ইংরেজি ভাষায় যেমন নেশনেলিজম বলতে আইডলজি অফ নেশনহুড বুঝায় [১] তেমনি বাংলা ভাষায় জাতীয়তাবাদ কথাটা (জাতি+ঈয় = জাতীয়) ‘জাতি সম্মন্ধীয়’ মতবাদকে বুঝায়। [২] কোন ব্যক্তি বা সমষ্টির আত্ম-পরিচয়কে বাদ দিয়ে যেমন তাদের আত্ম-স্বার্থ ঠিক করা যায় না, তেমনি কোন জাতীয়তাবাদ তার জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থ চিন্তাকে বাদ দিয়ে গড়ে উঠতে পারে না। এই জন্য জাতীয়তাবাদীদের জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থকে শান দিয়ে আগে বাড়তে দেখা যায়।
১.২. জাতি ও নেশন
বাংলা ভাষায় জাতীয়তাবাদের মত জাতি শব্দটা কিন্তু কেবল তৎসম বা খাস সংস্কৃত থেকে নেওয়া নয়; এর একটা আলাদা ফারসি শিকড়ও আছে। সংস্কৃতে জাতি (জন্ [জনন, উৎপত্তি] + তি = জাতি) হল ‘জন্মগত ভাবে ভিন্ন প্রানী’ [৩] বা ইংরেজিতে যাকে বলে স্পিসিস। আর এই অর্থে বর্নাশ্রম ধর্মের চতুর্বর্ন ও তাদের নানা উপ-বর্নের প্রত্যেকটা মানব গোষ্ঠিকে জাতি বলা হয়। অন্যদিকে ফারসিতে জাতি (জাত + বি = জাতি) হল জন্ম নয়, ‘গুন কিংবা কর্মবিভাগ হেতু মনুষ্যবিভাগ’। [৪] যেমন, হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, ইহুদি, ইংরেজ, রাশিয়ান ইত্যাদি। বাংলা জবানে সংস্কৃত ও ফারসি এই দুই অর্থেই জাত ও জাতি কথা দুটার ব্যবহার রয়েছে। [৫] বাংলাভাষিদের মধ্যে নেশনের তরজমা রুপে জাতি কথাটাকে এই দুই আলাদা অর্থে পড়া হয়ে থাকে। বুঝে কিংবা না বুঝে কে কোন অর্থে পড়বেন তা মূলত নির্ভর করে তার কসমোলজি বা জগতদৃষ্টি ও আত্ম-পরিচয়ের উপর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ইংরেজী ঐ (নেশন) শব্দের দ্বারা যে অর্থ প্রকাশ করা হয় সে অর্থ ইহার আগে আমরা ব্যবহার করি নাই।’ এই ব্যবহারিক বোধির হেরফের এড়াবার জন্য যদিও তিনি ‘নেশন কথাটাকে তর্জমা না করিয়া ব্যবহার করাই ভাল’ বলে মত দেন, কিন্তু নেশন কি তা বর্ননা করতে গিয়ে নিজেই আবার বলেন, ‘যাদের মধ্যে জন্মগত বন্ধনের ঐক্য আছে তাহারাই নেশন।’ [৬] আরও পরে তিনিই আবার ‘মহাজাতি সদনের নামকরনের মাধ্যমে সর্বভারতীয় জাতীয় ঐক্যের দ্যোতক “মহাজাতি” শব্দটি আমাদের দিয়ে গেছেন।’ [৭] রবীন্দ্রনাথের এই ঘুরপাক উপরে উল্লেখ করা জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থকে শান দিয়ে আগে বাড়ার জাতীয়তাবাদী প্রবনতার নমুনা মাত্র।
বাংলা ভাষায় দুই ভাবে জাতি কথাটাকে বুঝার কিংবা নেশনের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঘুরপাকের কারন যাই হউক না কেন, এখানে খেয়াল করার ব্যাপার হল ফারসির মত ইংরেজিতেও জন্মগত বন্ধনের ঐক্যের বাইরে নেশন রুপি একটা সংহত মানব গোষ্ঠির ধারনার চল এবং অন্যখানে একই লেবল আটা মানব গোষ্ঠির বেলায় নেশন কথাটার ব্যবহারিক অর্থ বদলে যাওয়া অসম্ভব নয়।
১.৩. নেশনের ধারনা
শুরুতে ইংরেজিতে লেটিন ক্রিয়াপদ নাসসি (Naci) থেকে নেশন কথাটা আসে। এটা শুধু মাত্র অন্য আরেকটা অপরিচিত এলাকার লোকদের বেলায় ব্যবহার করা হত। বিশেষ করে মধ্য যুগের শেষ দিকে ইউরোপের নানা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসা এক একটা অপরিচিত রাজ্য কিংবা অঞ্চলের ছাত্রদের বেলায় তা ব্যবহার করা হত। [৮] অন্যদিকে ১৮ শতকের শেষ দিকে ফ্রান্সে ডালাও ভাবে দেশের সব মানুষকে বুঝাতে নেশন কথাটার ব্যবহার শুরু হয়। নবুলমেন ও যাজক শ্রেনির আর্থিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য মূলক প্রাধান্য দূর করে দেশের শাসন ব্যবস্থাকে ‘যুক্তি ভিত্তিক’ করে সমাজকে ‘আধুনিক’ করতে চান এমন ‘লিবারেল রিপাবলিকানগন’ নেশন কথাটার এই নয়া অর্থ চালু করেন। ফরাসি বিপ্লব ও পহেলা মহা যুদ্ধের মাঝের সময়টাতে ইউরোপের প্রায় সব রাজ বংশের পতন ঘটলে নেশনের নয়া ও পুরানা অর্থ দুইটা এক হয়ে আপন ও অপর উভয়ের বেলায় ব্যবহার হতে থাকে এবং অনেক রাষ্ট্রের নাগরিকগন তথা নেশনকে সভারিন বা সার্বভৌম বলে ঘোষনা করা হয়। [৯]
প্রায় একই সময়ে পশ্চিম ইউরোপের ওই ‘গনতান্ত্রিকক বিপ্লব’-এর পাশাপাশি আরেকটা লিবারেল রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়। এতে দাবি করা হয়, আদতে সারা দুনিয়া নানা নেশনে ভাগ হয়ে আছে এবং বাইরের বাধাবিঘ্ন ছাড়া প্রত্যেক নেশনের নিজ ‘অন্তরাত্মার’ আইন মত চলার ও রাষ্ট্র গড়ার অধিকার রয়েছে। একমাত্র এই অধিকারকে মানার ভিতর দিয়ে দুনিয়ায় শান্তি আসতে পারে। [১০] আর এভাবে বিশেষ করে আন্ত-রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পরিভাষায় নেশন ও স্টেইট কথা দুইটার অর্থ একাকার হয়ে যায়; হাইফেন ওয়ালা নেশন-স্টেইট কথাটার ব্যবহার চালু হয়। কিন্তু শব্দ দুইটার অর্থকে আলাদা না রাখলে নেশোনেলিজমকে বুঝা যাবে না। [১১] কারন, নিজেদের রাষ্ট্র্র গড়ার ইচ্ছা ও তৎপরতার ভিতর দিয়ে বেশির ভাগ নেশোনেলিজমের উৎপত্তি, উদ্ভাবনা ও বিকাশ ঘটে।
এই ব্যাপারে আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার। যেহেতু নেশনের ধারনা, প্রত্যেকটা নেশনের সহজাত সার্বভৌমত্ব ও আজাদ হওয়ার অধিকারের মতবাদের জন্ম আধুনিক যুগে, তাই সত্তা হিসাবে নেশন ও নেশোনেলিজম উভয়কে মডার্ননিটি বা আধুনিকতার সংগে জড়িয়ে ফেলার এক ধরনের অনৈতিহাসিক ও ইউরোসেন্ট্রিক [১২] ঝোক দেখা যায়।
ধারনা হিসাবে নেশন ও নেশোনেলিজমের উৎপত্তি আধুনিক যুগের পশ্চিম ইউরোপে হলেও, সামাজিক, রাজনৈতিক সত্তা হিসাবে তাদেরকে আধুনিক কিংবা পশ্চিম ইউরোপিয়ান মনে করা যায় না। যা নতুন তা হল মধ্য যুগের দুনিয়া জুড়ে ডায়নেস্টিক স্টেইটস-এর প্রাধান্যের জায়গায় আধুনিক যুগের ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে নেশন-স্টেইটস-এর ধারনাগত প্রাধান্য।
১.৪. এথনি, ধর্ম, ভাষা, কৃষ্টি ও নেশন
নেশোনেলিজমের স্কলারদের প্রায় সবাই একমত যে, নেশন হল মূলত অনাত্মীয় কিন্তু দড় সংহতিধারি একটা তুলনা মূলক ভাবে বড় মানব গোষ্ঠি। [১৩] প্রশ্ন হল, নেশন যদি একটা সংহত মানব গোষ্ঠি হয়, তা হলে পরিবার, গোত্র, বর্ন, ধর্ম, কৃষ্টি, ভাষা, এথনি [১৪] কিংবা ইচ্ছা ভিত্তিক এসোসিয়েশনের আওতাধীন মানব সমষ্টির সংগে নেশনের তফাতটা কোথায়?
জায়গা বিশেষে ধর্মীয়, ভাষাভাষিক কিংবা এথনিক মানব গোষ্ঠির মত বড় না হলেও, অন্যান্য সংহত মানব সমষ্টির চেয়ে নেশন সাধারনত আকারে অনেক বড় হয়ে থাকে। তাছাড়া, তুলনা মূলক ভাবে নেশনের একটা সবল ‘সম্মিলিত ইতিহাস চেতনা’ থাকে। আর এই চেতনা থেকে তারা আশে পাশের অন্যান্য মানব গোষ্ঠি থেকে নিজেদের আলাদা মনে করে। [১৫] এই সচেতনতা ও স্বাতন্ত্রত্বোধ আবার তাদের সমষ্টিগত স্বার্থ নির্ধারন করে। ইতিহাস সচেতনতা, স্বাতন্ত্রত্বোধ ও স্বার্থের ভেদাভেদ আশে পাশের নেশনের সাথে এক ধরনের আবছা বিরুপতা, রেষারেষি ও বিরুদ্ধতারই শুধু জন্ম দেয় না, সময় সময় সরাসরি যুদ্ধ ফসাদ সৃষ্টি করতে পারে। [১৬] ফরাসি বিপ্লবের পরে ইউরোপে রাজায় রাজায় যুদ্ধের জায়গায় মানব গোষ্ঠিতে মানব গোষ্ঠিতে যুদ্ধের যে উৎপত্তি হয়, [১৭] তা এর একটা বড় আলামত।
যেহেতু এই আমরা/ওরা আবেগময় বাচবিচার ও রেষারেষি ছাড়া নেশন হয় না, তাই অন্য মানব গোষ্ঠি থেকে বিচ্ছিন্ন ও যোগাযোগশূন্য কোন মানব গোষ্ঠির নেশন হওয়ার নজির মিলে না। [১৮]
কিন্তু বড় লোকবল ও মিলিত ইতিহাস চেতনা নেশন হওয়ার জন্য জরুরি হলেও, পর্যাপ্ত নয়। নেশন হওয়ার জন্য সবচে বড় যে উপাদানের দরকার হয় তা হল, একটা আলাদা কিংবা আলগ করার মত ভূখন্ড; যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ, স্বকীয়তা ও অস্থিত্ব বজায় রাখতে পারার মত রাষ্ট্র গড়েছে কিংবা গড়তে পারে। [১৯]
খেয়াল করার বিষয়, এই শেষ উপাদানটা নেশনকে এথনি থেকে আলাদা বিশিষ্টতা দেয়। এদিক থেকে নেশনকে যেমন বিশেষ ভূখন্ডে একত্রিত এথনি, [২০] অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক কমিউনিটিও [২১] বলা যেতে পারে।
১.৫. নেশন ও নেশোনেলিটি
দুনিয়া জুড়ে যেমন বহু নেশেন রয়েছে, তেমনি আত্ম-সচেতনতা, স্বার্থের হেরফের ও স্বাতন্ত্রবোধ রয়েছে, অথচ সভারিন রাষ্ট্র গড়ার মত পর্যাপ্ত লোকবল কিংবা আলগ করার মত ভূখন্ড ছাড়া অনেক মানব গোষ্ঠি দুনিয়ার প্রায় সব খানে রয়েছে। নেশন-স্টেইটের তাত্বিক ছকের মধ্যে এরকম মানব গোষ্ঠির অস্থিত্বকে কবুল করার ও তাদের জন্য কোন রাজনৈতিক স্পেইস বরাদ্দ করার সুযোগ নাই। কিন্তু ধারনাগত বাধা বাস্তবতাকে এড়াতে পারে না।
বাংলাদেশ হওয়ার কয়েক মাসের ভিতর বের হওয়া একটা গবেষনা রিপোটে দেখা যায় জাতিসংঘের তখনকার ১৩৫ টা তথাকথিত নেশন-স্টেইটের শতকরা ৮৮ টাই খাস নেশন ছাড়াও এক বা একাধিক সংখ্যালঘু এথনি অথবা ধর্মীয় কিংবা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠি নিয়ে গঠিত। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যায় ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯২ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ২০টিরও কম নেশন-স্টেইট। [২২] একই বাস্তবতা বাংলাদেশেরও। এখানেও একাধিক সংখ্যালঘু এথনি অথবা ধর্মীয় কিংবা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠি রয়েছে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা এসব নেশন-স্টেইটের আওতাধীন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠিকে হয় এথনিক মাইনরিটি বা মাইনরিটি অথবা সাব নেশোনেলিটি বা নেশোনেলিটি বলে থাকেন।
উপরে বলা হয়েছে নেশনের প্রাথমিক বুনিয়াদ হল দড় সংহতিবোধ। প্রশ্ন উঠবে, এই সংহতি বোধের মূলে কি কোন বিশেষ ধরনের অবজেকটিভ ফেক্টার বা বাস্তত উপাদান কাজ করে?
সাধারনত ভাষা ও ধর্মের মত ফেক্টারকে নেশনের সংহতির বড় রকমের মাধ্যম মনে করা হয়। এই ব্যাপারে কেবল লিবারেল স্কলারগনই নন, এংগেলস ও লেলিনের মত আদি মার্কসিস্ট তাত্বিকরাও [২৩] এক মত। যদিও পরে স্টেলিন জাতি গঠনে ধর্মের ভূমিকাকে পুরাপুরি অবান্তর বলে মত দেন, [২৪] ‘বহু মার্কসিস্ট প্রিন্সিপুলের মত এটাও তখনকার রাজনৈতিক অবস্থার সাথে অংগাংগিভাবে জড়িত ছিল।’ এর পিছনে তার বড় উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার বামপহ্নী বুন্ড দলের আলাদা জুইশ নেশোনেলিটির যৌক্তিকতা ও স্বায়ত্বশাসনের দাবিকে প্রতিহত করা। [২৫]
সে যাই হউক, বাস্তবে দেখা যায় ভাষা কিংবা ধর্ম বহু জায়গায় সংহতির বড় বাহন হলেও, আরও অনেক অনেক জায়গায় হয় নাই। [২৬] আসলে আগে থেকে ঠিক করা এক বা একাধিক সংহতি গড়ার উপাদানের ভিত্তিতে নেশনকে চিহ্নিত করা অসম্ভব। [২৭] কারন, কোথায় নেশনের কোন কোন সংহতির উপাদান গুরুত্ব পাবে, তা মূলত নির্ভর করে নেশোনেলিস্টদের ‘আমরা/ওরা’র ‘ওরা’ রুপি মানব গোষ্ঠির পরিচয়ের বাস্তব কিংবা বানোয়াট তফাতের দাবির উপর।
এই জন্য হালে স্কলারদের মধ্যে নেশনকে অবজেকটিভ নয়, সোসিয়েলি কন্সট্রাকটেড সাবজেকটিভ সত্তা রুপে দেখার একটা চল শুরু হয়েছে। এসব স্কলারদের বিবেচনায় নেশন হল এক ধরনের কল্পনা আশ্রয়ী ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’। [২৮] আগে যেখানে নানা রকম হাছামিছা মিথের সাহায্যে কালচার ও কিংডমকে সাবুদ করা হত, আজকাল তেমনি কোন বিশেষ মানব গোষ্ঠির জাতিগত মর্যাদা ও ভূখন্ডের উপর কর্তৃত্বের দাবিকে জাইজ কিংবা নাজাইজ করার জন্য হাছামিছা মিথ ব্যবহার করা হয়। [২৯] মশহুর মার্কসিস্ট স্কলার এরিক হবসবাম (Eric Hobsbawm)-এর জবানিতে নেশন হল এই ধরনের ‘বানোয়াট ট্রেডিশনগুলার’ মধ্যে সবচে বড়। [৩০]
১.৫. নেশোনেলিজম ও নেশোনেলিস্টস
মোটকথা, নেশনের উদ্ভব, উদ্ভাবনায় সহায়ক সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার দরকার হলেও নেশোনেলিস্টস অর্থাত নেশোনেলিজমের আইডলগদের প্রচেষ্টা ছাড়া সেই সম্ভাবনা বাস্তব রুপ নিতে পারে না। [৩১] অন্যদিকে, নোশোনেলিস্টদের গোষ্ঠি, শ্রেনি কিংবা অন্যান্য পরিচয়, স্বার্থ ও অভিজ্ঞতা জনিত প্রতিক্রিয়া তাদের নেশোনেলিজমের চরিত্র ও প্রকৃতি ঠিক করতে বড় রকমের ভূমিকা রাখে।
সালো ব্যারন (Salo Baron) দেখিয়েছেন, প্রটেস্টানটইজম, কথোলিসিজম, অর্থডক্স সিজারও-পাপালইজম ও জুডাইজম পশ্চিম ইউরোপের নানা দেশের নোশোনেলিস্টদের চিন্তা চেতনার রুপ দেয়। দেখতে সেখানকার নোশোনেলিস্ট মতবাদ গুলা যতই সেকুলার রুপ নিয়ে থাকুক না কেন, ঐসব ধর্মীয় বুনিয়াদের কথা বাদ দিয়ে তাদের চরিত্র ও প্রকৃতির বাস্তব ব্যবধানকে বুঝা যাবে না। [৩২]
অন্যদিকে হিউ ট্রেভর-রুপার (Hugh Trevor-Roper) হবসবার্গ সাম্রাজ্যের চেক, পোলিশ ও জুইশ ‘দুসরা ধারার’ নোশোনেলিস্টদের জামআন, ইতালিয়ান ও হাংগেরিয়ান ‘মূল ধারার’ নেশোনেলিজমের ধ্যান, ধারনা ও পদ্ধতি থেকে ধার নেওয়ার ও অনুকরন করার বিষয়টা তুলে ধরেছেন। যেখানে মূল ধারার নোশোনেলিস্টদের উদ্দেশ্য ছিল তাদের অনুমিত একই ভাষাভাষী পাশাপাশি প্রিন্সিপালিটি গুলাকে এক করা, সেখানে দুসরা ধারার নেশোনেলিজমের লক্ষ্য হয় পড়ে ভাষা ও কালচারের ব্যবধানের ভিত্তিতে বড় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেংগে দিয়ে আলাদা হওয়া। [৩৩]
একই ভাবে এরিক হবসবাম নেশোনেলিজমকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একদিকে ফরাসি বিপ্লব অনুসারী সিভিক, গনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক এবং অন্যদিকে জারমান রোমান্টিক ধারার এথনিক, ভাষা ও কালচার ভিত্তিক নেশোনেলিজম। পহেলটার উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে ১৮৩০-৭০ সালের মধ্যে। লক্ষ্য ছিল জনগনকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের মাঝে জড় করে বাড়ন্ত অর্থনীতির পরিপূরক বড় বাজার তৈরি করা। অন্যদিকে অপরটার উৎপত্তি ও বিকাশ হয় ১৮৭০-১৯১৪ সালের মধ্যে। এর প্রকৃতি, প্রবনতা ছিল বড় রাজনৈতিক ইউনিটকে এথনিক ও ভাষাগত ব্যবধানের ভিত্তিতে ভেংগে দিয়ে বাড়ন্ত পুজিবাদি অর্থনীতির ইঞ্জিন নতুন টেকনোলজি ও উৎপাদন ব্যবস্থার আঘাত থেকে নিজেদের ট্রেডিশনেল কমিউনিটির জন্য স্বস্তি পাওয়ার পথ করা। এখানে এলিনেইটেড বা বিরাগী বুদ্ধিজীবিরাই হন এথনো-লিংগুস্টিক নেশোনেলিজমের বড় উমেদদার। [৩৪]
এলি কেদৌরি (Elie Kedourie) পশ্চিম ইউরোপে জাতীয়তাবাদী ধ্যান ধারনার শিকড় নির্দেশ করেছেন একদিকে ডেস্কাট থেকে কান্ট ও ফিক্টের দার্শনিক ঐতিহ্য ও ফিওরের জওয়াসিম, ফ্রান্সিসকান স্পিরুচিয়েলস ও মুনস্টারের এনাবেপ্টিস্টদের হেটেরোডক্স খৃশ্চিয়ান মিলেনিয়েলিজমের আর অন্যদিকে জার্মান ভাষাভাষী বুদ্ধিজীবিদের এলিনেশনের মাঝে। ফরাসি বিপ্লব এবং জার্মান রোমান্টিক্সদের আদর্শ ভেংগে পড়া ট্রেডিশনেল কমিউনিটির বিরাগী তরুনদের সবল কমিউনিটি অন্বেষী মনে দাগ কাটে এবং তারা পরিতৃপ্তি খুজে নেশনের নয়া সংহতি ও সহমর্মিতার মাঝে।
অন্যদিকে এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিগুলাতে পাশ্চাত্যের অনুকরনের সাথে তাদেরকে পাশ্চাত্যের সামাজিক ভাবে বর্জন জনিত রাগ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবিদের নেশোনেলিজমের মূল নিয়ামক হয়ে উঠে। কিন্তু নিজেদের ‘কাল্ট অফ দ্যা ডার্ক গডস’-এ ফিরে গেলেও, তারা ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবিদের হিস্টোরিসিজমকেই শুধু নয়, এমন কি তাদের নিখুত দুনিয়া গড়ার সাম্ভাব্যতায় (যার শিকড় খৃশ্চিয়ান মিলেনিয়েলিজম-এর মাঝে পুতা) বিশ্বাসের অনুকরন করে চলেন। [৩৫]
পশ্চিম ইউরোপের নেশোনেলিস্টদের কর্মকান্ডের পটভূমি ছিল প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে রাজতন্ত্রের ও সুবিধাভোগী নবুলমেন ও যাজক শ্রেনির উৎখাত করে গনতান্ত্রিক বিপ্লব ও আম মানুষের ইচ্ছা মাফিক শাসন কায়েম ও সামাজিক অগ্রগতির পথ করা। এসব নোশোনেলিস্টরা ছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেনির লোক। অন্যদিকে পুর্ব ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিয়েল শাসনের অধীন দেশ গুলাতে নোশোনেলিস্টরা হন মূলত পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত অথচ পুরানা সুবিধাভোগী শ্রেনির লোক। এই ব্যবধানের কারনে সেখানে নেশনের ধারনা ও নেশোনেলিজমের প্রকৃতি আলাদা রুপ নেওয়া অস্বাভাবিক ছিল না; এবং আদতে তাই হয়েছে। [৩৬]
১.৬. নেশোনেলিজমের প্রকৃতি বিভাগ
যেহেতু প্রত্যেকটা নেশোনেলিজম স্থান, কাল ও নেশোনেলিস্ট আইডলগ নির্ভর, তাই যে কোন নেশোনেলিজমকে বুঝতে হলে এক মাত্র ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা ও পর্যালোচনা করা ছাড়া আর কোন পথ নাই। অন্যদিকে নেশোনেলিজমকে যদি গবেষকের বানানো ধারনা মনে না করে জড়িত মানুষজনের প্রচেষ্টা ও সমর্থনের ফসল বলে মেনে নেওয়া হয়, তা হলে স্থান ও কাল নির্ভর প্রত্যেকটা নেশোনেলিজমের গতি প্রকৃতি থেকে নেশোনেলিজমের একটা স্থান কাল উত্তীর্ন ধারনা কিংবা চরিত্র প্রকৃতি ঠিক করা যাবে না। ফলে, ধারনা হিসাবে নেশোনেলিজমের পর্যাপ্ত ও সর্বসম্মত ডেফিনেশন মিলবে না। [৩৭] এতে নেশোনেলিজম কথাটা বর্তমান রাজনৈতিক ও বিশ্লেষন ধর্মী চিন্তার ব্যাপারে ব্যবহার করা সবচে আবছা ও ডিলাডেলা ধারনা গুলার মধ্যে অন্যতম [৩৮] রয়ে যাবে।
এই আন্ধাগলি থেকে বের হওয়ার জন্য দরকার নেশেনেলিজমের একটা পর্যাপ্ত অথচ সুনিদ্রিষ্ট ডেফিনেশন ঠিক করা এবং যে কোন নেশোনেলিজকে তুলনামূলক দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করার মত এই ডেফিনেশন থেকে সরাসরি বের করা একটা প্রকৃতি বিভাগ নিয়ে নানা নেশোনেলিজমের চরিত্র ও প্রকৃতির বিশ্লেষনের কাজ শুরু করা।
আদর্শ চরিত্র-প্রকৃতির ব্যবধানের ভিত্তিতে নেশোনেলিজমের একটা প্রকৃতি বিভাগ সম্ভবত পহেলা কার্লটন হেইজ (Carlton Hayes) বানান। এই গুলা ছিল মানবিক, ট্রেডিশনেল, জেকোবিন, লিবারেল এবং ইকোনমিক ও ইনট্রিগেল নেশোনেলিজম। [৩৯] যদিও হেইজের প্রকৃতি বিভাগ নেশোনেলিস্ট আদর্শের জটিলতা তুলে ধরতে সহায়ক, এর পটভূমিতে এক ধরনের ভাল মন্দের বাচ বিচারের উপস্থিতি রয়েছে, যা বস্তুনিষ্ট বিচার বিশ্লেষনের জন্য কাম্য নয়। [৪০]
তিন যুগেরও বেশি পরে একই আদর্শ চরিত্র-প্রকৃতির বিবেচনায় হ্যান্স কুন (Hans Kohn) নেশোনেলিজমকে দুই ভাগে ভাগ করেন, যথা পশ্চিমা ঐচ্ছিক (উপ-বিভাগ: ব্যক্তিবাদি ও সমষ্টিবাদি) ও পূবের অর্গেনিক টাইপ। [৪১] নৈতিক উদ্বেগ ছাড়াও, তার নিজের অন্যান্য লেখায় [৪২] তার প্রকৃতি বিভাগের ঘাটতি ধরা পড়ে। উদাহরন হিসাবে বলা যায়, তিনি যেখানে নেশন ও নেশোনেলিজমকে পুরাপুরি আধুনিক ব্যাপার বলে মনে করেন, সেখানে তার নিজের লেখায় প্রাক আধুনিক মটিফ এবং নেশোনেল আবেগ অনুভূতি ও চেতনার ভূমিকা বের হয়ে আসে। [৪৩]
লুই স্নাইডার (Louis Snyder) তার পহেলা দিকের লেখায় নেশোনেলিজমের সময় অনুক্রমিক পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিয়ে চারটা টাইপ নির্দেশ করেন। এগুলা হল ইনট্রিগেটিভ (১৮১৫-১৮৭১), ডিজরাপটিভ (১৮৭১-১৯০০), এগ্রেসিভ (১৯০০-১৯৪৫) ও কন্টেম্পরারি (১৯৪৫-?)। [৪৪] তিনি তার পরের লেখায় একটা ভূগোল ভিত্তিক প্রকৃতি বিভাগও পেশ করেন। এগুলা হল ফিসিফরাস ইউরোপিয়ান, রেসিয়েল বণ্ঢ্যাক আফ্রিকান, পলিটো-রিলিজিয়াস মিডুল ইস্টার্ন, মেসিয়ানিক রাশিয়ান, মার্কিন মেলটিং পট, এশিয়ান এনটি-কলোনিয়েল ও লেটিন আমেরিকান পপুলিস্ট নেশোনেলিজম । [৪৫] তার এই প্রকৃতি বিভাগ নেশোনেলিজমকে যতটা না, তারচে বেশি এর দুনিয়া জুড়ে প্রসারকে বুঝতে সহায়ক। তা সত্বেও, এটা ছিল আগেকার ইউরোসেন্ট্রিক প্রকৃতি বিভাগ এড়াবার একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
হালে বহুল ব্যবহৃত একটা প্রকৃতি বিভাগ হল হিউ সিটন-ওয়াটসন (Hugh Seton-Watson)-এর ওল্ড কন্টিনিউয়াস ও নিউ নেশনস (উপ-বিভাগ সেসেশনিস্ট, ইররিডেন্টিশ ও নেশন-বিলডিং) নেশোনেলিজম। এর খেয়াল করার মত দিকটা হল, আইডোলজির বদলে প্রক্রিয়ার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া। [৪৬]
অন্যদিকে জন ব্রুইলি (John Breuilly) নেশোনেলিজমকে মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যবধানের পটভূমিকায় গড়ে উঠা রাজনৈতিক বিরোধীতা রুপে দেখে নেশোনেলিস্ট বিরোধীতাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলা হল, সেসেশন, ইউনিফিকেশন এবং রিফর্ম মুভমেন্ট। এদের প্রত্যেকটা আবার পুরানা সাম্রাজ্য কিংবা তাদের কলোনিতে অথবা নেশন স্টেইট কিংবা নেশন স্টেইট দাবি না করা রাষ্ট্রে পাওয়া যেতে পারে। [৪৭]
এই ধারার আরেকটা প্রকৃতি বিভাগ পেশ করেছেন মাইকেল হেক্টার (Michael Hechter)। তার বিভাগ গুলা হল, পেরি-ফেরিয়েল, ইররিডেন্টিশ ও ইউনিফিকেশন নেশোনেলিজম। [৪৮]
উপরের পর্যালোচনার আলোকে আমরা বলতে পারি;
১. নেশন বা জাতি বলতে বুঝায় এমন একটা মানব গোষ্ঠি যারা
(ক) অনাত্মীয় হলেও সংহত ও (খ) আশেপাশের অন্য মানব গোষ্ঠির চেয়ে আলাদা সম্মিলিত ইতিহাস সচেতনতা, স্বতন্ত্রতা ও স্বার্থজ্ঞান সম্পন্ন এবং যাদের (গ) নিজেদের সমষ্টি স্বার্থ, স্বকীয়তা ও অস্থিত্ব বজায় রাখার আকুতি (ঘ) আর তার জন্য স্বশাসিত রাষ্ট্র গড়ার মত ভূখন্ড ও (ঙ ) পর্যাপ্ত লোকবল রয়েছে। অন্য কথায় নেশন এমন একটা এথনি বা স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র্য সম্পন্ন জনগোষ্ঠি যার স্বশাসিত রাষ্ট্র পাওয়ার তাগিদই শুধু নয়, তা গড়ার মত ভূখন্ড ও জনবল রয়েছে।
২. নেশোনেলিটি বা মাইনোরিটি কমিউনিটি বলতে বুঝবো কোন রাষ্ট্রে বসবাস রত এথনি যারা চাইলেও স্বশাসিত রাষ্ট্র গড়ার মত ভূখন্ড নাই।
৩. নেশোনেলিজম বলতে বুঝবো কোন মানব গোষ্ঠির তরফ থেকে স্বাদেশিকতার স্বক্রিয় মতবাদকে।
৪. নেশোনেলিস্ট বলতে বুঝবো নেশোনেলিজমের প্রবক্তা ও প্রয়াসীদেরকে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন