যাকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করতেন রবীন্দ্রনাথ
_তারেক অণু
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক – কি আশ্চর্য শক্তিশালী ধরনের নব চেতনার ধারক একটি কথা! জগতের সকল প্রাণী, কেবলমাত্র মানুষ নয়, সমস্ত প্রাণীকুলের সুখী হবার অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়েছে এইখানে। সেই আঁধার যুগে শোনালেন সাম্যবাদের গান, কে তিনি?
সিদ্ধার্থ নামের এক যুবরাজ, যিনি পরিচিত সারা বিশ্বের কাছে গৌতম বুদ্ধ হিসেবে। তিনিই বিশ্বে প্রথম কমিউন বা সঙ্ঘ শব্দটি ব্যবহার করেন, যে কারণে অনেকেই তাকে কমিউনিজমের আদি গুরু বলে থাকেন, সেই সাথে সকলের সম অধিকারের ব্যাপারটি তো আছেই।
বুদ্ধদেব আমার কাছে এক পরম আশ্চর্যের মানুষ, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে আমাদেরই অঞ্চলের এই পাহাড়ি রাজ্যে জন্ম নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে কোন অলৌকিক বলে সত্যজ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে অলৌকিকতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বাণী দিলেন- ধর্মকে বিশ্বাস করো না - অন্ধভাবে ভুল জিনিস শিখতে পার, সংস্কৃতিকে অনুকরণ করো না - অন্যের ভুল ধারণা তোমাকে প্রভাবিত করতে পারে, নিজে যাচাই-বাছাই করে যুক্তিসিদ্ধ মনে হলেই তবে সেই তথ্য গ্রহণ করতে পার।
সেই সাথে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ কোটি দেবতাদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমাদের বিপদে তো দেবতারা এগিয়ে আসেন না, নিজেদেরই সামলাতে হয়! তাদের কি দরকার আমাদের ?
কিন্তু তাহলে যে দেবতা জ্ঞানে বুদ্ধ দেবের মূর্তিতে সারা বিশ্ব জুড়ে পুজো করা হয়! নানা বইপত্র ঘেঁটে জানলাম- যে বুদ্ধ ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না তিনি নিশ্চয়ই নিজের মূর্তি গড়ে উপাসনা করতে বলে যান নি। এই ক্ষেত্রে মূল সমস্যা পাকিয়ে গেছে ভারতীয় উপমহাদেশে আক্রমণকারী গ্রীক সেনাদল, যাদের নেতৃত্বে ছিল আলেকজান্ডার। তারা বয়ে আনা প্যাগান ধর্মের সাথে এই দেশীয় প্রচলিত বিশ্বাসের একটা জগাখিচুড়ি নির্মাণের প্রয়াস চালালো এবং ব্যাপক ভাবে সফল হল, মানুষের মনে গেড়ে থাকা বুদ্ধদেবকে তারা গ্রীক সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর আদলে মাথায় উঁচু করে বাঁধা চুলের আদলে ঢিবি দিয়ে নির্মাণ করল। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানেই মনে হয় একমাত্র উপাসনালয় স্থাপিত হয়েছিল যেখানে একই বেদিতে হারকিউলিস এবং বুদ্ধদেবের মূর্তি আসীন ছিল।
মনে প্রশ্নে ঝড় বয়ে যায়, যে মানুষটি এতটাই আধুনিক ছিল, সে কি করে গতজন্ম- পরজন্মের মত খেলো ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন? পরে শুনি, এটিও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চক্রান্ত, শঙ্করাচার্য নামের সেই মহা ধড়িবাজ মৌলবাদী হিন্দুব্রাহ্মণ বুদ্ধ দেবের দর্শনের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে তাকে বিষ্ণুর একটি অবতার হিসেবে চালিয়ে দিল, সেই সাথে আর্য হিন্দুধর্মের পরজন্ম- জন্মান্তরের মত বিষয়গুলো বৌদ্ধধর্মের অংশ হয়ে গেল, অথচ বুদ্ধদেব কোন ধর্ম প্রচার করতেন না, তিনি তার একান্ত উপলব্ধি অর্থাৎ দর্শন প্রচার করতেন, অথচ তার মৃত্যুর অনেক বছর পরে এই মহামানবকে নিয়েই চালু হল ধর্ম, মূর্তিগড়া, যাবতীয় ব্যবসা!
বুদ্ধদেব নিয়ে যত তথ্য হাতে আসে ততই শ্রদ্ধার মাত্রা মহাকাশ ছাড়িয়ে যায়, অবাক বিস্ময়ে আপ্লুত হতে থাকি বারংবার , বিশ্বের যেখানেই যাওয়া হয় বুদ্ধ সম্পর্কে নতুন বইয়ের খোঁজ পেলে সংগ্রহ করবার চেষ্টা করি সবসময়ই, তবে তাকে দেবতা জ্ঞানে গদ গদ ভক্তি মার্কা লেখা না, তার দর্শনমূল্য বিবেচনা করে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। এবং তাবৎ বিশ্ব হাতড়িয়ে কয়েক মাস আগে খেয়াল করি বুদ্ধদেব সম্পর্কে আমার পড়া সবচেয়ে সুলিখিত, ব্যপক তথ্যসমৃদ্ধ বইটি লেখা হয়েছে বাংলা ভাষাতেই, লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বুদ্ধদেব নামের শীর্ণ বইটি মূলত রবিঠাকুরের বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধদেব নিয়ে লেখার সংকলন, বইটির প্রথম লাইন হচ্ছে- আমি যাকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তার জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি।
এরপরে বিশ্বকবি তার ঐন্দ্রজালিক ভাষায় উচ্ছসিত উপমা আর মুগ্ধতার জাল বুনেই থেমে যান নি বরং রীতিমত যুক্তির কষ্টিপাথর দিয়ে যাচাই করে দেখিয়েছেন কেন বুদ্ধকে বিশ্বমানব বলা হয় এবং কেন তার বাণী সর্বজনগ্রাহ্য হবে। বিশেষ করে কবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন বারংবার সেই ভেদাভেদমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার প্রচলনের চেষ্টার, উল্লেখ করেছেন বুদ্ধের আবির্ভাবে- সত্যের বন্যায় বর্ণের বেড়া দিলে ভাসিয়ে।
বিশ্বের সব মানুষ যে সমান, বহু যুগ ধরে চলতে থাকা জাত-পাত, ভেদাভেদ যে কেবল শোষণকারী একটা সমাজের কুৎসিত চক্রান্ত তার বিরুদ্ধেই যেন মহাস্ত্র হয়ে এল বুদ্ধের দর্শন।
তার সম্পর্কে কবি গুরু বললেন- এত বড় রাজা কি জগতে আর কোনোদিন দেখা দিয়েছে! বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, অপবিত্র ভেদবুদ্ধির নিষ্ঠুর মূঢ়তা ধর্মের নামে আজ রক্তে পঙ্কিল করে তুলেছে এই ধরাতল, পরস্পর হিংসার চেয়ে সাংঘাতিক পরস্পর ঘৃণার মানুষ এখানে পদে পদে অপমানিত। সর্বজীবে মৈত্রীকে যিনি মুক্তির পথ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেই তারই বাণীকে আজ উৎকণ্ঠিত হয়ে কামনা করি এই ভাতৃবিদ্বেষকলুষিত হতভাগ্য দেশে।
সেই সাথে যাবতীয় কুসংস্কারের ঝাড় প্রচলিত ধর্মগুলোর বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে সত্য-সুন্দর আনন্দলোকের কবি লিখলেন- যে ধর্মকর্মের দ্বারা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবার আশঙ্কা আছে তাকেই ভয় করতে হবে।
একই সাথে স্বজাতির কূপমণ্ডূকতায় ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে উপলব্ধি করলেন- কেবল দানের দ্বারা যার ক্ষয় হয় না, বৃদ্ধি হয়, মানুষের প্রতি সেই শ্রদ্ধাকে সাম্প্রদায়িক সিন্ধুকের মধ্যে তালা বন্ধ করে রাখলুম।
বিশ্বমানবের উচ্চতায় আরোহণকারী রবীন্দ্রনাথ তারই মতন আরেক বিশ্বনাগরিকের বন্দনায় মেতে উঠে বলেছেন- তিনি তার সব-কিছু ত্যাগ করেছিলেন দীনতম মূর্খতম মানুষেরও জন্য। তার সেই তপস্যার মধ্যে ছিল নির্বিচারে সকল দেশের সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।
বাকী প্রবন্ধগুলোতে রবি ঠাকুর সরল ভঙ্গীতে বলে গেছেন বুদ্ধ দর্শনের ইতিহাস, নানা শ্লোকের তাৎপর্য, বিভিন্ন দেশে ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব, বৈষ্ণবধর্ম কতৃক দখলকৃত বৌদ্ধ জীবনধারা, প্রিয়তম মানুষের উদ্দেশ্যে রচিত শ্রদ্ধার্ঘ্য তার অমর কবিতা। এবং সেই সাথে দ্ব্যর্থ ভাবে বলে গেছেন- বৌদ্ধ ধর্মেই মানবকে দেবতার স্থান প্রথম দেওয়া হয়েছে।
_তারেক অণু
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক – কি আশ্চর্য শক্তিশালী ধরনের নব চেতনার ধারক একটি কথা! জগতের সকল প্রাণী, কেবলমাত্র মানুষ নয়, সমস্ত প্রাণীকুলের সুখী হবার অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়েছে এইখানে। সেই আঁধার যুগে শোনালেন সাম্যবাদের গান, কে তিনি?
সিদ্ধার্থ নামের এক যুবরাজ, যিনি পরিচিত সারা বিশ্বের কাছে গৌতম বুদ্ধ হিসেবে। তিনিই বিশ্বে প্রথম কমিউন বা সঙ্ঘ শব্দটি ব্যবহার করেন, যে কারণে অনেকেই তাকে কমিউনিজমের আদি গুরু বলে থাকেন, সেই সাথে সকলের সম অধিকারের ব্যাপারটি তো আছেই।
বুদ্ধদেব আমার কাছে এক পরম আশ্চর্যের মানুষ, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে আমাদেরই অঞ্চলের এই পাহাড়ি রাজ্যে জন্ম নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে কোন অলৌকিক বলে সত্যজ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে অলৌকিকতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বাণী দিলেন- ধর্মকে বিশ্বাস করো না - অন্ধভাবে ভুল জিনিস শিখতে পার, সংস্কৃতিকে অনুকরণ করো না - অন্যের ভুল ধারণা তোমাকে প্রভাবিত করতে পারে, নিজে যাচাই-বাছাই করে যুক্তিসিদ্ধ মনে হলেই তবে সেই তথ্য গ্রহণ করতে পার।
সেই সাথে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ কোটি দেবতাদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমাদের বিপদে তো দেবতারা এগিয়ে আসেন না, নিজেদেরই সামলাতে হয়! তাদের কি দরকার আমাদের ?
কিন্তু তাহলে যে দেবতা জ্ঞানে বুদ্ধ দেবের মূর্তিতে সারা বিশ্ব জুড়ে পুজো করা হয়! নানা বইপত্র ঘেঁটে জানলাম- যে বুদ্ধ ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না তিনি নিশ্চয়ই নিজের মূর্তি গড়ে উপাসনা করতে বলে যান নি। এই ক্ষেত্রে মূল সমস্যা পাকিয়ে গেছে ভারতীয় উপমহাদেশে আক্রমণকারী গ্রীক সেনাদল, যাদের নেতৃত্বে ছিল আলেকজান্ডার। তারা বয়ে আনা প্যাগান ধর্মের সাথে এই দেশীয় প্রচলিত বিশ্বাসের একটা জগাখিচুড়ি নির্মাণের প্রয়াস চালালো এবং ব্যাপক ভাবে সফল হল, মানুষের মনে গেড়ে থাকা বুদ্ধদেবকে তারা গ্রীক সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর আদলে মাথায় উঁচু করে বাঁধা চুলের আদলে ঢিবি দিয়ে নির্মাণ করল। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানেই মনে হয় একমাত্র উপাসনালয় স্থাপিত হয়েছিল যেখানে একই বেদিতে হারকিউলিস এবং বুদ্ধদেবের মূর্তি আসীন ছিল।
মনে প্রশ্নে ঝড় বয়ে যায়, যে মানুষটি এতটাই আধুনিক ছিল, সে কি করে গতজন্ম- পরজন্মের মত খেলো ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন? পরে শুনি, এটিও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চক্রান্ত, শঙ্করাচার্য নামের সেই মহা ধড়িবাজ মৌলবাদী হিন্দুব্রাহ্মণ বুদ্ধ দেবের দর্শনের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে তাকে বিষ্ণুর একটি অবতার হিসেবে চালিয়ে দিল, সেই সাথে আর্য হিন্দুধর্মের পরজন্ম- জন্মান্তরের মত বিষয়গুলো বৌদ্ধধর্মের অংশ হয়ে গেল, অথচ বুদ্ধদেব কোন ধর্ম প্রচার করতেন না, তিনি তার একান্ত উপলব্ধি অর্থাৎ দর্শন প্রচার করতেন, অথচ তার মৃত্যুর অনেক বছর পরে এই মহামানবকে নিয়েই চালু হল ধর্ম, মূর্তিগড়া, যাবতীয় ব্যবসা!
বুদ্ধদেব নিয়ে যত তথ্য হাতে আসে ততই শ্রদ্ধার মাত্রা মহাকাশ ছাড়িয়ে যায়, অবাক বিস্ময়ে আপ্লুত হতে থাকি বারংবার , বিশ্বের যেখানেই যাওয়া হয় বুদ্ধ সম্পর্কে নতুন বইয়ের খোঁজ পেলে সংগ্রহ করবার চেষ্টা করি সবসময়ই, তবে তাকে দেবতা জ্ঞানে গদ গদ ভক্তি মার্কা লেখা না, তার দর্শনমূল্য বিবেচনা করে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। এবং তাবৎ বিশ্ব হাতড়িয়ে কয়েক মাস আগে খেয়াল করি বুদ্ধদেব সম্পর্কে আমার পড়া সবচেয়ে সুলিখিত, ব্যপক তথ্যসমৃদ্ধ বইটি লেখা হয়েছে বাংলা ভাষাতেই, লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বুদ্ধদেব নামের শীর্ণ বইটি মূলত রবিঠাকুরের বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধদেব নিয়ে লেখার সংকলন, বইটির প্রথম লাইন হচ্ছে- আমি যাকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তার জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি।
এরপরে বিশ্বকবি তার ঐন্দ্রজালিক ভাষায় উচ্ছসিত উপমা আর মুগ্ধতার জাল বুনেই থেমে যান নি বরং রীতিমত যুক্তির কষ্টিপাথর দিয়ে যাচাই করে দেখিয়েছেন কেন বুদ্ধকে বিশ্বমানব বলা হয় এবং কেন তার বাণী সর্বজনগ্রাহ্য হবে। বিশেষ করে কবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন বারংবার সেই ভেদাভেদমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার প্রচলনের চেষ্টার, উল্লেখ করেছেন বুদ্ধের আবির্ভাবে- সত্যের বন্যায় বর্ণের বেড়া দিলে ভাসিয়ে।
বিশ্বের সব মানুষ যে সমান, বহু যুগ ধরে চলতে থাকা জাত-পাত, ভেদাভেদ যে কেবল শোষণকারী একটা সমাজের কুৎসিত চক্রান্ত তার বিরুদ্ধেই যেন মহাস্ত্র হয়ে এল বুদ্ধের দর্শন।
তার সম্পর্কে কবি গুরু বললেন- এত বড় রাজা কি জগতে আর কোনোদিন দেখা দিয়েছে! বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, অপবিত্র ভেদবুদ্ধির নিষ্ঠুর মূঢ়তা ধর্মের নামে আজ রক্তে পঙ্কিল করে তুলেছে এই ধরাতল, পরস্পর হিংসার চেয়ে সাংঘাতিক পরস্পর ঘৃণার মানুষ এখানে পদে পদে অপমানিত। সর্বজীবে মৈত্রীকে যিনি মুক্তির পথ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেই তারই বাণীকে আজ উৎকণ্ঠিত হয়ে কামনা করি এই ভাতৃবিদ্বেষকলুষিত হতভাগ্য দেশে।
সেই সাথে যাবতীয় কুসংস্কারের ঝাড় প্রচলিত ধর্মগুলোর বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে সত্য-সুন্দর আনন্দলোকের কবি লিখলেন- যে ধর্মকর্মের দ্বারা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবার আশঙ্কা আছে তাকেই ভয় করতে হবে।
একই সাথে স্বজাতির কূপমণ্ডূকতায় ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে উপলব্ধি করলেন- কেবল দানের দ্বারা যার ক্ষয় হয় না, বৃদ্ধি হয়, মানুষের প্রতি সেই শ্রদ্ধাকে সাম্প্রদায়িক সিন্ধুকের মধ্যে তালা বন্ধ করে রাখলুম।
বিশ্বমানবের উচ্চতায় আরোহণকারী রবীন্দ্রনাথ তারই মতন আরেক বিশ্বনাগরিকের বন্দনায় মেতে উঠে বলেছেন- তিনি তার সব-কিছু ত্যাগ করেছিলেন দীনতম মূর্খতম মানুষেরও জন্য। তার সেই তপস্যার মধ্যে ছিল নির্বিচারে সকল দেশের সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।
বাকী প্রবন্ধগুলোতে রবি ঠাকুর সরল ভঙ্গীতে বলে গেছেন বুদ্ধ দর্শনের ইতিহাস, নানা শ্লোকের তাৎপর্য, বিভিন্ন দেশে ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব, বৈষ্ণবধর্ম কতৃক দখলকৃত বৌদ্ধ জীবনধারা, প্রিয়তম মানুষের উদ্দেশ্যে রচিত শ্রদ্ধার্ঘ্য তার অমর কবিতা। এবং সেই সাথে দ্ব্যর্থ ভাবে বলে গেছেন- বৌদ্ধ ধর্মেই মানবকে দেবতার স্থান প্রথম দেওয়া হয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন