রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৭

is Buddhism is religion?

In a religion, the main characteristic is that
there is a Creator God. But in Buddhism there is
no Creator God. In that sense Buddhism is not a
religion. The devout followers of all religions in
the world believe that there is a substance (permanent
entity) called atman or soul. But in Buddhism
there is no permanent entity called soul.
In that sense too Buddhism is not a religion. On
the contrary, in religion there should be some
organized institutions like churches and temples
and there are also some mediators such as
reverend fathers, monks and nuns to conduct
pujas and prayers etc. On this ground we can say
that in Buddhism too there are such institutions,
monks and nuns.
Simply because there are institutions, monks,
nuns and some sort of performances and offerings
and some pujas for the worldly pleasure of
the followers, one cannot say that Buddhism is also a religion. As there are no
major characteristics of religion in Buddhism, it is not a religion. Some say that
it is a philosophy. But it is neither a sheer philosophy. Of course in Buddhism
too, there is epistemology, psychology, metaphysics, logic and ethics, which
consists in a philosophy. But I should say that it is neither a religion nor a philosophy.
But it is a way of life which could be applied in our daily life. To be
exact, this way is nothing but practising and developing one's mind through
meditation.............

শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৭

ধর্ম এবং বিজ্ঞান।


০১
লিখেছেন – বাবলু মুৎসুদ্দী

সব ধর্মই কার্য – কারনেই হয় অকারনে কোন কিছু হয় না এবং হওয়া সম্ভবও নয়। কার্য – কারনে মন বা ধর্ম উদয় হয় (Genesis) কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়ে (Static development )আরেক চিত্ত (আগাম নতুন ধর্ম) উৎপন্ন হওয়ার কারন রেখে বিলীন (Desolution)হয়ে যায় । মন বা ধর্ম (চিত্ত) উৎপন্ন হয়ে বিলীন হতে যে সময় লাগে তাকে ০১ (এক) চিত্তক্ষণ (হাতে দুই আঙ্গুলে তুরি ফোঁটাতে সে সময়) বলে। আর ১৭ চিত্তক্ষণে ১ চিত্তবীথি (One Thought Process) হয় ।
বুদ্ধ বলেছেন প্রতিটি চিত্ত,(Psychic Life) ১৭ চিত্তক্ষণ বা এক চিত্তবীথি স্থায়ী বা ঠিকে থাকে। এবং নতুন কোন চিত্ত বা কর্ম সৃষ্টি করে বিলীন হয়ে যায় ।  বিজ্ঞানী আর্লবাট আনস্টাইন E=mc2 সূত্রানুসারে দেখতে পান পদার্থ শক্তিতে আর শক্তি পদার্থে রূপান্তুর হয় অতএব পদার্থ অভিনশ্বর ।
আর বিজ্ঞানী মহলে হিংসা বিদ্বেষের ছড়াছড়ি। সবাই তো আর আনস্টাইনের মত ভাবতে পারে নি ।   কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী Fred Holly পদার্থ , পরমাণু, শক্তি অভিনশ্বতার বিরোধিতা করে বলেন পদার্থ, পরমাণু, শক্তি নশ্বর, তিনি বলেন পরমাণু তার নিউক্লিয়াসের বহিঃস্থ ইলেকট্রন হারায় এবং তৎক্ষণাত বায়ু বা অন্য কোন পদার্থ হতে ইলেক্ট্রন গ্রহন করে তার হারানো ইলেক্ট্রন লাভ করে। পরমাণু নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে নতুন নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং নতুন পরমাণু সৃষ্টি হয় । এভাবে পদার্থের জীবন প্রক্রিয়া চলতে থাকে । এক সময় ইলেক্ট্রন ও নিউক্লিয়াস (প্রোটন ও নিউট্রন) দূর্বল থেকে দূর্বলতর হয়ে বন্ধন ক্ষমতা নষ্ট হলে পদার্থ ভেঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায় ।
ব্যাপারটা অনেক হাস্যকর ।
একমাত্র বিজ্ঞানী আনস্টাইন মনে হয় (সঠিক কিনা জানি না) গৌতম বুদ্ধের (Good Teacher/ First Enlighten Man ) সাথে একমত হতে পেরেছেন ।
বুদ্ধ সেই সুপ্রাচীন কালে্ কী সুন্দর নিখুত ব্যাখা প্রদান করেছেন তা আমি ভেবে বার বার অবাক হই। বুদ্ধ বলছেন পদার্থের মধ্যে এমন গুন বা ধর্ম  আছে যার দ্বারা তাদের মধ্যে সম্মিলনের বা বন্ধন ক্ষমতার ফলে অন্য পদার্থ সৃষ্টি হয় যা আধুনিক রসায়ন স্বীকার করে । বুদ্ধ বলেছেন চারটি ভুত রূপই পদার্থ যেমন মাটি, পানি, বায়ু, তেজ যেমন - মাটির কঠিনতা ও কোমলতা স্বভাব, পানির নিবদ্ধ ও নিঃসরন স্বভাব, বায়ুর সংকোচন ও প্রসারণ স্বভাব, তেজের (তাপমাত্রা) ঠান্ডা এবং গরম স্বভাব অর্থাৎ ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রনে অনুতে অনুতে আনবিক বন্ধন ক্ষমতার মাধ্যমে পুঃণ পুঃণ নতুন শক্তিতে রূপান্তর হয়ে থাকে । আবার প্রত্যেকটি ভূত রূপের মধ্যে উক্ত চারটি গুনই থাকে । যেমন হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মিলিত হয়ে পানি তৈরি করে আবার পানিতেই উক্ত মৌলগুলোই পাওয়া যায় এবং সেই পানি নতুন কোন পদার্থেরে সাথে মিশ্রিত হলে যে ফলাফল পাওয়া যাবে সেখানে একই মৌল বিদ্যমান থাকবে ।
তার মানে, ক্ষয় নাই ওরে…. তোর ক্ষয় নাই।

- ভূলত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থী

সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

বুদ্ধ দর্শন ও বিজ্ঞান!


নশ্বর সুজয়
(সংক্ষেপে)

মানুষ মাত্রই একটি কৌতুহলী প্রাণী। বস্তুত বিজ্ঞান বলে আমরা যা বুঝি তাও কৌতুহলের মাপকাঠিতে চলে। এই কৌতুহলের উপর নির্ভর হয়ে বিজ্ঞান অনেক অনেক অজানা বিষয়ের সমাধানে তৎপর। বর্তমানে এই যান্ত্রিকবিশ্বই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এই বিজ্ঞান শুধুই মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয় গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারচেয়েও বহুধাপ এগিয়ে। ঈশ্বর গড সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়েও এদের বিরাম নাই। তারা পৃথিবীর রহস্যময় সৃষ্টি তত্ত্বে এমনটাই সিদ্ধান্তে উপনীত যে-তাদের দাবী সমগ্র মহাকাশের যাবতীয় বস্তু দাড়িয়ে আছে periodic নামক টেবিলের উপর। যা ১০২ টা মোল দ্বারা গঠিত। মহাবিশ্বের এমন কোন ক্ষুদ্র বা বৃহৎ বস্তুও অবশিষ্ট নেই যা এই মোল ছাড়া গঠিত নয় । গ্রহ, তাঁরা, মাটি, আকাশ, জল সব কিছু হতে এই মোলগুলোর বন্ধন লাগবেই লাগবে । এমনকি  আমাদের শরীরও এই দিয়ে তৈরি । যদি ঈশ্বরের কোন আকার থাকে বা ঈশ্বর যদি কোন রূপে থাকেন তাহলে এই মোলগুলো দিয়েই তাকে রূপ ধারণ করতে হবে । বিশ্বের প্রায় ধর্ম গ্রন্থেও লেখা আছে ঈশ্বর বিরাজমান সমস্ত জীব আর বস্তুর মধ্যে ।
তাহলে ঈশ্বর গড বলতে আমরা কি বুঝব ?  এই হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম, বোরন, কার্বন ইত্যাদি হল গড ঈশ্বর ভগবানের অস্তিত্ব ? কিন্তু কিভাবে ?

বেশকিছু ধর্ম বা ধর্ম গ্রন্থের দাবী পৃথিবীর বাইরে সাতটা আকাশ আছে। যাকে ওরা বলে সাত আসমান।
কিন্তু বিজ্ঞানের দাবী ভিন্ন। বিজ্ঞান বলে পৃথিবীর বাহিরেও অসংখ্য আকাশ রয়েছে। পৃথিবী থেকে কোটি গুনে বৃহৎ গ্রহ, নক্ষত্র রয়েছে। এবং এদের সংখ্যাও কোটি কোটি । অগণিত , ধারনার বাইরে।
উইকিপিডিয়া সুত্র বলছে- সারা মহাবিশ্বের টোটাল শক্তির মধ্যে মহাবিশ্বের প্রায় ৫০ হাজার গ্যালাক্সি এর সমস্ত তারা , গ্রহ এবং প্রাণীকুল মাত্র ৫% শক্তি দ্বারা গঠিত । বাকি শক্তির ৬৮% এখনও উন্মুক্তই হয়নি , যাকে বিজ্ঞানে বলছে dark energy । আর বাকি dark matter ( ২৭%)  হল এই অন্ধকারের উৎস ।

তথ্যটি সম্পূর্ণ নয় কিন্তু বিষয় হল পুরো শক্তির নগণ্য শতাংশ শক্তি দিয়ে তৈরি এই পৃথিবীর মধ্যে আমরা বিভিন্ন বিভিন্ন শক্তির যে উপাসনা করি তার মুল শক্তি কি অন্য ? যেমন ধরুন ভগবানগুলো হিন্দুদের দায়িত্ব নিয়ে আছে , আল্লা মুসলিমদের , গড খ্রিস্টানদের, এরকম আরও আছে এদের কন্ট্রোল করে তবে কে ?  যদি এটা মিথ্যে হয় তবে সত্যটা কি ? সব ধর্মের দাবী তারাই সত্য তবে বাকিরা মিথ্যে প্রমাণিত হয় না কেন ?
১০২ টা মোলের জন্ম নেই মৃত্যু নেই । আছে শুধু সংযুক্তিকরণ আর বিচ্ছেদ । পৃথিবীর শুরু সেই মোলের সংযুক্তি ছিল আর কেয়ামত বা প্রলয় হবে সেই মোলগুলোর বিচ্ছুরণ । আবার তারা অন্য রাসায়নিক প্রক্রিয়া করে অন্য পৃথিবী বানাবে তবে তিন দিন কি সাত দিনে কিনা জানি না । তবে এই মোলগুলোর সৃষ্টিকর্তা কে তা জানতে না পারা অব্দি মোলগুলোকেই ঈশ্বর মানা যুক্তিপূর্ণ নয় কি ? বিভিন্ন ঈশ্বরের নামে লড়ার চেয়ে ঈশ্বর নিজের মধ্যে আছে মনে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি ? ধর্মকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মিথ্যা বেলুন না বানিয়ে নিজের আত্মার মধ্যে আত্মস্থ করা প্রকৃত ধার্মিকের কাজ নয় কি ?

পরিশেষে একটি কথা বলি- আপনি যদি সতি্যই সতি্যই প্রকৃত বুদ্ধ দর্শন বিষয়ে ধারণা রাখেন তাহলে এতোক্ষণ যা যা আলোচনা করলাম তার পুরোটাই মিলিয়ে নিতে পারবেন এ বুদ্ধদর্শনে।

কারণ বৌদ্ধ দর্শনে ঈশ্বরকে স্বীকার করে না। তারা জানে এই পৃথিবীর সবকিছু আমি তুমি পশুপক্ষী লতাগুম্ম সবই প্রকৃতির সৃজন মাত্র।

সুত্তপিটকের রতনসুত্তে উল্লেখ্ আছে শতসহস্র কোটি চক্রবালের কথা। সেখানেও অশরীরী প্রাণের অস্তিত্বের কথাও বুদ্ধ স্বীকার করেছিলেন।
এছাড়াও মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮) উল্লেখ্ আছে-
অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।
( প্রতিত্যসমুদ্পাদ  )

প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে-  ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।

এছাড়াও বিজ্ঞানের মোল বিষয়টিকে আপনি বুদ্ধদর্শনের সৃষ্টিতত্ত্বের এই নীতি সাহায্যে মিলিয়ে নিতে পারবেন- সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম
খ. চিত্ত নিয়ম
গ. বীজ নিয়ম
ঘ. কর্ম নিয়ম এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম

এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।

রবিবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৭

বৌদ্ধ সৃস্টকর্তা।


--প্রথমে বুঝতে হবে ঈশ্বর কি। কারন অন্য ধর্ম গুলোতে ঈশ্বরকে ব্যাক্তি (Person) হিসেবে নেওয়া হয় আর ঈশ্বর এর অর্থ ওদের কাছে ; Generator (সৃষ্টিকারী), Operator (পরিচালনাকারী) and Destructor (ধ্বংসকারী) সংক্ষেপে GOD। যা একটা being বা person। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মে Generator operator and Destructor হচ্ছে পাঁচটা Universal Rules বা Cosmic order যার দ্বারা এই universe পরিচালিত হয় আর এ ক্ষেত্রে এটি কোন ব্যাক্তি বা সত্ত্বা নয়। আর বুদ্ধ Hindu and other religion এর God এর explanation দীর্ঘ নিকায় এর কেবট্ট সূত্রতে বর্ণনা করেছেন। যেটি পড়লে জানা যায়- হিন্দুদের ঈশ্বরের (God) অস্থিত্ব বৌদ্ধ ধর্মে রয়েছে। ঐ সূত্রতে বুদ্ধ বলেছেন-Hindu and other Religion এ যাকে ঈশ্বর হিসেবে মান্য করা হয় তিনি স্বর্গ সমূহের উপরের একটি স্পেসে অবস্থান করেন। তাদের God হল বুদ্ধের ভাষায়- “মহাব্রম্মা”। যদিও ওনি খুব Supernormal power এর অধিকারি কিন্তু ওনি Generator, operator and destructor না....। অর্থাৎ জগতের সৃষ্টি, পরিচালন এবং ধ্বংস এই ত্রিকাজ তিনি করতে পারেন না। কিন্তু হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মালম্বীরা ভাবেন তিনিই এই কাজ ত্রয় করেন। তাই বৌদ্ধ ধর্মে, মহাব্রহ্মা (যাকে অন্য ধর্মসমূহে ঈশ্বর হিসেবে গন্য করা হয়) GOD নন। যেহেতু তিনি ঐ ত্রিকাজ করতে পারেন না। বৌদ্ধ ধর্ম বলছে সৃষ্টি, পরিচালন এবং ধ্বংস এই ত্রিকাজ কোন ব্যাক্তি করেন না। এগুলো স্বয়ংক্রিয় একটি ‘নির্ভরশীলতা বা আপেক্ষিক’ একটি পদ্ধতির মা্ধ্যমে হয়ে থাকে। এই স্বয়ংক্রিয় পদ্বতিকে আমরা ‘বিশ্বজনীন নীতি’ বা ‘Cosmological Laws’ বলতে পারি। কারো যদি সৃষ্টিকর্তা, ধ্বংসকর্তা, পরিচালনকর্তা রূপে কাউকে বসানো একান্ত প্রয়োজন হয় ধর্মে তাহলে এই নীতিগুলো বসান। বুদ্ধের এই নীতি সমূহ এত সুগভীর যে কোন ব্যাক্তি ঈশ্বর (যেমন: মহাব্রহ্মা) যদি সতি্যই থাকেন দেখা যাবে তিনি নিজেও এই নীতি সমূহে আটকা যদিও তিনি হয়তো অনেক উর্দ্ধতন সত্ত্বা। এবার আসা যাক, সেই স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? কি? যেগুলোর দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম (Rules of Physics or matter)
খ. চিত্ত নিয়ম (Rules of Mind or citta)
গ. বীজ নিয়ম (Rules of Germinal order)
ঘ. কর্ম নিয়ম (Rules of Karma ) এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম ( Rules of Dharma)।
এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী, ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন কিছুকে আমরা ধরে নেই তবে বৌদ্ধ ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা। Personal God (God as Being) বুদ্ধ এই জন্য স্বীকার করেন নাই কারন ওনি যদি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বা universe কে create করেন তার একটা উদ্দেশ্য থাকবে। উদ্দেশ্য থাকলে তার একটা তৃষ্ণা থাকবে। তৃষ্ণা থাকলে ওনি নিজেও মুক্ত নন..। আর যেখানে বুদ্ধ মুক্ত পুরুষ সেখানে Creator যদি মুক্ত না হন তবে তা যে সম্পূর্ণ ভুল একটা concept তার প্রমান দেয়।
এখন আরেকটি প্রশ্ন উঠতে পারে তা হলো কে এই বিশ্বজনীন নীতিকে পরিচালন করে? বা কিভাবে এই নীতি সমূহ পরিচালিত হয়? এই প্রশ্নসমূহের উত্তর বৌদ্ধ ধর্মে দিচ্ছে দুটি আলাদা তত্ত্ব দিয়ে। যথা:
১. প্রতীত্য সমুৎপাদ বা নির্ভরশীলতা তত্ত্ব (Depended origination)এবং
২. পট্ঠান (Conditional Relations)।
এগুলো ব্যতীত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি, পরিচালন এবং ধ্বংস হয় না। এখানে একটা আরেকটার সাথে যুক্ত। অনেক বুদ্ধধর্মলম্বীরা মনে করেন সব কর্মের কারণে হয়। সব কর্মফল। এটা সঠিক নয়। সব কর্মের কারণ না। বাকি নিয়মসমূহ ছাড়া কর্মফল একা কিছু করতে পাবে না। যেমন রুপ আমাদের body and এই earth, galaxy (যার origin physical element থেকে) এইগুলো যদি উৎপন্ন নাই হয় আমরা কর্মফল ভোগ করবো কিভাবে? “শূণ্য কল্প” ' যার অর্থ স্বরূপ বৌদ্ধ ধর্মে বলা হয়েছে- 'gap between the begin and end of the universe' এই সময়ে কি কর্মফল ভোগ করবে? তার উত্তর হলো না...। কারণ লোক বা জগৎ (রূপ) ছাড়া কর্মফল ভোগ করা যাবে না। আবার রূপ থাকলেও যদি চিত্ত না থাকে তবে এই ক্ষেত্রেও কর্মফল কাজ দিবে না। চিত্ত ছাড়া সত্ত্বগণ রোবট তুল্য। কারণ যদি চিত্ত না থাকে অনুভব করবে কে? কর্মফল যে পাচ্ছে তা বুঝবে কে? কেউ যদি তবুও প্রশ্ন করেন তাহলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড
ে কিভাবে সৃষ্টি, চালন এবং ধ্বংস হয় যদি ব্যাক্তিরূপ কোন ঈশ্বর না থাকেন। তাহলে শেষবারের উত্তর হচ্ছে- প্রধান পাঁচটি, সহকারী ২টি এবং অন্যান্য কিছু নির্ভরশীল তত্ত্বের মাধ্যমেই ঐ কাজ ত্রয় বৌদ্ধ ধর্মে GOD এর কাজ করে থাকে তাদের নিজস্ব স্বভাবের মধ্য দিয়ে। আশাকরি আপনারা বুঝেছেন।

লাভ জিহাদ।

What is the meaning of love jihad?
Love Jihad is the term given to the alleged conversion of non-Muslim women to Islam by Muslim boys and men under the pretense of love.
#লাভ জিহাদ কি ?

#লাভ জিহাদ হচ্ছে বৌদ্ধ মেয়ে হয়ে অন্য অবৌদ্ধ ছেলের সাথে প্রেম করা , অথবা বৌদ্ধ ছেলে হয়ে অন্য অবৌদ্ধ মেয়ের সাথে প্রেম করা , শেষে প্রেম করে নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করে ধর্মান্তরিত হওয়াকে লাভ জিহাদ বলে।

#লাভ জিহাদ এবং বৌদ্ধ বোনদের জন্য সতর্কবার্তাঃ

#অতি স¤প্রতি সিলেটের একটি ঘটনা দেশের ছোট বড় প্রায় সবকটি পত্র পত্রিকায় নিউজ হিসেবে ছাপিয়েছে। নিউজটি হল একজন সিলেটের ডাক্তার তার স্ত্রীকে তালাবদ্ধ অবস্থায় বন্দি করে হজ পালন করতে সৌদি আরব গেছেন।
বলা বাহুল্য, তালাবদ্ধ অবস্থায় বন্দিনী স্ত্রীলোকটি এককালে হিন্দু ছিলেন এবং তিনিও পেশায় ডাক্তার। লাভ জিহাদীদের খপ্পরে পড়ে নিজ পিতৃ ধর্ম পরিত্যাগ ও ভালবাসার টানে অতি আশা করে মুসলিম ডাক্তারের ঘরণী হয়েছে, আর এর চরম মূল্য কি করে দিচ্ছেন, তা আমরা সকলে পত্র পত্রিকা খুললেই দেখা যায়।

#এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বহু পুরাতন ও ধারাবাহিক ঘটনার একটি মাত্র। প্রায় প্রত্যেকটি ধর্মান্তরিত বিয়ের পর ধর্মান্তরিত মেয়েদের ক্ষেত্রে এমনই হয়। কারণ মূল কারণ হলো যে ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়েটা করলেন, ঐ ধর্ম দর্শনে একজন পূরুষের ৪ এর অনধিক বিয়ে করার অধিকার এবং ভাল না লাগলে দেন মোহরের টাকা দিয়ে বিদেয় করার বিধান সংরক্ষিত করা আছে। বৌদ্ধ মেয়েদের ধর্মান্তরিত হয়ে বিবাহ ও পরবর্তী পরিনতি হল স্বামীহারা হয়ে আবার অন্যে ব্যাক্তিকে স্বামী হিসেবে গ্রহন করা, নয়তো অন্যের বাড়ীতে ঝিগিরী করা, নয়তো শেষে পতিতালয়ে গমন করে যৌনদাসী হওয়া।

#কিন্তু এই মেয়েটি বুদ্ধের ছায়াতলে স্বাধীন মুক্তপাখি ছিল।

#এইভাবে ফাঁদে ফেলে জিহাদিরা মেয়েটাকে প্রথমে নাস্তিক বানায় তারপর বিয়ে করবে তারপর ধর্মান্তরিত করে তারপর ওদের কাজ শেষ । গাছের ফুল ঘ্রাণ নেওয়ার পর ওটাকে ফেলে দেওয়া ছাড়া কোন কাজ থাকে না।

#জিহাদের জন্ম সূরা নিসা আয়াত ৩ - #তোমরা মহিলাদের মধ্যে থেকে তোমাদের পছন্দনুযায়ী দুই-দুই , তিন- তিন , চার- চার জনকে বিয়ে করে নাও।

#তাহলে শিকারের ফাঁদ পাততে অসুবিধা কোথায় ?

জিহাদিরা মালাউন মহিলাদের উপর কু-নজর বেশি কারণ - সূরা নিসা আয়াত -২৪ #বিবাহিত পরস্ত্রী তোমাদের কাছে নিষিদ্ধ যে সব বিবাহিত অমুসলিমদের তোমরা জিহাদে ধরে এনেছো তারা তোমাদের জন্য বৈধ । গণিমতের মাল হিসাবে তাদের ভোগ করা যায়।

#বৌদ্ধধর্মের অনেক নারীরা মৌলবাদিদের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন সাবধান হয়ে যান ।

#মডেল তারকা শ্রাবস্তি দত্ত তিন্নি - ভালোবেসে বিয়ে করেছিল আরেক মডেল হিল্লোলকে দেড় বছর সংসার করেছেন একটা মেয়ে সন্তানও হয়েছে পরে বাইন তালাক। তারপর তিন্নির ঠিকানা হয়েছে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে এখন মায়ের বাসায় থাকেন কিন্তু সুস্হ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি ।
#এখন সম্প্রতি অপু বিশ্বাস সবকিছু ছেড়ে এসেও কিভাবে হেনস্হার স্বীকার হচ্ছে তা করো অজানা নয়।

#এখন এইসব জিহাদি আরেক নামিদামী মডেলকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে , সংসার করে । কিছু দিন পর হয়তো নতুন কাউকে ধরবে। যেমন , বেশ্যালয়ের একেক দিন একেক ঘরে গমন করে খরিদ্দার।

#দৈনিক কালের কন্ঠ প্রকাশিত ২৪ সেপ্টম্বর ২০১৩ ধামরাইয়ে শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিত হয়ে উলঙ্গ অবস্হায় অন্য বাড়িতে আশ্রয় নেয় ধর্মান্তরিত হিন্দু মেয়ে সাগরিকা সূত্রধর । সে এখন তালাক প্রাপ্ত । হয়তো এখন কোন আবাসিক হোটেলে প্রতিতা বৃত্তিতে আছেন।

#যারা ভিক্ষা, ঝিগিরী বা পতিতালয়ে যেতে পারে নি এমন অনেক মেয়ে আছে যারা লাভ জিহাদের স্বীকার হয়ে , পারছে না মরতে পারছে না জন্ম দেওয়া মা বাবার কাছে মুখ দেখাতে । রাতে চোখের জ্বলে বালিশ ভিজালেও দেখার কেউ নাই ।

#এইসব দিদিদের জানা উচিত ভালোবেসে ঘর করা যায় তবে মা বাবার আশীর্বাদ ছাড়া অল্পদিনও সুখে শান্তিতে ঘর করতে পারে না ।

#তাই লাভ জিহাদিদের সাথে প্রেম করার চিন্তা বাদ দিয়ে নিজে সতর্ক হোন অন্যকে সতর্ক করুন।

#ত্রিপিটকের  জ্ঞান যার মধ্যে আছে বা মা-বার কাছ থেকে জেনেছেন তারা কখনও লাভ জিহাদের খপ্পরে পরে না বরং তাদের দিকে থুঃ থুঃ ছুড়ে মারেন।

সুতরাং সময় থাকতে সাবধান হোক হে ভাই ভগ্নি।

বৌদ্ধ দর্শনে যুক্তি।


ড: নীরুকুমার চাকমা [ অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ]
বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা-ধারনা ও বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলো অভিজ্ঞতালব্ধ ও প্রমাণ সাপেক্ষ; এবং এ কারণে অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে সত্য বলে অপ্রমাণিত কোন কিছুকেই আধুনিক মানুষ সহজে জানতে বা গ্রহণ করতে নারাজ। শিক্ষিত সমাজের কাছে তাই ধর্মের আবেদন নগণ্য। ধর্মীয় মতবাদকে সাধারনত মনে করা হয় অবৈজ্ঞানিক, অন্ধবিশ্বাসভিত্তিক অযৌক্তিক। অন্যান্য ধর্মের উপর এ অভিযোগ চাপানো গেলেও বুদ্ধ ধর্মের উপর চাপানো কিন্তু যুক্তি-সজ্ঞত বলে মনে হয় না। খ্রিষ্ট জম্মের সেই ষষ্ট শতাব্দিতে উৎপত্তি হলেও বুদ্ধধর্ম আসলে একটি আধুনিক ধর্ম, বৈজ্ঞানিক ধর্ম, যুক্তির ধর্ম। বুদ্ধের সুমহান উপদেশ, বানী ও চিন্তাধারাই বুদ্ধদর্শনের উৎস ও ভিত্তি। অন্য কথায়, বুদ্ধের ধর্মই আসলে বুদ্ধ দর্শন। বুদ্ধ দর্শনের প্রধান বৈশিষ্টই হচ্ছে স্বাধীন চিন্তা। স্বাধীন চিন্তার এ গতিধারা যুগে যুগে বিকশিত হয়েছে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। ধর্মের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস এ দর্শনকে কলুষিত করতে পারেনি কোনদিন। অতিজাগতিক বা অতীন্দ্রিয় ব্রহ্ম বা ইশ্বরের অন্ধবিশ্বাস এ দর্শনে থাঁই পাইনি কনোদিন।যুক্তির স্বচ্ছতা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এ দর্শনের প্রাণ।
হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম, ও ইসলামধর্মের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস, কিন্তু বুদ্ধ ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি। বুদ্ধের বানী ও উপদেশকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করলে বা নির্বিচারে গ্রহণ করলে বুদ্ধ ধর্মকে বুঝা যাবে না। একমাত্র যুক্তির মাধ্যমে বুদ্ধ ধর্মকে জানা বা বুঝা সম্ভব। বুদ্ধ যীশু খ্রিষ্টের মতো ঈশ্বরের সন্তান নন, শ্রীকৃষ্ণের মতো ভগবান নন, হযরত মুহম্মদের (দঃ) মতো পয়গম্বরও নন। রাজপুত্র হলেও তিনি ছিলেন আমাদের মতই রক্ত মাংসের মানুষ যিনি নিজের সাধনাবলে বুদ্ধত্ব লাভ করে ইতিহাসে মহামানব বলে পরিচিত হবার গৌ্রব অর্জন করেন। অন্যান্য ধর্ম প্রচারকরা যেখানে নিজেদের বানীগুলোকেই এক মাত্র পরম সত্য বলে দাবী করেন এবং এগুলোকেই অন্ধভাবে ও নির্বিচারে গ্রহণ করার জন্যে আহ্বান জানান, বুদ্ধ সেখানে তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আমি যা বলছি তা তোমরা নির্বিচারে মেনে নিওনা, আমার কথাকে তোমরা নিজেরা পরিক্ষা করে দেখ।’ এত বড় কথা যুক্তিবাদী ছাড়া আর কে বলতে পারে?
এ জীবন ও জগতকে বুদ্ধ বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলদ্ধি করেছেন, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ দ্বারা বিচার করেছেন, যুক্তি দিয়ে বুঝাবার চেষ্টা করেছে। অন্যান্য ধর্ম যেখানে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দিয়েছে, বুদ্ধ ধর্ম সেখানে প্রাধান্য দিয়েছে বুদ্ধিকে, যুক্তিকে এবং এ জীবন ও জগতের সব জিনিসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন। বুদ্ধের মতে জগতের প্রত্যেক্তি জিনিস কার্যকারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। কোন বস্তুই স্বয়ং উৎপন্ন হইনা একটি ঘটনা অন্য একটি ঘটনা থেকে সঞ্জাত। সবকিছুই উৎপত্তি হয় ঘটনা থেকে। বুদ্ধ দর্শনে এ তত্ত্বকে বলা হয় ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’। এ তত্ত্বানুসারে আমাদের জীবন দুঃখময় , এ দুঃখের কারণ আছে, এ দঃখ থেকে মুক্তিও পাওয়া যায়। জীবন যে দুঃখময় তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বুদ্ধ নিত্য, অপরিবর্তনশীল, চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর বলে কোন জিনিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করেন না। তাঁর মতে জগতের সবকিছু পরিবর্তনশীল, সারা বিশ্বে চলেছে বস্তুর বিরামহীন পরিবর্তন ও রূপান্তর। আমাদের জীবন হচ্ছে এক অবিরাম প্রবাহ-আবির্ভাব ও তিরোভাব এক অন্তহীন স্রোত, এ জগতে শাশ্বত সত্তা বলতে কোন জিনিস নেই।বুদ্ধ দর্শনের এ বৈজ্ঞানিকমত পরবর্তীকালে মার্ক্স ও এঙ্গলকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। অধিবিদ্যায় বা শুদ্ধ তত্ত্ব জিজ্ঞাসায় বুদ্ধ কোনদিন আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর দর্শন ছিল সম্পূর্ণভাবে জীবন মুখী। জীবন সমস্যা সমাধানে যে জিনিস কোন প্রয়োজনে আসে না, বুদ্ধ সে জিনিসকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছেন. বুদ্ধের মতে, জগত কি নিত্য না অনিত্য, সসীম না অসীম, ঈশ্বর আছে কি নেই এ ধরণের তত্ত্ব বিচারে আত্ত্বনিয়োগ করা অর্থহীন এবং সময়ের অপচয় মাত্র, কারণ এতে দুঃখের নিবৃত্তি হয় না, জিবনের লক্ষ্য অর্জিত হয় না। বুদ্ধ দর্শনের বৈশিষ্ট্য তাই শুদ্ধ তত্ত্ব বিচার নয়,দুঃখ থেকে মুক্তিলাভের চেস্তা করা। এ মুক্তির প্রশ্নে বুদ্ধ ধর্ম যে মত পোষণ করে তা নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী.

বৌদ্ধ শাস্ত্রে মারের দর্শন।

---------------------------------------
‘মার’ শব্দটি ত্রিপিটক সাহিত্যের বহুল প্রচলিত নাম। মার বলতে একটি রুপক অর্থে বুঝায়। মারের স্থায়ী কোন আকার, আকৃতি, অস্তিত্ব ও অবস্থা আমাদের দৃষ্টিগোচর নয়। সত্ত্বের চিন্তা-চেতনা ও কাজকর্মের উপর প্রভাব বিস্তারই এর স্বভাব। আমরা বৌদ্ধ সাহিত্য অধ্যয়ন করলে দেখতে পাই, সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনের প্রথম থেকেই বুদ্ধত্ব লাভ করা পর্যনন্ত এমনকি বুদ্ধত্ব লাভ করার পর থেকে মহাপরিনির্বাণের পর মুর্হুত মারের অশুভ শক্তি লক্ষ্য করা যায়। তার শিষ্যমন্ডলীদের জীবন কাহিনীতেও এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও মারের একটি অশুভ শক্তি লক্ষ্য করা যায়। মানুষ একটি শুভ কাজে অগ্রসর হলে অখবা ধ্যান সমাধিতে নিবিষ্ট হলে মার বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনে দেখতে পাই, মার বলতে সকল প্রকার অশুভ শক্তির অধার, উন্নতির অন্তরায়, সাফল্যের প্রতিবন্ধক এবং মুক্ত, সুস্থ ও সুন্দর চিন্তা বিরোধক শক্তি। মারের শক্তি দুর্দমনীয় ও পরাক্রমশালী। আভিধানিক অর্থে মার হল অকুশল মনোবৃত্তি কিংবা রিপুসমূহের অপশক্তি। ত্রিপিটক সাহিত্য উল্লেখ আছে, রতি, আরতি তৃষ্ণা নামে তিন কন্যা এবং কাম, ক্ষুধা, পিপাসা, প্রভৃতি কার অগণিত সৈন্য সামন্ত ছিল। মানুষ কল্যাণ পথে অথবা ধ্যান ও মার্গ পথে অগ্রসর হলেই প্রথমে যে মারসেনা আক্রমন করে তা হল কাম ভোগের বাসনা। সাধক যদি এই ধাপকে অতিক্রম করে সম্মুখ অগ্রসর হয় তারপরে আত্ক্রমন করে আরতি সেনা। পর্যাযক্রমিক ক্ষুধা-পিপাসা সেনা, বাসনা বা তৃষ্ণা সেনা, তন্দ্রা ও আলস্য সেনা, ভয়-ভীতি সেনা, সংশয় বা সন্দেহ সেনা, মান-অভিমান, লাভ-সৎকার, পূজা প্রভৃতি সেনা একটির পর একটি এসে উপস্থিত হয়। এই সেনারা সাধককে পরাস্ত করতে সর্ব অশুভ শক্তি নিয়োগ করে। এসব মার সেনাকে অতিক্রম করতে না পারলে বোধি বা বুদ্ধত্ব লাল কখনও সম্ভব নয়। কুমার সিদ্ধার্থ এ সকল মারসেনাকে পরাজিত করে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়েছিলেন।
আমরা বুদ্ধ বলতে মহাজ্ঞানী সর্বোত্তম জ্ঞানের অধিকারীকে বুঝি। যিনি সকল বন্ধনহীন এবং দুঃখ, দুঃখ কারণ, দুঃখ নিরোধ, দুঃখ নিরোধের উপায় –এই চতুরার্য সত্য আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামক শ্রেষ্ঠ মার্গ অনুশীলন করে বিশুদ্ধ জীবন যাপন করেন। ‘যার জয়-পরাজয় পর্যবসিত হয়না, যার জয় রিপু জগতে কিছুমাত্র অনুসরণ করেনা, সেই রিপুজয়ী সর্বদর্শী বুদ্ধকে তোমরা কোন উপায়ে বিচলিত করবে’? ভগবান বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভ করে একসময় নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থ বৃক্ষের ছায়ায় বসে মুক্তির নির্মল আনন্দ অনুভব করেছিলেন। এমনি সময় তার চিত্তে অন্য এক চেতনা জাগ্রত হল তার মনে হল এই মুক্তি হয়ত সত্যিকারের মুক্তি নয়। বিশুদ্ধ মুক্তি ও পরিশুদ্ধ জীবন যাপনের জন্য এ পথ পরিত্যাগ করা উচিত৤ এই চেতনা প্রবাহের সূচনাতেই বুদ্ধ উপলব্দি করলেন আমি অশুভ শক্তির ছায়ামুক্ত হয়ে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়েছে, হে মার! তুমি আমার চিত্ত বিভ্রান্তি ঘটাতে পারবেনা। আমি তোমাকে চিনেছি এই পাপমতি মার।
বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য পাচ ধরণের মারের কথা বলা হয়েছে।
১. ক্লেশমার,
২. অভিসংস্কার বা ভোগ-চেতনা মার,
৩.দেবপুত্র মার,
৪, স্কন্ধ মার,
৫. মৃত্যূমার
১. ক্লেশমারঃ ক্লেশ পালি কিলেস শব্দের অর্থ দাঁড়ায় চিত্তের কালিমা৤ আমরা জানি চিত্ত বা মন স্বভাবতঃ স্বচ্ছ আযনার মত নিরমল। স্বচ্ছ আয়না যেমন ধুলো-বালি দ্বারা আচ্ছন্ন হয় সেরুপ চিত্ত বা মনও লোভ, দ্বেষ,মোহনামক কালিমা দ্বারা আবৃত হয়। চিত্তে বা মনে ক্লেশ উৎপন্ন হলে মানুষ শুভাশুভ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে৤ মানুষ ক্লেশের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সর্বদা বিভিন্ন প্রকার পাপকর্মে লিপ্ত হয়।
২. অভিসংস্কার মারঃ এই মারকে ভোগ-চেতনা মারও বলে। অভিসংস্কার মারকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।
ক) পুঞ্ঞাভিসঙ্খারা,
খ) অপুঞ্ঞাভিসঙ্খারা,
গ) আনঞ্ঞভিসঙ্খারা
আমরা জানি জন্মের কারণ হচ্ছে সংস্কার। এজন্য সংস্কারকে জন্মের হেতু সৃষ্টিকারী বলে। এ মারও মানুষকে ভূল পথে পরিচালিত করে নিবার্ণ লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পুঞ্ঞাভিসঙ্খারা দ্বারা সত্ত্বগণ কামলোক, রুপলোক ও অরুপলোকে জন্মগ্রহন করে। কিন্তু সত্ত্বগণ সমূলে তৃষ্ণা ক্ষয় করতে না পারলে ভব থেকে ভবান্তরে বারবার জন্মগ্রহন করে। সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনে রামপুত্র রুদ্রক এর নিকট অবগত হয়েছিলেন অরুপ ধ্যানভূমি থেকেও সত্ত্বগণ পুনরায় গর্ভাশয়ে জন্মগ্রহন করেন। অন্যদিকে সত্ত্বগণ যেন পুণ্যকর্মদ্বারা পুণ্য সঞ্চয় করে মাররাজ্যে অতিক্রম না করতে পারে সেজন্য অপুঞ্ঞাভিসঙ্খারা মারের প্রভাব সত্ত্বগণের মধ্যে বিদ্যামান থাকে। এ মারের প্রভাবে সত্ত্বগণ জন্মজন্মান্তরব্যাপী দুঃখ ভোগ করে। তারা এ মারের প্রভাবে প্রভাবিত হয় বলে নিবার্ণ লাভে সমর্থ হয়না। অন্যদিকে আনঞ্ঞভিসঙ্খারা হল উৎপন্ন সংস্কারসমূহকে চিত্তের মধ্যে বদ্ধমূল স্থায়ী করে নেওয়া। বৌদ্ধধর্মে ও দশর্নে কোন ব্যক্তি বা মানুষকে চিরমুক্তি পেতে হলে পুণ্য ও অপুণ্যের অতীত হতে হবে। অথার্ৎ সংস্কার যাতে তাকে স্পর্শ করতে না পারে। যাদের পুরাতণ বীজ ক্ষীণ হয়েছে, নুতন কর্ম উৎপাদনের হেতু বিদ্যমান নেই এবং যাদের ভবিষ্যৎ জন্মের আসক্তিও নেই সেই কর্মবীজ ক্ষয়প্রাপ্ত সৎপুরুষগণ নির্বাপিত প্রদীপের ন্যায় নিবার্ণপ্রাপ্ত হন।
৩. দেবপুত্র মারঃ বৌদ্ধ দর্শনে ৩১ প্রকার লোকভূমি রয়েছে। এর মধ্যে চার অপায় ভূমি যেমনঃ তির্য্যক, প্রেত, অসুর, নিরয়। এখানে সত্ত্বগণ জন্ম হয় লোভ, দ্বেষ, মোহ কারণে। সত্ত্বের চিত্তে লোভ উৎপন্ন হলে প্রেত যোনিতে, দ্বেষ উৎপন্ন হলে নিরয়ে, মোহ উৎপন্ন হলে তির্য্যককুলে এবং ক্রোধ উৎপন্ন হলে অসুরকূলে সত্ত্বগণ জন্মগ্রহন করে। অপায় ভূমির উর্দ্ধে হল মনুষ্য ভূমি। মনুষ্য জন্ম লাভ করা অতীব দুলর্ভ। তবে ধ্যান সমাধি করার জন্য মনুষ্যলোকই উত্তম। তাই সিদ্ধার্থ মনুষ্য ভুমিতে আর্বিভূত হয়ে বুদ্ধত্ব লাভ করেন।
এই মনুষ্যভূমি উর্দ্ধে ছয়টি স্বর্গভূমি যথাঃ চর্তুমহারাজিক, ত্রয়তিংশ, যাম, তুষিত, নিমার্ণরতি ও পরিনির্মিত বশবর্তী। এরপর ষোলটি রুপভূমি রয়েছে। ব্রহ্ম পারিষদ, ব্রহ্মপুরোহিত, মহাব্রহ্মা, পরিত্তাভ, অপ্রমাণাভ, আভাস্বর, পরিত্তশুভ, অপ্রমাণশুভ, শুভাকীর্ণ, বৃহৎফল, অসঞ্জসত্ত্ব, অবহা, অতপ্ত, সুদর্শন, সুদর্শী, আকনিষ্ঠ। অরুপ ভূমি চারটি যথা আকাশানন্তায়ন, বিজ্ঞানানন্তায়ন, আকিঞ্চনায়তন ও নৈব সংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন। দেবলোকে অবস্থানরত দেবপুত্রগণের অনেক অলৌকিক ঋদ্ধিশক্তির কথা ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে। তারা মারের আবেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আকারের রুপ ধারন করে। পরনির্ম্মিত বশবর্তী দেবলোকের দেবপুত্রগণ মাররুপে আর্বিভূত হয়ে নানান অলৌকিক শক্তির কার্য সম্পাদন করে। দেবপুত্র মারগণ সাধকদের জন্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়ায়। পরনির্ম্মিত বশবর্তী দেবপুত্র মার সম্রাট অশোকের ৩য় সংগীতিতে অকুশল শক্তি প্রয়োগ করেছিল। সেজন্য দেবপুত্র মারকে দমন করার জন্য অহর্ৎ উপগুপ্তকে সংঘ দায়িত্ব দিয়েছিল। উপগুপ্ত স্থবির বিভিন্ন প্রকার ঋদ্ধিশক্তির সাহায্যে মারের উপদ্রব বন্ধ করেন।
৪ স্কন্ধ মারঃ পঞ্চস্কন্ধ সমন্বয়ে জীবের জীবন গঠিত৤ সেই পঞ্চস্কন্ধ হল রুপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান। পঞ্চস্কন্ধ প্রধানত নাম ও রুপ নিয়ে বিভক্ত৤ বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান হল নাম৤ আর রুপ হল ৩২ প্রকার অশুচি পদার্থ। লোম, নখ, দন্ত, ত্বক প্রভৃতি। এই পঞ্চস্কন্ধ সমন্বিত দেহ অনিত্য দুঃখ ও অনাত্ন। মিথ্যাদৃষ্টিবশতঃ আমরা এই দেহকে কত গর্ব করি। অথচ এই দেহে নিত্য সারবস্তু বলতে কিছুই নেই। অবিদ্যার কারণে সত্ত্বগণ জীবজগতে কিংবা এই সংসারে বারবার আসা যাওয়া করছে। অনুপাদিসেস নিবার্ণ লাভের মাধ্যমে মানুষের পঞ্চস্কন্ধ দেহমার ধ্বংস হয়। সোপাদিসেস নিবার্ণ প্রাপ্তির মাধ্যমে সিদ্ধার্থ গৌতম তৃষ্ণা লোভ, দ্বেষ, মোহরুপ মারকে পরাস্ত করলেও স্কন্ধ মার বিদ্যমান ছিল। বুদ্ধত্বলাভের পর আশি বছর বয়সে তিনি অনুপাদিসেস নিবার্ণের মাধ্যমে ক্লেশমারকে ধ্বংস করেন।
৫. মৃত্যুমারঃ পঞ্চস্কন্ধ দেহধারী জীবমাত্রই মৃত্যুর অধীন। অর্থাৎ সংস্কার মাত্রই অনিত্য। মৃত্যু কারো কাম্য নয়। তবুও জীবের মৃত্যু আসে। চ্যুতি চিত্তের বা মনের উদয়ে পঞ্চস্কন্ধ বা নাম-রুপ বা দেহ-মনের বিচ্ছিন্নতাকে বৌদ্ধদর্শনে মৃত্যু বলে। কালমৃত্যু ও অকালমৃত্যু ভেদে দুপ্রকার। দেহ মনের পরিবর্তনশীলতাকে কালমৃত্যু। ভববন্ধনে আবদ্ধ প্রাণির মৃত্যু অকালমৃত্যু। আর বন্ধনছিন্নকারীর মৃত্যু হল সমুচ্ছেদ মৃত্যু। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, মুর্খ-পন্ডিত ভেদাভেদ রীতিনীতি মৃত্যুতে নেই। সুতরাং, মার সর্বদা সজাগ সজীব ও তৎপর থাকে। অথার্ৎ সত্য সুন্দর ও পবিত্রতার পরিপস্থি এক অশুভ মায়াময় প্রভাবই মারের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। একমাত্র ধ্যান, সমাধি প্রজ্ঞা ও স্মৃতি অনুশীলনের ‍মাধ্যমেই এই মায়াচ্ছন্ন আবেশ হতে কিংবা জগত হতে মানুষ মুক্ত হতে পারেন।

সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকীকরণ।


বাংলাদেশে বর্তমানে সবকিছুরই সাম্প্রদায়িকীকরণ সম্পন্ন হয়েছে। কি রাজনীতি,কি অর্থনীতি,কি সমাজনীতি,কি শিক্ষানীতি।বর্তমান প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত যে পাঠ্যপুস্তক রয়েছে সেগুলো পড়ে যদি একটি ছেলে বা মেয়ে বড় হয়,তাহলে তাকে আর জোড় করে মুসলিম বানাতে হবে না,সে আপনা-আপনিই মুসলিম মানসিকতা সম্পন্ন হয়ে উঠবে।দেশের যে অনুসঙ্গটিকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত মনে করা হত তা হল সংস্কৃতি।কিন্তু বিগত দু'দশক থেকে সেখানেও ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়েছে।বাংলাদের সবচেয়ে প্রবীণ জীবিত কবি আল মাহমুদ একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ,তাঁর সৃস্টিও ধর্মীয় উপাদানে ভরা।আর নাটকে এবং চলচিত্রে ধর্মের মাত্রারিক্ত ব্যবহার তো আছেই।এই রকম সাংস্কৃতির মাধ্যমে একটি ধর্মকে হেয় প্রতিপন্য করার একটি উদ্দেশ্যমূলক মিউজিক ভিডিও নিয়ে আজকে আলোচনা করব।
। শর্ট টেলিফ্লিম দুরবীন এ তাহসানের
মোমের দেয়ালের মিউজিক ভিডিওটি দেখুন।
হিন্দু পুজো পাট করা মেয়ে নন্দিতা কিভাবে,
নামাজি- রোজাদার রাশেদেরর প্রেমে পড়ে। কিভাবে
সেক্যুলার  সেজে নামাজি রাশেদ(তাহসান) নন্দিতার
পুজোর পায়েস খায়। অনেকেই মনে করবেন এতে দোষের কি আছে।প্রেমে ও পড়তেই পারে।আমার মতেই দোষের কিছুই নেই।কিন্তু যখন মোমের দেওয়াল বলা হয় সমস্যাটি এখানেই।এখানে মোমের দেওয়াল বলতে আসলে নন্দিতা মানে হিন্দু মেয়েটির ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে বুঝানো হয়েছে কৌশলে,কেননা মোমের দেওয়াল যেমন ক্ষণস্হায়ী এবং ঠুনকো,তেমনি  হিন্দু মেয়েটির ধর্ম বিশ্বাসও ঠুনকো।আর রাসেদ( তাহসান) সেই
দেয়াল বা নন্দিতা নামে হিন্দু মেয়েটির ধর্ম  বিশ্বাস টুনকো আর
তাহসান সেই মোমের দেয়াল ভাঙ্গতে চায়।
ভিডিওটি দেখুন পরিষ্কার হয়ে যাবে
কিভাবে রোমান্টিক গান ও রোমান্টিক
কাপলের প্রেমের কেমিষ্ট্রির মাধ্যমে হিন্দু
বিশ্বাস মানে মোমের দেয়াল মানে টুনকো
বিশ্বাস মুসলিম প্রেমিক তাহসান ভাঙ্গছে।
যা আরো প্ররোচনা দিবে অমুসলিম মেয়েদের
মুসলিম ছেলেদের সাথে প্রেমে জড়াতে।
এখানে এক পর্যায়ে দেখা যায় নন্দিতা দেবতার
নৈবধ্য ও ধুপের ধুয়ো দেবতার বিশ্বাস হতে,পতিদেবতা তাহসানের বিশ্বাসের
দিকে ধাবিত হচ্ছে।তার মানে তাহসান
তাকিয়ার প্রেমের মাধ্যমে হিন্দু নন্দিতার
মোমের দেয়াল কে ভেঙ্গে দিচ্ছে।এখানে
মোমের দেয়াল যে হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস তা
বুঝতে অনেক বড়ো পন্ডিত হবার প্রয়োজন
নেই।
এখন শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে ও এক ধর্মের কাছে আরেক ধর্মের পরাজয়ের কাহিনী দেখানো হচ্ছে। হিন্দু ধর্মকে ছোট করা হয়েছে।
গানের নাম ঃ মোমের দেয়াল শিল্পি।এর প্রভাব হচ্ছে দুই ধরনের অন্যধর্মের ছেলে মেয়েরা নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে হিনমন্যতায় ভুগবে,তারা ভাববে তাদের ধর্মতা এবং সামাজিক প্রথাগুলো কুসংস্কার। দ্বীতিয়ত, নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসকে ভাববে ঠুনকো,ইসলামী বিশ্বাসের প্রতি আকৃস্ট হবে।এ ছাড়াও এর দ্বারা পুরুষতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী নারীর অসহায় আত্নসমর্পণের চিত্রও অঙ্কিত হয়েছে।

বিবর্তনবাদ ও বুদ্ধ দর্শন।

বিবর্তনবাদে বিজ্ঞানের পৃথিবীতে বুদ্ধ
নশ্বর সুজয়
Sydney, Australia
( দীর্ঘ শ্রমসাধ্য একটি নাতিদীর্ঘ ভিন্নধর্মী আলোচনা)

আলোচনার শুরুতে সর্বপ্রথম তথাগত বুদ্ধের অনবধ্য একটি গাথা তুলে ধরলাম- আড়াই হাজার বছর পূর্বেও বুদ্ধ কতটুকুই বিবর্তনবাদী ছিলেন তা জানার জন্য-
এককস্সেকম্হি কপ্পম্হি পুগ্গলস্সট্ঠি সঞ্চযো,
সিযা পব্বতসমো রাসি ইতি বুত্তাং মহেসিনা
-এক কল্প কালের মধ্যে একজন মানুষ যতবারই মৃত্যু বরন করে থাকে, যদি ততবারের অস্থি সমূহ সংগ্রহ করে রাখা হয় তাহলে বিশাল বৈপুল্যপর্বত প্রমাণ স্তুপে পরিণত হবে।- বুদ্ধ  ( কাযবিজ্ঞান-৮১)

বিজ্ঞানীদের দাবী -মহাবিশ্বের নানা ভূতত্ত্বীয় বিবর্তনের ফলে আজকের এই পৃথিবী নামক গ্রহটির উৎপত্তি হয়। এছাড়াও বিজ্ঞানের অনুমান আমাদের এই পৃথিবীর বয়স মহাবিশ্বের বয়সের একতৃতীয়াংশ। সৌরজগৎ উৎপত্তির আনুমানিক ১০০বিলিয়ন বছরের পরবর্তী সময়ের মধ্যে নানা সংঘর্ষের ফলে সৃজন হয় এই পৃথিবী নামক আমাদের বাসযোগ্য গ্রহটি। তাও আবার আজ থেকে ৫৪ বিলিয়ন বছর আগে। যা কিনা একটি লৌহ এবং বায়ু মন্ডলে গঠিত ছিল।
এরই মধ্যে থিয়া নামক অন্য একটি গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর বিশাল একটি সংঘর্ষ হয়, ফলে ঐ সময় ধ্বংস হয়ে যায় বায়ুমন্ডল এবং ঐ থিয়া নামক গ্রহাণুটিও। এতে করে সৃষ্টি হয় আর এক নতুন গ্রহ , যাকে আমরা বলি চাঁদ।
বিজ্ঞান মতে ঐ সময়টি লক্ষ লক্ষ বছর সময়কাল পৃথিবী খুবই উত্তপ্ত ছিল, চারিদিকে টগবগ করতে থাকে গলিত লাভা। যা কিনা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে পাথরে রূপান্তরিত হয়। এবং ঐ পাথর থেকে পানি জমতে থাকে পৃথিবীর প্রথম সাগরে। বিজ্ঞানীরা আনুমানিক ধারনা করে যে এই পানি এবং পাথরের বয়স প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন বছর।
এভাবে আরো কয়েক বিলিয়ন বছর গত হলে ঐ পানি আর পাথরের সংস্পর্শে জমানো শ্যাওলা হতে প্রথম অক্সিজেনের সৃষ্টি হয়। ঐ সময়টিতে পৃথিবীতে অক্সিজেনর মাত্রা এতোই বেশি ছিল যে তাতে উৎপন্ন সকল প্রকার ব্যাকটিরিয়া মারা যায়। এর পরবর্তী প্রায় ১ বিলিয়ন বছর সময়কাল পৃথিবীতে আর তেমন কিছু পরিবর্তন ঘটেনি, কোনো প্রকার প্রানেরও সৃজন হয়নি, এমনকি কোন প্রকার নড়াচড়াও করেনি।
এভাবে স্থির থাকতে থাকতে হঠাৎ পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠাংশ আলাদা আলাদা হতে শুরু করে, খন্ড খন্ড হতে থাকে। যাকে আমরা বলি মহাদেশ। বিজ্ঞানের ধারণা প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে মহাদেশের এমন বিভাজনটি সংগঠিত হয়। ঐ সময়টিতেও পৃথিবীতে কোনো প্রকার প্রাণের আর্বিভাব হয়নি। কারণ ঐ সময়টিতে পৃথিবী ছিল তীব্র শীতল। এতটাই শীতল ছিল যে, পুরো পৃথিবী যেন একটি বরফ গোলায় রূপান্তরিত হয়।
এরপর ধীরে ধীরে বরফ হ্রাস হওয়া কালীন পৃথিবীতে আবারো অক্সিজেন জমতে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারনা ঐ সময়টিতে পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রাণের উদ্ভব হতে থাকে।
বিজ্ঞান বলে প্রথমে এককোষী তারপর বহুকোষী প্রাণীর উৎপত্তি হয়।
এরপরও বিজ্ঞানের দাবী ঐ সময়টিতে যেসকল এককোষী  ও বহুকোষী প্রাণীর  উদ্ভব হয়েছিল তাদের ৯০ শতাংশ প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে প্রকৃতিক নানা কারণে। এদের মধ্যে ডায়নোসরও ছিল। আজ থেকে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে সাইবেরিয়ার বিশাল অগ্ন্যৎপাতই এর দায়ী। এরপরও পরবর্তীতে ঘটে যায় ধ্বংসাত্মক তুষারপাত সহ এই পৃথিবীতে আরো নানা বিবর্তন। তাতেও লুপ্ত হয় ৭৫ শতাংশের অধিক প্রাণীকূল।
এভাবে নানা উৎপত্তি আর বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে আমরা উপনীত হয়েছি বর্তমানের এই পৃথিবী।
যাইহোক এইত গেল পৃথিবীর ক্রম বিকাশের সংক্ষিপ্ত আলোকপাত।
চলুন এবার জানা যাক মানুষের বিবর্তনবাদের সংক্ষিপ্ত ধারনা- মানুষের বিবর্তন বিষয়ে নানা ধর্ম নানা মতবাদ ভিন্ন ভিন্ন যুক্তিও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। তবে কোনটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেনি আজ অবদি। পক্ষান্তরে এবিষয়ে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বরাবরই আলাদা। মানব বিবর্তন বিষয়ে গবেষকদের মধ্য ডারউইন অন্যতম। ডারউইনের দাবী বর্তমানে এই মানব জাতিটির আদি বংশ হচ্ছে বানর বা শিম্পাঞ্জি।
দশ বছর গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে ডারউইন উপনীত হলেও, বিশ বছর কাল সেই সত্য গোপন করতে হয়েছিল তাঁকে। কেননা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জীব যে মানুষ তাঁরই পিতৃপুরুষ শিম্পাঞ্জি কিংবা গোরিলা, এটা তৎকালীন সমাজ যে মেনে নিতে পারবে না, তা ডারউইন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ব্রুনো, কোপার্নিকাস কিংবা গ্যালিলিওর জীবনী থেকে রক্ষণশীল সমাজের এই বিরোধিতা সম্পর্কে আজ অনেকটাই আমরা ধারণা করতে পারি।
তারপরও নানা প্রশ্ন থেকে যায়- আজো কোনো বানর বা শিম্পাঞ্জিকে লেজ খসে পরে মানুষে রূপান্তরিত হতে কেউ দেখেনি। যদি তাই হতো এতো দিন বানর বা শিম্পাঞ্জি নামক প্রাণীকূলটি পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকব না। সবই মানুষ প্রজাতিতে রূপ নিত। এছাড়াও আধুনিক বিজ্ঞানীরাও এমন ঘটনার প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ দিতে পারে নি।
এত গেল সংক্ষেপে মানব বিবর্তনের বিজ্ঞানের আনুমানিক ধারনা।
চলুন এবার আলোচনায় আসি আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের ব্যাখ্যায়। ঐ সময়কালে কিন্তু বিজ্ঞানের তেমন সাক্ষর পরিলক্ষিত হয় না। তবে এ বিজ্ঞান শব্দটির জনক সেই তথাগত বুদ্ধ। বুদ্ধের প্রথম দেশনায় ধর্মচক্র সূত্রে  বার বার উল্লেখিত হয়েছে বুদ্ধ কর্তৃক। যেমন- চক্ষু বিজ্ঞান, ঘ্রাণ বিজ্ঞান, রূপ বিজ্ঞান ইত্যাদি। তবে বুদ্ধের বিজ্ঞান শব্দটির ব্যাখ্যা আর বর্তমান আধুনিক সাইনচ ব বিজ্ঞান শব্দটির ব্যাখ্যা পুরো ভিন্ন।
পৃথিবীর রহস্য বিষয়ে তথাগত বুদ্ধ সহজে উপস্থাপন করেছিলেন- এ সংসার আদি অন্ত বিরহিত। সংক্ষিপ্ত মানব জীবনে এর রহস্যের পেছনে ছুটলে পুরো জীবনই চলে যাবে তথাপি রহস্য রহস্যই থেকে যাবে। সুতরাং ঐ দিকে কালক্ষেপন না করে বর্তমানকে নিয়ে স্বীয় স্বীয় করণী সম্প্রদন কর।
পৃথিবী এমন কোন ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র বস্তুও অবশিষ্ট নেই যা হেতু ছাড়া সৃজন, উতপ্তি বা সংঘটিত হয়েছে।
অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-(মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮)
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।

প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে-  ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বুদ্ধ  যদি পুনজন্ম বিশ্বাস করে তাহলে জন্মচক্রে প্রবেশের পূর্বে সত্ত্বার বা প্রাণীর অবস্থান কেমন ছিল। ভবচক্রে সর্বপ্রথম সে আসল কি ভাবে। আদিতে এই সত্ত্বার কিরূপ স্বরূপ ছিল। ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এসেই যায়। আবার অন্যদিকে যারা ঈশ্বরের বিশ্বাসী, প্রভু বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তারা জটপট করে উত্তর করেন- আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টি ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এখন যদি তাকে আবার দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হয় ; ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্কে কে সৃষ্টি করল। এর উত্তরেও আপনি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না প্রকৃত পক্ষে। সবদিকেই কিন্তু, কেন, এরূপ চলতেই থাকবে।

বুদ্ধের সমকালীন সময়েও বুদ্ধকে এরূপ উভয়কটিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ত্রিবেদজ্ঞ চতুরবেদজ্ঞ ব্রাম্মণরাই বুদ্ধের সাথে এরূপ তার্কিক যুদ্ধে আগ্রহী হতেন। ত্রিপিটকের বিভিন্ন সূত্রে তা পরিলক্ষিত হয়।

জগত - সৃষ্টি - জন্মতত্ত্ব বিষয়ে বুদ্ধের কেমন বিচার ধারণা বা সিদ্ধান্ত ছিল তা
 আমরা বুদ্ধের বিভিন্ন দেশনায় দেখতে পাই।

এছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম মতে, অন্যান্য ধর্মের god অর্থাৎ generator, operator, destructor। অর্থাৎ ঈশ্বর এই কাজ করে থাকে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর নাই। তাই এই কাজগুলো কিভাবে সংঘটিত হবে? তাদের মতে এগুলো স্বয়ংক্রিয় একটি ‘নির্ভরশীলতা বা আপেক্ষিক’ একটি
পদ্ধতির মাধ্যমে হয়ে থাকে। এই
স্বয়ংক্রিয়
 পদ্বতিকে ‘বিশ্বজনীন
নীতি’ বা ‘Cosmological Laws’ বলা যায়। বৌদ্ধ ধর্মে যদি সৃষ্টিকর্তা,
ধ্বংসকর্তা, পরিচালনকর্তা রূপে কাউকে বসানো একান্ত প্রয়োজন হয়
তাহলে এই নীতি বসান যায়। সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম (Rules of Physics or matter)
খ. চিত্ত নিয়ম (Rules of Mind or citta)
গ. বীজ নিয়ম (Rules of Germinal order)
ঘ. কর্ম নিয়ম (Rules of Karma ) এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম ( Rules of Dharma)।

এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।
Ven. S. Dhammika তার good question good answer গ্রন্থে চমকপ্রদ আলোকপাত করেছেন।
এ সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান এবং বুদ্ধের ব্যাখ্যা অভিন্ন। "অগ্গঞা সূত্রে" বুদ্ধের ব্যাখ্যা হলো, লক্ষ লক্ষ বছরের দীর্ঘ সময় ব্যাপী প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় সৌরমন্ডল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় সৌরমন্ডলের বর্তমান ঘূর্ণায়মান অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বপ্রকৃতির প্রথম প্রাণীর সৃষ্টি হয় জলে, এককোষী প্রাণী হিসেবে। পরবর্তী পর্যায়ে বিবর্তনের মাধ্যমে এককোষী প্রাণী বহুকোষী যৌগিক প্রাণীতে রুপান্তরীত হয়। প্রাকৃতিক কার্য-কারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রুপান্তর ঘটেছে, যা বুদ্ধের "প্রতীত্য সমুৎপাদ সূত্রে"ও দেশিত হয়েছে।
আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমরা মানুষের অপরিমেয় শক্তিতে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষ মূল্যবান এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে অনন্ত মেধা সুপ্ত আছে। কর্মসাধনায় প্রতিটি মানুষ বুদ্ধের মত প্রজ্ঞা লাভ করে কোন বিষয় আসলে যে রকম  ঠিক সেই রকম প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করি, মনের ঈর্ষা, ক্রোধ ও ঘৃণার স্থলে করুণা, ক্ষমা ও মৈত্রীর অনূভূতিতে উজ্জিবীত হয়ে প্রতিটি মানুষ নিজ জ্ঞানশক্তির সাহায্যে জীবন জগতের সকল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। বুদ্ধ বলেছেন আমাদের অন্য কেউ রক্ষা করতে পারে না, নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হয়।
অজ্ঞতা ধূর করে জ্ঞানের আলোকে জীবনের স্বরুপ জ্ঞাত হয়ে আপন কর্মশক্তির সাহায্যে নিজ নিজ সমস্যা সমাধান করতে হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতার জ্ঞানাআলোকে বুদ্ধ স্পষ্ট ভাবে সেই পথ চলার সন্ধান দিয়েছেন।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, " যদি কোন ধর্ম আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমান
তালে চলে, তা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম।"

এদিক থেকে বৌদ্ধরা খুবই ভাগ্যবান.....

অবশ্য এই ব্যাপারে আরেক মহাপুরুষ ভেন. প্রফেসর আনন্দ কৌশল্যায়না বলেছেন, " বৌদ্ধরা এতই ভাগ্যবান যে তাদেরকে জন্মের পর
থেকেই ‘কেউনা’ নামক কোন অশরীরি শক্তির নির্দেশ, আদেশ অথবা কোন প্রেরিত বা নাজেলকৃত মতবাদকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে জীবন পরিচালনা করতে হয়না।"
ভারত বাংলা উপমহাদেশের প্রখ্যাত পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে -
“অজ্ঞানতারই অপর নাম ঈশ্বর। আমরা আমাদের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করতে লজ্জা পাই এবং তার জন্য বেশ ভারী গোছের একটা নামের আড়ালে আত্মগোপন করি। সেই ভারী গোছের আড়ালটির নামই ঈশ্বর। ঈশ্বর বিশ্বাসের আরও একটি কারণ হল বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের অপারগতা ও অসহায়ত্ব।"

বুদ্ধ ছিলেন মূলত একজন সমাজসংস্কারক, ধর্মপ্রচারক। কিন্তু অধিবিদ্যা বা আধ্যাত্মবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই ঈশ্বর, আত্মা, জগৎ প্রভৃতি বিষয়ের দার্শনিক বিচারে তাঁর কোন আগ্রহ ছিলো না।
এ বিষয়ে বুদ্ধ অতি সুন্দর উপমাসূচক দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। ব্রাহ্মণদের আত্মবাদ বিষয়ে ‘দীঘনিকায়ে’র ‘পোট্ঠপাদ সূত্তে’ বলা হয়েছে-
আত্মাকে স্বর্গসুখ ভোগ করতে কে দেখেছে? না দেখে তার অস্তিত্ব স্বীকার করা নিতান্ত উপহাস্যস্পদ। যদি কোন পুরুষ বলে যে, সে এই দেশের যে জনপদকল্যাণী (=দেশের সুন্দরতম স্ত্রী) তাকে চায়। তাতে লোকে তাকে প্রশ্ন করে, যে স্ত্রীকে সে চায় সে কি ক্ষত্রিয়াণী, ব্রাহ্মণী, বৈশ্যস্ত্রী বা শূদ্রী? অমুক নামধারী বা অমুক গোত্রধারী, লম্বা বা বেটে বা মাঝারি? এরূপ প্রশ্নে ‘না’ বললে (তাকে হয়তো নির্বোধ বা পাগল ঠাউরে) কেউ সেই বাক্যের কোন প্রমাণ চায় না। এরূপ আত্মবাদী ব্রাহ্মণবাক্যের প্রমাণ চাওয়া হয় না।
.
দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটি আরো সুন্দর। কোন ব্যক্তি প্রাসাদে আরোহণের জন্য চৌরাস্তায় সিঁড়ি বানালে লোকেরা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ওহে! তুমি যে প্রাসাদের জন্য সিঁড়ি বানাচ্ছো, তুমি কি জানো সেই প্রাসাদটি পূর্ব দিকে, দক্ষিণ দিকে, পশ্চিমদিকে বা উত্তরদিকে? উঁচু, নিচু বা মাঝারি? এই প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ বললে তাকে বলা হয় যে, যাকে তুমি জানো না, দেখোনি সেই প্রাসাদে চড়ার জন্য সিঁড়ি বানাচ্ছো? ঐদি এই প্রশ্নের উত্তরে ‘হাঁ’ বলা হয় তবে কি তার বাক্য প্রমাণশূন্য হবে না?
.
এই উদাহরণের সহায়তায় গৌতম বুদ্ধ দেখিয়েছেন যে, ব্রাহ্মণদর্শনে প্রতিপাদিত ‘আত্মা’ নামক কোন পদার্থ নেই। কেননা যখন কেউ আত্মাকে দেখেনি, শোনেনি তখন তার অস্তিত্ব কিভাবে স্বীকার করা হয়? পরলোকে সেই আত্মাকে সুখী বানাতে যে উপায় গ্রহণ করা হয় তা কি নিরর্থক নয়? কেননা যার মূল নেই তাকে সিঞ্চন করা প্রয়োজন হয় না।
মূলত বুদ্ধ একজন সমাজসংস্কারকই ছিলেন,।
.
শ্রাবস্তীর জেতবনে বিহার করার সময় মোগ্গলিপুত্ত তিস্স বুদ্ধকে দশটি প্রশ্ন করেছিলেন, যার উত্তরে বুদ্ধ নিস্পৃহ থেকেছিলেন। এগুলোকেই বুদ্ধের দশ অ-কথনীয় বলা হয়। মজ্ঝিমনিকায় অনুসারে বুদ্ধের অকথনীয় সূচিতে মাত্র দশটি বাক্য আছে, যা লোক (বিশ্ব), আত্মা এবং শরীরের ভেদাভেদ তথা মুক্ত পুরুষের গতি বিষয়ক। এই প্রশ্নগুলো হলো-
(ক) লোক বিষয়ক:
(১) লোক শাশ্বত বা নিত্য (eternal) কি-না ?
(২) লোক কি অনিত্য (non-eternal) ?
(৩) লোক কি সসীম (finite) ?
(৪) লোক কি অসীম (infinite) ?
(খ) দেহাত্মার একতা বিষয়ক:
(৫) আত্মা ও শরীর কি এক ?
(৬) আত্মা ও শরীর কি ভিন্ন ?
(গ) নির্বাণ-পরবর্তী অবস্থা বিষয়ক:
(৭) মৃত্যুর পর তথাগতের কি পুনর্জন্ম হয়েছে ?
(৮) মৃত্যুর পর কি তথাগতের পুনর্জন্ম হয় নি ?
(৯) তথাগতের পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া- উভয়ই কি সত্য ?
(১০) তথাগতের পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া- উভয়ই কি অসত্য ?
.
বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধের এ মৌনতার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা হয়েছে। কোন কোন পণ্ডিতের মতে বুদ্ধের এই নীরবতা তত্ত্ববিষয়ক অজ্ঞানের প্রতীক। কিন্তু এ মত গ্রহণযোগ্য নয় এজন্যেই যে, তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের উত্তর না জানলে তিনি ‘বুদ্ধ’ সংজ্ঞায় বিভূষিত হতেন না। বুদ্ধ শব্দের অর্থ জ্ঞানী। আবার কারো কারো মতে বুদ্ধ আত্মা, জগৎ, ঈশ্বর ইত্যাদির অস্তিত্বে সন্দিগ্ধ ছিলেন বলে এই মৌনতা তাঁর সংশয়বাদের স্বীকৃতি। কিন্তু তাঁদের এ ধারণা যে সম্পূর্ণই অর্বাচীন তার প্রমাণ হলো বুদ্ধের অনিত্যবাদ, অনাত্মবাদ, নিরীশ্বরবাদের মধ্য দিয়ে এই বহমান জগতের কোনো বস্তুকেই ধ্রুব বা নিত্য বলে স্বীকার না করা।
.
অনেক পণ্ডিত বুদ্ধের মৌন থাকাকে উদ্দেশ্যমূলক আখ্যায়িত করে বলেন, বুদ্ধ ছিলেন সর্বজ্ঞানী। তিনি তত্ত্বশাস্ত্রের প্রশ্নোত্তর জানতেন এবং মানবজ্ঞানের সীমাও জানতেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, তত্ত্বশাস্ত্রীয় যত প্রশ্ন আছে তাদের নিশ্চিতভাবে উত্তর হয় না। এরকম কোন প্রশ্নের উত্তরে দার্শনিকরাও এক মত নন। তত্ত্বশাস্ত্রের প্রশ্নে সৃষ্ট ঝঞ্ঝাট ব্যর্থ বিবাদকে প্রশ্রয় দেয়। কেননা অন্ধগণ স্পর্শ করে হাতির স্বরূপ বর্ণনা করলে সেই বর্ণনা বিরোধাত্মক ও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাই তিনি তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের প্রতি মৌন থেকে নিস্পৃহতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, সে সব প্রশ্নের উত্তর ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণে নিষ্প্রয়োজন। বুদ্ধমতে এসব অব্যাকৃত প্রশ্নে আগ্রহী হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এসব তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের উত্তরে ব্যবহার বা নীতিমার্গের কোন সমস্যার সমাধান হয় না।
.
বুদ্ধের মতে সংসার দুঃখে পরিপূর্ণ। দর্শনের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুঃখের সমাপ্তি সন্ধান। সেকারণে তিনি দুঃখের সমস্যা ও দুঃখনিরোধের উপর অধিক জোর দিয়েছেন। তাই মালুঙ্ক্যপুত্ত যখন বুদ্ধকে এই দশ অকথনীয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন- “ভগবন্ ! যদি এ বিষয়ে জানেন …তবে বলুন …না জানলে …বা যিনি জানেন না বা বোঝেন না তাঁকে সরাসরি বলে দেওয়াই যুক্তিসংগত- ‘আমি জানি না।’ …”
বুদ্ধ এর উত্তর দিতে গিয়ে বলেছেন- “…আমি একে অ-কথনীয় …বলেছি, …কারণ …এর সম্বন্ধে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভিক্ষুচর্যা বা ব্রাহ্মচর্যের জন্য যোগ্য নয়। আবার নির্বেদ-বৈরাগ্য, শান্তি …পরম-জ্ঞান ও নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যও এই অ-কথনীয়ের কোনো আবশ্যকতাই নেই; তাই আমি এদের বলেছি অবক্তব্য।”
.
বুদ্ধের মতে ভবরোগে পীড়িত জীব অধ্যাত্মবিষয় নিয়ে কী করবে ? তার কাছে তো কর্তব্য পথ জেনে চলা হচ্ছে জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। এজন্যেই বৌদ্ধধর্ম প্রারম্ভে মানুষকে নীতিশাস্ত্রে আগ্রহী করায় তা ‘নৈতিক যথার্থবাদ’ (ethical realism) নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। (বিশিষ্ট লেখক ও  গবেষক --রণদীপম বসু)

.
তবে কোন বদ্ধ চিন্তার পাকে আটকে না থেকে স্বাধীন চিন্তার পক্ষেই বুদ্ধের সম্মতি ও উপদেশ পরিলক্ষিত হয়। যেমন (মজ্ঝিমনিকায়-১/২/৩) বুদ্ধ উপদেশ শুরু করেছিলেন এভাবে-
“ভিক্ষুগণ! আমি সেতুর মতো অতিক্রম করার জন্য তোমাদের ধর্মোপদেশ দিচ্ছি, ধরে রাখার জন্য নয়। …যেমন, একজন পুরুষ …এমন এক বিরাট নদীর ধারে উপস্থিত হলো যার এপার বিপদসঙ্কুল, ভয়পূর্ণ এবং ওপার সুখ-সমৃদ্ধিপূর্ণ তথা ভয়রহিত। অথচ সেখানে যাওয়ার জন্য কোনো তরীও নেই, নেই কোনো সেতু। …তখন সে …তৃণ-কাষ্ঠ …পত্র সংগ্রহ করে সেতু বেঁধে, তার সাহায্যে দৈহিক পরিশ্রমের দ্বারা স্বস্তিপূর্বক নদী পার হলো। …এরপর তার মনে হলো- ‘এই সেতু আমার উপকার করল, এর সাহায্যে …আমি পার হলাম; অতএব এখন একে আমি কেনই বা মাথায় করে অথবা কাঁধে তুলে… নিয়ে যাব না।’ …তবে কি …ঐ পুরুষকে সেতুটির প্রতি কর্তব্য পালনকারী ধরতে হবে? …না…। ভিক্ষুগণ! ঐ পুরুষ সেতুটি থেকে দুঃখকেই আহরণ করবে।”
.
একবার বুদ্ধকে কেশপুত্র গ্রামের কালামো নানা মতবাদে সত্য-মিথ্যা সন্দেহ করে প্রশ্ন করেছিলেন- “প্রভু! কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ কেশপুত্র গ্রামে এসে নিজ নিজ মতবাদ প্রকাশ…করেন, অন্যের মতবাদে দ্বি-মত হন, নিন্দা করেন।… অন্যেরাও…স্বীয় মতবাদ প্রকাশ করে…অন্যের মতবাদে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেন। অতএব…আমার মনে এরূপ দ্বিধা হয়- এঁদের মধ্যে…কে সত্য বলেন কেই বা মিথ্যা বলেন?’
উত্তরে বুদ্ধ বলেন- “‘কালামো! তোমার সন্দেহই…ঠিক, যেখানে প্রয়োজন সেখানেই সন্দেহ করেছ। …কালামো! তুমি শ্রুত কথার (বেদের) ভিত্তিতে কারুর কথা মেনে নিও না; তর্কের খাতিরে, বিনা যুক্তিতে, বক্তার ভব্যরূপে মুগ্ধ হয়ে, নিজের পুরনো সিদ্ধান্তের অনুকূল বলে, এই শ্রমণ আমার গুরু’ বলে মেনে না নিয়ে, নিজের বিচারে যা তুমি ধর্মসংগত, উত্তম, নির্দোষ, অনিন্দিত মনে করবে, যাকে গ্রহণ করা হিতকর ও সুখকর বলে জানবে নির্দ্বিধায় তাকে স্বীকার কর।’”
.

রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ মানব।


যাকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করতেন রবীন্দ্রনাথ
_তারেক অণু

জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক – কি আশ্চর্য শক্তিশালী ধরনের নব চেতনার ধারক একটি কথা! জগতের সকল প্রাণী, কেবলমাত্র মানুষ নয়, সমস্ত প্রাণীকুলের সুখী হবার অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়েছে এইখানে। সেই আঁধার যুগে শোনালেন সাম্যবাদের গান, কে তিনি?

সিদ্ধার্থ নামের এক যুবরাজ, যিনি পরিচিত সারা বিশ্বের কাছে গৌতম বুদ্ধ হিসেবে। তিনিই বিশ্বে প্রথম কমিউন বা সঙ্ঘ শব্দটি ব্যবহার করেন, যে কারণে অনেকেই তাকে কমিউনিজমের আদি গুরু বলে থাকেন, সেই সাথে সকলের সম অধিকারের ব্যাপারটি তো আছেই।

বুদ্ধদেব আমার কাছে এক পরম আশ্চর্যের মানুষ, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে আমাদেরই অঞ্চলের এই পাহাড়ি রাজ্যে জন্ম নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে কোন অলৌকিক বলে সত্যজ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে অলৌকিকতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বাণী দিলেন- ধর্মকে বিশ্বাস করো না - অন্ধভাবে ভুল জিনিস শিখতে পার, সংস্কৃতিকে অনুকরণ করো না - অন্যের ভুল ধারণা তোমাকে প্রভাবিত করতে পারে, নিজে যাচাই-বাছাই করে যুক্তিসিদ্ধ মনে হলেই তবে সেই তথ্য গ্রহণ করতে পার।

সেই সাথে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ কোটি দেবতাদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমাদের বিপদে তো দেবতারা এগিয়ে আসেন না, নিজেদেরই সামলাতে হয়! তাদের কি দরকার আমাদের ?

কিন্তু তাহলে যে দেবতা জ্ঞানে বুদ্ধ দেবের মূর্তিতে সারা বিশ্ব জুড়ে পুজো করা হয়! নানা বইপত্র ঘেঁটে জানলাম- যে বুদ্ধ ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না তিনি নিশ্চয়ই নিজের মূর্তি গড়ে উপাসনা করতে বলে যান নি। এই ক্ষেত্রে মূল সমস্যা পাকিয়ে গেছে ভারতীয় উপমহাদেশে আক্রমণকারী গ্রীক সেনাদল, যাদের নেতৃত্বে ছিল আলেকজান্ডার। তারা বয়ে আনা প্যাগান ধর্মের সাথে এই দেশীয় প্রচলিত বিশ্বাসের একটা জগাখিচুড়ি নির্মাণের প্রয়াস চালালো এবং ব্যাপক ভাবে সফল হল, মানুষের মনে গেড়ে থাকা বুদ্ধদেবকে তারা গ্রীক সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর আদলে মাথায় উঁচু করে বাঁধা চুলের আদলে ঢিবি দিয়ে নির্মাণ করল। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানেই মনে হয় একমাত্র উপাসনালয় স্থাপিত হয়েছিল যেখানে একই বেদিতে হারকিউলিস এবং বুদ্ধদেবের মূর্তি আসীন ছিল।

মনে প্রশ্নে ঝড় বয়ে যায়, যে মানুষটি এতটাই আধুনিক ছিল, সে কি করে গতজন্ম- পরজন্মের মত খেলো ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন? পরে শুনি, এটিও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চক্রান্ত, শঙ্করাচার্য নামের সেই মহা ধড়িবাজ মৌলবাদী হিন্দুব্রাহ্মণ বুদ্ধ দেবের দর্শনের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে তাকে বিষ্ণুর একটি অবতার হিসেবে চালিয়ে দিল, সেই সাথে আর্য হিন্দুধর্মের পরজন্ম- জন্মান্তরের মত বিষয়গুলো বৌদ্ধধর্মের অংশ হয়ে গেল, অথচ বুদ্ধদেব কোন ধর্ম প্রচার করতেন না, তিনি তার একান্ত উপলব্ধি অর্থাৎ দর্শন প্রচার করতেন, অথচ তার মৃত্যুর অনেক বছর পরে এই মহামানবকে নিয়েই চালু হল ধর্ম, মূর্তিগড়া, যাবতীয় ব্যবসা!

বুদ্ধদেব নিয়ে যত তথ্য হাতে আসে ততই শ্রদ্ধার মাত্রা মহাকাশ ছাড়িয়ে যায়, অবাক বিস্ময়ে আপ্লুত হতে থাকি বারংবার , বিশ্বের যেখানেই যাওয়া হয় বুদ্ধ সম্পর্কে নতুন বইয়ের খোঁজ পেলে সংগ্রহ করবার চেষ্টা করি সবসময়ই, তবে তাকে দেবতা জ্ঞানে গদ গদ ভক্তি মার্কা লেখা না, তার দর্শনমূল্য বিবেচনা করে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। এবং তাবৎ বিশ্ব হাতড়িয়ে কয়েক মাস আগে খেয়াল করি বুদ্ধদেব সম্পর্কে আমার পড়া সবচেয়ে সুলিখিত, ব্যপক তথ্যসমৃদ্ধ বইটি লেখা হয়েছে বাংলা ভাষাতেই, লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বুদ্ধদেব নামের শীর্ণ বইটি মূলত রবিঠাকুরের বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধদেব নিয়ে লেখার সংকলন, বইটির প্রথম লাইন হচ্ছে- আমি যাকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তার জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি।

এরপরে বিশ্বকবি তার ঐন্দ্রজালিক ভাষায় উচ্ছসিত উপমা আর মুগ্ধতার জাল বুনেই থেমে যান নি বরং রীতিমত যুক্তির কষ্টিপাথর দিয়ে যাচাই করে দেখিয়েছেন কেন বুদ্ধকে বিশ্বমানব বলা হয় এবং কেন তার বাণী সর্বজনগ্রাহ্য হবে। বিশেষ করে কবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন বারংবার সেই ভেদাভেদমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার প্রচলনের চেষ্টার, উল্লেখ করেছেন বুদ্ধের আবির্ভাবে- সত্যের বন্যায় বর্ণের বেড়া দিলে ভাসিয়ে।

বিশ্বের সব মানুষ যে সমান, বহু যুগ ধরে চলতে থাকা জাত-পাত, ভেদাভেদ যে কেবল শোষণকারী একটা সমাজের কুৎসিত চক্রান্ত তার বিরুদ্ধেই যেন মহাস্ত্র হয়ে এল বুদ্ধের দর্শন।

তার সম্পর্কে কবি গুরু বললেন- এত বড় রাজা কি জগতে আর কোনোদিন দেখা দিয়েছে! বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, অপবিত্র ভেদবুদ্ধির নিষ্ঠুর মূঢ়তা ধর্মের নামে আজ রক্তে পঙ্কিল করে তুলেছে এই ধরাতল, পরস্পর হিংসার চেয়ে সাংঘাতিক পরস্পর ঘৃণার মানুষ এখানে পদে পদে অপমানিত। সর্বজীবে মৈত্রীকে যিনি মুক্তির পথ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেই তারই বাণীকে আজ উৎকণ্ঠিত হয়ে কামনা করি এই ভাতৃবিদ্বেষকলুষিত হতভাগ্য দেশে।

সেই সাথে যাবতীয় কুসংস্কারের ঝাড় প্রচলিত ধর্মগুলোর বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে সত্য-সুন্দর আনন্দলোকের কবি লিখলেন- যে ধর্মকর্মের দ্বারা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবার আশঙ্কা আছে তাকেই ভয় করতে হবে।

একই সাথে স্বজাতির কূপমণ্ডূকতায় ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে উপলব্ধি করলেন- কেবল দানের দ্বারা যার ক্ষয় হয় না, বৃদ্ধি হয়, মানুষের প্রতি সেই শ্রদ্ধাকে সাম্প্রদায়িক সিন্ধুকের মধ্যে তালা বন্ধ করে রাখলুম।

বিশ্বমানবের উচ্চতায় আরোহণকারী রবীন্দ্রনাথ তারই মতন আরেক বিশ্বনাগরিকের বন্দনায় মেতে উঠে বলেছেন- তিনি তার সব-কিছু ত্যাগ করেছিলেন দীনতম মূর্খতম মানুষেরও জন্য। তার সেই তপস্যার মধ্যে ছিল নির্বিচারে সকল দেশের সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।

বাকী প্রবন্ধগুলোতে রবি ঠাকুর সরল ভঙ্গীতে বলে গেছেন বুদ্ধ দর্শনের ইতিহাস, নানা শ্লোকের তাৎপর্য, বিভিন্ন দেশে ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব, বৈষ্ণবধর্ম কতৃক দখলকৃত বৌদ্ধ জীবনধারা, প্রিয়তম মানুষের উদ্দেশ্যে রচিত শ্রদ্ধার্ঘ্য তার অমর কবিতা। এবং সেই সাথে দ্ব্যর্থ ভাবে বলে গেছেন- বৌদ্ধ ধর্মেই মানবকে দেবতার স্থান প্রথম দেওয়া হয়েছে।
_তারেক অণু

জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক – কি আশ্চর্য শক্তিশালী ধরনের নব চেতনার ধারক একটি কথা! জগতের সকল প্রাণী, কেবলমাত্র মানুষ নয়, সমস্ত প্রাণীকুলের সুখী হবার অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়েছে এইখানে। সেই আঁধার যুগে শোনালেন সাম্যবাদের গান, কে তিনি?

সিদ্ধার্থ নামের এক যুবরাজ, যিনি পরিচিত সারা বিশ্বের কাছে গৌতম বুদ্ধ হিসেবে। তিনিই বিশ্বে প্রথম কমিউন বা সঙ্ঘ শব্দটি ব্যবহার করেন, যে কারণে অনেকেই তাকে কমিউনিজমের আদি গুরু বলে থাকেন, সেই সাথে সকলের সম অধিকারের ব্যাপারটি তো আছেই।

বুদ্ধদেব আমার কাছে এক পরম আশ্চর্যের মানুষ, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে আমাদেরই অঞ্চলের এই পাহাড়ি রাজ্যে জন্ম নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে কোন অলৌকিক বলে সত্যজ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে অলৌকিকতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বাণী দিলেন- ধর্মকে বিশ্বাস করো না - অন্ধভাবে ভুল জিনিস শিখতে পার, সংস্কৃতিকে অনুকরণ করো না - অন্যের ভুল ধারণা তোমাকে প্রভাবিত করতে পারে, নিজে যাচাই-বাছাই করে যুক্তিসিদ্ধ মনে হলেই তবে সেই তথ্য গ্রহণ করতে পার।

সেই সাথে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ কোটি দেবতাদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমাদের বিপদে তো দেবতারা এগিয়ে আসেন না, নিজেদেরই সামলাতে হয়! তাদের কি দরকার আমাদের ?

কিন্তু তাহলে যে দেবতা জ্ঞানে বুদ্ধ দেবের মূর্তিতে সারা বিশ্ব জুড়ে পুজো করা হয়! নানা বইপত্র ঘেঁটে জানলাম- যে বুদ্ধ ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না তিনি নিশ্চয়ই নিজের মূর্তি গড়ে উপাসনা করতে বলে যান নি। এই ক্ষেত্রে মূল সমস্যা পাকিয়ে গেছে ভারতীয় উপমহাদেশে আক্রমণকারী গ্রীক সেনাদল, যাদের নেতৃত্বে ছিল আলেকজান্ডার। তারা বয়ে আনা প্যাগান ধর্মের সাথে এই দেশীয় প্রচলিত বিশ্বাসের একটা জগাখিচুড়ি নির্মাণের প্রয়াস চালালো এবং ব্যাপক ভাবে সফল হল, মানুষের মনে গেড়ে থাকা বুদ্ধদেবকে তারা গ্রীক সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর আদলে মাথায় উঁচু করে বাঁধা চুলের আদলে ঢিবি দিয়ে নির্মাণ করল। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানেই মনে হয় একমাত্র উপাসনালয় স্থাপিত হয়েছিল যেখানে একই বেদিতে হারকিউলিস এবং বুদ্ধদেবের মূর্তি আসীন ছিল।

মনে প্রশ্নে ঝড় বয়ে যায়, যে মানুষটি এতটাই আধুনিক ছিল, সে কি করে গতজন্ম- পরজন্মের মত খেলো ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন? পরে শুনি, এটিও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চক্রান্ত, শঙ্করাচার্য নামের সেই মহা ধড়িবাজ মৌলবাদী হিন্দুব্রাহ্মণ বুদ্ধ দেবের দর্শনের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে তাকে বিষ্ণুর একটি অবতার হিসেবে চালিয়ে দিল, সেই সাথে আর্য হিন্দুধর্মের পরজন্ম- জন্মান্তরের মত বিষয়গুলো বৌদ্ধধর্মের অংশ হয়ে গেল, অথচ বুদ্ধদেব কোন ধর্ম প্রচার করতেন না, তিনি তার একান্ত উপলব্ধি অর্থাৎ দর্শন প্রচার করতেন, অথচ তার মৃত্যুর অনেক বছর পরে এই মহামানবকে নিয়েই চালু হল ধর্ম, মূর্তিগড়া, যাবতীয় ব্যবসা!

বুদ্ধদেব নিয়ে যত তথ্য হাতে আসে ততই শ্রদ্ধার মাত্রা মহাকাশ ছাড়িয়ে যায়, অবাক বিস্ময়ে আপ্লুত হতে থাকি বারংবার , বিশ্বের যেখানেই যাওয়া হয় বুদ্ধ সম্পর্কে নতুন বইয়ের খোঁজ পেলে সংগ্রহ করবার চেষ্টা করি সবসময়ই, তবে তাকে দেবতা জ্ঞানে গদ গদ ভক্তি মার্কা লেখা না, তার দর্শনমূল্য বিবেচনা করে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। এবং তাবৎ বিশ্ব হাতড়িয়ে কয়েক মাস আগে খেয়াল করি বুদ্ধদেব সম্পর্কে আমার পড়া সবচেয়ে সুলিখিত, ব্যপক তথ্যসমৃদ্ধ বইটি লেখা হয়েছে বাংলা ভাষাতেই, লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বুদ্ধদেব নামের শীর্ণ বইটি মূলত রবিঠাকুরের বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধদেব নিয়ে লেখার সংকলন, বইটির প্রথম লাইন হচ্ছে- আমি যাকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তার জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি।

এরপরে বিশ্বকবি তার ঐন্দ্রজালিক ভাষায় উচ্ছসিত উপমা আর মুগ্ধতার জাল বুনেই থেমে যান নি বরং রীতিমত যুক্তির কষ্টিপাথর দিয়ে যাচাই করে দেখিয়েছেন কেন বুদ্ধকে বিশ্বমানব বলা হয় এবং কেন তার বাণী সর্বজনগ্রাহ্য হবে। বিশেষ করে কবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন বারংবার সেই ভেদাভেদমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার প্রচলনের চেষ্টার, উল্লেখ করেছেন বুদ্ধের আবির্ভাবে- সত্যের বন্যায় বর্ণের বেড়া দিলে ভাসিয়ে।

বিশ্বের সব মানুষ যে সমান, বহু যুগ ধরে চলতে থাকা জাত-পাত, ভেদাভেদ যে কেবল শোষণকারী একটা সমাজের কুৎসিত চক্রান্ত তার বিরুদ্ধেই যেন মহাস্ত্র হয়ে এল বুদ্ধের দর্শন।

তার সম্পর্কে কবি গুরু বললেন- এত বড় রাজা কি জগতে আর কোনোদিন দেখা দিয়েছে! বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, অপবিত্র ভেদবুদ্ধির নিষ্ঠুর মূঢ়তা ধর্মের নামে আজ রক্তে পঙ্কিল করে তুলেছে এই ধরাতল, পরস্পর হিংসার চেয়ে সাংঘাতিক পরস্পর ঘৃণার মানুষ এখানে পদে পদে অপমানিত। সর্বজীবে মৈত্রীকে যিনি মুক্তির পথ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেই তারই বাণীকে আজ উৎকণ্ঠিত হয়ে কামনা করি এই ভাতৃবিদ্বেষকলুষিত হতভাগ্য দেশে।

সেই সাথে যাবতীয় কুসংস্কারের ঝাড় প্রচলিত ধর্মগুলোর বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে সত্য-সুন্দর আনন্দলোকের কবি লিখলেন- যে ধর্মকর্মের দ্বারা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবার আশঙ্কা আছে তাকেই ভয় করতে হবে।

একই সাথে স্বজাতির কূপমণ্ডূকতায় ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে উপলব্ধি করলেন- কেবল দানের দ্বারা যার ক্ষয় হয় না, বৃদ্ধি হয়, মানুষের প্রতি সেই শ্রদ্ধাকে সাম্প্রদায়িক সিন্ধুকের মধ্যে তালা বন্ধ করে রাখলুম।

বিশ্বমানবের উচ্চতায় আরোহণকারী রবীন্দ্রনাথ তারই মতন আরেক বিশ্বনাগরিকের বন্দনায় মেতে উঠে বলেছেন- তিনি তার সব-কিছু ত্যাগ করেছিলেন দীনতম মূর্খতম মানুষেরও জন্য। তার সেই তপস্যার মধ্যে ছিল নির্বিচারে সকল দেশের সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।

বাকী প্রবন্ধগুলোতে রবি ঠাকুর সরল ভঙ্গীতে বলে গেছেন বুদ্ধ দর্শনের ইতিহাস, নানা শ্লোকের তাৎপর্য, বিভিন্ন দেশে ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব, বৈষ্ণবধর্ম কতৃক দখলকৃত বৌদ্ধ জীবনধারা, প্রিয়তম মানুষের উদ্দেশ্যে রচিত শ্রদ্ধার্ঘ্য তার অমর কবিতা। এবং সেই সাথে দ্ব্যর্থ ভাবে বলে গেছেন- বৌদ্ধ ধর্মেই মানবকে দেবতার স্থান প্রথম দেওয়া হয়েছে।

এই ধরনীর গর্বের ধন গৌতম বুদ্ধ

গৌতম বুদ্ধ কেবলমাত্র বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক বা একজন মহান দার্শনিক নন। তিনি মানবজাতির গৌরব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। হিন্দু পণ্ডিতদের অনেকে এমনকি মহাত্না গান্ধী গৌতম বুদ্ধকে মনে করতেন একজন অবতার হিসাবে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক মুসলিম গবেষক মনে করতেন যে, গৌতম বুদ্ধ একজন নবী ছিলেন। প্রথিবীতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি নেই যাঁকে নিয়ে এত টানাটানি।----- তিনি অবতার ছিলেন কি-না বা একজন নবী ছিলেন কি-না তা জানি না, তবে এটুকু নির্দ্ধিধায় বলতে পারি, তিনি ছিলেন এ ধরণীর গর্বের ধন। মানবতাবাদী এই মহান দার্শনিক মনব কল্যাণের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তিনি সুন্দরী স্ত্রী, শিশু-সন্তান, পিতা-মাতা এবং রাজ্য ত্যাগ করেছেন কোন স্বর্গ লাভের জন্য নয় বা কোন পরমেশ্বরকে পাবার উদ্দ্যেশ্য নয়। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মানুষকে কীভাবে দুঃখ-কষ্ট ও হতাশার হাত থেকে মুক্ত করা যায়। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে যে কঠোর কৃচ্ছ সাধনার মাধ্যমে দুঃখের হাত থেকে মুক্তির পথের সন্ধান করেছেন তার তুলনা নিনি নিজেই। নিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি হিন্দু ধর্মের বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন দীর্ঘ ৪৫ বছর। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য ও শুদ্রের বিভাজন তিনি মানতেন না। সব বর্ণের মানুষকে তিনি সমান দৃষ্টিতে দেখতেন এবং সমভাবে শ্রদ্ধা করতেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সমাজে সার্বজনীনরূপে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। এখন থেকে অড়াই হাজার বছর আগে এ ধরণের উদ্যোগ যে কত বড় মাপের তা কেবলমাত্র ইতিহাসবিদ এবং সমাজতত্ত্ববিদরাই অনুধাবন করতে পারবেন। পাশ্চাত্যের অনেকে দাবী করেন যে, দর্শনের উৎপত্তি হয়েছে গ্রীসে। কিন্তু এ কথা সথ্য নয়। গ্রীসের প্রথম দার্শনিক থেলিসের জন্মের বহু আগেই গৌতম বুদ্ধের দর্শন এ দেশকে আলোড়িত করেছিল। আজ পাশ্চাত্যের দেশগুলো অস্তিত্ববাদ (-------) যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ (---------), প্রয়োগ বাদ (----) ইত্যাদি সমকালীন দার্শনিক সম্প্রদায় নিয় গর্ববোধ করে। কিন্তু তারা জানেনা এবং আমরাও অনেকে জানি না যে এ সমস্ত দর্শনের জন্ম বিগত একশত বছরে পাশ্চাত্যে হয়নি। এ জাতীয় দর্শনের উদ্ভব ঘটেছে আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধের হাতে। পাশ্চাত্যে অস্তিত্ববাদের উদ্ভব হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। এ দর্শনের মূল কথা হলো পৃথিবীর মানুষ দুঃখ কষ্ট বেদনার জ্বালায় অতিষ্ঠ।তাদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। কাজেই আমাদের চিন্তা-চেতনা-জ্ঞান সাধনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কী করে দুঃখের হাত থেকে বাঁচতে পারি। গত শতাব্দিতে পাশ্চাত্যের অস্তিত্ববাদী দার্শনিকগণ যে বক্তব্য উপস্থাপন করে পৃথিবীময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন সে বক্তব্যই আরও সহজ এবং সরল করে বলে গেছেন গৌতম বুদ্ধ আড়াই হাজার বছর আগে। তাই অবশ্যই বলতে হবে, তিনি অস্তিত্ববাদী দর্শনের জনক। যৌক্তি প্রত্যক্ষবাদ দর্শনের ইতিহাসে বিপ্লব এনেসে। এ সম্প্রদায়ের দার্শনিকগণ অধিবিদ্যার বিরুদ্ধে ঘোষণা করে, অধিবিদ্যাকে দর্শনের আলোচনার বাইরে ঠেলে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য হলো যা যাচাইযোগ্য নয় তা-ই অর্থহীন। আর এ কারণেই তারা ঈশ্বর, আত্না, মরণোত্তর জীবন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনাকে অর্থহীন বলেছেন। কিন্তু পাশ্চাত্যে যোক্তিক প্রত্যক্ষবাদীরা যে কথা বলে সমকালীন বিশ্বে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন সে কথাই গৌতম বুদ্ধ অনেক আগে বলে গেছেন। তিনি অধিবিদ্যা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দেয়া থেকে বিরত থাকতেন। কারণ এ সমস্ত বিষয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া যায় না। তাই এ বিষয় সর্ম্পকে আলোচনাকে তিনি বলেছেন অর্থহীন। আর এ করণে সার্বিক মূল্যায়নের পর এ কথা অনস্বীকার্য যে তিনিওই যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদেরও জনক। প্রয়োগবাদ্দী দর্শন মূলতঃ সমকালীন আমেরিকান দার্শনিকদের অবদান বলে মনে করা হয়। এ দর্শনের মূলমন্ত্র হলো যা কাজে লাগে অর্থাৎ যার উপযোগিতা আছে তাই অর্থপূর্ণ বা তাৎপর্যপূর্ণ।যার ব্যহারিক মুল্য নেই বা উপকারে আসে না তা নিয়ে ভাবা বা আলোচনা করা নিরর্থক। প্রয়োগবাদীদের শিক্ষা দর্শন বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সাদরে গ্ররহীত হয়েছে। এই দর্শনের যে প্রধান কথা তা হলো প্রয়োজনীয়তা বা ব্যবহারিক মূল্য বা উপযোগিতা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, গৌতম বুদ্ধ মনব ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি যিনি চিন্তা-চেতনা জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে উপযোগিতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। আর সে কারণে সার্বিক মূল্যায়নের পর নিঃসন্দেহে এবং নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনিই প্রয়োগবাদী জীবন দর্শনের জনক। জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের মতে বৌদ্ধ ধর্ম হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এখানে বলা প্রয়োজন যে, গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা দ্বারা নিতি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কতিপয় বিষয়ে তাদের দর্শন অ অভিন্ন। তাঁরা উভয়েই মনে করেন যে, এ জগৎ দুঃখে পরিপূর্ণ এবং আমরা সবাই দুঃখের সাগরে ভাসছি। শোপেনহাওয়ার বলেন যে, “হতে চাওয়া” “বাঁচতে চাওয়া” ইত্যাদি হচ্ছে দুঃখের মূলে। গৌতম বুদ্ধও কামনা বাসনাকেই সমস্ত দুঃখের কারণ বলে মনে করতেন। তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের কামনা বাসনার শেষ নেই সেহেতু আমাদের দুঃখের শেষ নেই। শোপেনহাওয়ার বলেন, আমাদের সাধ অনন্ত তাই দুঃখও অনন্ত। তাঁরা উভয়েই মনে করেন যে মৃত্যু আমাদের দুঃখের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন না, মৃত্যু দুঃখের ব্যাপারে কোন সমাধান নয়। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষাকে শোপেনহাওয়ারের কাছে অন্য যে কোন ধর্মীয় নেতার শিক্ষার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ এবং মানবাজাতির কল্যাণের জন্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে আর সে কারনে খ্রিস্টান ঘরে জন্মগ্রহণ করে এবং খ্রিস্ট পরিবেশে বড় হবার পরও তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বৌদ্ধ ধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো দার্শনিকও ছিলেন গৌতম বুদ্ধের প্রতি একান্ত শ্রদ্ধাশীল। জীবনের শেষ পর্যায়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি অপকটে স্বীকার করেন যে, পৃথিবীর অন্য যে কোন ধর্মের তুলনায় তিনি বৌদ্ধ দর্শনকে অধিক পছন্দ করেন। তবে বৌদ্ধ ধর্মের শুরুতে যে শিক্ষা প্রচলিত ছিল কেবলমাত্র সেটাকেই তিনি ভালবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর মতো এই নিবন্ধকারও মনে করেন যে, বৌদ্ধ ধর্মের প্রাথমিক স্তরেই গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ছিল অবিকৃত। আজ ২৫৫৭ বুদ্ধাব্দের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রার্থনা হোক, গৌতম বুদ্ধের মুল ও অবিকৃত শিক্ষার নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং বুদ্ধবাণী সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করুক। লেখক পরিচিতিঃ ড. কাজী নূরুল ইসলাম, প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, বিশ্ব ধর্ম বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Result List
Result Search
S.S.C Result
J.S.C Result
P.S.C Result
Contact

Cantonment English School & College
Bayzid Bostami,Chittagong- 4210..
Telephone: 031-682666, 031-681551, Ext: 3172
E-mail: cescctg05@gmail.com



E-mail
Subscriber
© 2011-2017 CESC | About TSMTS | Contact Us | Powered By: TSMTS

Happiness.

happiness are people who know of impermanency ~

they know that riches ~ fame ~ holding high ranking posts ~ possessions of all resources are just gold coated ~
~ they would fade and crumble ~ parting them but they bear no misery ~

whatever they possess ~ 
they have no attachment to them ~
they are willing to lose or lost them without remorse ~
they have no greed desires to crave for more ~

to those who are in the state of being very poor ~
surviving with bread and water ~ plain rice with a little vegetables ~
and in a shelther when rain water leaks through whenever it pours ~
but they never complain ~

they harbour no sadness or bitterness ~
they know in minds that such occurrences would pass any second ~

whether rich or poor ~
when they are very sick and weak in bed ~
they never feel sad or depress ~
they know that sickness strikes and go so as their weakness would too disappear ~

when any people request for their hands ~
they wont hesitate and go with grace ~
even toil a whloe day ~
they wont accept anything except • thank you •
and also • thanks • them for giving them a chance to serve them ~
for their pledge is ~
• born to serve not to be served •
they would never think of themselves as • helpfulness • but call it • happiness •

the moment when they are going to die ~
they are able to let go everything ~
then bravely • they face dead ~
for they know that any fruit ripes too long must fall ~
thus they accept dead gracefully ~
then die peacefully and happily ~

The Lord Buddha says ☆ such people would definitely rebirth in a very happy and perfectly wonderful realm ☆

বুদ্ধ দর্শন।

গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীদের অন্যতম। অনেকেই  তাঁকে প্রচলিত অর্থে দার্শনিক বলতে নারাজ। কারণ তিনি দার্শনিক আলোচনা থেকে শুধু বিরতই থাকেননি, বরং সেগুলোকে অহেতুক এবং সময়ের অপচয়  বলে মনে করতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘যে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে না তা নিয়ে আলোচনা অর্থহীন।‘ কিন্তু এটাই যে একটা বড় দর্শন, বর্তমান শতাব্দীর যেক্তিক প্রত্যক্ষবাদীদের (logical positivist) তত্তবিদ্যাবিরোধী বক্তব্য থেকে তা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।
গৌতম বুদ্ধের চারটি আর্য সত্যের(চতুরার্য সত্য) সব কটিই দু:খকে কেন্দ্র করে। তাঁর শিক্ষা ও দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে কীভাবে দু:খের হাত থেকে বাঁচানো যায়। গৌতম বুদ্ধ দু:খের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাননি, তিনি দু:খকে জয় করতে চেয়েছেন। দু:খের হাত থেকে বাঁচার জন্য গৌতম বুদ্ধ কারও কাছে সাহায্য না চেয়ে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও সংযমের মাধ্যমে দু:খের হাত থেকে অব্যাহতি লাভের চেষ্টা করেছেন। জগতে দু:খের কথা শুধু গৌতম বুদ্ধ একাই বলেননি, বিভিন্ন উপনিষদে দু:খ সম্পর্কে অনেক আলোচনা আছে। সাংখ্য দর্শনের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ সাংখ্যকারিকার প্রথম সূত্রই ত্রিবিদ দু:খ নিয়ে শুরু করেছে। ভারতীয় দর্শনের  একমাত্র চার্বাক সম্প্রদায় ছাড়া আস্তিক ও নাস্তিক সব কটি দার্শনিক সম্প্রদায়ই দু:খ নিয়ে আলোচনা করেছে এবং এর হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করাকেই জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য বলে মনে করেছে। তবে প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের কোন দার্শনিকই গৌতম বুদ্ধের মত এত গভীরভাবে এবং যোক্তিকতার সঙ্গে দু:খ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেননি।
গৌতম বুদ্ধের শিক্ষার সঠিক মূল্যায়নের জন্য পাশ্চাত্য দার্শনিকদের মধ্যে শোপেন হাওয়ার (Schopen Hauer), নিটশে (Nietzsche), কিয়ের্কেগার্ড (Kierkegaard) প্রমুখ সম্পর্কে কী বলেছেন তার সঙ্গে তুলনা করে দেখতে পারি।
শোপেন হাওয়ার একজন দু:খবাদী দার্শনিক। তাঁকে অনেকেই‍‍‍ “Prince of Pessimism” বলেন। তাঁর মতে, এ জগত দু:খের আলয়। দু:খই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য। সুখ অকল্পনীয় ও অসম্ভব বস্তু। যতই আমাদের জ্ঞান বাড়ে, ততই আমাদের দু:খ বাড়ে। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ দু:খের কথা বললেও আশার বাণী শুনিয়েছেন, বাঁচার পথ দেখিয়েছেন। শোপেন হাওয়ার বৌদ্ধধর্মকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম মনে করলেও বুদ্ধের মূল শিক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে আছেন। বুদ্ধের শিক্ষা আমাদের আশার আলো দেখায়, আর শোপেন হাওয়ার তাঁর সামনে পর্দা টেনে আমাদের হতাশার অন্ধকারে ঠেলে দেন।
শোপেন হাওয়ার জ্ঞানকে সুখের অন্তরায় হিসেবে দেখেছেন। অথচ সব দর্শন ও ধর্ম জ্ঞানকে মুক্তির একমাত্র উপায় বা অন্যতম উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এমনকি মীমাংসা দর্শনে যেখানে যাগযজ্ঞ ও উপাসনার প্রাধান্য বা বৈঞ্চব দর্শনে যেখানে ভক্তিতেই মুক্তির কথা বলা হয়েছে, সেখানেও জ্ঞানকে উপেক্ষা করা হয়নি। বরং জ্ঞানই যে মুক্তির মূলে তা স্বীকার করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মেও জ্ঞানকে মুক্তির পথ হিসেবে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তাই গৌতম বুদ্ধের সম্যক জ্ঞানের উপর জোর দেওয়া যে কতটুকু সংগত তা সহজেই অনুমেয়।
নিটশেও দু:খ নিয়ে আলোচনা করেছেন । তবে তাঁর বক্তব্য আরও ভিন্নতর। তিনি প্রথম জীবনে শোপেন হাওয়ার দ্বারা প্রভাবিত হলেও পরে সে প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। সে যাই হোক তিনি মায়া-মমতা, দয়া-সহানুভূতি ইত্যাদিকে অনেক ছোট করে দেখিয়েছেন। তাঁর কাছে মানবিক গুণের চেয়ে শক্তির গুরুত্ব বেশী। তিনি বলেন, উচ্চতর সম্প্রদায়ের স্বার্থে নিম্নতর সম্প্রদায়ের ধ্বংস হওয়া উচিত। গৌতম বুদ্ধের দর্শন ঠিক এর বিপরীত। তাঁর শিক্ষা ভালোবাসা আর দয়ার কথায় পূর্ণ। তাঁর কাছে ছোট-বড় কেউ নেই। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য ও শূদ্র- এই শ্রেণী বিভাগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, জন্মগত কারণে মানুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। তাই নিটশের দর্শনের মতো উচ্চতর শ্রেণী বা সম্প্রদায়ের স্বার্থে নিম্নতর শ্রেণী বা সম্প্রদায়ের ধ্বংস বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনে অকল্পনীয়। কিয়ের্কেগার্ডও বুদ্ধের মত তত্ত্ববিদ্যায় উৎসাহী ছিলেন না এবং তাঁরও মূল লক্ষ্য মানুষের নৈতিক দিকটা। তিনিও বুদ্ধের মতো বলেছেন, কামনা-বাসনাই দু:খ আনে। তবে তাঁর এ ব্যাখ্যা ঈশ্বরকেন্দ্রিক, কিন্তু বুদ্ধের ব্যাখ্যায় ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। বুদ্ধের মতো কিয়ের্কেগার্ড বাসনার উর্দ্ধে যেতে চান না। কারণ তিনি মনে করেন, বাসনা ত্যাগ বৌদ্ধিক আত্মহত্যার শমিল। কামনা মূলত: দুই প্রকারের : স্বার্থপর কামনা এবং পরমার্থ কামনা। স্বার্থপর কামনাকে বাদ না দিলে কিয়ের্কেগার্ডের কাম্য মুক্তি (salvation) লাভ সম্ভব নয়। তাই তাঁর চেয়ে বুদ্ধের বত্তব্যই অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
আগই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রত্যকটি দু:খের জন্য ব্যক্তি নিজেই দায়ী, অন্য কেউ নয়।আরব দেশের এক কবি বলেছিলেন, ‘মারা যাওয়ার পর তাঁর কবরের ওপর যেন লিখে রাখা হয় যে, তাঁর পাপের জন্য তাঁর বাপ দায়ী। কারণ তাঁর বাপ না থাকলে তাঁর জন্ম হতো না এবং জন্ম না হলে তিনি পাপ করতেন না ।‘ কিন্তু বুদ্ধ কখনোই উদোরপিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাননি। তাঁর মতে, আমার দু:খ আমারই সৃষ্টি। শুধু দু:খ নয়, এমনকি আমাদের জন্মের জন্যও আমরাই দায়ী। জন্মলাভের বাসনা থেকেই আমাদের জন্ম হয়েছে।
প্রয়োগবাদ (Pragmatism) সম্প্রতিক কালের আর একটি দর্শন। এ দর্শনের মূল বক্তব্য হলো, যা কাজে লাগে এবং যা প্রয়োজনীয় ত-ই সত্য, তা-ই আলোচ্য ও বিবেচ্য হওয়া উচিত। সম্ভবত গৌতম বুদ্ধই প্রয়োগবাদেরও পুরোধা। মালুক্য পুত্রের তত্ত্ববিদ্যা বিষয়ক প্রশ্নের জবাবে তিনি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, কেউ যদি তীর বিদ্ধ হয় তাহলে কী তার প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত? যেহেতু সে কষ্ট পাচ্ছে, সেহেতু সে প্রথমে তীরটা খুলবে। এর আগে সে নিশ্চয়ই ভাববে না, তীরটা কী গতিতে এল, তীরটা কে মারল, তীরটা কীসের তৈরী। তাই আমরা যেহেতু দু:খের সাগরে ভাসছি, আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত এই দু:খের হাত থেকে কিভাবে বাঁচা যায় তার চেষ্টা করা। বুদ্ধের মতে, আমাদের কাছে এর চেয়ে বড় সত্য আর নেই।
সমকালীন দর্শনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ (Logical positivism) । এ মত অনুসারে principle of verification বা পরখনীতি হচ্ছে সত্যের মানদন্ড। যে বাক্যকে পরখ করা যায় না তা অর্থহীন। তাঁদের মতে, তত্ত্ববিদ্যাবিষয়ক অবধারণ এই পরখনীতির আওতায় পড়ে না। তাই এরা অর্থহীন। গৌতম বুদ্ধ পরখনীতির উল্লেখ না করলেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তত্ত্ববিদ্যায় আলোচ্য বক্তব্য প্রমাণও করা যায় না আবার অপ্রমাণও করা যায় না। গৌতম বুদ্ধ সর্বপ্রকার চরম মত ও পথের বিরোধী ছিলেন। সম্ভবত এটা তাঁর ব্যক্তি জীবনেরই অভিজ্ঞতার ফল। তিনি মধ্যমা প্রতিপদ বা মধ্যম পথকেই উত্তম পথ বলে স্বীকার করেছেন। অ্যারিস্টটল যে Golden Mean এর কথা বলেছেন তা তাঁর ২০০বছর আগে গৌতম বুদ্ধই বলে গেছেন। বস্তুত বুদ্ধের মধ্যমা প্রতিপদ ও অ্যারিস্টটলের Golden Mean এর মধ্যে পার্থক্য নিরূপন করা কঠিন।
অনেক পন্ডিত ব্যক্তি বৌদ্ধধর্মকে হিন্দুধর্মের আর একটি শাখা বলে মনে করেন। কেউ আবার মনে করেন, বৌদ্ধধর্মের মধ্যেই হিন্দুধর্ম পূণর্তা লাভ করেছে। যেমন, স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর শিকাগো বক্তৃতায় বলেছেন, ‍’ Buddhism is the fulfillment of Hinduism.’ অনেকে আবার বৌদ্ধধর্মের সাথে খ্রীষ্ট ধর্মের মিল খুজেঁ পেয়ে এদের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্বন্ধ আছে কিনা তা খুঁজতে চান। ড. বেণী মাধব বড়ুয়া বলেন, ‘ইহা নিশ্চিত যে, শুধু বাইবেলের পূরাকল্পে বর্ণিত প্রফেটগণের জীবন ও বাণীর ঐতিহাসিক ধারা দ্বারা যীশুখ্রীষ্টের জীবন ও বাণী ব্যাখ্যাত হয় না। ঐ ধারার সহিত অপর এক ধারার মণিকাঞ্চন সহযোগ আবশ্যক। অপর ধারা খুঁজিতে গেলে বাধ্য হইয়া ভারতের আর্য সংষ্কৃতির বৌদ্ধ ধারায় আশ্রয় লইতে হয়। বুদ্ধ ব্যবহৃত উপমাগুলি এবং যিশু খ্রীষ্টের প্যারাবেলস –এর মধ্যে সাদৃশ্য এত ঘনিষ্ঠ যে, তাহা শুধু chance coincidence বলে যেন সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। যেমন বুদ্ধের উপমাগুলি ভারতের পূর্ববর্তী সাহিত্যে পাওয়া যায় না তেমন যীশুর প্যারাবেলস বাইবেলের পূরাভাগে পাওয়া যায় না।‘ ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার সংঙ্গে সম্পূর্ণ একমত না হয়েও অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা যায়, গৌতম বুদ্ধ ও যীশু খ্রিষ্টের শিক্ষার মিল আমাদের চিন্তাকে নাড়া না দিয়ে পারে না। আমার জানা মতে পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত এমন কোন মনীষীর আবির্ভাব ঘটেনি যিনি গৌতম বুদ্ধের মতো একাধারে নৈতিক শিক্ষার প্রবক্তা ও সমাজ সংষ্কারক এবং যার দর্শনকে অস্তিত্ববাদ, প্রয়োগবাদ ও যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সব ধর্মের শিক্ষিত প্রবক্তাদের কাছে তিনি সমাদৃত এবং এ বিষয়ে তিনি সত্যিই অনন্য। রাজত্বের লোভ ত্যাগ করে তিনি সত্যের সন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন। আজ তাই কোটি কোটি মানুষের হৃদয়সিংহাসনে তিনি সমাসীন।
সূত্র : ইসলাম, কাজী নূরুল। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শন । দৈনিক প্রথমআলো, সোমবার, ১৯ মে ২০০৮খ্রী:, পৃষ্ঠা-৮ (প্রজ্ঞাদর্পন ব্লগ কর্তৃক পুন:র্মুদ্রিত)

পার্বত্য চট্টগ্রামে থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের পুন:জাগরণে মহান ভিক্ষুসংঘের ভূমিকা।


- ড. জিনবোধি ভিক্ষু
সুচনা ঃ ইতিহাস হচ্ছে যে কোন জাতি-গোষ্ঠির অতীত কথা। অতীতের ধারাবাহিক ঘটনা প্রবাহ, ইতিবাচক-নেতিবাচক-ইতিকথা- যার ভিত্তি ভূমিতে দাঁড়িয়ে বর্তমানের নির্মাণ । কোন মহান জাতি ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থায় সুনিয়ন্ত্রিত আচার, অনুশীলন প্রবর্তিত করেছিল, ইতিহাস তারই কাহিনীর উজ্জ্বল প্রকাশ । ইতিহাস নিজ সৃষ্টি মহিমায় মহিমাম্বিত এবং অতীতের গৌবরে গৌববান্বিত এক সত্যের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত । ইতিহাস এবং ঐতিহ্য জাতির চলার পথ প্রর্দশক এবং ভবিষ্যতে অতীতের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি জাতির শুভ সঙ্গীরুপে হুশীয়ারী সংক্ষেতের ধারক ও বাহক । যে সকল জ্ঞানী ও গুণীজনেরা জাতির মুক্তি সাধনে আত্মত্যাগী, মানব সভ্যতার বিকাশে ও শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসারে আমরণ সংগ্রাম করে গিয়েছে, তাঁদের লক্ষ্য অর্জনের কাহিনী ইতিহাসের পাতায় স্বণাক্ষরে লেখা থাকবে। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌমত্ব গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ একটি দেশ। বাংলাভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা নামে স্বীকৃত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপ-ভাষা রয়েছে । দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ও ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সংযোগ স্থল হল ‘বাংলাদেশ’। বিশ্বের প্রধান চার ধর্মাবলম্বী বৌদ্ধ, মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টানের বসবাস এই ‘বাংলাদেশে’। বৌদ্ধরা এদেশের আদি অধিবাসী । এই দেশের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশেষতঃ প্রাচীন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন বিবর্তনে বৌদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম যুগ যুগ ধরে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে এখনও সেই ধারা অব্যাহত আছে । বৌদ্ধ মূলতঃ শান্তপ্রিয় জাতি। সম্প্রীতিতে সহাবস্থান তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য । কালের বিবর্তনে যদিও নানা উত্থান-পতন হয়েছে তাতেও তারা প্রাচীন সংস্কারগত কারণে বিশেষতঃ বুদ্ধ ও তাঁর নৈতিকতাকে অন্তরে ধারণ করে মৈত্রী চেতনা, সাম্যভাব সর্বোপরি অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী । বৌদ্ধজনগণ এদেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করে আসতেছে । বাংলাদেশের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি চারটি ভাগে বিভাজন করা হয়েছে। যথা-
১. সমতলীয় বাঙ্গালি বৌদ্ধ ।
২. পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী বা পাহাড়ি বৌদ্ধ ।
৩. সমতলীয় রাখাইন বৌদ্ধ এবং
৪. উত্তবঙ্গের ওরাঁও আদিবাসী বৌদ্ধ ।
এই সকল বৌদ্ধদের মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে আদিবাসী বা পাহাড়ি বৌদ্ধরা সর্বাধিক । বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের চট্টগ্রামে, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা সমূহের এদের বসতি ইদানিং উত্তরবঙ্গের ওরাঁও আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি হিসেবে আত্ম প্রকাশ করতে শুরু করেছে । প্রাচীন বিকৃতি বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করে বুদ্ধের মৌলিক নীতি থেরবাদী ধর্মে দীক্ষিত হয়ে পুনজাগরণের ধারাকে ধারণ করে চলেছে এটা আরেকটি শুভ লক্ষণ বলা যায় । বৌদ্ধরা সংখ্যায় স্বল্প হলেও সমগ্র বিশ্ববৌদ্ধ ধর্মদর্শন ও সভ্যতার ইতিহাসে যুগান্তকারী মাইল স্টোন সৃষ্টিকারী বৌদ্ধরাই উত্তরাধিকারী ।
রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিনটি পার্বত্য জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত । এই তিনটি পার্বত্য জেলার দশ ভাষা-ভাষী ১৩টি জুম্ম বা পাহাড়িদের বসবাস ; এগুলি হলো- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো বা মুরং, বম, খুমী, খ্যায়ং, রাখাইন, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই বা কুকি, রিয়াং, উসুই বা পাংখোয়া।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি নয় উপজাতি নামে স্বীকৃত । এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা গুলো নৃ-তাত্বিক বিচারে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠির অর্ন্তভূক্ত । এ প্রসঙ্গে প্রফেসর বেসইনে পিয়ের বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উপজাতীয় লোকেরা মানব জাতিতত্ত্বের দিক থেকে পূর্ব পাকিস্থানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অন্যান্য স্থায়ী বাসিন্দাদের থেকে আলাদা । এদের সাদৃশ রয়েছে তিব্বত থেকে ইন্দোচীন পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের পাহাড়িয়া লোকদের সঙ্গে । এরা খর্বকায় এদের গায়ের হাড় উন্নত, মাথার চুল কালো, ছোট চোখ সর্বোপরি শারীরিক গঠন ও আকৃতির দিক থেকে এঁরা মঙ্গোলীয় জাতির বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে (পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি প্রফেসর পিয়ের বেসেইনে অনুবাদ : অধ্যাপিকা সুপিয়া খান, বাংলা একাডেমী ঢাকা - ১৯৯৬,পৃ: ২)।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এক একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠির উৎপত্তি, বিকাশ, ভাষা, সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির ইতিহাস অন্য আদিবাসীর জাতিসত্তা থেকে ভিন্ন স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সমুজ্জ্বল । অতীব গৌরবের বিষয় হলো- তিন পার্বত্য জেলায় তিনজন রাজা বিদ্যমান । যথাক্রমে- (১) চাকমা রাজা, (২) বোমাং রাজা এবং (৩) মং রাজা । তাঁদের জন্য আলাদা আলাদা এলাকা রয়েছে । তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী (৪৮.২০%) বাঙ্গালি বাদে উপজাতির মধ্যে সংখ্যা চাকমা সর্ববৃহৎ (২৮.৭৫%), দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে মারমা (১৪.৭১%) ও ত্রিপুরা (৬.৩২%) জনগোষ্ঠী। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতি ও বাঙ্গালির অনুপাত ৯৩.৭ । কিন্তু ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে আদমশুমারি রিপোর্ট মতে, উপজাতি বাঙ্গালি অনুপাত হলো ৫১.৮৯, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাংখোয়া ভাষা ও সাহিত্যে সাওন ফরিদ, এইচ,এস,ডি, ও রাঙ্গামাটি,২০০৬ (পৃঃ ২৩-২৪) । আয়তন হলো- ১৩,২৯৫ বর্গ কিলোমিটার (৫০৮৯ বর্গ মাইল), আদিবাসী জনগোষ্ঠি গুলোর মধ্যে- চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, খ্যাং, মুরুং বা ম্ররাে সবাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং ত্রিপুরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী তবে কিছু কিছু ত্রিপুরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী । খুকি, পাংখোয়া, লুসাই, রিয়াং সহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠির জনগণ প্রকৃতি পুজারী বা সর্ব প্রানবাদে বিশ্বাসী, এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির জনগণের মধ্যে অনেকে বর্তমানে খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী । তবে অতীতের তুলনায় বৌদ্ধধর্মের প্রতি প্রবল অনুরাগ শ্রদ্ধা, ভক্তি, ধ্যান-সাধনার অনুশীলন শাস্ত্রচর্চা, দানীয় প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক আকার ধারণ করেছে নির্দ্ধিধায় বলা যায় । এ ব্যাপারে আত্মত্যাগী আধ্যাত্মিক ধ্যান-সাধনায়রত এবং বুদ্ধের ত্রিপিটক শাস্ত্রে পারঙ্গম মহান ভিক্ষুসঙ্ঘের অবদান রয়েছে বেশি । এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন । বুদ্ধের সমসাময়িক এবং পরবর্তীকালে দেশে-বিদেশে বৌদ্ধ ধর্মের এত প্রসার তার মূলে প্রাজ্ঞ শাস্ত্রজ্ঞা ও সাধক ভিক্ষু-সংঘের ভূমিকা মূখ্য ছিল এবং আছে । এ প্রসঙ্গে কিঞ্চিৎ ধারণা দেয়া হলোঃ
এ সকল আধিবাসীদের জীবন-জীবিকার হাতিয়ার হলো প্রধাণত জুম চাষ । জুম চাষের দ্বারা অর্থ নৈতিক চাহিদা পূরণ এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অভাব-অনটন ঘুছানোর জন্য আপ্রাণ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন । পঞ্চাশের দশক থেকে কিছুটা চাকুরি ও ব্যবসা বাণিজ্যের সাথেও সম্পৃক্ত হওয়ায় অনেকটা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্যতা দেখা যায় । তাও চাহিদা অনুসারে অত্যন্ত অপ্রতুল । বর্তমানে ব্যাপকতা বেড়েছে বলা যায় । শিক্ষার হার খুবই কম, বর্তমান সরকারের পরিকল্পনানুসারে অনেকটা এগিয়ে অর্থ নৈতিকভাবে এখনও দুর্বল, বাস্তবতায় না দেখলে সঠিকভাবে তথ্য উপস্থাপন করা কঠিন । নিজস্ব সংস্কৃতি ও কৃষ্টি লালনে-পালনে-রক্ষণে খুবই সচেতন এবং আন্তরিক । খাদ্য দ্রব্যের কোন পরিবর্তন বা সংস্কার নেই নাপ্পি বা ছিদোল (এক প্রকার Shrimp Paste) অন্যতম প্রিয় খাদ্যের উপাদান, মদ্যপান (ঘরে তৈরী) নানা উৎসব অনুষ্ঠানের অপরিহার্য ও স্বীকৃত বিষয় । পরিবারের মেয়েরা তাঁতের কাপড় বোনে, মেয়েরা জাতি ভেদে পিনোন, থামি, খাদি, ব্লাউজ এবং পুরুষেরা লুঙ্গি, ফতুয়া, শার্ট ইত্যাদি পরিধান করে । সাধারণত মাচাং ঘরে বসবাস ইদানিং কিছু কিছু পাকা ও মাটির ঘর নির্মাণ করে বসবাস করতে দেখা যায় । বেশির ভাগ মাচাং ঘরেই তাঁদের বসবাস ।
ধর্মীয় রীতি-নীতি অতীতের কিছুটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মান্ধতা থাকলেও বর্তমান থেরবাদ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে প্রায় বুদ্ধের প্রকৃত ধর্ম বিষয়ে আগ্রহশীল । বিভেদ নেই। রাজমাতা কালিন্দী রাণীর ভাবাদর্শকে মনে প্রাণে গ্রহণ করেছে এবং ভিক্ষুসংঘের আদেশ নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করে থাকে। বড়ুয়া বৌদ্ধরা শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত বলে দাবী করলেও মূলতঃ বুদ্ধের রীতি-নিয়মের প্রতি তেমন শ্রদ্ধাশীল নন । তাদের ভিক্ষুসংঘের মধ্যে বুদ্ধের ধর্ম-বিনয়ের প্রতি বিরোধ নেই। যদিও ধ্যানী ভিক্ষু ও কর্মী ভিক্ষুদের কিছু দুরত্ব দেখা যায় । ইদানিং তাও কমে এসছে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে সবার অংশ গ্রহন দেখা যায় । বাঙ্গালি বৌদ্ধদের মধ্যে যথেষ্ট সংস্কার হলেও অথেরবাদীগণ বর্তমান থেরবাদী বলে জোর গলায় জনসমাজে প্রকাশ করে চলেছে এটাই দুর্ভাগ্য । বর্তমান উচ্চ শিক্ষিত ভিক্ষু গৃহীদের মধ্যেও সেই মানসিক দেখা যায় । পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের মধ্যে তা নেই বরং মারমা ও চাকমা ভিক্ষু সংঘের ভেতরে থেরবাদ ধর্মের প্রতি কঠোর ব্রতপালনের প্রতি একাগ্রতা বেশী বলা যায় । এটা অত্যন্ত শুভ লক্ষণ । ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ যেভাবে দৃষ্টিনন্দন, শৈল্পিক, কারুকার্য খচিত হচ্ছে বৌদ্ধিক চিন্তা-চেতনায় তৈরী হয়েছে এবং হচ্ছে তা অভূতপূর্ব এবং সার্বজনীন ভাবে গ্রহণ যোগ্যতা লাভ করেছে । আমি তজ্জন্য সাধুবাদ জানাই । স্ব-জাতি, স্ব-সংস্কৃতি এবং স্বজাতির ছেলে-মেয়েদের উন্নত করার জন্য মহান ভিক্ষুসংঘ অসাধারণ অবদান রেখে চলেছে যা দেশে-বিদেশে প্রশংসনীয় এবং পরিব্যাপ্ত ।
১৮৬০খ্রিষ্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বতন্ত্র জেলা পরিণত হওয়াতে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা প্রত্যক্ষ ভাবে ইংরেজ শাসনাধীন চলে যায় । ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের সময় এই জেলা পূর্বপাকিস্থানের অর্ন্তভূক্ত হয় এবং ১৯৭১ খ্রিষ্ঠাব্দে স্বাধীনতার বাংলাদেশ অভ্যূত্থানের সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি জেলা হিসেবে অর্ন্তভূক্ত হয় ।
বলা বাহুল্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভাষা-ভাষী জাতি সত্ত্বাদের মধ্যে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, খিয়াং, ও বড়ুয়া ইত্যাদি সম্প্রদায়ের লোকেরাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হিসেবে পরিচিত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে ভূক্ত এই জাতিসত্ত্বার লোকগুলি বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস করে আসছে । চট্টগ্রামের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্ম্পক বহু প্রাচীন । চট্টগ্রাম ছিল আরাকান, ত্রিপুরা ও বাংলার রাজশক্তির শক্তি পরীক্ষা কেন্দ্ র। এই রণক্ষেত্রে ইউরোপ থেকে আগত পর্তুগীজ বণিকেরাও অংশ গ্রহণ করেছিল । প্রাথমিক যুগে আরাকান রাজশক্তি দক্ষিণের শঙ্ক নদী অতিক্রম করে । পরবর্তীতে মোগলেরা চট্টগ্রাম দখল করে নেয় । এই ভাবে বিভিন্ন সময়ে রাজশক্তির হাত বদল হয়ে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম ইংরেজদের করায়ত্ত হয় । আরো উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম একটি ঐতিহ্যবাহী থানার নাম রাঙ্গুনীরা । রাঙ্গুনীয়া শব্দটি বাংলা নয় । প্রাচীন বার্মার রাজধানী রেঙ্গুন এর সাথে তার উচ্চারণগত সাদৃশ্য রয়েছে । বার্মা বৌদ্ধ রাজ্য । রাঙ্গুনীয়াও বৌদ্ধ রাজ্য ছিল। এ প্রসঙ্গে আহাম্মদ হাসানের লেখা প্রণিধাণ যোগ্য । রাঙ্গুনীয়ার চাকমা রাজাদের আদি পুরুষদের শেরমুস্ত খাঁ ১৭৩৭ খ্রিঃ তিনি বর্তমান বান্দরবান জেলা আলীকদমে রাজত্ব করতেন । জাতে চাকমা হলেও তিনি মারমা রাজাদের মত মোগল সংস্কৃতির অনুরাগী ছিলেন বলে মনে হয় । স্বধর্মীয় আরাকান রাজাদের সামরিক চাপে অতিষ্ট হয়ে তিনি মোগদের সাথে মিত্রতা করেন । ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সুবাদার শাহসুজা আরাকান রাজার হাতে নিহত হলে মোগল-মারমা শত্রুতার সুযোগে তিনি নিরুপদ্রবে রাজত্ব করেন । তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পালক পুত্র শুকদেব ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজা হন । পলাশী যুদ্ধের পর মোগল ছত্র ছায়ার অবসানে তিনি চাকমা অধ্যুষিত রাঙ্গুনীয়ার পদুয়ার রাজধানী স্থানান্তরিত করে নিজেদের নামানুসারে শুকবিলাস নাম দেন । ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে নবাব মীরকাশিম ইংরেজদের হাতে চট্টগ্রামের শাসনভার অর্পণ করলেও শুকদেব রাঙ্গুনীয়ায় স্বাধীন রাজা ছিলেন । ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে শুকদেব রাজা মৃত্যুর পর শের দৌলত খাঁ রাঙ্গুনীয়ার রাজা হন । তিনিও রাঙ্গুনীয়ার স্বাধীন রাজা ছিলেন । ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দে শের দৌলত খাঁর মৃত্যৃর পর তাঁর পুত্র জান বক্স খাঁ রাঙ্গনীয়ার রাজা হন । ইংরেজদের আক্রমণের সময় ইছামতির মোহনায় বৃটিশ নৌ-অবরোধের মূখে সেনাপতি রানু দেওয়ান অাত্মসর্মপন করেন । ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজা জান বক্স খাঁ গর্ভণর ওয়ারেন হেস্টিংসের ক্ষমা লাভ করে ইংরেজদের বশ্যতা স্বীকার করেন (মি: কন্টিনের রেভেনিই হিস্টি দ্রস্টব্য)।
এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে রাজা জান বক্স খাঁ শুকবিলাস থেকে উত্তর রাঙ্গুনীয়ায় রাজধানী সরিয়ে নিয়ে রাজানগর নামককরণ করেন । ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পুত্র টব্বর খাঁ রাঙ্গুনীয়ার রাজা হন । ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে রাজা ধরম বক্সের খাঁর মৃত্যুর পরে ১২ বছর সুখলাল দেওয়ান রাজ্যের দেখাশুনা করেন । ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ধরম বক্সের বড়রাণী কালিন্দি রাজ্যের শাসনবার গ্রহন করেন । রাঙ্গুনীয়ার রানীর হার্টও কালিন্দী রাণীর রোড তাঁরই স্মৃতিবহ । লুসাই যুদ্ধে ইংরেজদের সহায়তা করার বিনিময়ে তিনি কর্ণফুলি ও ইছামতি নদীর শুল্ক চন্দ্রঘোনায় ও ইছামতির শুল্ক ঘাটচেকে আদায় করা হত । এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য যে, রাঙ্গুনীয়ার চাকমা রাজাদের হয়ত নিজস্ব চাকমা নাম ছিল । মোগল আমলের মুসলিম সংস্কৃতির ফ্যাশন গ্রহনে আরাকান রাজাদের মত চাকমা রাজারাও মুসলিম নামে পরিচিত হলেও বৃটিশদের অধীনতার পর চাকমা রাজারা নিজস্ব হিন্দু নাম গ্রহণ করার সে রেওয়াজ এখনো বজায় আছে ।
১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে রাণী কালিন্দীর মৃত্যুর পর রাজ বংশীয় হরিশ্চন্দ্রকে সরকার রাজা উপাধি সহকারে রাজা তথা জমিদারীর ভার অর্পণ করেন । ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা হরিশ্চন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজ কুমার ভূবন মোহন সাবালক না হওয়া পর্যন্ত কোটর্স অব ওয়ার্ডস নামক ইংরেজদের এক সংস্থা জমিদারী দেখা শুনা করেন ।
রাজা হরিশ্চন্দ্রের আমলেই রাঙ্গুনীয়া চাকমা রাজা রাজধানী পার্বত্য চট্টগ্রামে রাঙ্গামাটিতে নিয়ে যান । কিন্তু রাঙ্গুনীয়াতে তাঁদের জমিদারী বহাল থাকে । রাজা হরিশ্চন্দ্রের সৎভাই নবচন্দ্র দেওয়ান রাজা নগরের রাজবাড়িতে থেকে যান, তাঁর পুত্র মোহিনী দেওয়ান রাজানগর ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার ছিলেন । তার ছেলে তুষার দেওয়ান এখন বেতবুনিয়ার হেডম্যান ।
রাঙ্গুনীয়ার রাণীর হাট, রাজার হাট, পদুয়ার রাজার হাট ও রোয়াজা হাট রাঙ্গুনীয়ার চাকমাদের স্মৃতি হয়ে রয়েছে । বর্তমান প্রথম দিকে বৃটিশ শাসনাধীন রাঙ্গুনীয়ার ভারত শাসন আইনের আওতায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে যায় । এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, চাকমা রাজাদের রাজ্য বলতে প্রধাণত রাঙ্গুনীয়া বুঝালেও পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাউজানও এর অর্ন্তভূক্ত ছিল বলে জানা যায় । (রাঙ্গুনীয়া স্মরণিকা, রাঙ্গুনীয়া সমিতি, ঢাকা, সম্পাদক, ডা: ফজলুর রহমান- ১৯৯৭, পৃষ্ঠা- ৫৭-৫৮)।
রাঙ্গুনীয়ার গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মে জাগরণে আরেক গৌরবদীপ্ত ইতিহাস গভীর ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে । চাকমা রাজা ধরমবক্স খাঁর মৃত্যুর পরে (১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে) মহিয়সী রাণী কালিন্দী প্রজাদের শাসন কার্যভার গ্রহণ করেন । তিনি ধর্মের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাবতী ছিলেন । তাঁর আমন্ত্রণে হারবাং এর জন্ম জাত আরাকান থেকে আগত প্রখ্যাত বৌদ্ধ সংঘ মনীষা শাস্ত্রজ্ঞ শ্রীমৎ সারমিত্র বা সারমেধ মহাস্থবির ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বৈদ্য পাড়া হয়ে মহামুনি পাহাতলী গ্রামের ঐতিহাসিক চৈত্র সংক্রান্তি মেলায় আসলে সেখান থেকে রাজানগরে রাজ বিহারে আগমন করেন।
মহামান্য সংঘরাজের মুখ নি:সৃত হিতোপদেশ বাণী ও বিনম্র ব্যবহারে তিনি (কালিন্দীরাণী) এতই অভিভূত হয়ে পড়ে ছিলেন যে, তারই সুফল স্বরুপ তিনি তাঁর নিকট বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন । প্রকৃতপক্ষে রাণী মহোদয় সেই দিনেই প্রাচীন তান্ত্রিক থেরবাদ ধর্মমত ত্যাগ করে থেরবাদী বৌদ্ধ আর্দশকে বরণ করে নিয়ে সমগ্র বৌদ্ধ সমাজগগণে নতুন করে এক নজির স্থান করেন । তখন থেকে সমগ্র পার্বত্যবাসী বৌদ্ধদের মধ্যে বিরাট প্রভাব বিরাজ করছিল । শ্রদ্ধা পরায়ণ রাণী তাঁর প্রতি অতিশয় প্রসন্ন হয়ে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষে রাজকীয় ঐতিহাসিক পুর্ণ্যাহ উপলক্ষে মহাসমারোহে মহামান্য সংঘরাজ সারমেধ মহাস্থবিরকে আরাকানী ভাষায় উপাধিযুক্ত সীলমোহর প্রদানে সম্মাণিত করেন । এর অর্থ হল- (1219 AF The Seal of Arakaness Sangharaja and Vibayachara) সংঘরাজের পক্ষে এটা তাঁর দ্বিতীয়বার রাজকীয় উপাধি লাভ । পূণ্য শীলা কলিন্দী রাণীর প্রদত্ত উপাধি গ্রহন করে তিনি আকিয়াব ফিরে গিয়ে ছিলেন । তখনও চট্টগ্রামে রাউলি পুরোহিতগণ থেরবাদ অনুসারে সমগ্রভাবে উপসম্পদা গ্রহন করতে সম্মত হতে পারেননি । কিন্তু সংঘরাজের আগমনে এবং বুদ্ধবাণীর উপদেশে শুনে যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া এবং সচেতনতা জাগ্রতা হয়েছিল । তাঁর আগমনের পর পূর্ব বঙ্গীয় মহাযানী ধর্মাবলম্বী বৌদ্ধ সমাজে থেরবাদ ধর্মের পুনৎজাগরণ শুরু হয় এবং সংঘরাজ নিকায় নামে বুদ্ধের বিনয় সম্মত ভিক্ষুসংঘ ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে মহামুনি পাহাড়তলীর ঐতিহাসিক হাঙ্গার ঘোনায় সর্বপ্রথম সাতজন রাউলি* সাতজন রাউলি পুরোহিত হলো যথাক্রমে- ১) পাহাড়তলী সর্বজন শ্রদ্ধেয় জ্ঞানালংকার মাথে, ২) ধর্মপুরের হরি মাথে, ৩) মির্জাপুরের সুধন মাথে, ৪) গুমাইমদ্দনের দুরাজ মাথে, ৫) বিনাজুরীর হরি মাথে, ৬) পাহাড়তলী কমল ঠাকুর এবং ৭) দমদমার অভয়চরণ মাথে (মহাস্থবির)।
পুরোহিত নাম ধর্মীয় গুরুদেরকে উক্ত উদক সীমায় শুভ উপসম্পদা দিয়ে পরিশুদ্ধ সংঘ সদস্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মহিয়সী কালিন্দীর পূন: আমন্ত্রণে মহাস্থবির মহোদয় আরাকান, কক্সবাজার এবং রামু হতে ২৫ জন বিনয়ধর স্থবির-মহাস্থবির ভিক্ষু সংঘ নিয়ে রাজানগরে আগমন করেন । রাণীর অর্থানুকুল্যে ও আচার্য চন্দ্রমোহন মহাস্থবিরের অনলস প্রচেষ্টায় এবং সংঘরাজ সারমেধ মহাস্থবিরের পৌরহিত্যে রাঙ্গুণীয়ায় পবিত্র ভিক্ষু সীমা প্রতিষ্ঠিত হয় । এই সীমার ‘চিং’ নাম তাঁরই প্রদত্ত । এই সীমা বাংলাদেশীয় বৌদ্ধদের সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক পাষাণ নির্মিত ভিক্ষু সীমা (ভিক্ষু শীলাচারশাস্ত্রী- চট্টগ্রামের বৌদ্ধধর্ম, চট্টগ্রাম- পৃষ্ঠা-৪৫)।
রাজনগর রাজবিহারে এবং মহামুনি পাহাতলী মহামুনি মন্দিরকে ভিত্তি করে সমতলীয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত বৌদ্ধদের মধ্যে থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের জাগরণ ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন প্রান্তে নবজোয়ারের শুভ সুচিত হয়েছিল ।
তখন থেকে সমতলীয় পার্বত্যবাসী বৌদ্ধদের মধ্যে নতুন করে অতীতের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের ধারা শুরু হয় । ইতিপূর্বে যা ছিল সেই সম্পর্কে মহাপণ্ডিত রাহুল সাংস্কৃত্যায়ণ এর মতে, ‘সম্রাট কনিষ্কের সময় প্রথম বুদ্ধমূর্তি নির্মিত হয় । তখন মহাযান মতবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে বড় জাঁকজমকের সাথে বুদ্ধমূর্তি পূজা-অর্চনা চলতে থাকে এবং সেখানেই বহুশত বোধিসত্ত্বের মূর্তিও নির্মিত হয় । এই বোধিসত্ত্বদের তারা ব্রহ্মাণদের দেব-দেবীর আসন অর্পণ করেন । তারা এই বোধিসত্ত্বদের ‘তারা’ এবং প্রজ্ঞা পারমিতার বুদ্ধ দেব-দেবীও কল্পনা করেন । তখন তাদের ভাবনা করার জন্য অনেক স্তোস্ত্রাদিও রচিত হতে থাকে । তারা হীনযানের সূত্র হতে অধিক মাহাত্ম্যপূর্ণ নিজেদের সূত্র রচনা করেন । বহুশত পৃষ্টায় সূত্রগুলি শীঘ্রই পাঠ হয় না বলেই তারা প্রত্যেক সূত্র দুই তিন পদ্ধতিতে রচনা করেন । এই মহাযান মতবাদ (তন্ত্রযান, বজ্রযান ও মন্ত্রযান) সপ্তম/অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত চলতে থাকে । তখন তারা কেউ পন্হী (জুতা) নির্মাণ করতেন বলে ‘পন্হী পা; কেউ কম্বল পড়ে থাকতেন ‘কমড়ি পা; কেউ ওখল রাখতেন বলে ওখরী পা; বলা হত । এক কথায় তাদের বলা হত সিদ্ধযোগী । এই সব সিদ্ধযোগীরা বা লুলিরা জঙ্গলে তপস্যা করতেন । তারা জনসাধারণ হতে ঠিকই দূরে থাকতে চাইতেন, কিন্তু জনসাধারণ ততই তাদের কাছে যেতেন । লোকেরা এই সিদ্ধযোগীদের বোধিসত্ত্ব ও অন্যান্য দেবতাদের ন্যায় অলৌকিক ঋদ্ধি ও দিব্য শক্তির অধিকারী মনে করতেন । রাজারা নিজেদের কন্যাদের পর্যন্ত তাদের দান করতে দ্বিধাবোধ করতেন না (ভারত মে ও বৌদ্ধ ধরমকা উত্থান অর পতন, দিল্লী- ২০০১পৃঃ ১১)।
এই সকল গৃহী পুরোহিতরা বংশ পরষ্পরায় বৌদ্ধ সমাজে কালী পূজা, দুর্গা পূজা, মনসা পূজা ও প্রভৃতি পূজায় স্বহস্তে পশুবলি করতেন । এই প্রসঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি পুরষ্কারে ভূষিত পন্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির বলতেন । চট্টগ্রামের চাকমা রাজাদের কালী মন্দির ও শিব মন্দিরে পূজা করতে দেখে অনেকেই তাদেরকে অবৌদ্ধ মনে করতেন । বস্তুতঃ থেরবাদ ধর্মমত গ্রহণের পূর্বে বাংলার সকল বৌদ্ধরা নানা দেব-দেবীর পূজায় অভ্যস্ত ছিলেন (শাসন বংশ, অনুবাদ, পন্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির ,মূখবন্ধ, কলি- ,পৃষ্ঠায় -১৯৬২)।
মহান ভিক্ষু সংঘের অবদান ঃ বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসারের মূলে বুদ্ধ প্রমুখ মহান ভিক্ষুসংঘের ভূমিকা অতুলনীয় । বুদ্ধ সমেত ৬১ জন অর্হৎ শিষ্যদের নিয়ে তাঁর সাধনা লব্ধ জ্ঞান জীব জগতের মহান কল্যাণে বিশেষতঃ দুঃখ মুক্তির উপায় হিসেবে প্রচারাভিযান এখন অব্যহত রয়েছে । পৃথিবীতে যতদিন পাঁচজন ভিক্ষু সদস্য থাকবেন ততদিন বুদ্ধের ধর্মবাণী চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে । রাজা-মহারাজা, ধনী-সাধারণ, দায়ক-দায়িকাগণ পৃষ্টপোষকতা করবেন ।
সম্ভবতঃ এ কারণে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহোদয় বলেছেন, রাঙাগামাাটিতে যে সকল বৌদ্ধ আছেন তাঁহারা যদিও এখন চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের শিষ্য, তথাপি তাহাঁদের মধ্যে এমন আচার ব্যবহার আছে । তাঁহাতে বোধ হয় তাঁহারা প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ; কিন্তু নিকটবর্তী চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের সংশ্রবে আসিয়া তাঁহারা অনেক পরিমাণে হীনযান মত গ্রহন করিয়াছেন ( হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ৩য় খণ্ড, রচনা সংগ্রহ কলি- পৃ:- ৩৬০)।
পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের মধ্যে থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ব্যাপক দেখা গেলেও মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই চাকসহ আরো অনেক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিরা একই ধর্মাবলম্বী । শুধুমাত্র ত্রিপুরা জনগোষ্ঠিদের হিন্দু ধর্মের আর্দশকে গ্রহণ করতে দেখা যায় । ত্রিপুরা সম্প্রদায় ব্যতীত অন্যান্য জনগোষ্ঠি স্মরণাতীত কাল থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী তাতে কোন সন্দেহ নেই । তবে থেরবাদ বৌদ্ধ
ধর্ম প্রচার ও প্রসারের আগে তাঁদের ধর্ম ছিল মূল বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তিত তন্ত্রযান-মন্ত্রযান ও বজ্রযানের প্রভাব ছিল বেশী । এই তন্ত্রযান বৌদ্ধ ধর্ম গুরুদেরকে বলা হত লুরি । ইদানিং কোন কোন স্থানে চাকমাদের মধ্যে এই ‘লুরি’ দেখা যায় । এই ‘লুরি’ শব্দটি পাল যুগে রচিত ‘চর্যাগীতি’তে দেখা যায়। যেমন- ‘অদয় বঙ্গালে দেশ লুড়িউ’।
চাকমাদের দু’টি প্রাচীন শাস্ত্র গ্রন্থ আছে । তমধ্যে একটি যোগ কালাম এবং অপরটি ভদকালাম। এই গ্রন্থ দু’টিতে নাথ যোগীদের অন্যতম গুরু গোরক্ষনাথের কথা উল্লেখ্য যোগ্য । চর্যাগীতিতে খানহ্ পা, সরহ পা, লুই পা (মৌননাথ বা মৎস্যে পা), হাড়ী পা প্রভৃতি ৮৪ (চুরাশি) জন সিদ্ধ যোগী বা লুরিদের কথা উল্লেখ রয়েছে (চর্যাগীতি পঞ্চাশিকা, পৃ: ৪৪)।
দৈনন্দিন ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত চাকমা লুরিদের প্রণীত গ্রন্থ গুলিকে ‘আগতারা’ বলা হত । এগুলি মূলতঃ ভগবান বুদ্ধের উপদিষ্ট এক একটি সুত্রের এক একটি অংশ বিশেষ । সুত্র গুলি পালি, সংস্কৃত, চাকমা, ব্রহ্মী প্রভৃতি সংমিশ্রত ভাষায় রচিত । আবার দু’টি একটি বিশুদ্ধ পালি ভাষায়ও দেখা যায় । একাদশ শতাব্দীতে ব্রহ্মদেশের রাজা অনিরুদ্ধ তাঁর সাম্রাজ্যে থেরবাদ ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার পর উক্ত ‘অরি বা লুরি’দের তাঁর দেশ থেকে বিতারিত করেন, এই গৃহী পুরোহিতরা চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এসেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায় । সম্ভবতঃ তারাই উক্ত ‘তারা’ গ্রন্থগুলি বহন করে এনেছিলেন (ভিক্ষু শরণ পাল, বৌদ্ধধর্ম উত্থান-পতন ও চাকমা বৌদ্ধ সমাজ, কলি-২০০৯, পৃ: ১০১)।
রাণী কালিন্দী তান্ত্রিক মতবাদ থেকে থেরবাদ ধর্মে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে সর্ব প্রকার সাহায্য সহযোগিতা দান করেন । ঐ সময় রাণীর পৃষ্ঠপোষকতায় নীল কমল ও ফুল চন্দ্র লোথক কর্তৃক বর্মী ভাষায় লিখিত ‘থাদুওয়াং’ (শাক্যবংশ) গ্রন্থের অনুবাদ করা হয় । যা “বৌদ্ধ রঞ্জিক” নামে গ্রন্থটি রাণীর মৃত্যু (১৮৭৩ ইং) বেশ কয়েক বছর পরে ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল (সুগত চাকমা: চাকমা পরিচিতি, রাঙ্গামাটি, ১৯৯৩০)।
এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় রচিত গৌতম বুদ্ধের প্রথম জীবন গ্রন্থ । থাদুওয়াং গ্রন্থে শাক্য সিংহ গৌতম বুদ্ধের অভিসন্ধি, অভিনিষ্ক্রমণ, বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি, ধর্ম প্রচারক এবং পরিশেষে মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্তি পর্যন্ত সমগ্র জীবন আখ্যান বর্ণিত হয়েছে ( দাসগুপ্ত, নলিনীনাথ, বাংলায় বৌদ্ধধর্ম, কলিকাতা-২০০১)।
১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে চাকমারাণী পূণ্যশীলা কালিন্দী মহান পুণ্য পুরুষ সংঘ মনীষা সারমেধ মহাস্থবিরের নিকট থেরবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত হওয়ার সময়ে কোন ‘লুরি’ তাঁর পূর্ব ধর্মমত ত্যাগ করে থেরবাদ আদর্শ গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়নি । রাণী কালিন্দীর থেরবাদে দীক্ষিত হওয়ার আনুমানিক সতের বছর পর দীননাথ চাকমা নামক জনৈক ‘লুরি’ তাঁর তান্ত্রিক ধর্মের বেড়াজাল ছিন্ন করে প্রথম থেরবাদী ভিক্ষু ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন । তাঁর ভিক্ষু নাম ছিল শ্রীমৎ বরমিত্র। দুর্ভাগ্য উপসম্পদা আচার্য কে, সন, তারিখ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি । ভিক্ষুত্ব গ্রহণের পর ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজগুরু পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন শ্রীমৎ রথবংশ নামে আর একজন ভিক্ষুর নাম পাওয়া যায় । এবং তিনিও রাজগুরু পদে সম্মাণিত ছিলেন । কাট্টলি নিবাসী পুনংচান চাকমা ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে উপসম্পদা গ্রহন করে শ্রীমৎ বিজয়ানন্দ ভিক্ষু নামে খ্যাত হয়ে ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন । তিনিও ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজগুরু পদে মর্যাদা লাভ করে সদ্ধর্মের প্রচার ও প্রসারে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন । তাঁর গৃহী নাম ছিল কালা চোগা চাকমা । তিনি তখনকার দিনে বৌদ্ধ দেশ শ্রীলংকায় গিয়ে বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করে বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন । স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পূর্বক বৌদ্ধ ধর্মের জাগরণে বিরল ভূমিকা পালন করেছিলেন । তাঁর উপসম্পদার গুরু ছিলেন রাজগুরু ধর্মরত্ন মহাস্থবির । তারপর ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে পালকধন নামে জনৈক চাকমা যুবক সংসার ধর্ম ত্যাগ করে প্রব্রজ্যাসহ ভিক্ষুত্ব ধর্ম গ্রহণ করে । তখন তাঁর নাম ছিলেন শ্রীমৎ প্রিয়রত্ন ভিক্ষু । ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে চাকমা রাজা ভূবন মোহন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বোয়লখালী দশবল বৌদ্ধ রাজবিহারে ১৯৩৪-১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজগুরু পদে ছিলেন । সেখানে ক্রমাগত সতের বছর অবস্থানকালীন অনেক ছাত্র শ্রমণকে তিনি এই বিহারে শিক্ষা প্রদান করেছিলেন । ছেলেদেরকে নিয়ে বিহারের চারিদিকে সুশোভন বৃক্ষ রোপন করে বিহারটি ছায়া সুশীতল তপোবন রুপ দান করেন । সেখান থেকে রাঙ্গামাটি রাজবিহারে অবস্থান করে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ছেলেদেরকে আশ্রয় দিতেন এবং হাই স্কুলে পড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন । তরুন মেধাবী ভিক্ষু শ্রামণদেরকে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম এবং কলিকাতায় পাঠিয়ে দিতেন । এভাবে তিনি ত্রিশ ও চল্লিশের দশক গুলিতে এই জেলায় একটি সুসংহত ভিক্ষুসংঘ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক অবদান রেখেছিলেন ।
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে চাকমা রাজ পুর্ণ্যাহের সময় চাকমা সার্কেলের ভিক্ষুদের নিয়ে ‘পার্বত্য ভিক্ষু সমিতি’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়েছিল । পার্বত্য চট্টগ্রামের ধর্মীয় উন্নতি সাধনে এটা ছিল ভিক্ষুদের প্রথম সংস্থা । চট্টল ভিক্ষু সমিতি নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছিল । পুস্তিকা খানিতে বৌদ্ধ গৃহীদের ত্রিরত্ন বন্দনা, পঞ্চশীল গ্রহনসহ প্রাণী হত্যা ও সুরাপানের কুফল নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী সন্নিবেশিত ছিল । এই সমিতির সভাপতি ছিলেন রাজগুরু ভদন্ত ধর্মরত্ন মহাস্থবির, সহ-সভাপতি ভদন্ত প্রিয়রত্ন মহাস্থবির, সম্পাদক ছিলেন ভদন্ত আনন্দমিত্র ভিক্ষু, যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন ভদন্ত বিমলানন্দ ভিক্ষু ।
ভদন্ত প্রিয়রত্ন মহাস্থবিরের শিষ্যবর্গের মধ্যে ভদন্ত আনন্দ ভিক্ষু, ভদন্ত বিমলানন্দ ভিক্ষু, ভদন্ত ক্ষান্তিবর ভিক্ষু, ভদন্ত শীলানন্দ ভিক্ষু, ভদন্ত রত্নজ্যোতি ভিক্ষু, ভদন্ত উদয়ানন্দ ভিক্ষু ও ভদন্ত দেবানন্দ ভিক্ষু প্রমূখের নাম উল্লেখযোগ্য । এদের মধ্যে ক্ষান্তিবর ভিক্ষু মহামুনি পালি টোলে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করে সূত্রের আদ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন । বিদ্যারত্ন ভদন্ত বিমলানন্দ ভিক্ষু কলিকাতায় ধর্মোদয় পালি কলেজ থেকে সুত্র, বিনয়, শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অভিধর্মের আদ্য ও মধ্য পাশ করেছিলেন । তিনি ‘আঘর তারা’ সম্পাদনের জন্য আরাকান ও ব্রহ্মদেশ ঘুরে আসেন । সেখানে তিনি ‘অরিন্তমা’ তারা নামে একটি তারা সংগ্রহ করেন । এই ‘অরিন্তমা’ তারাটি তৎকালীন ‘গৈরিকা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল । ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ভদন্ত বিমলানন্দ ভিক্ষু অকাল মৃত্যু পার্বত্যবাসীদের অপুরনীয় ক্ষতি সাধন হয়েছিল । এর বছর খানেক পরে সদ্ধর্ম ও সমাজ হিতৈষী ভদন্ত প্রিয়রত্ন মহাস্থবির ও দেহত্যাগ করেন । ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর আরেক প্রিয় শিষ্য ভদন্ত আনন্দ মিত্র ইহলোক ত্যাগ করেন।
পন্ডিত ভদন্ত ক্ষান্তিবর মহাস্থবির সূত্র, বিনয় ও অভিধর্ম বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন । তিনি ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রেঙ্গুনে অনুষ্টিত ৬ষ্ঠ সংগীতি অনুষ্টিত তৎকালীন পাকিস্থান বৌদ্ধ প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন । তিনি দীর্ঘকাল পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজ্যে ভিক্ষুসংঘের সংঘনায়ক ছিলেন । ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তাঁর সাধন পীঠে দেহ ত্যাগ করেন ।
চাকমা রাজগুরু আচার্য ভগবান চন্দ্র মহাস্থবির (যিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে অধ্যাপক) রাজগুরু শ্রীমৎ ধর্মরত্ন মহাস্থবির আমৃত্যু পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন । রাজানগর রাজবিহারে দীর্ঘকাল অবস্থান করেন রাজগুরু ভগবানচন্দ্র মহাস্থবির রাজগুরু ধর্মরত্ন মহাস্থবির র্দীঘনিকায় এবং মহাপরিনির্বাণ গ্রন্থের লেখক আমৃত্যু সেখানে থেকে শুধু সাহিত্য সাধনা করেননি সমাজ সংস্কার ও সদ্ধর্মের জাগরনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন । রাঙ্গামাটি আনন্দ বিহারে অধ্যক্ষ দার্শনিক বিশুদানন্দ মহাস্থবির সত্যদর্শন ও ভক্তি শততম গ্রন্থ প্রণেতা এবং উপ-সংঘরাজ বহুগ্রন্থ প্রণেতা সুগত বংশ মহাস্থবির কয়েক বছর সেখানে অবস্থান করে পার্বত্যবাসী বৌদ্ধদের পাশাপাশি বাঙ্গালি বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মীয় চেতনাকে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন । সকলের অতিশ্রদ্ধা ভাজন হয়েছিলেন । শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির (বর্তমান উপ-সংঘরাজ) ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বোয়ালখালী দশবল বৌদ্ধবিহারে কয়েক বছর অবস্থান করে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘র্পাবত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম’ এবং ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে রাঙ্গামাটি ‘মোনঘর’ নামে আশ্রম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্তরিক সহযোগিতা করে অত্র এলাকার ছেলে-মেয়েদেরকে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ সুবিধা দিয়ে শিক্ষার আলো বঞ্চিতদেরকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন । তার প্রত্যক্ষ সুফল স্বরুপ কলিকাতায় ‘শিশু করুনা সংঘ’ এবং ঢাকাস্থ ‘বনফুল আদিবাসী গ্রীন হার্ট স্কুল কলেজে’র প্রতিষ্ঠাদ্বয় যথাক্রমে কর্মবীর শ্রীমৎ বিমলতিষ্য মহাস্থবির এবং কর্মবীর শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত সাংঘিত ব্যক্তিত্ব যাঁদের দ্বারা হাজার হাজার আদিবাসী পার্বত্য এলাকার ছেলে-মেয়েরা বর্হিবিশ্বের প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে । এ জাতীয় সমাজ-সদ্ধর্মে সেবামূলক কার্যক্রম যে কোন জাতির জন্য অতীব শুভ সংবাদ । বিশ্বের যত বৌদ্ধ দেশ আছে সব দেশের আত্মত্যাগী মহান ভিক্ষুসংঘ অতি উচ্চ শিক্ষিত, শাস্ত্রজ্ঞ, গবেষক এবং লেখক হিসেবে স্ব-জাতি, স্ব-সংস্কৃতি এবং স্বদ্ধর্মের উন্নতিতে অসাধারণ অবদান রেখে চলেছেন । ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করার অনেক আগে আত্মত্যাগী এবং ধর্ম প্রচারক বৌদ্ধ ভিক্ষুরাই আমেরিকা আবিস্কার করেছিল। এটা ভিক্ষুদের জন্য অতি আত্মশ্লাগার বিষয় । বলতে দ্বিধা নেই চট্টগ্রামের বাঙ্গালি বৌদ্ধ ভিক্ষুরা শিক্ষা-দীক্ষায় ধ্যানে-জ্ঞানে, শাস্ত্রে অসাধারণ পণ্ডিত, সাধক, লেখক, সাহিত্যক, কর্মবীর হিসেবে বিগত শতাব্দীতে দেশে-বিদেশে শাসন সদ্ধর্মের স্তম্ভ হিসেবে সুনাম-সুখ্যাতির শীর্ষে আরোহন করেছেন । এখনও কিছু কিছু প্রভাব থাকলেও আগের তুলনায় কম বললেও ভূল হবে না । পঞ্চাশের দশক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়েক জন অসাধারণ পুণ্য পুরুষ ত্রিপিটক শাস্ত্রজ্ঞ মহান সাধক এবং সমাজ-সদ্ধর্ম সংস্কারক সাংঘিক মহিষীদের আর্বিভাব সত্যিই গৌবরবের বিষয় । তম্মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির এবং সাধকশ্রেষ্ঠ আর্য পুরুষ সাধনানন্দ মহাস্থবির মহোদয় (বনভান্তে) অন্যতম।
রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে রাঙ্গামাটি বর্তমান বিলাইছড়ি উপজেলাধীন কুতুবদিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন । তাঁর পিতার রুদ্রসিং কার্ব্বারী এবং মাতা ইছামতি তঞ্চঙ্গ্যা । তাঁর গৃহী নাম ছিল ফুল নাথ তঞ্চঙ্গ্যা । ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ভদন্ত তিষ্য মহাস্থবিরের নিকট প্রব্রজ্যা এবং ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে শুভ উপসম্পদা গ্রহণ করেন । তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাগুরু ছিলেন মন বাহাদুর । সেখানে থেকে রাঙ্গুনীয়া ইছামতি ধাতুচৈত্য বিহারের অধ্যক্ষ, শ্রীমৎ ধর্মানন্দ মহাস্থবিরের স্নেহ সান্নিধ্যে থেকে শাস্ত্র শিক্ষা এবং রাঙ্গুনীয়া হাইস্কুলে এবং পরে কোয়ে পাড়া হাই স্কুলে পড়াশুনা করেন । ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে উচ্চ শিক্ষার্থে বার্মায় (মিয়ানমার) লেংপেডং বিশ্ববিদ্যালয় ও কামইহেডা বিশ্ববিদ্যালয়ে দশ বছর লেখা-পড়া করে পালি সাহিত্যে এম, এ এবং ত্রিপিটক বিশারদ উপাধি প্রাপ্ত হন । বর্হিবিশ্বে তাঁর এই অর্জন অত্যন্ত প্রশংসার দাবী রাখে । ১৯৫৪-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রেঙ্গুনে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ বৌদ্ধ মহাসংগীতিতে পাকিস্থানের প্রতিনিধি হয়ে সংগীতিকারক হিসেবে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন । এই সময় শ্রীমৎ সত্যপ্রিয় নামে অপর এক চাকমা ভিক্ষু এতে যোগদান করেন । তিনি শ্রীমৎ আনন্দ মহাস্থবিরের প্রিয় শিষ্য ছিলেন । ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ২শে ডিসেম্বর রেঙ্গুন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে সর্ব প্রথম তাঁর জন্ম স্থান কুতুদিয়া গ্রামে পর্দাপণ করেন । তখন চাকমা রাজা ত্রিদিপ রায় এর আমন্ত্রণে তিনি রাঙ্গামাটি রাজ বিহারে আগমন করেন । কাপ্তাই বাঁধের জলে অধুনা নিম্মজ্জিত চাকমা রাজপ্রাসাদে অনতিদুরে প্রতিষ্ঠিত ছিল মনোরম গৌতমমুনি বিহার । সেই রাজবিহারে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে ভদন্ত অগ্রবংশ মহাস্থবির মহাসমারোহে ধর্মীয় মর্যাদাপুর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজগুরু পদে বরণ করা হয় । ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে রাইংখ্যং এর বঙলতলী ক্যাং- এ কঠিন চীবর দানের ব্যবস্থা করেন । তিনি পার্বত্য চট্টল ভিক্ষু সমীতিকে পুনঃগঠন করেন, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সমপ্রদায়ের অনেক কুলপুত্রকে প্রব্রজ্যা দিয়ে তিনি ভিক্ষু ও শ্রামণ তৈরী করেন । তাঁর সদ্ধর্ম দেশনার উদ্বুদ্ধ সুদক্ষ ভিক্ষুর সংখ্যা সন্তোষজনক ভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে । বুদ্ধপূজা, কঠিন চীবরদান, সংঘদান, অষ্টপরিস্কার দানের মত ধর্মীয় অনুষ্ঠান ব্যাপক ভাবে প্রত্যেক এলাকায় প্রচলন করেন । ফল শ্রুতিতে এতদঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের (সদ্ধর্ম) সমৃদ্ধি লাভ হতে থাকে । তিনি প্রায় ৫০টির মত ধর্মীয় পুস্তিকা রচনা করে ধর্মীয় সাহিত্যেও সমৃদ্ধি করেছেনে । তিনি ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে কলিকাতাস্থ ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহারে এবং শিশুকরুণা সংঘে কয়েক বছর অবস্থান করেন । তিনি সেখান থেকে ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে নেদাল্যান্ডে অনুষ্ঠিত Humen Right Confarence এবং ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ২রা জুলাই থেকে ২রা আগষ্ট মাসে জেনেভায় অনুষ্টিত United Nations Economic and Social Council প্রভৃতি আন্তজার্তিক সম্মেলনে যোগদান করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় বিশ্ববাসীদের কাছে তুলে ধরেন । তাছাড়া তিনি বৃটেন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা ও নেপাল প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন । এ ব্যাপারে যার ভূমিকা ছিল তিনি হলেন কর্মবীর বিমল তিষ্য মহাস্থবির । ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ৩০ অক্টোবর কর্মবীর বিমল তিষ্য মহাথের ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কলিকাতাস্থ উত্তর চব্বিশ পরগণা চকপাচুরিয়ায় রাজার হাট নামক স্থানে ‘বোধিচারিয়া বিদ্যালয়’ ও ‘শিশু করুণা সংঘ’ নামে অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন । মূলতঃ ‘শিশু করুনা সংঘ’ শ্রীমৎ বিমল তিষ্য মহাস্থবির এবং রাজ গুরুর পরিকল্পনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । ১৯৮৬ সালে ভারতে আশ্রিত ২৫০ জন এতিম শিশুর অবিভাবকের দায়িত্ব প্রতিপালনের পালনের জন্য “পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ ও মিরপুর শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব তাঁরই অনুজ ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরোর হাতে তুলে দিয়ে ভারতে গমন করেন । ভদন্ত বিমল তিষ্য মহাথের ভারত সরকারের সহযোগিতা ও ফ্রান্স সরকারের অনুকম্পায় ৭২ জন আদিবাসী শিশুকে ফ্রান্সে পাঠিয়েছেন । এখানে উল্লেখ্য যে, এই ৭২ জন শিশুকে ফ্রান্সে পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের । বর্তমানে এই শিশুরা ইউরোপের মত উন্নত রাষ্ট্র ফান্সে নাগরিকত্ব লাভ করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন । তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের সভাপতি এবং বিমল তিষ্য ভন্তে পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পরিব্যাপ্ত হয়েছে । রাজগুরু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সম্মানি হিসেবে পন্ডিতি ভাতাও পেতেন।
মায়ানমার সরকার থেকে ‘আগ্গমহাসদ্ধম্মজ্যোতিকাধ্বজ’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন । ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রত্যাবর্তন করে রাজ বিহারে অবস্থান করে সাত বছর স্ব-দায়িত্ব পালনের মধ্যে দিয়ে ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে অত্র বিহারে দেহত্যাগ করেন । এ মহামনীষীর স্মারক গ্রন্থের সম্পাদনার দায়িত্ব এবং জীবনী গ্রন্থ বর্তমান লেখকের দ্বারা প্রণীত হয়েছে । এই গুরু দায়িত্ব, কৃতজ্ঞতা ও মূল্যায়নের সৌভাগ্যও বটে। তাঁর মত বড়মাপের সমাজ সংস্কারক, সদ্ধর্ম সেবক নিবেদিতপ্রাণ সাংঘিক ব্যক্তিত্ব অতীব দুর্লভ।
সাধক শ্রেষ্ঠ আর্যপুরুষ সর্বজন পুজ্য ভদন্ত সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে) বৌদ্ধ জাতির জন্য অনন্য কীর্তিমান সাংঘিক পুরোধা । যাঁর কঠোর সাধনা, অনুভূতি, শীলজ্ঞান এবং অভূতপূর্ব দেশনা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে অতিপূজ্য এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহান ব্যক্তি হিসেবে নন্দিত হয়েছেন । তাঁর মত কঠোর ধ্যান সাধক ভিক্ষু দ্বিতীয় খুঁজে পাওয়া কঠিন । অন্য দিকে নির্লিপ্ত, নিরাসক্ত এবং র্নিলোভ আদর্শ সাংঘিক পূন্য পুরুষ বর্তমান সময়ে অত্যন্ত বিরল।
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে মগবান মৌজার মোরঘোনায় জন্ম গ্রহণ করেন । তার গৃহী নাম ছিল রথীন্দ্র চাকমা । পিতা হারুমোহন চাকমা এবং মাতা বীরপতি চাকমা । তার জন্ম দাতা পিতা-মাতা সেই যুগের শীলবান, শীলব্রতী ও ধার্মিক ছিলেন । বয়স বাড়ার সাথে সাথে আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করার মানসে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন । সেখানে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন । শৈশবকাল থেকেই তিনি ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন । নীরব জীবন যাপন করতে পছন্দ করতেন । সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জাতের পশু-পাখী হত্যা এবং বাজারে বিক্রয় করা তাঁর কোমল অন্তরে ভীষণভাবে পীড়া দিত এবং দুঃখ প্রকাশ করতেন । একদিন দেবদত্ত্বের দ্বারা আহত প্রাণী রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের আশ্রয়ে গিয়ে তাঁর দ্বারা সুস্থ করে দেবদত্ত্ব সেই প্রাণী ফেরত চাওয়া সত্ত্বেও শাক্যরাজ্যের বিনিময়ে প্রাণীর জীবন রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিলেন । বর্তমান সময়ে অলিক কল্পনা মাত্র । সেদিন তার কোমল অন্তরে সেই শিক্ষাটি গভীরভাবে বুঝতে পেরে নিজেই আত্মত্যাগ চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে, পটিয়া নিবাসী এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্রী গজেন্দ্রলাল বড়ুয়ার আন্তরিক সহায়তায় ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাস্থবির এর নিকট তিনি প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন । ভদন্ত দীপঙ্কর মহাস্থবির ছিলেন সেই যুগের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে প্রথম বি,এ পাস এবং ত্রিপিটক বিশারদ উপাধি ধারী । রথীন্দ্র শ্রামণ কিছু সময় পর্যন্ত সেখানে পালি ও বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করে পরিবেশগত কারণে তাকে মুক্তির পথ খুঁজতে সেখান থেকে বের হলে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে কাপ্তাই এর পাশে ধনপাতার গভীর জঙ্গলে ধ্যানরত হয়ে পড়েন । দুঃভাগ্যবশতঃ ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে জলবিদ্যুৎ তৈরীর জন্য কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের দরুন বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক জলমগ্ন হওয়ায় তিনি দীঘিনালায় চলে যান । তখন থেকে তিনি ভক্তদের দৃষ্টি গোচর হয় ।
১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে রাজগুরু অগ্রবংশের উদ্যোগে এবং ভিক্ষু সংঘের সহায়তায় তাঁকে উপসম্পদা প্রদান করা হয়েছিল । তিনি সুদীর্ঘকাল সেখানে ধ্যানচর্চা করে দুরছড়িতে চলে যান । সেখানেও ছয়/সাত বছর থেকে ধর্মপ্রাণ শ্রী অনিল বিহারী চাকমার (হেডম্যান) এর প্রার্থনায় তিনটিলায় চলে যান । ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের শ্রদ্ধা শীলা মাতা আরতি রায়ের আকুল আহব্বানে রাঙ্গামাটির রাজ বনবিহারে আগমন করেন । সেখানে তার ধর্মাভিযান শুরু হয় ব্যাপক ভাবে। এই সময় থেকে মননশীল মেধা ও সাধনা লব্ধ জ্ঞানে ১মও ২য় খন্ড দেশনা গ্রন্থ প্রকাশিত হয় । ইদানিং তাঁর অসংখ্য শিষ্য-প্রশিষ্য দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাধক পুরুষের আদর্শ ও অমৃতবাণী প্রচার ও প্রচারে অসাধারন ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তাঁর জীবনে সবচেয়ে অমরকীর্তি বাংলা ভাষায় ত্রিপিটক গ্রন্থাবলী অনুবাদ ও প্রকাশের সুব্যবস্থা করেছেন। ভিক্ষু-শ্রামণদের জন্য হাসপাতাল এবং পুর্ণাঙ্গ প্রেস স্থাপনসহ শাসন সদ্ধর্মের কল্যাণে সুন্দর পরিবেশ সর্বোপরি বিশ্বশান্তি প্যাগোডা স্থাপনের অভিনব দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিক নক্সা তৈরী করে গেছেন । বৌদ্ধ প্রধান প্রতিরুপ দেশ থাইল্যাণ্ডের বিশ্বখ্যাত “ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের” প্রতিনিধিদেরকে সর্বপ্রথম বর্তমান লেখককের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে এনে মৈত্রী সম্পর্ক তৈরী করেছিলেন । তারা রাজবন বিহারের নতুন করে বিশ্ব প্যাগোডা প্রতিষ্ঠার জন্য অভিনব ও দৃষ্টিনন্দন নক্সার তৈরীর ব্যাপারে সহায়তা করেছেন । উল্লেখ্য যে এ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ বিহার সমূহের পূজা ও প্রার্থনার জন্য সর্ব মোট ২৫০টি অষ্টধাতু বুদ্ধ মূর্তি লেখকের মাধ্যমে বাংলাদেশে বৌদ্ধদের জন্য প্রদান করেছেন । তৎমধ্যে ৮০টি বুদ্ধ মূর্তি বনবিহারের শাখা সমূহে প্রদান করা হয়েছে । তৎজন্যে তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে ৩০ জানুয়ারি ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে শারীরিক বাধ্যর্ক জনিত কারণে ইহলোক থেকে পরলোকে গমন করেন । রোগশর্য্যা থেকে দেহত্যাগ এবং পেটিকাবদ্ধ অনুষ্ঠান পর্যন্ত পাশে থেকে সেবা-যত্ন করার মহান সুযোগ লেখকের হয়েছে। প্রায় সকল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে স্মৃতিচারণ করার সূবর্ণ সুযোগ লাভ করে কৃতার্থ বোধ করছি । বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রচারের ক্ষেত্রে এ জাতীয় মহান কৃতি সাধক পুরুষের প্রয়োজন সমাধিক ।
মৈত্রী কামী শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ তিলোকানন্দ মহাস্থবির ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে শুভ উপসম্পদা গ্রহণ করে বাঘাই ছড়ি মগবান শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করেন । তিনি ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে বাঘাইছড়ি কাচালং “শিশু সদন” নামে অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে পাহাড়িদের শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধনে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন । এই মানব প্রেমী কল্যাণ মিত্র মহান ত্যাগদীপ্ত পুণ্য পুরুষের মানবতাবাদী কর্মকান্ডের স্বীকৃতি স্বরুপ ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ থেকে “সাদা মনের মানুষ” হিসেবে সম্মাণিত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বৌদ্ধ সমাজকে গৌরবান্বিত করেছেন । তিনি বর্তমান ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিক্ষুসংঘ, বাংলাদেশ’ এর মাননীয় উপ-সংঘরাজ হিসেবে বরিত হয়ে শাসন সমাজের উন্নতিতে কাজ করে যাচ্ছেন।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে কর্মবীর সুমনালংকার মহাস্থবির কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন’। এই প্রতিস্থানের মাধ্যমে অত্র এলাকার অসংখ্য শিশু-কিশোর পড়াশুনা করে অনেকেই সরকারী-বেসরকারী ভাবে বিভিন্ন কর্মে জড়িত হওয়া ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন । তিনি বহু দেশ-বিদেশের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করেন । স্ব-জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হিসেবে জাতির দুর্দিনে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা বোধ করেননি । তিনি দীর্ঘ বছর ‘পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ, বাংলাদেশ’ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ।
কর্মবীর জ্ঞনপ্রিয় ভিক্ষু ও শাসন প্রিয় ভিক্ষু’র যৌথ ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে “গিরি ফুল শিশু সদন” প্রতিষ্ঠিত করে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছেলে-মেয়েদেরকে যুগোপযোগী শিক্ষায় সুশিক্ষিত করার জন্য বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণে বান্দরবান এলাকায় আলোকিত এবং সাংঘিক ব্যক্তিত্ব শ্রীমৎ উ,পঞ্ঞা জোত থের (বি,সি,এস) আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বৌদ্ধ ধর্মে শুভ উপসম্পদা গ্রহণ করে সমতলীয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণ তরুণীদের বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন । তারই সুন্দর পরিকল্পনায় অত্র এলাকায় প্রথমত ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘মহাসুখ প্রার্থনা পুরণ’ বৌদ্ধ জাদি (স্বর্ণ মন্দির) ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন এবং ২০০০খ্রিঃ তা শুভ উদ্বোধন করা হয় ।
দ্বিতীয়ত ঃ রামজাদি মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে এবং শুভ উদ্বোধন করা হয় ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে । তাঁর জীবনে এই দুটি ঐতিহাসিক কর্মকান্ড মহান পূণ্যতীর্থে রুপলাভ করেছে । তাঁর উপদেশ এবং লেখা অপূর্ব । বুদ্ধের মৌলিক বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করলে সমাজ ও জাতি আরো বেশি উপকৃত হবে আশা রাখি । অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের আলোকিত সন্তান হিসেবে সমাজ ও জাতি আরো অনেক কিছু প্রত্যাশা করে।
যে বিষয়টি না জানালে বর্তমান লেখাটি অপুর্ণ থেকে যাবে তা হলো- স্মরনাতীত কাল থেকে ঐতিহাসিক অন্যতম পুণ্যতীর্থ চিৎমরম বিহার যা সমতলীয় ও পার্বত্যবাসী আপামর বৌদ্ধদের জন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি করার একমাত্র স্থান ছিল । অত্র বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ পরাক্রমা মহাস্থিবের অবদান ছিল অবিস্মরণীয় । পরবর্তীকালে সর্বজন শ্রদ্ধেয় উ. পাণ্ডিতা মহাথের স্ব-জাতি ও স্বধর্মের উন্নতিতে অনেক ত্যাগ ও দুরদর্শিতার পরিচয় দেন । তাঁর মহাপ্রয়াণের পর লেখক তাঁর জীবনি বাংলায় লিপিবদ্ধ করে দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল । বর্তমান ভদন্ত উ. পমোক্ষা মহাস্থবির মহোদয় সুযোগ্য উত্তরসুরী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন ।
১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মানিকছড়ি মহামুনি মন্দিরটিও অত্র রাজ পরিবারের অন্যতম পুণ্যতীর্থ হিসেবে প্রতিবছর কার্তিক পূর্ণিমায় বিশাল মেলা বসে । এটি পঞ্চমতম রাজা নিপ্রু চাই মারমা কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করা হয় । বর্তমানে শ্রীমৎ উত্তমা মহাস্থবির তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে । বহু ভিক্ষু শ্রামণদের ধর্মীয় ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে । মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে প্রতিষ্ঠিত মহামুনি মন্দিরটিও (মং রাজার) বদান্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । উল্লেখ্য যে, ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামেরই পুণ্য পুরুষ চান্দা ঠাকুর নামে খ্যাত সুদুর আরাকানের মহামুনির অনুকরণে অত্র বিহারে বিশাল আকার বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণ করেন সর্ব সাধারণের পূজা ও প্রার্থনার ব্যবস্থা করে অক্ষয় র্কীত্তি স্থাপন করে গেছেন । প্রবাদ আছে- ‘ছোট খাটো চান্দা ঠাকুর এত বুদ্ধি জানে, আকিয়াবের মহামুনি কদলপুরে আনে’। অত্র বিহারে প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা, বড়ুয়া ইত্যাদি সম্প্রদায়ের বিশাল মিলন মেলা বসে । বান্দরবান উজানিপাড়া মহা বৌদ্ধ মন্দিরও একটি রাজপরিবারের দ্বারাই নির্মিত বৌদ্ধ বিহার । এখানে বহু ভিক্ষু-শ্রমণ ত্রিপিটক শাস্ত্রের উপর লেখা-পড়া করে থাকে । বর্তমানে বিহারাধ্যক্ষ উ. চান্দা ওয়ারা মহাস্থবির কর্তৃক পরিচালিত হয়ে থাকে । টেকনাফের নিলা এলাকায় মহাপণ্ডিত উ. পাণ্ডিতা মহাস্থবির একজন আন্তজার্তিকভাবে পরিচিত একজন সাংঘিক ব্যক্তিত্ব । তিনি লণ্ডণ থেকে বি, এ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন । সেখানেও একটি প্রাচীন চৈত্য মন্দির (জাদী) আছে । প্রতিবছর মেলা বসে এবং বৌদ্ধদেশ মায়ানমার আরাকান থেকেও পূজা দেওয়ার অসংখ্য লোক সমাগম হয় । অত্র এলাকায় বসবাসকারী বৌদ্ধদের অস্তিত্ব রক্ষা, ধর্মীয় সংস্কার বিশেষতঃ শিক্ষার উন্নতি তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য ।
২০০০ খিষ্টাব্দে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ভিক্ষুদের দ্বারা ‘ত্রিরত্ন ভিক্ষু এসোশিয়েশন’ নামে আরেকটি সংস্থা গড়ে উঠেছে । সম্প্রতি বিলাইছড়ি এলাকায় ঐ সংস্থার নামে প্রায় পঞ্চাশ একর জমি সংগ্রহ করে বির্দশন ভাবনা কেন্দ্র স্থাপন পূর্বক জনকল্যাণ মূলক কার্যক্রম শুরু করেছে । রাজস্থলীর কর্মবীর ধর্মানন্দ মহাস্থবির এই সংস্থার সভাপতি এবং সম্পাদক বিনয় তিষ্য থেরো । তঞ্চঙ্গ্যা বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় গুরু ভদন্ত ক্ষেমাঙ্কর মহাস্থবির অসাধারণ শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন । তিনি অভিধর্ম পিটকের কয়েকটি খণ্ড বাংলা ভাষায় অনুদিত করে প্রকাশ করে গেছেন । তিনি রাজানগর রাজবিহার এবং ওয়াগা বিহারসহ আরো বহু বিহারের সার্বিক উন্নয়নসহ সমাজ সংস্কারের বিরল ভূমিকা রেখেছিলেন ।
খাগড়াছড়ি সদর বেতছড়ি গ্রামে সম্প্রতি প্রায় পঞ্চাশ একর জমি নিয়ে রাজগুরু অগ্রবংশ ও সাধকশ্রেষ্ঠ বনভন্তের নামাঙ্কিত বির্দশন ভাবনা কেন্দ্র ও ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । অত্র এলাকা তথা মহান ভিক্ষুদের জন্য অত্যন্ত শুভ সংবাদ । তাছাড়া আরো বহু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে তথ্য না পাওয়ার জন্য তা উল্লেখ করা সম্ভবপর হয়নি । সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে তাও পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ করা হবে । আরো অসংখ্য নাম না জানা অনেক ভিক্ষুর কার্যক্রমের কথা তুলে ধরতে পারলাম না বলে দুঃখিত । পরবর্তীতে কৃতজ্ঞ চিত্তে তথ্যাদি ফেলে অবশ্যই স্বগৌরবে জন সমক্ষে প্রকাশ করার আশা রাখি ।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, অষ্টম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত ক্রমাগত চারশত বছর পাল রাজত্বের সময়কালকে বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশের স্বর্ণ যুগ বলা হয়েছে । এদেশে পাল আমলে শিক্ষা, সংস্কৃতি , কৃষ্টি, সভ্যতা, স্থাপত্য ও শিল্পকলা বিকাশের অভূতপূর্ব অবদান শুধু রেখে যাননি বরং পশ্চিমা দেশে যখন শিক্ষার আলো প্রবেশ করেনি তখন এ বাংলায় চট্টগ্রামে পণ্ডিত বিহার, কুমিল্লাই শালবন বিহার, রাজশাহীতে সোমপুর বিহার এবং বগুড়ায় মহাস্থানগড় বিহার (বিশ্ববিদ্যালয়) পাল রাজাদের ঐকান্তিক পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । এই সকল বিদ্যাপীঠে দেশ-বিদেশের অসংখ্য বিদ্যার্থীগণ এসে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভের সুযোগ হয়েছিল । এসব বিদ্যাপীঠে বসে চুরাশি সিদ্ধাচার্যগণ চর্যাগীতি রচনা করে গেছেন । এ চর্যাগীতি থেকে বাংলা ভাষার গোড়া পত্তন হয়েছে । দুর্ভাগ্য বিষয় এয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে অন্ধকারময় যুগ হিসেবে পরিচিত । উনবিংশ শতাব্দীর অথার্ৎ রেনেঁসার যুগ সন্ধিক্ষণ থেকে বৌদ্ধধর্মের ক্ষীণ প্রভাব অনেকটা জাগ্রত হলেও এ অঞ্চলে প্রচলিত বৌদ্ধধর্মকে আমরা বিকৃত বৌদ্ধধর্ম বলা যায় । না হিন্দু না মুসলিম এবং না বৌদ্ধ এই ছিল অবস্থান । ক্রমে তা বিবর্তিত হয়ে তান্ত্রিক মহাযানী বৌদ্ধধর্ম হিসেবে প্রাধান্য লাভ করেছিল । এখনও সেই প্রভাব কিছু কিছু এলাকায় দেখা যায় । বিংশ শতকের এই তিন পার্বত্য চট্টগ্রামে থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর নতুন করে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার-প্রসারের ফলে সরল প্রাণ বৌদ্ধ সমাজের মধ্যে এক বিশাল প্রভাব পড়েছিল । শ্রী মুকুন্দ চাকমা তাঁর এক প্রবন্ধ থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশকালকে তিন ভাগে বিভাজন করে দেখিয়েছেন- যথা: ব্রিটিশ শাসনের শেষকাল পর্যন্ত রাজগুরু প্রিয়রত্ন মহাস্থবিরের থেরবাদী ধর্মের প্রতিষ্ঠাকাল। পাকিস্থানের শাসন আমলেকে বলতে পারি, অগ্রবংশ ভন্তের সংস্কার কাল এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ সময়কে পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ ও বনভন্তের সাম্প্রতিককাল ( রাজগুরু, সম্পাদক তেজবংশ স্থবি,২০০৮. পৃঃ ২৩০)।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার-প্রসারে সমাজ ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে নিজের জীবন উৎর্সগ করে আরো যাঁরা অনন্য ভূমিকা রাখেন তাঁরা হচ্ছেন- সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের ১৯৩২ খ্রিষ্ঠাব্দে রুপকার বড়দাম গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতার নাম যামিনী রঞ্জন চাকমা মাতা সুমিত্রা দেবী চাকমা। তিনি ১৯৫৩ খ্রিষ্ঠাব্দে রাঙ্গামাটি রাজ বিহাবে শ্রীমৎ আনন্দ মোহন স্থবিরের নিকট প্রব্রজ্যা গ্রজন করেন। ১৯৫৪ খ্রিষ্ঠাব্দে শ্রীমৎ পুঞ্ঞাস্বামী ভিক্খু প্রচেষ্ঠায় উপসম্পদা গ্রহন করেন । ২০০৮ খ্রিষ্ঠাব্দে রাঙ্গামটি রাজবিহারে সংঘরাজ রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রয়া অনুষ্ঠানে সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন । ২০১০ খ্রিষ্ঠাব্দে পরলোক গমন করেন । সংঘরাজ ভদন্ত অভয়তিষ্য মহাথের, তিনি ১৯৩৫ খ্রিষ্ঠাব্দে শুভলং জুরাছড়ি ঘিলাতলী গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি ১৯৫৬ খ্রিষ্ঠাব্দে কার্তিক মাসে শ্রীমৎ প্রজ্ঞাসার মহাস্থবিরের নিকট প্রব্রজ্যা গ্রহন করেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্ঠাব্দে শ্রীমৎ পঞ্ঞাস্বামী মহাস্থবিরের উপধ্যায়ত্বে উপসম্পদা গ্রহন করেন। ২০০৮ খ্রিষ্ঠাব্দে রাঙ্গামটি রাজবিহারে সংঘরাজ রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রয়া অনুষ্ঠানে উপ-সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন । ২০১০ খ্রিষ্ঠাব্দে সংঘরাজ সুগতপ্রিয় মহাথেরোর জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রয়া অনুষ্ঠানে সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন । ২০১০ খ্রিষ্ঠাব্দে পরলোক গমন করেন উ.পাণ্ডিতা মহাথের (বরকল সদর বৌদ্ধ বিহার), শ্রদ্ধালংকার মহাথের ( ভেদভেদী সংঘরাম বিহার), বোধিপাল মহাথের (গামাড়ী ঢালা বনবিহার), সত্যনন্দ মহাথের (রাঙ্গাপানি মিলন বিহার), সুমনালংকার মহাথের (পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন), ধর্মকীত্তি মহাথের (রাঙ্গাপানি মিলন বিহার), প্রজ্ঞালংকার মহাথের (বনসংঘ), চিত্তানন্দ মহাথের, পূর্নজ্যোতি মহাথের ( রাঙ্গামাটি মৈত্রী বিহার), নন্দপাল মহাথের (বনসংঘ), নন্দপাল মহাথের (লতিবান আর্দশ বৌদ্ধ বিহার), যবনা তিষ্য মহাথের, তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের আর্যানন্দ মহাস্থবির, রাজস্থলী মৈত্রী বিহারের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শ্রীমৎ শান্ত জ্যোতি মহাস্থবির প্রমূখ ভিক্ষু সংঘ।
এখন আমরা এক বিংশ শতাব্দির চ্যালেঞ্জের দ্বার প্রান্তে উপনীত। প্রাচীন সংস্কারমুক্ত তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মকে অনেক পিছনে ফেলে থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে এগিয়ে চলেছে তা বৌদ্ধ জাতি তথা মহান ভিক্ষুসংঘের জন্য অত্যন্ত মঙ্গলময় বার্তা বলা যায় । এ ব্যাপারে অনেক উচ্চ শিক্ষিত এবং পণ্ডিত গৃহী সমাজ সংস্কারক, সংগঠক, সাহিত্যিকও লেখকদের অবদানও কম নয় । সীমাবদ্ধতারকারণে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করতে পারলাম না বলে আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।
লেখেক পরিচিতি ঃ অধ্যাপক, পালি ও সংস্কৃত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়, উপাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, বুড্ডিস্ট রিচার্স এ- পাবলিকেশন সেন্টার।
(নন্দসার স্মারকে প্রকাশিত, ২৯ নভেম্বর ২০১৩ইং)

ফ্যাসিবাদ।

 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে...