেছে। সে হিসেবে বুদ্ধের নিয়মে তৃষ্ণা ক্ষয় করে মার্গফল লাভ করার যথেষ্ট সুযোগ বিদ্যমান।
ভগবান বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর প্রথম বারাণসীর নিকটবর্তী ঋষিপতন মৃগদাবে পঞ্চ বর্গীয় শিষ্য কৌন্ডিণ্য , বপ্প, ভদ্দিয়, মহানাম ও অশ্বজিতকে উপদেশ সহকারে দেশনার বলেছিলেন,হে ভিক্ষুগণ নির্বাণকামী ব্রতচারী দুই অন্তের অনুশীলন করবে না, প্রথম কাজে কম সুখোদ্রেকের প্রতি অনুরক্তি, যা হীন, গ্রাম্য, ইতর সাধারণের সেবা, অনার্য জনোচিত ও অনর্থকর, দ্বিতীয়/ আত্ম নিগ্রহে অনুরক্তি যা দুঃখ দায়ক, নিকৃষ্ট ও অনর্থকর। এ দুই অন্ত বর্জন করে তথাগত মধ্যম প্রতিপদ বা মধ্যমপন্থা, অভিসম্ভোদি জ্ঞান লাভ করেছেন যা চক্ষুকরনী ও জ্ঞান করনী এবং যা উপশমা অভিজ্ঞ, সম্ভোদি ও নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গিই সে মধ্যম প্রতিপদ। যথা সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি।
এ দেশনার পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের মধ্যে কৌন্ডিণ্য ধর্ম চক্ষু লাভ করেন। অর্থাৎ মার্গফল লাভ করেন, জগতে প্রথম স্রোতাপন্ন মানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সে দেশনায় আঠার কোটি দেব, ব্রহ্মা ধর্ম চক্ষু লাভ করেন। মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাতে অন্য কিছুই প্রয়োজন হয়নি। এখনও এরকম মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। আবার অন্তিম সময়ে অর্থাৎ বুদ্ধের পরিনির্বাণের সময় কুশীনগরে মল্লদের শালবনে পরিব্রাজক সুভদ্রকে বললেন, হে সুভদ্র! যে ধর্ম বিনয়ে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গেই উপলদ্ধি নেই (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নেই) প্রথম শ্রমণও তথায় নেই, দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, এবং থাকতে পারেনা। সুভদ্র! যে ধর্ম বিনয়ে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের উপলদ্ধি আছে, (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ আছে) প্রথম শ্রমণও তথায় আছে, তথায় দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রমণও আছে, তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমণও আছে, চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমণও আছে। হে সুভদ্র! ঊনত্রিশ বৎসর বয়সে আমি সর্বজ্ঞাতা জ্ঞান লাভ করার জন্য প্রব্রজিত হয়েছিলাম। যখন আমি প্রব্রজিত হই, সেদিন হতে এখন পর্যন্ত ৫১ বৎসর পর্যন্ত আমি আর্য মার্গ ধর্মের প্রদেশে বিদর্শন মার্গ প্রবর্তন করেছি। ইহার মধ্যে প্রথম শ্রমণ (স্রোতপন্ন) আছে, ‍দ্বিতীয় শ্রমণ (সকৃদাগামী) আছে, তৃতীয় শ্রমণ (অনাগামী) আছে এবং চতুর্থ শ্রমণ (অর্হৎ) আছে। ভগবান বুদ্ধের এ অন্তিম বাণীতেই আছে যে, ‍বিদর্শন মার্গ ছাড়া অন্য কোন মার্গ নেই মুক্তি লাভের জন্য। তাহলে আমরা কেন অন্য পথে যাওয়ার চেষ্টা করব? বুদ্ধত্ব লাভ করার পূর্বে সিদ্ধার্থ কৃচ্ছ সাধন, শমথ ভাবনা ইত্যাদি অনেক কিছু দেখেছেন ও আচরণ করেছেন। তা সবই ত্যাগ করে নির্বাণ লাভ করার পথ আবিস্কার করেছেন। প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রেও পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন একমাত্র আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথের নির্বাণ লাভ হবে। অন্য কোন বিকল্প পথ নেই। ইহা ছাড়া বুদ্ধের ধর্ম আচরণ করা, ধর্মে উন্নত হওয়া ও সাফল্য অর্জন করা- স্থান, কাল, পাত্রভেদে অকালিক।

রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৭

is Buddhism is religion?

In a religion, the main characteristic is that
there is a Creator God. But in Buddhism there is
no Creator God. In that sense Buddhism is not a
religion. The devout followers of all religions in
the world believe that there is a substance (permanent
entity) called atman or soul. But in Buddhism
there is no permanent entity called soul.
In that sense too Buddhism is not a religion. On
the contrary, in religion there should be some
organized institutions like churches and temples
and there are also some mediators such as
reverend fathers, monks and nuns to conduct
pujas and prayers etc. On this ground we can say
that in Buddhism too there are such institutions,
monks and nuns.
Simply because there are institutions, monks,
nuns and some sort of performances and offerings
and some pujas for the worldly pleasure of
the followers, one cannot say that Buddhism is also a religion. As there are no
major characteristics of religion in Buddhism, it is not a religion. Some say that
it is a philosophy. But it is neither a sheer philosophy. Of course in Buddhism
too, there is epistemology, psychology, metaphysics, logic and ethics, which
consists in a philosophy. But I should say that it is neither a religion nor a philosophy.
But it is a way of life which could be applied in our daily life. To be
exact, this way is nothing but practising and developing one's mind through
meditation.............

শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৭

ধর্ম এবং বিজ্ঞান।


০১
লিখেছেন – বাবলু মুৎসুদ্দী

সব ধর্মই কার্য – কারনেই হয় অকারনে কোন কিছু হয় না এবং হওয়া সম্ভবও নয়। কার্য – কারনে মন বা ধর্ম উদয় হয় (Genesis) কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়ে (Static development )আরেক চিত্ত (আগাম নতুন ধর্ম) উৎপন্ন হওয়ার কারন রেখে বিলীন (Desolution)হয়ে যায় । মন বা ধর্ম (চিত্ত) উৎপন্ন হয়ে বিলীন হতে যে সময় লাগে তাকে ০১ (এক) চিত্তক্ষণ (হাতে দুই আঙ্গুলে তুরি ফোঁটাতে সে সময়) বলে। আর ১৭ চিত্তক্ষণে ১ চিত্তবীথি (One Thought Process) হয় ।
বুদ্ধ বলেছেন প্রতিটি চিত্ত,(Psychic Life) ১৭ চিত্তক্ষণ বা এক চিত্তবীথি স্থায়ী বা ঠিকে থাকে। এবং নতুন কোন চিত্ত বা কর্ম সৃষ্টি করে বিলীন হয়ে যায় ।  বিজ্ঞানী আর্লবাট আনস্টাইন E=mc2 সূত্রানুসারে দেখতে পান পদার্থ শক্তিতে আর শক্তি পদার্থে রূপান্তুর হয় অতএব পদার্থ অভিনশ্বর ।
আর বিজ্ঞানী মহলে হিংসা বিদ্বেষের ছড়াছড়ি। সবাই তো আর আনস্টাইনের মত ভাবতে পারে নি ।   কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী Fred Holly পদার্থ , পরমাণু, শক্তি অভিনশ্বতার বিরোধিতা করে বলেন পদার্থ, পরমাণু, শক্তি নশ্বর, তিনি বলেন পরমাণু তার নিউক্লিয়াসের বহিঃস্থ ইলেকট্রন হারায় এবং তৎক্ষণাত বায়ু বা অন্য কোন পদার্থ হতে ইলেক্ট্রন গ্রহন করে তার হারানো ইলেক্ট্রন লাভ করে। পরমাণু নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে নতুন নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং নতুন পরমাণু সৃষ্টি হয় । এভাবে পদার্থের জীবন প্রক্রিয়া চলতে থাকে । এক সময় ইলেক্ট্রন ও নিউক্লিয়াস (প্রোটন ও নিউট্রন) দূর্বল থেকে দূর্বলতর হয়ে বন্ধন ক্ষমতা নষ্ট হলে পদার্থ ভেঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায় ।
ব্যাপারটা অনেক হাস্যকর ।
একমাত্র বিজ্ঞানী আনস্টাইন মনে হয় (সঠিক কিনা জানি না) গৌতম বুদ্ধের (Good Teacher/ First Enlighten Man ) সাথে একমত হতে পেরেছেন ।
বুদ্ধ সেই সুপ্রাচীন কালে্ কী সুন্দর নিখুত ব্যাখা প্রদান করেছেন তা আমি ভেবে বার বার অবাক হই। বুদ্ধ বলছেন পদার্থের মধ্যে এমন গুন বা ধর্ম  আছে যার দ্বারা তাদের মধ্যে সম্মিলনের বা বন্ধন ক্ষমতার ফলে অন্য পদার্থ সৃষ্টি হয় যা আধুনিক রসায়ন স্বীকার করে । বুদ্ধ বলেছেন চারটি ভুত রূপই পদার্থ যেমন মাটি, পানি, বায়ু, তেজ যেমন - মাটির কঠিনতা ও কোমলতা স্বভাব, পানির নিবদ্ধ ও নিঃসরন স্বভাব, বায়ুর সংকোচন ও প্রসারণ স্বভাব, তেজের (তাপমাত্রা) ঠান্ডা এবং গরম স্বভাব অর্থাৎ ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রনে অনুতে অনুতে আনবিক বন্ধন ক্ষমতার মাধ্যমে পুঃণ পুঃণ নতুন শক্তিতে রূপান্তর হয়ে থাকে । আবার প্রত্যেকটি ভূত রূপের মধ্যে উক্ত চারটি গুনই থাকে । যেমন হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মিলিত হয়ে পানি তৈরি করে আবার পানিতেই উক্ত মৌলগুলোই পাওয়া যায় এবং সেই পানি নতুন কোন পদার্থেরে সাথে মিশ্রিত হলে যে ফলাফল পাওয়া যাবে সেখানে একই মৌল বিদ্যমান থাকবে ।
তার মানে, ক্ষয় নাই ওরে…. তোর ক্ষয় নাই।

- ভূলত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থী

সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

বুদ্ধ দর্শন ও বিজ্ঞান!


নশ্বর সুজয়
(সংক্ষেপে)

মানুষ মাত্রই একটি কৌতুহলী প্রাণী। বস্তুত বিজ্ঞান বলে আমরা যা বুঝি তাও কৌতুহলের মাপকাঠিতে চলে। এই কৌতুহলের উপর নির্ভর হয়ে বিজ্ঞান অনেক অনেক অজানা বিষয়ের সমাধানে তৎপর। বর্তমানে এই যান্ত্রিকবিশ্বই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এই বিজ্ঞান শুধুই মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয় গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারচেয়েও বহুধাপ এগিয়ে। ঈশ্বর গড সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়েও এদের বিরাম নাই। তারা পৃথিবীর রহস্যময় সৃষ্টি তত্ত্বে এমনটাই সিদ্ধান্তে উপনীত যে-তাদের দাবী সমগ্র মহাকাশের যাবতীয় বস্তু দাড়িয়ে আছে periodic নামক টেবিলের উপর। যা ১০২ টা মোল দ্বারা গঠিত। মহাবিশ্বের এমন কোন ক্ষুদ্র বা বৃহৎ বস্তুও অবশিষ্ট নেই যা এই মোল ছাড়া গঠিত নয় । গ্রহ, তাঁরা, মাটি, আকাশ, জল সব কিছু হতে এই মোলগুলোর বন্ধন লাগবেই লাগবে । এমনকি  আমাদের শরীরও এই দিয়ে তৈরি । যদি ঈশ্বরের কোন আকার থাকে বা ঈশ্বর যদি কোন রূপে থাকেন তাহলে এই মোলগুলো দিয়েই তাকে রূপ ধারণ করতে হবে । বিশ্বের প্রায় ধর্ম গ্রন্থেও লেখা আছে ঈশ্বর বিরাজমান সমস্ত জীব আর বস্তুর মধ্যে ।
তাহলে ঈশ্বর গড বলতে আমরা কি বুঝব ?  এই হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম, বোরন, কার্বন ইত্যাদি হল গড ঈশ্বর ভগবানের অস্তিত্ব ? কিন্তু কিভাবে ?

বেশকিছু ধর্ম বা ধর্ম গ্রন্থের দাবী পৃথিবীর বাইরে সাতটা আকাশ আছে। যাকে ওরা বলে সাত আসমান।
কিন্তু বিজ্ঞানের দাবী ভিন্ন। বিজ্ঞান বলে পৃথিবীর বাহিরেও অসংখ্য আকাশ রয়েছে। পৃথিবী থেকে কোটি গুনে বৃহৎ গ্রহ, নক্ষত্র রয়েছে। এবং এদের সংখ্যাও কোটি কোটি । অগণিত , ধারনার বাইরে।
উইকিপিডিয়া সুত্র বলছে- সারা মহাবিশ্বের টোটাল শক্তির মধ্যে মহাবিশ্বের প্রায় ৫০ হাজার গ্যালাক্সি এর সমস্ত তারা , গ্রহ এবং প্রাণীকুল মাত্র ৫% শক্তি দ্বারা গঠিত । বাকি শক্তির ৬৮% এখনও উন্মুক্তই হয়নি , যাকে বিজ্ঞানে বলছে dark energy । আর বাকি dark matter ( ২৭%)  হল এই অন্ধকারের উৎস ।

তথ্যটি সম্পূর্ণ নয় কিন্তু বিষয় হল পুরো শক্তির নগণ্য শতাংশ শক্তি দিয়ে তৈরি এই পৃথিবীর মধ্যে আমরা বিভিন্ন বিভিন্ন শক্তির যে উপাসনা করি তার মুল শক্তি কি অন্য ? যেমন ধরুন ভগবানগুলো হিন্দুদের দায়িত্ব নিয়ে আছে , আল্লা মুসলিমদের , গড খ্রিস্টানদের, এরকম আরও আছে এদের কন্ট্রোল করে তবে কে ?  যদি এটা মিথ্যে হয় তবে সত্যটা কি ? সব ধর্মের দাবী তারাই সত্য তবে বাকিরা মিথ্যে প্রমাণিত হয় না কেন ?
১০২ টা মোলের জন্ম নেই মৃত্যু নেই । আছে শুধু সংযুক্তিকরণ আর বিচ্ছেদ । পৃথিবীর শুরু সেই মোলের সংযুক্তি ছিল আর কেয়ামত বা প্রলয় হবে সেই মোলগুলোর বিচ্ছুরণ । আবার তারা অন্য রাসায়নিক প্রক্রিয়া করে অন্য পৃথিবী বানাবে তবে তিন দিন কি সাত দিনে কিনা জানি না । তবে এই মোলগুলোর সৃষ্টিকর্তা কে তা জানতে না পারা অব্দি মোলগুলোকেই ঈশ্বর মানা যুক্তিপূর্ণ নয় কি ? বিভিন্ন ঈশ্বরের নামে লড়ার চেয়ে ঈশ্বর নিজের মধ্যে আছে মনে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি ? ধর্মকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মিথ্যা বেলুন না বানিয়ে নিজের আত্মার মধ্যে আত্মস্থ করা প্রকৃত ধার্মিকের কাজ নয় কি ?

পরিশেষে একটি কথা বলি- আপনি যদি সতি্যই সতি্যই প্রকৃত বুদ্ধ দর্শন বিষয়ে ধারণা রাখেন তাহলে এতোক্ষণ যা যা আলোচনা করলাম তার পুরোটাই মিলিয়ে নিতে পারবেন এ বুদ্ধদর্শনে।

কারণ বৌদ্ধ দর্শনে ঈশ্বরকে স্বীকার করে না। তারা জানে এই পৃথিবীর সবকিছু আমি তুমি পশুপক্ষী লতাগুম্ম সবই প্রকৃতির সৃজন মাত্র।

সুত্তপিটকের রতনসুত্তে উল্লেখ্ আছে শতসহস্র কোটি চক্রবালের কথা। সেখানেও অশরীরী প্রাণের অস্তিত্বের কথাও বুদ্ধ স্বীকার করেছিলেন।
এছাড়াও মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮) উল্লেখ্ আছে-
অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।
( প্রতিত্যসমুদ্পাদ  )

প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে-  ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।

এছাড়াও বিজ্ঞানের মোল বিষয়টিকে আপনি বুদ্ধদর্শনের সৃষ্টিতত্ত্বের এই নীতি সাহায্যে মিলিয়ে নিতে পারবেন- সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম
খ. চিত্ত নিয়ম
গ. বীজ নিয়ম
ঘ. কর্ম নিয়ম এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম

এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।

ফ্যাসিবাদ।

 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে...