মঙ্গলবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৭

ফ্যাসিবাদ।


 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে মনে করে। রাষ্ট্র হচ্ছে বর্ম, নেপথ্যে থাকে একটি সর্বগ্রাসী দল বা গোষ্ঠী, ফ্যাসিবাদ যাদের আদর্শ। ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্রের গুরুত্বের ওপর জোর দেয়া হয়। ফ্যাসিবাদ সেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বিরোধী, যে গণতন্ত্রে জাতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে বিচার করা হয়।
 #ফ্যাসিবাদ-এ ভিন্নমতের কোন ঠাঁই নেই। এ জন্য ফ্যাসিবাদে ভিন্নমতকে সহ্য না করে দমন করা হয়।
পৃথিবীতেই একটি অত্যন্ত আলোচনা, সমালোচনা ও দুশ্চিন্তার ডিসকোর্স। এটি মানুষের বিকাশের জন্য হুমকি স্বরুপ। কিন্তু ফ্যাসিবাদের চরিত্র, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য; কিভাবে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র বিরাজ করে তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারার দরুণ ব্যর্থ হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম। সমাজ ও ব্যক্তিপরিসরে গভীরভাবে প্রোথিত থাকে ফ্যাসিবাদের শর্ত ও বীজ। ফ্যাসিবাদ একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনকে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের মতবাদ। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে – সামরিক স্বৈরতন্ত্রের কোন জনসমর্থন থাকেনা, অপরদিকে ফ্যাসিবাদের বৈধতা চেতন কিংবা অবচেতনভাবে জনগণের কাছ থেকেই আসে। ফলে,একটি চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় দমন-পীড়ণ-নিপীড়ণ-শোষণে সর্বসাধারণের জীবন অতিষ্ঠ হলেও ঠিক কী উপায়ে আন্দোলন সংগঠন ও মুক্তি অর্জন সম্ভব সেই ব্যাপারে জনগণ সম্পূর্ণভাবে থাকে অন্ধকারে।এমনকি দার্শনিক ভিত্তি ছাড়াও ফ্যাসিবাদ টিকতে পারেনা। জার্মানীতিতে #হিটলার’এর আবির্ভাবের পূর্বে শোপেনহাওয়ার-নীৎসে প্রমুখ দার্শনিকরা এই মতবাদের পক্ষে সমর্থন ও প্রচারণা চালান। শোপেনহাওয়ার খুঁজছিলেন একজন ‘জিনিয়াস’; নীৎসে খুঁজছিলেন একজন ‘সুপারম্যান’। পরবর্তীতে হিটলারের মত একজন ফ্যাসিস্ট শাসক জার্মানীর রাষ্ট্র ক্ষমতায় কিভাবে আবির্ভূত হয় তা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়না। মানবেন্দ্রনাথ রায় তাঁর ‘ফ্যাসিজম’ বইটিতে ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সমাজ-রাষ্ট্রকাঠামোয় এর বিস্তারের প্রকৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এটি পাঠ করা আবশ্যক কারণ এই আজকে পর্যন্ত পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ফ্যাসিবাদ বিরাজ করছে দোর্দন্ড প্রতাপে। ফ্যাসিবাদের শর্ত ও বীজ এবং জনগণ ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে তা অনুধাবনের মধ্যেই রয়েছে ভবিষ্যতের মানবমুক্তির পথ। আমেরিকা বর্তমান পৃথিবীর ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্র এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই কেন্দ্রের মধ্যমণি। সুতরাং, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবির্ভাবের পেছনে সমগ্র বিশ্বের মানুষ কোন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে তার নির্মোহ স্বরুপ অন্বেষণ করাই মুক্তিকামী মানুষের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।]
তুলনামুলকভাবে #ফ্যাসিবাদ একটি নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ। এটি ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম ইতালিতে আবির্ভূত হয়। তখন থেকেই এটি ইউরোপের সকল দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বেশ কয়েকটিতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর সহসা আবির্ভাব এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব স্বাভাবিকভাবেই একে বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য বিষয়ে পরিণত করছে। তবে ফ্যাসিবাদ কর্তৃক সংঘটিত নৃশংসতা সমগ্র প্রগতিশীল ও মুক্তিকামী পৃথিবীকে মর্মাহত করতেও সময় নেয়নি। এর পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক লেখালেখি হচ্ছে এবং হয়েছে। যুক্তিপ্রদর্শনকারী এবং স্তুতিকারী কোনটিরই অভাব না থাকার পরেও ফ্যাসিবাদকে রাজনৈতিকভাবে পশ্চাদগামী এবং সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল পরিবর্তন বলে আখ্যায়িত করা যায়, ক্ষয়প্রাপ্ত পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার চরম প্রচেষ্টা হিশেবে একে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধবংসাত্মক প্রভাব কর্তৃক সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ফ্যাসিবাদের উৎস। জার্মানিতে এর সাফল্যের পেছনে নানা আপাতযুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা গিয়েছিলো।
তথাপি আমাদের সময়ের এই বিকট অস্বাভাবিকতাকে নিয়ে সেই অর্থে তীক্ষ্ণ অনুসন্ধান হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে এটি যুদ্ধোত্তর কোন আবির্ভাব নয়। এমন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ করেই ঘটতে পারেনা। ইতিহাসে বেশ দীর্ঘকালব্যাপী ঘটতে থাকা দার্শনিক ভাবনা বিকাশের অবধারিত ফলাফল হচ্ছে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ। যদি ফ্যাসিবাদ একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে তবে এর মতাদর্শগত ভিত্তি নিহিত রয়েছে দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয়ে থাকে ফ্যাসিবাদের কোন দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা এই প্রপঞ্চটিকে বুঝতে বাধা দেয়। সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিশেবে আবির্ভাবের পূর্বেই ফ্যাসিবাদ একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন অর্জন করে এবং তা আঠারো-ঊনিশ শতকের নানা বৈপ্লবিক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের রসদ যোগানো বৈপ্লবিক দর্শনের বিপরীত। ফ্যাসিবাদী দর্শন উত্তর-হেগেলিয়ান আদর্শের যৌক্তিক পরিণতি। অত্যাধুনিক দৃষ্টবাদ (বৈজ্ঞানিক তথ্যই জ্ঞানের ভিত্তি ও সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র নিশ্চত পথ- অগাস্ট কোঁৎ এর মতবাদ-অনুবাদক), নব্য বস্তুবাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের সেই ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ঘরানাসমূহ যা ভাববাদকে বাতিল করার দাবি করে নতুন একপ্রকারের দার্শনিক অতীন্দ্রিয়বাদের অন্বেষণ করে। সেইসব ছদ্মবেশী বা অসৎ ভাবাদর্শ সমূহ প্রয়োগবাদ ও নব্য-হেগেলিয়ানবাদে গিয়ে শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে। প্রথমটি হীন বস্তুবাদের ইন্দ্রিয়সর্বস্ব উদরপূর্তিকরণ দর্শনের সাথে ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সমন্বয় করে এবং পরেরটি জঙ্গিবাদী প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে হেগেলিয়ান যুক্তিশাস্ত্রের বৈপ্লবিক বিকৃতি ঘটায়।ফ্যাসিবাদ নৈতিকতা, ন্যায়, স্বাধীনতার সকল পার্থিব মানকে লঙ্ঘন করে ঐশ্বরিক অনুমোদন দাবি করে। ইতালীয় ফ্যাসিবাদের আনুষ্ঠানিক দার্শনিক জিওভানি জেন্টাইল প্রথম এই দাবিটিকে ত্বরান্বিত করেন। তিনি বলেন, “মানুষ প্রকৃতিগত দিক থেকেই ধার্মিক। চিন্তার অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরের গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া। যে যত চিন্তা করবে সে তত ঈশ্বরের সান্নিধ্যে নিজেকে অনুভব করবে। যেহেতু মানুষের তুলনায় ঈশ্বরই সবকিছু। মানুষ কিছুই নয়” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক পশ্চাৎপদতাকে ন্যায়সঙ্গত করার লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদী #দার্শনিক আধুনিক ইউরোপের একেবারে গোড়ার মৈলিকসত্য মানবতাবাদকে উপেক্ষা করেছেন।পার্থিব মুক্তির জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হবার পূর্বে মানুষকে পরলৌকিক অভিভাবকত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হয়েছে। তাই এই কষ্টার্জিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক সুবিধাদি থেকে মানুষকে বঞ্চিত করতে নবজাগরণের সময়কাল থেকে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক মুক্তি হতে তাকে প্রবঞ্চিত করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।ফ্যাসিবাদী দর্শন কর্তৃক প্রচারিত মানুষের অতি-ধার্মিক আত্মবিলোপ হচ্ছে ঘৃণ্য বস্তুবাদের বহি:প্রকাশ যা বৈপ্লবিক দার্শনিক বস্তুবাদকে বিরোধীতার লক্ষ্যে উত্থিত হয়। ফ্যাসিবাদী বিশ্বাস মেনে নেয়া নশ্বর মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের ধর্মতত্ত্বের সকল বশ্যতা স্বীকার করা সত্তায় পরিণত করে শুধুমাত্র ঈশ্বরের ক্রীড়ানক হিশেবে পুনরুজ্জীবিত হয়, ঈশ্বরের সংকল্প এবং কর্মপ্রক্রিয়া সকল প্রকার পার্থিব অনুশাসনের ঊর্ধে বলে ধরে নেয়। স্বর্গীয় উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কৃত এহেন বর্বরতা ও সহিংসতামূলক কর্মকান্ড যাতে করে বৈধতা পায়, মহাবিশ্বে অনুপ্রবেশ করতে পারে। চিন্তার প্রক্রিয়াকে যাতে করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাই প্রতারণামূলকভাবে এদের “ঈশ্বরের ধ্যান” হিসেবে হাজির করা হয়। এইসব কর্মকান্ড ঐশ্বরিকপন্থায় অনুপ্রাণিত করা হয়। ঈশ্বর অধ:পতিত ও দুর্দশাগ্রস্ত পুঁজিবাদের ঢাল হয়ে ওঠেন এবং কুরুচিপূর্ণ বস্তুবাদের জরাগ্রস্ত ব্যবস্থার প্রত্যেক গোঁড়া ঠিকাদার স্বর্গীয় ভাবধারায় অনুপ্রাণিত ক্রীড়ানকে পরিণত হয়। এই চাতুর্যপূর্ণ কৌশলের মাধ্যমে ঈশ্বরের ক্রীড়ানকেরা অন্যদের স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের জন্য একচ্ছত্র স্বেচ্ছাচারিতা বহাল রাখে। ফ্যাসিস্ট শাসক পরিণত হয় অতিমানবে।যাইহোক, আত্মপ্রত্যাখানের এই অতি-ধর্মীয় মতবাদ ফ্যাসিবাদের সর্বগ্রাহী দার্শনিক জেন্টাইলকে “মানুষের অন্তহীন ও অবিনশ্বর অস্তিত্ব ” আবিষ্কার করা থেকে নিরুৎসাহিত করেনা। একটি জরাগ্রস্ত সামাজিক ব্যবস্থাকে সংরক্ষণের ঐতিহাসিক অসম্ভব কাজে নিযুক্ত মানুষের এই ‘পবিত্র’ উদ্দেশ্য অবশ্যই “অন্তহীন, নি:শর্ত ও স্বার্থহীন” হতে হবে। জেন্টাইল আত্মপ্রত্যাখান ও ফ্যাসিস্ট শাসকের সর্বেসর্বাত্বের বন্দনার মতো চূড়ান্ত পরস্পর-বিরোধী দুটি মতবাদকে “দার্শনিক” ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কোন অসুবিধাবোধ করেননি। তিনি একজন নব্য-হেগেলিয়ান এবং তিনি জানেন উদ্দেশ্য চরিতার্থের লক্ষ্যে কিভাবে তর্কশাস্ত্রের বিকৃতি ঘটাতে হয়। “আধ্যাত্মবাদী” সুবিধাজনক দর্শন ও প্রয়োগবাদও এক্ষেত্রে তাঁকে সহায়তা করেছে। “ভাবনা হচ্ছে ঈশ্বরের ধ্যান” এই মতবাদে দীক্ষিত করে তিনি মূলত এমন একটি ভূমিকা পালন করেন যেটিকে তিনি যুক্তিশাস্ত্রের একটি অনবদ্য কৌশলগত অনুষঙ্গ বলে বিশ্বাস করেন।
“#ঈশ্বর এবং ভাবনা জীবনের দুই বিপরীত প্রান্তের প্রতিনিধিত্ব করে। দুটোই আবশ্যকীয় এবং অপরিহার্য তথাপি একে অন্যের বিপরীত ও পরস্পর বিরোধী” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)।
উপরন্তু, ঈশ্বর এবং মানুষকে জেন্টাইল ঘোষণা করেন, “আত্মউপলব্ধির একটি শ্বাশ্বত গতির নমনীয় ঐক্য; একটি জীবন্ত এবং সেইসূত্রে নিরন্তর ঐক্য যা সবসময় আত্মসত্তার প্রতি অসন্তুষ্ট” (পূর্বোক্ত)। হেগেলিয়ান তর্কশাস্ত্রের করুণ ব্যঙ্গাত্মক বর্ণনা এই নব্য-পান্ডিত্যচর্চা বেশ অদ্ভূতভাবেই হিন্দু অতীন্দ্রিয়বাদেরসাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অতীন্দ্রিয়বাদ কী? এটা কি এমন কোন মানসিক আত্মসংযমহীন অবস্থা যা তমসাচ্ছন্ন জ্ঞান-সংস্কৃতির উপর আস্থাশীল করে এবং পরীক্ষালব্ধভাবে প্রতিপাদ্য বৈজ্ঞানিক সত্যও যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন দার্শনিক ধারণাকে প্রত্যাখান করে দেয়? জেন্টাইল কর্তৃক ব্যাখ্যাত ফ্যাসিবাদী দর্শন মূলত অতীন্দ্রিয়বাদেরই সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা। ভাবনার অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরের উপাসনা করা। তবুও তাঁর সাথে ভাবনার সম্পর্ক বৈপরীত্য, সাংঘর্ষিক!লক্ষ্য একই হবার পরেও কিভাবে সক্রিয় বৈপরীত্যের কর্মসম্পাদনকে নিষ্ক্রিয় ধ্যানের জগতের সাথে সনাক্ত করা যেতে পারে তা বোঝা যুক্তিবাদী মনের আয়ত্তের বাইরে। কিন্তু আধ্যাত্মবাদী ধারণাও যুক্তির সীমারবাইরে। সুতরাং ভাবনাকে গভীর ধ্যানের দ্বারা চিহ্নিত করা একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক উদ্ভাবন। কোন একটি বিষয়কে নিয়ে ভেবে আমরা জ্ঞানপ্রাপ্ত হই। ধ্যান এমন কোন ফললাভের দিকে পরিচালিত করেনা। এর মানে হচ্ছে ইতোমধ্যে জ্ঞাত বিষয়ের মধ্যেই বিরাজ করা। কেউ যদি ধর্মীয় পূর্বানুমান গুলো দিয়ে শুরু করে তবে সে কেবলমাত্র ঈশ্বরের উপর আরোপিত গুণগুলোই ধ্যান করতে পারে। কিন্তু পূর্বানুমান তার ধ্যানের উদ্দেশ্যকে ভাবনা নামক মানসিক কাজ থেকে দূরে স্থাপন করে। তাই এটা স্রেফ চিন্তার একটি সম্পূর্ণ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব যা ভাবনাকে ধ্যান কর্তৃক চিহ্নিত হতে দেয়না অথবা জ্ঞানতত্ত্বের মূলনীতির একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতি সাধন।

যাইহোক, এই অতীন্দ্রিয়বাদ যতই বিশৃঙ্খলাপূর্ণ এবং তমসাচ্ছন্ন হোক না কেন এর প্রায়োগিক উপপাদন খুবই স্পষ্ট।এগুলো সম্পূর্ণ চূড়ান্ত কদর্যভাবে পুরোদস্তুর বস্তুবাদী। হেগেলিয়ান রাষ্ট্রতত্ত্ব অনুপ্রেরণা নিয়ে জেন্টাইল ফ্যাসিস্ট স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে দার্শনিক অনুমোদন হাজির করেন, “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র আলিঙ্গন ও অন্তর্ভূক্ত করে সকল আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ যার মধ্যে ধর্মও রয়েছে। … …. যে রাষ্ট্র অন্য কোন সার্বভৌম ক্ষমতাকে মেনে নেয় সেই রাষ্ট্র আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। যা আধ্যাত্মিক তাই স্বাধীন কিন্তু রাষ্ট্রের – (যা নিজেই আধ্যাত্মিক) ক্ষমতার চূড়ান্ত সীমার মধ্যে” (পূর্বোক্ত)। আধ্যাত্মিক ফ্যাসিবাদী স্বৈরতন্ত্রের স্বর্গারোহিত ক্ষমতা কোন হীন বস্তুবাদী উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত তা “ফ্যাসিবাদী চর্চা” শীর্ষক অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। বুর্জোয়ারা ফ্যাসিবাদী স্বৈরতন্ত্রের নিষ্ঠুর অনুষঙ্গ দ্বারা তাদের হ্রাসমান ক্ষমতাকে রক্ষা করতে “রাজার ঐশ্বরিক অধিকার” এই দাবির উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিতে চায়। রাজার ধারণা অতীত হতে পারে কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত হেগেলিয়ান দার্শনিক মতবাদ অনুযায়ী বিমূর্তভাবে লব্ধ রাষ্ট্রের স্বর্গীয় অনুমোদনের বিশেষ সুবিধা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধভাবে না হলেও যৌক্তিকভাবে গত হওয়া রাজার ধারণা নতুন মোড়কে রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণী দাবি করতেই পারে। “রাজা কোন ভুল করতে পারেনা”- এই মধ্যযুগীয় প্রভুত্বব্যঞ্জক উক্তিকে ফ্যাসিবাদী দার্শনিকেরা “রাষ্ট্র কোন ভুল করতে পারেনা”- এই অনুশাসনমূলক উক্তিতে রুপান্তর করেছেন।

প্রসঙ্গক্রমে এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফ্যাসিবাদের শেকড় গীতার স্বর্গীয় দর্শনে খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে বলা হয়েছে পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষমতা (বিভূতি) হচ্ছে ভগবানের ক্ষমতা। তাই দার্শনিকভাবে ফ্যাসিবাদ নতুন কোন প্রপঞ্চ নয় অথবা এটা বলাও ভুল হবে যে এর কোন দর্শন নেই। ফ্যাসিবাদ জীবনের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির অনিবার্য পরিণতি। গীতা প্রচারিত মতবাদ এবং নব্য-হেগেলিয়ান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের দার্শনিকতত্ত্বের ধারণার মধ্যে সঙ্গত যোগসূত্র খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, ফ্যাসিস্ট স্বৈরতন্ত্রের দর্শন আধুনিক অতীন্দ্রিয়বাদ ও আধ্যাত্মবাদ থেকেই উৎসারিত যা জীবনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া পর্দশন করে। এর ভারতীয় পূর্বপুরুষদের শোপেনহাওয়ারের মধ্যদিয়ে চিহ্নিত করা যায় যাঁর শিষ্য নীটশে ছিলেন ফ্যাসিবাদী দর্শনের জনক। আরও তলিয়ে দেখার পূর্বে, এই বিকট আবির্ভাবের আধ্যাত্মবাদী অবিবেচনার সাথে কিছুটা পরিচিত হওয়া যাক। “ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের একটি গভীর আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য ও যথার্থতা রয়েছে।ফ্যাসিবাদী মতবাদ নিহিত রয়েছে তার কর্মপ্রবাহে। এটা কোন বদ্ধ মতাদর্শিক ব্যবস্থা নয়। এটা একটা নতুন ধরণের ভাবনা, নতুন ধরণের জীবনব্যবস্থা।ধর্মানুভূতি হচ্ছে ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য” (জি.জে-পূর্বোক্ত)। ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য তার কর্মপ্রবাহে পরিস্কারভাবে ব্যক্ত হয়েছে যা এর দার্শনিকের মতে একটু মতবাদ হিশেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফ্যাসিবাদী আন্দোলন মোহমুক্ত পাতি-বুর্জোয়া জনতাকে একটি ধর্মোন্মাদ বাহিনী হিসেবে একত্রিত করে এবং তাদেরকে একটি কূট ধর্মযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় যা জনসাধারণের পুরনো দাসত্বের শেকলেই নতুন প্রলেপ দিয়ে থাকে। ফ্যাসিবাদী শক্তি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দাসদের বিদ্রোহকে সহিংস উপায়ে দমিয়ে রাখে এবং ঘৃণ্য ভূমিকা পালনে একে পৃষ্ঠপোষকতা করে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াতন্ত্র। ফলে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচারী ক্ষমতা লাভে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। ফ্যাসিবাদের “দৃঢ়মূল আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য” প্রত্যক্ষ করা যায় বহু বছর ধরে সংঘটিত অসংখ্য সহিংসতার মধ্যে। এর সবটাই প্রয়োগের দিক থেকে কুরুচিপূর্ণ বস্তুবাদ তথা পুঁজিবাদকে রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব হিশেবে কৃত। এই ধরণের কাজ কিভাবে “দৃঢ় আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যের” সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়? ফ্যাসিস্ট দার্শনিক এর জবাব দেন: ফ্যাসিবাদের কোন নীতি নেই। এটি কোন যৌক্তিক মতাদর্শের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। আধ্যাত্মবাদের কোন কারণ জানা নেই; এর মধ্যে যুক্তির কোন স্থান নেই। ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যের বহি:প্রকাশ ঘটে এর স্বেচ্ছাচারিতায়। পুঁজিবাদী আধিপত্যের উপযোগিতা এই আধ্যাত্মবাদের উন্মত্ত আবির্ভাবের একমাত্র নীতি। ফ্যাসিবাদ নিজেকে প্রকৃত দার্শনিক তত্ত্ব ও যৌক্তিক নীতির বলয়ে জড়াতে চায়না।এটি পুঁজিবাদী সভ্যতার হীন বস্তুবাদ থেকে সমাজের মুক্তির চেষ্টায় রত শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত ধর্মযুদ্ধে যেকোন বর্ম ব্যবহারের ইচ্ছাপোষণ করে। একটি রহস্যজনক স্বর্গীয় ইচ্ছা, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য, ধর্মানুভূতির মতবাদ পার্থিব ক্ষমতার অবাধ স্বেচ্ছাচারিতায় খুবই কাজে আসে যেন একটি অতিমানবিক উদ্দেশ্যের নির্দেশ পালন করা যার কোন অনুশাসন নেই; যার কাছে মানবসৃষ্ট বিধি-বিধানের কোন বৈধতা নেই। তথাপি,জেন্টাইলের মতে, ফ্যাসিবাদ “প্রত্যেকটি বিমূর্ত, যৌক্তিক, অধর্মীয় চিন্তা, এমনকি অপ্রকৃত উদারনীতিবাদ এবং প্রকৃত বস্তুবাদী বন্ধনহীন নির্মাণশৈলীর প্রথা ও ব্যবস্থার” ঘোষিত শত্রু। এখানে আমরা আধ্যাত্মবাদকে তার প্রকৃত তাৎপর্য সমেত নগ্নরুপে পাই। ফ্যাসিবাদ ধর্মসম্বন্ধীয়; তাই এটি যুক্তিবাদকে অনিষ্ট এবং উদারনীতিবাদকে অপ্রকৃত ঘোষণা করে। এটি দার্শনিক বস্তুবাদের বিরুদ্ধে কারণ তা ঘৃণ্য বস্তুবাদী চর্চার সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব। এটি ধর্মের রক্ষাকারী কারণ বিশ্বাস অজ্ঞতার পারিতোষিক বরাদ্দ করে যা গণমানুষকে সহজেই শোষণ উপযোগী করে তোলে।

বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম।

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম
** সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম যে কোন ব্যক্তি, পরিবার তথা সমাজ ও রাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে অপরিহার্য নীতি আলোচনা কর?

উত্তর ঃ সুচনা ঃ সুত্তপিটকের অর্ন্তগত দীর্ঘনিকায়ের অর্থকথা সুমঙ্গল বিলাসীনি গ্রন্থে পূরাণ বর্জ্জিদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ভগবান যখন গৃধ্রকুট পর্বতে অবস্থান করতে ছিলেন। তখন রাজা অজাতশত্রু কর্তৃক প্রেরিত বর্ষকার মন্ত্রীর উক্তিকে বুদ্ধ বর্জ্জিদের সম্পকে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম সম্পর্কে অবগত করেছিলেন। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হল ঃ

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম ঃ ভগবান বুদ্ধ বৈশালীর সারন্দদ চৈত্যে অবস্থান করার সময় বৃজিদের জাতীয় কল্যাণে যে সাতটি উপদেশ প্রদান করেছিলেন সে গুলোকে বৌদ্ধ সাহিত্যে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মরুপে আখ্যায়িত। এই সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মের মধ্যে নিহিত রয়েছে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপন করার অমূল্য উপদেশ। যে কোন ব্যক্তি বা পরিবার তথা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি এতে নিহিত রয়েছে। সে গুলো হল ঃ
১.    তাঁরা যেন সদা সর্বদা অভিন্ন হৃদয়ে সাধারণ সভায় সম্মিলিত হয়। অথার্ৎ বর্জ্জিগণ সর্বদা সম্মিলিত হন; সর্বদা সুম্মিলিত হতে অথার্ৎ গতকল্য সম্মিলিত হয়েছি পরশু ও পূনঃ অদ্য কেন সম্মিলিত হব, তারা এরুপ বলে না। এভাবে একতা ও সংহতি নিহিত আছে।
২.    তাঁরা যেন সকলে একমত হয়ে সংঘবদ্ধ ভাবে সভায় উপস্থিত হয় ও সভা ত্যাগ এবং একমতে সাধারণ কর্তব্য কার্য সম্পাদন করে। অর্থাৎ- বর্জ্জিগণ সম্মিলিত হওয়ার সংকেত পেলে তাদের মধ্যে কেউ এখনতো আমার কাজ আছে বা আমি তো মাঙ্গলিক কাজে ব্যাপৃত আছি এরুপ কোন আপত্তি না করে যে যেভাবে থাকুক না কেন যথা সময়ে সকলে সম্মিলিত হয়ে থাকেন ও কার্য্যাদি সকলে একমত হয়ে সম্পাদন করতঃ এক সঙ্গে বৈঠক হতে উঠে থাকেন এবং এক জনের রোগ, দুঃখ অভাবাদি ঘটলে সকলে মিলিত হয়ে তা প্রতিকার করেন। একের কার্য হলেও তা সকলে সম্পাদন করেন। এখানেও ঐক্য ও সংহতি ও সমাজ পরিচালনার নীতি নিহিত আছে।
৩.    তাঁরা যেন হঠাৎ অবিহিত বিধি ব্যবস্থা গ্রহন না করে বিহিত বিধি ব্যবস্থার উচ্ছেদ না করে এবং যথা বিহীত প্রাচীন বিধি ব্যবস্থা সমূহ পালন করেন। অর্থাৎ- বর্জ্জিগণ পূর্বে যেরুপ বিধি ধর্মতঃ ব্যবস্থাপিত হয়নি এমন কোন বিধি বর্তমানে ব্যবস্থাপিত সুনীতি গুলো ও লংঘন করেনা, পৌরানিক বজ্জীরাজ ধর্মে বিচারাদি সম্পর্কে যে রুপ ব্যবস্থা আছে তার অনুবর্তী হয়ে চলেন। এতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নিহিত আছে।
৪.    বায়োবৃদ্ধ ও জ্ঞান বৃদ্ধদের প্রতি সম্মান প্রর্দশন করে ও তাঁদের উপদেশ মেনে চলে। অর্থাৎ-বর্জ্জিগণ তাদের মধ্যে যাঁরা বৃদ্ধ তাঁদের প্রতি সৎকার গৌরব সম্মান ও পূজা করেন এবং তাঁদের হিতোপদেশ মেনে চলেন। এতে ঐক্য সংহতি ও সৎজীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।
৫.    তাঁরা যেন কুলবধ ুও কুলকমারীদের প্রতি কুব্যবহার বা কোন প্রকার জবর দস্তি না করে। অর্থাৎ, বর্জ্জিগণ কুলবধু ও কুলকুমারিদের প্রতি কুব্যবহার বা বলপূর্বক ধরে এনে স্বীয় গৃহে বাস করান না বা বলাৎকার করেন না। এতে সৎ জীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।
৬.    বর্জ্জিদেশের অভ্যন্তরে ও বর্হিভাগে বর্জ্জিদের প্রতিষ্ঠিত যত চৈত্য আছে, সেগুলো পূজার্চ্চানাদি দ্বারা সম্মান প্রর্দশন করে এবং তাদের প্রাপ্য রাজস্বাদি আতœসাৎ না করে। অর্থাৎ বর্জ্জিগণ তাঁদের স্বীয় নগরে ও বর্হিনগরে বর্জ্জীদের যে সমস্ত চৈত্য আছে তৎসমুদয় সৎকার গেীরব, সম্মান, পূজা যথাবিহিত ভাবে করে থাকেন এবং পূর্বে যে সমস্ত রাজস্ব দেশ সেবার্থে প্রদত্ত তা ফেরত নেয় না ও পূর্বকৃত ধর্ম্মত পূজার পরিহানি করে না।
৭.    তাঁরা যেন বর্জ্জি রাজ্যে অর্হৎদের রক্ষণাবেক্ষন ও ভরণ পোষনের সুব্যবস্থা করে যাতে তদ্দেশাস্থিত অর্হৎতেরা নিবিঘেœ ও শান্তিতে বসবাস করতে পারে এবং ভিন্ন দেশের অর্হৎতেরা ও তাঁদের রাজ্য আগমন করে শান্তি বাস করতে পারে। এতে সৎ জীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপনের জন্য অমূল্য উপদেশ। যা শিক্ষা করে আমাদের সমাজ, জাতি তথা পরিবারকে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপনের জন্য গড়ে তুলতে পারি। 

ভবচক্র।

বুদ্ধমতে ভবচক্রের (wheel of existence) দ্বাদশ নিদান:
.
(১) অবিদ্যা (ignorance) : অবিদ্যা হলো সকল দুঃখের মূল কারণ। অবিদ্যা মানে অজ্ঞান। এখানে অবিদ্যা অভাব-বাচক নয়, বরং বিরোধ-বাচক অর্থে প্রতিপাদন হয়েছে। অর্থাৎ অবিদ্যা মানে জ্ঞানশূন্য নয়, জ্ঞানের বিপক্ষ। যেমন যে বস্তু অবাস্তবিক তাকে বাস্তবিক ভাবা, সে বস্তু দুঃখময় তাকে সুখময় ভাবা, যে বস্তু আত্মা নয় (অনাত্মা, non-self) তাকে আত্মা ভাবা হচ্ছে অবিদ্যার প্রতীক। অবিদ্যা হলো সত্যের সম্যক জ্ঞানের অভাব। অবিদ্যার প্রভাবে আমরা অনিত্য সংসারকে নিত্য বলে মনে করি। বস্তুর যথার্থ স্বরূপকে না জানার কারণ অবিদ্যা প্রতিফলিত হয়ে সংস্কারকে উৎপন্ন করে। অর্থাৎ এই অবিদ্যাজনিত কামনা ও বাসনা থেকে উদ্ভূত হয় আমাদের সংস্কার।
.
(২) সংস্কার (impression) : সংস্কার হলো আমাদের অতীত জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ। অর্থাৎ পূর্বজন্মের কর্মাবস্থাই সংস্কার। পূর্বজন্মের কর্ম ও অনুভবের দরুন উৎপন্ন সূক্ষ্ম ও বাসনাময় বস্তু হলো সংস্কার। সংস্কারের কারণ হচ্ছে অবিদ্যা। অবিদ্যাজনিত কর্ম একপ্রকার শক্তি উৎপন্ন করে। এই শক্তি আবার কর্মের ফল সৃষ্টি করে। এক জীবনের সংস্কার পরের জীবনের চিন্তা ও কর্মকে উৎপন্ন করে। ফলে পূর্বজন্মের সংস্কার থেকেই পরজন্মের বিজ্ঞান বা চেতনা উদ্ভূত হয়।
.
(৩) চেতনা বা বিজ্ঞান (consciousness) : আমাদের বিজ্ঞান বা চেতনার কারণ হলো অতীত জীবনের সংস্কার। চেতনা থাকে বলেই এই জীবদেহ মাতৃগর্ভে দিন দিন বাড়তে থাকে, এই বিজ্ঞানের দরুনই শিশুর শরীর ও মন বিকশিত হয়। অর্থাৎ পূর্বজন্মের সংস্কার চৈতন্যরূপে মাতৃজঠরে আবির্ভূত হয় এবং জীবদেহ গঠন করে। কাজেই চেতনা থেকে উদ্ভূত হয় জীবদেহ বা নামরূপ।
বৌদ্ধদর্শন মতে এই বিজ্ঞান হচ্ছে প্রতিসন্ধি (জন্ম) স্কন্ধ। প্রতিসন্ধি ক্ষণে বা উপপত্তি ক্ষণে গর্ভস্থ পাঁচটি স্কন্ধ (রূপ, বিজ্ঞান, বেদনা, সংজ্ঞা ও সংস্কার) হচ্ছে বিজ্ঞান বা চেতনা। উল্লেখ্য, ভূতব্যতিরিক্ত অমূর্ত তত্ত্বকে বৌদ্ধগণ স্কন্ধ বলেন।
.
(৪) নামরূপ (mind body organism) : দৃশ্যমান শরীর ও মনের সংবলিত সংস্থানবিশেষ হচ্ছে নামরূপ। সোজা কথায় দেহ-মনের সংগঠন। নামরূপের কারণ হলো চেতনা বা বিজ্ঞান। এই নামরূপ থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের ষড়ায়তন বা ছয়টি ইন্দ্রিয়। ইন্দ্রিয়গুলোর নিবাস শরীরে ও মনে। পাঁচ বাহ্যেন্দ্রিয় শরীরে থাকে বলে মনে করা হয় এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মন হচ্ছে আন্তর। নামরূপের অস্তিত্ব না থাকলে এই ছয়টি ইন্দ্রিয় উদ্ভূত হতো না।
.
(৫) ষড়ায়তন (six sense organs) : ষড়ায়তন হলো বিশেষ বিশেষ বিষয়যুক্ত পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও মনের সঙ্কলন। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক হচ্ছে বাহ্য পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মন হচ্ছে আন্তর ইন্দ্রিয়। এই ছয়টি ইন্দ্রিয়ই বিষয়ের সাথে সম্পর্ক গ্রহণ করে। ইন্দ্রিয়ের প্রাদুর্ভাবকাল হতে ইন্দ্রিয়, বিষয় ও চেতনা বা বিজ্ঞানের সন্নিপাতকাল পর্যন্ত হচ্ছে ‘ষড়ায়তন’। এই ছয়টি ইন্দ্রিয় আছে বলেই স্পর্শ সম্ভব হয়। কাজেই ষড়ায়তন থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের স্পর্শ।
.
(৬) স্পর্শ (sense contact) : স্পর্শ হলো আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সাথে তাদের বিষয়ের সংযোগ। যদি বিষয়ের সাথে ইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক না হতো তবে ইন্দ্রিয়ানুভূতি (বেদনা) উদ্ভূত হতো না। সুখ-দুঃখাদির কারণ জ্ঞানের শক্তি উৎপন্ন হবার পূর্ব অবস্থা হচ্ছে স্পর্শ। এই স্পর্শ থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের অনুভূতি বা বেদনা।
.
(৭) বেদনা বা অনুভূতি (sense experience) : আমাদের বেদনা বা অনুভূতির কারণ হলো স্পর্শ। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা উৎপন্ন অনুভবই বেদনা। বুদ্ধমতে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা জীবের সুখাত্মক অনুভূতি হয় (যা জীবের তৃষ্ণাকে মৈথুনের পূর্বে যে-যাবৎ মৈথুনরাগের সমুদাচার না হয় সে-যাবৎ অবস্থা), তাকে ‘বেদনা’ সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এই বেদনা থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের তৃষ্ণা বা ভোগ-বাসনা।
.
(৮) তৃষ্ণা বা ভোগবাসনা (craving) : শব্দ, স্পর্শ, রূপ ইত্যাদি বিষয়ের বা ভোগ্যবস্তুকে ভোগ করার বাসনাই হলো তৃষ্ণা। অর্থাৎ তৃষ্ণা হচ্ছে বিষয়লাভের তীব্র ইচ্ছা। তৃষ্ণার কারণে জীব সাংসারিক বিষয়ের পশ্চাতে অন্ধের মতো দৌঁড়ায়। ভোগ ও মৈথুনের কামনাকারী জীবের অবস্থাই হচ্ছে তৃষ্ণা। রূপাদি কামগুণ ও মৈথুনের প্রতি রাগের সমুদাচার তৃষ্ণার অবস্থা। এর অন্ত হয় যখন এই রাগের প্রভাব থেকে জীব ভোগের পর্যেষ্টি আরম্ভ করে। এই তৃষ্ণা থেকেই উদ্ভূত হয় উপাদান বা বিষয়ের প্রতি অনুরাগ।
.
(৯) উপাদান বা বিষয়ানুরাগ (mental clinging) : উপাদান হলো জাগতিক বিষয়ের প্রতি অনুরাগ বা আসক্তি। যে জীব ভোগের পর্যেষ্টিতে দৌঁড়-ঝাঁপ করে তার সেই অবস্থা হচ্ছে উপাদান। এই উপাদানের কারণ হলো তৃষ্ণা এবং এই উপাদান থেকে উদ্ভূত হয় ভব বা পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রস্তুতি।
.
(১০) ভব (tendency to be born) : ভব কথার অর্থ হলো পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি বা ব্যাকুলতা। মানুষ বা জীবের মধ্যে জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি বিদ্যমান থাকায় তাকে জন্ম গ্রহণ করতে হয়। এই প্রবৃত্তি জীবকে জন্ম নিতে প্রেরিত করে। উপাদানবশে জীব কর্ম করে, যার ফল হচ্ছে অনাগত ভব। ‘ভব’ হচ্ছে কর্ম যার দরুন জন্ম হয়। এ হচ্ছে কর্মভাব। যে অবস্থায় জীব কর্ম করে তা হচ্ছে ভব। যেহেতু ভব থেকে উদ্ভূত হয় জাতি বা জন্ম, কাজেই পুনর্জন্মের কারণ হলো ভব।
.
(১১) জাতি (rebirth) : জাতি শব্দের অর্থ হচ্ছে জন্ম। এ হচ্ছে পুনঃ প্রতিসন্ধি (জন্ম), অর্থাৎ পুনর্জন্ম। মরণান্তর প্রতিসন্ধি কালে পঞ্চস্কন্ধ হচ্ছে জাতি। প্রত্যুৎপন্নভবের আলোচনায় যে অঙ্গকে ‘বিজ্ঞান বা চেতনা’ নাম দেয়া হয় তাকে অনাগত ভবের সমীক্ষায় ‘জাতি’ বলা হয়। (সংশ্লিষ্ট দার্শনিক পরিভাষায় বিষয়টা অনুধাবনে যে জটিল আকার ধারণ করে বাস্তবে তা এতো জটিল নয়; প্রথম আর্যসত্য দ্রষ্টব্য)। সোজা কথায়, জীব যদি জন্মগ্রহণ না করতো বা শরীর ধারণ না করতো তাহলে তাকে জরামরণের অধীন হতে হতো না। কাজেই জীবের জরামরণের কারণ হলো জাতি বা জন্ম।
.
(১২) জরামরণ (old age and death) : জরামরণ মানে জরা ও মরণ। আক্ষরিক অর্থে বার্ধক্য ও মৃত্যু। বৌদ্ধদর্শনে ‘জরামরণ’ বলতে রোগ, শোক, নিরাশা ইত্যাদি সাংসারিক সমস্ত দুঃখকেই বুঝানো হয়েছে। জীবের জরামরণ উদ্ভূত হয় তার জাতি বা জন্মের কারণে। তাই জরামরণাদি হলো সকল দুঃখের কারণ।
 .
এই বারোটি নিদানের মধ্যে প্রথম দুটি পূর্ববর্তী জীবনে, পরের আটটি বর্তমান জীবনে এবং শেষ দুটি ভবিষ্যৎ জীবনে কার্যকরী হয়। এখানে মূল কারণ অবিদ্যা। অবিদ্যার কারণে জীব বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না বলে তৃষ্ণা থেকে মুক্ত হতে পারে না এবং বার বার জন্মচক্রে পতিত হয়ে দুঃখ থেকেও মুক্ত হতে পারে না। এই অবিদ্যা থেকেই অন্য নিদানগুলি আবির্ভূত হয়ে ‘ভবচক্র’ অর্থাৎ অস্তিত্বের বৃত্তকে বারবার আবর্তিত করছে। তাই এই চক্রটির আবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে-
 .
[ অতীত জীবন বা পূর্বজন্ম ]
> ১.অবিদ্যা > ২.সংস্কার >
[ বর্তমান জীবন বা এ জন্ম ]
> ৩.চেতনা বা বিজ্ঞান > ৪.নামরূপ > ৫.ষড়ায়তন > ৬.স্পর্শ > ৭.বেদনা > ৮.তৃষ্ণা > ৯.উপাদান >
[ ভবিষ্যৎ জীবন বা পরজন্ম ]
> ১০.ভব > ১১.জাতি > ১২.জরামরণ > (১.অবিদ্যা)
.
উপরিউক্ত কারণ শৃঙ্খল থেকে বোঝা যায় যে, কার্যের দিক থেকে যেমন দুঃখ সর্বশেষ উৎপন্ন কার্য, তেমনি কারণের দিক থেকে অবিদ্যা সর্বপ্রথম কারণ।
সংগ্রহে : ভদন্ত জ্ঞানবংশ স্থবির।

সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৭

জাতি,জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয়তাবাদী।


ইংরেজি ভাষায় যেমন নেশনেলিজম বলতে আইডলজি অফ নেশনহুড বুঝায় [১]  তেমনি বাংলা ভাষায় জাতীয়তাবাদ কথাটা (জাতি+ঈয় = জাতীয়) ‘জাতি সম্মন্ধীয়’ মতবাদকে বুঝায়। [২] কোন ব্যক্তি বা সমষ্টির আত্ম-পরিচয়কে বাদ দিয়ে যেমন তাদের আত্ম-স্বার্থ ঠিক করা যায় না, তেমনি কোন জাতীয়তাবাদ তার জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থ চিন্তাকে বাদ দিয়ে গড়ে উঠতে পারে না। এই জন্য জাতীয়তাবাদীদের জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থকে শান দিয়ে আগে বাড়তে দেখা যায়।

১.২. জাতি ও নেশন

বাংলা ভাষায় জাতীয়তাবাদের মত জাতি শব্দটা কিন্তু কেবল তৎসম বা খাস সংস্কৃত থেকে নেওয়া নয়; এর একটা আলাদা ফারসি শিকড়ও আছে। সংস্কৃতে জাতি (জন্ [জনন, উৎপত্তি] + তি = জাতি) হল ‘জন্মগত ভাবে ভিন্ন প্রানী’ [৩] বা ইংরেজিতে যাকে বলে স্পিসিস। আর এই অর্থে বর্নাশ্রম ধর্মের চতুর্বর্ন ও তাদের নানা উপ-বর্নের প্রত্যেকটা মানব গোষ্ঠিকে জাতি বলা হয়। অন্যদিকে ফারসিতে জাতি (জাত + বি = জাতি) হল জন্ম নয়, ‘গুন কিংবা কর্মবিভাগ হেতু মনুষ্যবিভাগ’। [৪] যেমন, হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, ইহুদি, ইংরেজ, রাশিয়ান ইত্যাদি। বাংলা জবানে সংস্কৃত ও ফারসি এই দুই অর্থেই জাত ও জাতি কথা দুটার ব্যবহার রয়েছে। [৫] বাংলাভাষিদের মধ্যে নেশনের তরজমা রুপে জাতি কথাটাকে এই দুই আলাদা অর্থে পড়া হয়ে থাকে। বুঝে কিংবা না বুঝে কে কোন অর্থে পড়বেন তা মূলত নির্ভর করে তার কসমোলজি বা জগতদৃষ্টি ও আত্ম-পরিচয়ের উপর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ইংরেজী ঐ (নেশন) শব্দের দ্বারা যে অর্থ প্রকাশ করা হয় সে অর্থ ইহার আগে আমরা ব্যবহার করি নাই।’ এই ব্যবহারিক বোধির হেরফের এড়াবার জন্য যদিও তিনি ‘নেশন কথাটাকে তর্জমা না করিয়া ব্যবহার করাই ভাল’ বলে মত দেন, কিন্তু নেশন কি তা বর্ননা করতে গিয়ে নিজেই আবার বলেন, ‘যাদের মধ্যে জন্মগত বন্ধনের ঐক্য আছে তাহারাই নেশন।’ [৬] আরও পরে তিনিই আবার ‘মহাজাতি সদনের নামকরনের মাধ্যমে সর্বভারতীয় জাতীয় ঐক্যের দ্যোতক “মহাজাতি” শব্দটি আমাদের দিয়ে গেছেন।’ [৭] রবীন্দ্রনাথের এই ঘুরপাক উপরে উল্লেখ করা জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থকে শান দিয়ে আগে বাড়ার জাতীয়তাবাদী প্রবনতার নমুনা মাত্র।

বাংলা ভাষায় দুই ভাবে জাতি কথাটাকে বুঝার কিংবা নেশনের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঘুরপাকের কারন যাই হউক না কেন, এখানে খেয়াল করার ব্যাপার হল ফারসির মত ইংরেজিতেও জন্মগত বন্ধনের ঐক্যের বাইরে নেশন রুপি একটা সংহত মানব গোষ্ঠির ধারনার চল এবং অন্যখানে একই লেবল আটা মানব গোষ্ঠির বেলায় নেশন কথাটার ব্যবহারিক অর্থ বদলে যাওয়া অসম্ভব নয়।

১.৩. নেশনের ধারনা

শুরুতে ইংরেজিতে লেটিন ক্রিয়াপদ নাসসি (Naci) থেকে নেশন কথাটা আসে। এটা শুধু মাত্র অন্য আরেকটা অপরিচিত এলাকার লোকদের বেলায় ব্যবহার করা হত। বিশেষ করে মধ্য যুগের শেষ দিকে ইউরোপের নানা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসা এক একটা অপরিচিত রাজ্য কিংবা অঞ্চলের ছাত্রদের বেলায় তা ব্যবহার করা হত। [৮] অন্যদিকে ১৮ শতকের শেষ দিকে ফ্রান্সে ডালাও ভাবে দেশের সব মানুষকে বুঝাতে নেশন কথাটার ব্যবহার শুরু হয়। নবুলমেন ও যাজক শ্রেনির আর্থিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য মূলক প্রাধান্য দূর করে দেশের শাসন ব্যবস্থাকে ‘যুক্তি ভিত্তিক’ করে সমাজকে ‘আধুনিক’ করতে চান এমন ‘লিবারেল রিপাবলিকানগন’ নেশন কথাটার এই নয়া অর্থ চালু করেন। ফরাসি বিপ্লব ও পহেলা মহা যুদ্ধের মাঝের সময়টাতে ইউরোপের প্রায় সব রাজ বংশের পতন ঘটলে নেশনের নয়া ও পুরানা অর্থ দুইটা এক হয়ে আপন ও অপর উভয়ের বেলায় ব্যবহার হতে থাকে এবং অনেক রাষ্ট্রের নাগরিকগন তথা নেশনকে সভারিন বা সার্বভৌম বলে ঘোষনা করা হয়। [৯]

প্রায় একই সময়ে পশ্চিম ইউরোপের ওই ‘গনতান্ত্রিকক বিপ্লব’-এর পাশাপাশি আরেকটা লিবারেল রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়। এতে দাবি করা হয়, আদতে সারা দুনিয়া নানা নেশনে ভাগ হয়ে আছে এবং বাইরের বাধাবিঘ্ন ছাড়া প্রত্যেক নেশনের নিজ ‘অন্তরাত্মার’ আইন মত চলার ও রাষ্ট্র গড়ার অধিকার রয়েছে। একমাত্র এই অধিকারকে মানার ভিতর দিয়ে দুনিয়ায় শান্তি আসতে পারে। [১০] আর এভাবে বিশেষ করে আন্ত-রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পরিভাষায় নেশন ও স্টেইট কথা দুইটার অর্থ একাকার হয়ে যায়; হাইফেন ওয়ালা নেশন-স্টেইট কথাটার ব্যবহার চালু হয়। কিন্তু শব্দ দুইটার অর্থকে আলাদা না রাখলে নেশোনেলিজমকে বুঝা যাবে না। [১১] কারন, নিজেদের রাষ্ট্র্র গড়ার ইচ্ছা ও তৎপরতার ভিতর দিয়ে বেশির ভাগ নেশোনেলিজমের উৎপত্তি, উদ্ভাবনা ও বিকাশ ঘটে।

এই ব্যাপারে আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার। যেহেতু নেশনের ধারনা, প্রত্যেকটা নেশনের সহজাত সার্বভৌমত্ব ও আজাদ হওয়ার অধিকারের মতবাদের জন্ম আধুনিক যুগে, তাই সত্তা হিসাবে নেশন ও নেশোনেলিজম উভয়কে মডার্ননিটি বা আধুনিকতার সংগে জড়িয়ে ফেলার এক ধরনের অনৈতিহাসিক ও ইউরোসেন্ট্রিক [১২] ঝোক দেখা যায়।

ধারনা হিসাবে নেশন ও নেশোনেলিজমের উৎপত্তি আধুনিক যুগের পশ্চিম ইউরোপে হলেও, সামাজিক, রাজনৈতিক সত্তা হিসাবে তাদেরকে আধুনিক কিংবা পশ্চিম ইউরোপিয়ান মনে করা যায় না। যা নতুন তা হল মধ্য যুগের দুনিয়া জুড়ে ডায়নেস্টিক স্টেইটস-এর প্রাধান্যের জায়গায় আধুনিক যুগের ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে নেশন-স্টেইটস-এর ধারনাগত প্রাধান্য।    
 ১.৪. এথনি, ধর্ম, ভাষা, কৃষ্টি ও নেশন

নেশোনেলিজমের স্কলারদের প্রায় সবাই একমত যে, নেশন হল মূলত অনাত্মীয় কিন্তু দড় সংহতিধারি একটা তুলনা মূলক ভাবে বড় মানব গোষ্ঠি। [১৩] প্রশ্ন হল, নেশন যদি একটা সংহত মানব গোষ্ঠি হয়, তা হলে পরিবার, গোত্র, বর্ন, ধর্ম, কৃষ্টি, ভাষা, এথনি [১৪] কিংবা ইচ্ছা ভিত্তিক এসোসিয়েশনের আওতাধীন মানব সমষ্টির সংগে নেশনের তফাতটা কোথায়?

জায়গা বিশেষে ধর্মীয়, ভাষাভাষিক কিংবা এথনিক মানব গোষ্ঠির মত বড় না হলেও, অন্যান্য সংহত মানব সমষ্টির চেয়ে নেশন সাধারনত আকারে অনেক বড় হয়ে থাকে। তাছাড়া, তুলনা মূলক ভাবে নেশনের একটা সবল ‘সম্মিলিত ইতিহাস চেতনা’ থাকে। আর এই চেতনা থেকে তারা আশে পাশের অন্যান্য মানব গোষ্ঠি থেকে নিজেদের আলাদা মনে করে। [১৫] এই সচেতনতা ও স্বাতন্ত্রত্বোধ আবার তাদের সমষ্টিগত স্বার্থ নির্ধারন করে। ইতিহাস সচেতনতা, স্বাতন্ত্রত্বোধ ও স্বার্থের ভেদাভেদ আশে পাশের নেশনের সাথে এক ধরনের আবছা বিরুপতা, রেষারেষি ও বিরুদ্ধতারই শুধু জন্ম দেয় না, সময় সময় সরাসরি যুদ্ধ ফসাদ সৃষ্টি করতে পারে। [১৬] ফরাসি বিপ্লবের পরে ইউরোপে রাজায় রাজায় যুদ্ধের জায়গায় মানব গোষ্ঠিতে মানব গোষ্ঠিতে যুদ্ধের যে উৎপত্তি হয়, [১৭] তা এর একটা বড় আলামত।

যেহেতু এই আমরা/ওরা আবেগময় বাচবিচার ও রেষারেষি ছাড়া নেশন হয় না, তাই অন্য মানব গোষ্ঠি থেকে বিচ্ছিন্ন ও যোগাযোগশূন্য কোন মানব গোষ্ঠির নেশন হওয়ার নজির মিলে না। [১৮]

কিন্তু বড় লোকবল ও মিলিত ইতিহাস চেতনা নেশন হওয়ার জন্য জরুরি হলেও, পর্যাপ্ত নয়। নেশন হওয়ার জন্য সবচে বড় যে উপাদানের দরকার হয় তা হল, একটা আলাদা কিংবা আলগ করার মত ভূখন্ড; যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ, স্বকীয়তা ও অস্থিত্ব বজায় রাখতে পারার মত রাষ্ট্র গড়েছে কিংবা গড়তে পারে। [১৯]
খেয়াল করার বিষয়, এই শেষ উপাদানটা নেশনকে এথনি থেকে আলাদা বিশিষ্টতা দেয়। এদিক থেকে নেশনকে যেমন বিশেষ ভূখন্ডে একত্রিত এথনি, [২০] অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক কমিউনিটিও [২১] বলা যেতে পারে।

১.৫. নেশন ও নেশোনেলিটি

দুনিয়া জুড়ে যেমন বহু নেশেন রয়েছে, তেমনি আত্ম-সচেতনতা, স্বার্থের হেরফের ও স্বাতন্ত্রবোধ রয়েছে, অথচ সভারিন রাষ্ট্র গড়ার মত পর্যাপ্ত লোকবল কিংবা আলগ করার মত ভূখন্ড ছাড়া অনেক মানব গোষ্ঠি দুনিয়ার প্রায় সব খানে রয়েছে। নেশন-স্টেইটের তাত্বিক ছকের মধ্যে এরকম মানব গোষ্ঠির অস্থিত্বকে কবুল করার ও তাদের জন্য কোন রাজনৈতিক স্পেইস বরাদ্দ করার সুযোগ নাই। কিন্তু ধারনাগত বাধা বাস্তবতাকে এড়াতে পারে না।

বাংলাদেশ হওয়ার কয়েক মাসের ভিতর বের হওয়া একটা গবেষনা রিপোটে দেখা যায় জাতিসংঘের তখনকার ১৩৫ টা তথাকথিত নেশন-স্টেইটের শতকরা ৮৮ টাই খাস নেশন ছাড়াও এক বা একাধিক সংখ্যালঘু এথনি অথবা ধর্মীয় কিংবা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠি নিয়ে গঠিত। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যায় ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯২ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ২০টিরও কম নেশন-স্টেইট। [২২] একই বাস্তবতা বাংলাদেশেরও। এখানেও একাধিক সংখ্যালঘু এথনি অথবা ধর্মীয় কিংবা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠি রয়েছে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা এসব নেশন-স্টেইটের আওতাধীন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠিকে হয় এথনিক মাইনরিটি বা মাইনরিটি অথবা সাব নেশোনেলিটি বা নেশোনেলিটি বলে থাকেন।

উপরে বলা হয়েছে নেশনের প্রাথমিক বুনিয়াদ হল দড় সংহতিবোধ। প্রশ্ন উঠবে, এই সংহতি বোধের মূলে কি কোন বিশেষ ধরনের অবজেকটিভ ফেক্টার বা বাস্তত উপাদান কাজ করে?

সাধারনত ভাষা ও ধর্মের মত ফেক্টারকে নেশনের সংহতির বড় রকমের মাধ্যম মনে করা হয়। এই ব্যাপারে কেবল লিবারেল স্কলারগনই নন, এংগেলস ও লেলিনের মত আদি মার্কসিস্ট তাত্বিকরাও [২৩] এক মত। যদিও পরে স্টেলিন জাতি গঠনে ধর্মের ভূমিকাকে পুরাপুরি অবান্তর বলে মত দেন, [২৪] ‘বহু মার্কসিস্ট প্রিন্সিপুলের মত এটাও তখনকার রাজনৈতিক অবস্থার সাথে অংগাংগিভাবে জড়িত ছিল।’ এর পিছনে তার বড় উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার বামপহ্নী বুন্ড দলের আলাদা জুইশ নেশোনেলিটির যৌক্তিকতা ও স্বায়ত্বশাসনের দাবিকে প্রতিহত করা। [২৫]
সে যাই হউক, বাস্তবে দেখা যায় ভাষা কিংবা ধর্ম বহু জায়গায় সংহতির বড় বাহন হলেও, আরও অনেক অনেক জায়গায় হয় নাই। [২৬] আসলে আগে থেকে ঠিক করা এক বা একাধিক সংহতি গড়ার উপাদানের ভিত্তিতে নেশনকে চিহ্নিত করা অসম্ভব। [২৭] কারন, কোথায় নেশনের কোন কোন সংহতির উপাদান গুরুত্ব পাবে, তা মূলত নির্ভর করে নেশোনেলিস্টদের ‘আমরা/ওরা’র ‘ওরা’ রুপি মানব গোষ্ঠির পরিচয়ের বাস্তব কিংবা বানোয়াট তফাতের দাবির উপর।

এই জন্য হালে স্কলারদের মধ্যে নেশনকে অবজেকটিভ নয়, সোসিয়েলি কন্সট্রাকটেড সাবজেকটিভ সত্তা রুপে দেখার একটা চল শুরু হয়েছে। এসব স্কলারদের বিবেচনায় নেশন হল এক ধরনের কল্পনা আশ্রয়ী ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’। [২৮] আগে যেখানে নানা রকম হাছামিছা মিথের সাহায্যে কালচার ও কিংডমকে সাবুদ করা হত, আজকাল তেমনি কোন বিশেষ মানব গোষ্ঠির জাতিগত মর্যাদা ও ভূখন্ডের উপর কর্তৃত্বের দাবিকে জাইজ কিংবা নাজাইজ করার জন্য হাছামিছা মিথ ব্যবহার করা হয়। [২৯] মশহুর মার্কসিস্ট স্কলার এরিক হবসবাম (Eric Hobsbawm)-এর জবানিতে নেশন হল এই ধরনের ‘বানোয়াট ট্রেডিশনগুলার’ মধ্যে সবচে বড়। [৩০]

১.৫. নেশোনেলিজম ও নেশোনেলিস্টস

মোটকথা, নেশনের উদ্ভব, উদ্ভাবনায় সহায়ক সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার দরকার হলেও নেশোনেলিস্টস অর্থাত নেশোনেলিজমের আইডলগদের প্রচেষ্টা ছাড়া সেই সম্ভাবনা বাস্তব রুপ নিতে পারে না। [৩১] অন্যদিকে, নোশোনেলিস্টদের গোষ্ঠি, শ্রেনি কিংবা অন্যান্য পরিচয়, স্বার্থ ও অভিজ্ঞতা জনিত প্রতিক্রিয়া তাদের নেশোনেলিজমের চরিত্র ও প্রকৃতি ঠিক করতে বড় রকমের ভূমিকা রাখে।

সালো ব্যারন (Salo Baron) দেখিয়েছেন, প্রটেস্টানটইজম, কথোলিসিজম, অর্থডক্স সিজারও-পাপালইজম ও জুডাইজম পশ্চিম ইউরোপের নানা দেশের নোশোনেলিস্টদের চিন্তা চেতনার রুপ দেয়। দেখতে সেখানকার নোশোনেলিস্ট মতবাদ গুলা যতই সেকুলার রুপ নিয়ে থাকুক না কেন, ঐসব ধর্মীয় বুনিয়াদের কথা বাদ দিয়ে তাদের চরিত্র ও প্রকৃতির বাস্তব ব্যবধানকে বুঝা যাবে না। [৩২]
অন্যদিকে হিউ ট্রেভর-রুপার (Hugh Trevor-Roper) হবসবার্গ সাম্রাজ্যের চেক, পোলিশ ও জুইশ ‘দুসরা ধারার’ নোশোনেলিস্টদের জামআন, ইতালিয়ান ও হাংগেরিয়ান ‘মূল ধারার’ নেশোনেলিজমের ধ্যান, ধারনা ও পদ্ধতি থেকে ধার নেওয়ার ও অনুকরন করার বিষয়টা তুলে ধরেছেন। যেখানে মূল ধারার নোশোনেলিস্টদের উদ্দেশ্য ছিল তাদের অনুমিত একই ভাষাভাষী পাশাপাশি প্রিন্সিপালিটি গুলাকে এক করা, সেখানে  দুসরা ধারার নেশোনেলিজমের লক্ষ্য হয় পড়ে ভাষা ও কালচারের ব্যবধানের ভিত্তিতে বড় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেংগে দিয়ে আলাদা হওয়া। [৩৩]

একই ভাবে এরিক হবসবাম নেশোনেলিজমকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একদিকে ফরাসি বিপ্লব অনুসারী সিভিক, গনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক এবং অন্যদিকে জারমান রোমান্টিক ধারার এথনিক, ভাষা ও কালচার ভিত্তিক নেশোনেলিজম। পহেলটার উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে ১৮৩০-৭০ সালের মধ্যে। লক্ষ্য ছিল জনগনকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের মাঝে জড় করে বাড়ন্ত অর্থনীতির পরিপূরক বড় বাজার তৈরি করা। অন্যদিকে অপরটার উৎপত্তি ও বিকাশ হয় ১৮৭০-১৯১৪ সালের মধ্যে। এর প্রকৃতি, প্রবনতা ছিল বড় রাজনৈতিক ইউনিটকে এথনিক ও ভাষাগত ব্যবধানের ভিত্তিতে ভেংগে দিয়ে বাড়ন্ত পুজিবাদি অর্থনীতির ইঞ্জিন নতুন টেকনোলজি ও উৎপাদন ব্যবস্থার আঘাত থেকে নিজেদের ট্রেডিশনেল কমিউনিটির জন্য স্বস্তি পাওয়ার পথ করা। এখানে এলিনেইটেড বা বিরাগী বুদ্ধিজীবিরাই হন এথনো-লিংগুস্টিক নেশোনেলিজমের বড় উমেদদার। [৩৪]

এলি কেদৌরি (Elie Kedourie) পশ্চিম ইউরোপে জাতীয়তাবাদী ধ্যান ধারনার শিকড় নির্দেশ করেছেন একদিকে ডেস্কাট থেকে কান্ট ও ফিক্টের দার্শনিক ঐতিহ্য ও ফিওরের জওয়াসিম, ফ্রান্সিসকান স্পিরুচিয়েলস ও মুনস্টারের এনাবেপ্টিস্টদের হেটেরোডক্স খৃশ্চিয়ান মিলেনিয়েলিজমের আর অন্যদিকে জার্মান ভাষাভাষী বুদ্ধিজীবিদের এলিনেশনের মাঝে। ফরাসি বিপ্লব এবং জার্মান রোমান্টিক্সদের আদর্শ ভেংগে পড়া ট্রেডিশনেল কমিউনিটির বিরাগী তরুনদের সবল কমিউনিটি অন্বেষী মনে দাগ কাটে এবং তারা পরিতৃপ্তি খুজে নেশনের নয়া সংহতি ও সহমর্মিতার মাঝে।

অন্যদিকে এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিগুলাতে পাশ্চাত্যের অনুকরনের সাথে তাদেরকে পাশ্চাত্যের সামাজিক ভাবে বর্জন জনিত রাগ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবিদের নেশোনেলিজমের মূল নিয়ামক হয়ে উঠে। কিন্তু নিজেদের ‘কাল্ট অফ দ্যা ডার্ক গডস’-এ ফিরে গেলেও, তারা ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবিদের হিস্টোরিসিজমকেই শুধু নয়, এমন কি তাদের নিখুত দুনিয়া গড়ার সাম্ভাব্যতায় (যার শিকড় খৃশ্চিয়ান মিলেনিয়েলিজম-এর মাঝে পুতা) বিশ্বাসের অনুকরন করে চলেন। [৩৫]

পশ্চিম ইউরোপের নেশোনেলিস্টদের কর্মকান্ডের পটভূমি ছিল প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে রাজতন্ত্রের ও সুবিধাভোগী নবুলমেন ও যাজক শ্রেনির উৎখাত করে গনতান্ত্রিক বিপ্লব ও আম মানুষের ইচ্ছা মাফিক শাসন কায়েম ও সামাজিক অগ্রগতির পথ করা। এসব নোশোনেলিস্টরা ছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেনির লোক। অন্যদিকে পুর্ব ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিয়েল শাসনের অধীন দেশ গুলাতে নোশোনেলিস্টরা হন মূলত পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত অথচ পুরানা সুবিধাভোগী শ্রেনির লোক। এই ব্যবধানের কারনে সেখানে নেশনের ধারনা ও নেশোনেলিজমের প্রকৃতি আলাদা রুপ নেওয়া অস্বাভাবিক ছিল না; এবং আদতে তাই হয়েছে। [৩৬]
১.৬. নেশোনেলিজমের প্রকৃতি বিভাগ

যেহেতু প্রত্যেকটা নেশোনেলিজম স্থান, কাল ও নেশোনেলিস্ট আইডলগ নির্ভর, তাই যে কোন নেশোনেলিজমকে বুঝতে হলে এক মাত্র ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা ও পর্যালোচনা করা ছাড়া আর কোন পথ নাই। অন্যদিকে নেশোনেলিজমকে যদি গবেষকের বানানো ধারনা মনে না করে জড়িত মানুষজনের প্রচেষ্টা ও সমর্থনের ফসল বলে মেনে নেওয়া হয়, তা হলে স্থান ও কাল নির্ভর প্রত্যেকটা নেশোনেলিজমের গতি প্রকৃতি থেকে নেশোনেলিজমের একটা স্থান কাল উত্তীর্ন ধারনা কিংবা চরিত্র প্রকৃতি ঠিক করা যাবে না। ফলে, ধারনা হিসাবে নেশোনেলিজমের পর্যাপ্ত ও সর্বসম্মত ডেফিনেশন মিলবে না। [৩৭] এতে নেশোনেলিজম কথাটা বর্তমান রাজনৈতিক ও বিশ্লেষন ধর্মী চিন্তার ব্যাপারে ব্যবহার করা সবচে আবছা ও ডিলাডেলা ধারনা গুলার মধ্যে অন্যতম [৩৮] রয়ে যাবে।

এই আন্ধাগলি থেকে বের হওয়ার জন্য দরকার নেশেনেলিজমের একটা পর্যাপ্ত অথচ সুনিদ্রিষ্ট ডেফিনেশন ঠিক করা এবং যে কোন নেশোনেলিজকে তুলনামূলক দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করার মত এই ডেফিনেশন থেকে সরাসরি বের করা একটা প্রকৃতি বিভাগ নিয়ে নানা নেশোনেলিজমের চরিত্র ও প্রকৃতির বিশ্লেষনের কাজ শুরু করা।

আদর্শ চরিত্র-প্রকৃতির ব্যবধানের ভিত্তিতে নেশোনেলিজমের একটা প্রকৃতি বিভাগ সম্ভবত পহেলা কার্লটন হেইজ (Carlton Hayes) বানান। এই গুলা ছিল মানবিক, ট্রেডিশনেল, জেকোবিন, লিবারেল এবং ইকোনমিক ও ইনট্রিগেল নেশোনেলিজম। [৩৯] যদিও হেইজের প্রকৃতি বিভাগ নেশোনেলিস্ট আদর্শের জটিলতা তুলে ধরতে সহায়ক, এর পটভূমিতে এক ধরনের ভাল মন্দের বাচ বিচারের উপস্থিতি রয়েছে, যা বস্তুনিষ্ট বিচার বিশ্লেষনের জন্য কাম্য নয়। [৪০]

তিন যুগেরও বেশি পরে একই আদর্শ চরিত্র-প্রকৃতির বিবেচনায় হ্যান্স কুন (Hans Kohn) নেশোনেলিজমকে দুই ভাগে ভাগ করেন, যথা পশ্চিমা ঐচ্ছিক (উপ-বিভাগ: ব্যক্তিবাদি ও সমষ্টিবাদি) ও পূবের অর্গেনিক টাইপ। [৪১] নৈতিক উদ্বেগ ছাড়াও, তার নিজের অন্যান্য লেখায় [৪২] তার প্রকৃতি বিভাগের ঘাটতি ধরা পড়ে। উদাহরন হিসাবে বলা যায়, তিনি যেখানে নেশন ও নেশোনেলিজমকে পুরাপুরি আধুনিক ব্যাপার বলে মনে করেন, সেখানে তার নিজের লেখায় প্রাক আধুনিক মটিফ এবং নেশোনেল আবেগ অনুভূতি ও চেতনার ভূমিকা বের হয়ে আসে। [৪৩]

লুই স্নাইডার (Louis Snyder) তার পহেলা দিকের লেখায় নেশোনেলিজমের সময় অনুক্রমিক পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিয়ে চারটা টাইপ নির্দেশ করেন। এগুলা হল ইনট্রিগেটিভ (১৮১৫-১৮৭১), ডিজরাপটিভ (১৮৭১-১৯০০), এগ্রেসিভ (১৯০০-১৯৪৫) ও কন্টেম্পরারি (১৯৪৫-?)। [৪৪] তিনি তার পরের লেখায় একটা ভূগোল ভিত্তিক প্রকৃতি বিভাগও পেশ করেন। এগুলা হল ফিসিফরাস ইউরোপিয়ান, রেসিয়েল বণ্ঢ্যাক আফ্রিকান, পলিটো-রিলিজিয়াস মিডুল ইস্টার্ন, মেসিয়ানিক রাশিয়ান, মার্কিন মেলটিং পট, এশিয়ান এনটি-কলোনিয়েল ও লেটিন আমেরিকান পপুলিস্ট নেশোনেলিজম । [৪৫] তার এই প্রকৃতি বিভাগ নেশোনেলিজমকে যতটা না, তারচে বেশি এর দুনিয়া জুড়ে প্রসারকে বুঝতে সহায়ক। তা সত্বেও, এটা ছিল আগেকার ইউরোসেন্ট্রিক প্রকৃতি বিভাগ এড়াবার একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

হালে বহুল ব্যবহৃত একটা প্রকৃতি বিভাগ হল হিউ সিটন-ওয়াটসন (Hugh Seton-Watson)-এর ওল্ড কন্টিনিউয়াস ও নিউ নেশনস (উপ-বিভাগ সেসেশনিস্ট, ইররিডেন্টিশ ও নেশন-বিলডিং) নেশোনেলিজম। এর খেয়াল করার মত দিকটা হল, আইডোলজির বদলে প্রক্রিয়ার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া। [৪৬]

অন্যদিকে জন ব্রুইলি (John Breuilly) নেশোনেলিজমকে মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যবধানের পটভূমিকায় গড়ে উঠা রাজনৈতিক বিরোধীতা রুপে দেখে নেশোনেলিস্ট বিরোধীতাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলা হল, সেসেশন, ইউনিফিকেশন এবং রিফর্ম মুভমেন্ট। এদের প্রত্যেকটা আবার পুরানা সাম্রাজ্য কিংবা তাদের কলোনিতে অথবা নেশন স্টেইট কিংবা নেশন স্টেইট দাবি না করা রাষ্ট্রে পাওয়া যেতে পারে। [৪৭]

এই ধারার আরেকটা প্রকৃতি বিভাগ পেশ করেছেন মাইকেল হেক্টার (Michael Hechter)। তার বিভাগ গুলা হল, পেরি-ফেরিয়েল, ইররিডেন্টিশ ও ইউনিফিকেশন নেশোনেলিজম। [৪৮]

উপরের পর্যালোচনার আলোকে আমরা বলতে পারি;

১.         নেশন বা জাতি বলতে বুঝায় এমন একটা মানব গোষ্ঠি যারা

(ক) অনাত্মীয় হলেও সংহত ও (খ) আশেপাশের অন্য মানব গোষ্ঠির চেয়ে আলাদা সম্মিলিত ইতিহাস সচেতনতা, স্বতন্ত্রতা ও স্বার্থজ্ঞান সম্পন্ন এবং যাদের (গ) নিজেদের সমষ্টি স্বার্থ, স্বকীয়তা ও অস্থিত্ব বজায় রাখার আকুতি (ঘ) আর তার জন্য স্বশাসিত রাষ্ট্র গড়ার মত ভূখন্ড ও (ঙ ) পর্যাপ্ত লোকবল রয়েছে। অন্য কথায় নেশন এমন একটা এথনি বা স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র্য সম্পন্ন জনগোষ্ঠি যার স্বশাসিত রাষ্ট্র পাওয়ার তাগিদই শুধু নয়, তা গড়ার মত ভূখন্ড ও জনবল রয়েছে।

২.        নেশোনেলিটি বা মাইনোরিটি কমিউনিটি বলতে বুঝবো কোন রাষ্ট্রে বসবাস রত এথনি যারা চাইলেও স্বশাসিত রাষ্ট্র গড়ার মত ভূখন্ড নাই।

৩.        নেশোনেলিজম বলতে বুঝবো কোন মানব গোষ্ঠির তরফ থেকে স্বাদেশিকতার স্বক্রিয় মতবাদকে।

৪.         নেশোনেলিস্ট বলতে বুঝবো নেশোনেলিজমের প্রবক্তা ও প্রয়াসীদেরকে।

ফ্যাসিবাদ।

 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে...