নশ্বর সুজয়
(সংক্ষেপে)
মানুষ মাত্রই একটি কৌতুহলী প্রাণী। বস্তুত বিজ্ঞান বলে আমরা যা বুঝি তাও কৌতুহলের মাপকাঠিতে চলে। এই কৌতুহলের উপর নির্ভর হয়ে বিজ্ঞান অনেক অনেক অজানা বিষয়ের সমাধানে তৎপর। বর্তমানে এই যান্ত্রিকবিশ্বই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এই বিজ্ঞান শুধুই মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয় গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারচেয়েও বহুধাপ এগিয়ে। ঈশ্বর গড সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়েও এদের বিরাম নাই। তারা পৃথিবীর রহস্যময় সৃষ্টি তত্ত্বে এমনটাই সিদ্ধান্তে উপনীত যে-তাদের দাবী সমগ্র মহাকাশের যাবতীয় বস্তু দাড়িয়ে আছে periodic নামক টেবিলের উপর। যা ১০২ টা মোল দ্বারা গঠিত। মহাবিশ্বের এমন কোন ক্ষুদ্র বা বৃহৎ বস্তুও অবশিষ্ট নেই যা এই মোল ছাড়া গঠিত নয় । গ্রহ, তাঁরা, মাটি, আকাশ, জল সব কিছু হতে এই মোলগুলোর বন্ধন লাগবেই লাগবে । এমনকি আমাদের শরীরও এই দিয়ে তৈরি । যদি ঈশ্বরের কোন আকার থাকে বা ঈশ্বর যদি কোন রূপে থাকেন তাহলে এই মোলগুলো দিয়েই তাকে রূপ ধারণ করতে হবে । বিশ্বের প্রায় ধর্ম গ্রন্থেও লেখা আছে ঈশ্বর বিরাজমান সমস্ত জীব আর বস্তুর মধ্যে ।
তাহলে ঈশ্বর গড বলতে আমরা কি বুঝব ? এই হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম, বোরন, কার্বন ইত্যাদি হল গড ঈশ্বর ভগবানের অস্তিত্ব ? কিন্তু কিভাবে ?
বেশকিছু ধর্ম বা ধর্ম গ্রন্থের দাবী পৃথিবীর বাইরে সাতটা আকাশ আছে। যাকে ওরা বলে সাত আসমান।
কিন্তু বিজ্ঞানের দাবী ভিন্ন। বিজ্ঞান বলে পৃথিবীর বাহিরেও অসংখ্য আকাশ রয়েছে। পৃথিবী থেকে কোটি গুনে বৃহৎ গ্রহ, নক্ষত্র রয়েছে। এবং এদের সংখ্যাও কোটি কোটি । অগণিত , ধারনার বাইরে।
উইকিপিডিয়া সুত্র বলছে- সারা মহাবিশ্বের টোটাল শক্তির মধ্যে মহাবিশ্বের প্রায় ৫০ হাজার গ্যালাক্সি এর সমস্ত তারা , গ্রহ এবং প্রাণীকুল মাত্র ৫% শক্তি দ্বারা গঠিত । বাকি শক্তির ৬৮% এখনও উন্মুক্তই হয়নি , যাকে বিজ্ঞানে বলছে dark energy । আর বাকি dark matter ( ২৭%) হল এই অন্ধকারের উৎস ।
তথ্যটি সম্পূর্ণ নয় কিন্তু বিষয় হল পুরো শক্তির নগণ্য শতাংশ শক্তি দিয়ে তৈরি এই পৃথিবীর মধ্যে আমরা বিভিন্ন বিভিন্ন শক্তির যে উপাসনা করি তার মুল শক্তি কি অন্য ? যেমন ধরুন ভগবানগুলো হিন্দুদের দায়িত্ব নিয়ে আছে , আল্লা মুসলিমদের , গড খ্রিস্টানদের, এরকম আরও আছে এদের কন্ট্রোল করে তবে কে ? যদি এটা মিথ্যে হয় তবে সত্যটা কি ? সব ধর্মের দাবী তারাই সত্য তবে বাকিরা মিথ্যে প্রমাণিত হয় না কেন ?
১০২ টা মোলের জন্ম নেই মৃত্যু নেই । আছে শুধু সংযুক্তিকরণ আর বিচ্ছেদ । পৃথিবীর শুরু সেই মোলের সংযুক্তি ছিল আর কেয়ামত বা প্রলয় হবে সেই মোলগুলোর বিচ্ছুরণ । আবার তারা অন্য রাসায়নিক প্রক্রিয়া করে অন্য পৃথিবী বানাবে তবে তিন দিন কি সাত দিনে কিনা জানি না । তবে এই মোলগুলোর সৃষ্টিকর্তা কে তা জানতে না পারা অব্দি মোলগুলোকেই ঈশ্বর মানা যুক্তিপূর্ণ নয় কি ? বিভিন্ন ঈশ্বরের নামে লড়ার চেয়ে ঈশ্বর নিজের মধ্যে আছে মনে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি ? ধর্মকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মিথ্যা বেলুন না বানিয়ে নিজের আত্মার মধ্যে আত্মস্থ করা প্রকৃত ধার্মিকের কাজ নয় কি ?
পরিশেষে একটি কথা বলি- আপনি যদি সতি্যই সতি্যই প্রকৃত বুদ্ধ দর্শন বিষয়ে ধারণা রাখেন তাহলে এতোক্ষণ যা যা আলোচনা করলাম তার পুরোটাই মিলিয়ে নিতে পারবেন এ বুদ্ধদর্শনে।
কারণ বৌদ্ধ দর্শনে ঈশ্বরকে স্বীকার করে না। তারা জানে এই পৃথিবীর সবকিছু আমি তুমি পশুপক্ষী লতাগুম্ম সবই প্রকৃতির সৃজন মাত্র।
সুত্তপিটকের রতনসুত্তে উল্লেখ্ আছে শতসহস্র কোটি চক্রবালের কথা। সেখানেও অশরীরী প্রাণের অস্তিত্বের কথাও বুদ্ধ স্বীকার করেছিলেন।
এছাড়াও মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮) উল্লেখ্ আছে-
অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।
( প্রতিত্যসমুদ্পাদ )
প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে- ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।
এছাড়াও বিজ্ঞানের মোল বিষয়টিকে আপনি বুদ্ধদর্শনের সৃষ্টিতত্ত্বের এই নীতি সাহায্যে মিলিয়ে নিতে পারবেন- সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম
খ. চিত্ত নিয়ম
গ. বীজ নিয়ম
ঘ. কর্ম নিয়ম এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম
এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন