বিবর্তনবাদে বিজ্ঞানের পৃথিবীতে বুদ্ধ
নশ্বর সুজয়
Sydney, Australia
( দীর্ঘ শ্রমসাধ্য একটি নাতিদীর্ঘ ভিন্নধর্মী আলোচনা)
আলোচনার শুরুতে সর্বপ্রথম তথাগত বুদ্ধের অনবধ্য একটি গাথা তুলে ধরলাম- আড়াই হাজার বছর পূর্বেও বুদ্ধ কতটুকুই বিবর্তনবাদী ছিলেন তা জানার জন্য-
এককস্সেকম্হি কপ্পম্হি পুগ্গলস্সট্ঠি সঞ্চযো,
সিযা পব্বতসমো রাসি ইতি বুত্তাং মহেসিনা
-এক কল্প কালের মধ্যে একজন মানুষ যতবারই মৃত্যু বরন করে থাকে, যদি ততবারের অস্থি সমূহ সংগ্রহ করে রাখা হয় তাহলে বিশাল বৈপুল্যপর্বত প্রমাণ স্তুপে পরিণত হবে।- বুদ্ধ ( কাযবিজ্ঞান-৮১)
বিজ্ঞানীদের দাবী -মহাবিশ্বের নানা ভূতত্ত্বীয় বিবর্তনের ফলে আজকের এই পৃথিবী নামক গ্রহটির উৎপত্তি হয়। এছাড়াও বিজ্ঞানের অনুমান আমাদের এই পৃথিবীর বয়স মহাবিশ্বের বয়সের একতৃতীয়াংশ। সৌরজগৎ উৎপত্তির আনুমানিক ১০০বিলিয়ন বছরের পরবর্তী সময়ের মধ্যে নানা সংঘর্ষের ফলে সৃজন হয় এই পৃথিবী নামক আমাদের বাসযোগ্য গ্রহটি। তাও আবার আজ থেকে ৫৪ বিলিয়ন বছর আগে। যা কিনা একটি লৌহ এবং বায়ু মন্ডলে গঠিত ছিল।
এরই মধ্যে থিয়া নামক অন্য একটি গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর বিশাল একটি সংঘর্ষ হয়, ফলে ঐ সময় ধ্বংস হয়ে যায় বায়ুমন্ডল এবং ঐ থিয়া নামক গ্রহাণুটিও। এতে করে সৃষ্টি হয় আর এক নতুন গ্রহ , যাকে আমরা বলি চাঁদ।
বিজ্ঞান মতে ঐ সময়টি লক্ষ লক্ষ বছর সময়কাল পৃথিবী খুবই উত্তপ্ত ছিল, চারিদিকে টগবগ করতে থাকে গলিত লাভা। যা কিনা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে পাথরে রূপান্তরিত হয়। এবং ঐ পাথর থেকে পানি জমতে থাকে পৃথিবীর প্রথম সাগরে। বিজ্ঞানীরা আনুমানিক ধারনা করে যে এই পানি এবং পাথরের বয়স প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন বছর।
এভাবে আরো কয়েক বিলিয়ন বছর গত হলে ঐ পানি আর পাথরের সংস্পর্শে জমানো শ্যাওলা হতে প্রথম অক্সিজেনের সৃষ্টি হয়। ঐ সময়টিতে পৃথিবীতে অক্সিজেনর মাত্রা এতোই বেশি ছিল যে তাতে উৎপন্ন সকল প্রকার ব্যাকটিরিয়া মারা যায়। এর পরবর্তী প্রায় ১ বিলিয়ন বছর সময়কাল পৃথিবীতে আর তেমন কিছু পরিবর্তন ঘটেনি, কোনো প্রকার প্রানেরও সৃজন হয়নি, এমনকি কোন প্রকার নড়াচড়াও করেনি।
এভাবে স্থির থাকতে থাকতে হঠাৎ পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠাংশ আলাদা আলাদা হতে শুরু করে, খন্ড খন্ড হতে থাকে। যাকে আমরা বলি মহাদেশ। বিজ্ঞানের ধারণা প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে মহাদেশের এমন বিভাজনটি সংগঠিত হয়। ঐ সময়টিতেও পৃথিবীতে কোনো প্রকার প্রাণের আর্বিভাব হয়নি। কারণ ঐ সময়টিতে পৃথিবী ছিল তীব্র শীতল। এতটাই শীতল ছিল যে, পুরো পৃথিবী যেন একটি বরফ গোলায় রূপান্তরিত হয়।
এরপর ধীরে ধীরে বরফ হ্রাস হওয়া কালীন পৃথিবীতে আবারো অক্সিজেন জমতে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারনা ঐ সময়টিতে পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রাণের উদ্ভব হতে থাকে।
বিজ্ঞান বলে প্রথমে এককোষী তারপর বহুকোষী প্রাণীর উৎপত্তি হয়।
এরপরও বিজ্ঞানের দাবী ঐ সময়টিতে যেসকল এককোষী ও বহুকোষী প্রাণীর উদ্ভব হয়েছিল তাদের ৯০ শতাংশ প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে প্রকৃতিক নানা কারণে। এদের মধ্যে ডায়নোসরও ছিল। আজ থেকে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে সাইবেরিয়ার বিশাল অগ্ন্যৎপাতই এর দায়ী। এরপরও পরবর্তীতে ঘটে যায় ধ্বংসাত্মক তুষারপাত সহ এই পৃথিবীতে আরো নানা বিবর্তন। তাতেও লুপ্ত হয় ৭৫ শতাংশের অধিক প্রাণীকূল।
এভাবে নানা উৎপত্তি আর বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে আমরা উপনীত হয়েছি বর্তমানের এই পৃথিবী।
যাইহোক এইত গেল পৃথিবীর ক্রম বিকাশের সংক্ষিপ্ত আলোকপাত।
চলুন এবার জানা যাক মানুষের বিবর্তনবাদের সংক্ষিপ্ত ধারনা- মানুষের বিবর্তন বিষয়ে নানা ধর্ম নানা মতবাদ ভিন্ন ভিন্ন যুক্তিও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। তবে কোনটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেনি আজ অবদি। পক্ষান্তরে এবিষয়ে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বরাবরই আলাদা। মানব বিবর্তন বিষয়ে গবেষকদের মধ্য ডারউইন অন্যতম। ডারউইনের দাবী বর্তমানে এই মানব জাতিটির আদি বংশ হচ্ছে বানর বা শিম্পাঞ্জি।
দশ বছর গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে ডারউইন উপনীত হলেও, বিশ বছর কাল সেই সত্য গোপন করতে হয়েছিল তাঁকে। কেননা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জীব যে মানুষ তাঁরই পিতৃপুরুষ শিম্পাঞ্জি কিংবা গোরিলা, এটা তৎকালীন সমাজ যে মেনে নিতে পারবে না, তা ডারউইন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ব্রুনো, কোপার্নিকাস কিংবা গ্যালিলিওর জীবনী থেকে রক্ষণশীল সমাজের এই বিরোধিতা সম্পর্কে আজ অনেকটাই আমরা ধারণা করতে পারি।
তারপরও নানা প্রশ্ন থেকে যায়- আজো কোনো বানর বা শিম্পাঞ্জিকে লেজ খসে পরে মানুষে রূপান্তরিত হতে কেউ দেখেনি। যদি তাই হতো এতো দিন বানর বা শিম্পাঞ্জি নামক প্রাণীকূলটি পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকব না। সবই মানুষ প্রজাতিতে রূপ নিত। এছাড়াও আধুনিক বিজ্ঞানীরাও এমন ঘটনার প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ দিতে পারে নি।
এত গেল সংক্ষেপে মানব বিবর্তনের বিজ্ঞানের আনুমানিক ধারনা।
চলুন এবার আলোচনায় আসি আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের ব্যাখ্যায়। ঐ সময়কালে কিন্তু বিজ্ঞানের তেমন সাক্ষর পরিলক্ষিত হয় না। তবে এ বিজ্ঞান শব্দটির জনক সেই তথাগত বুদ্ধ। বুদ্ধের প্রথম দেশনায় ধর্মচক্র সূত্রে বার বার উল্লেখিত হয়েছে বুদ্ধ কর্তৃক। যেমন- চক্ষু বিজ্ঞান, ঘ্রাণ বিজ্ঞান, রূপ বিজ্ঞান ইত্যাদি। তবে বুদ্ধের বিজ্ঞান শব্দটির ব্যাখ্যা আর বর্তমান আধুনিক সাইনচ ব বিজ্ঞান শব্দটির ব্যাখ্যা পুরো ভিন্ন।
পৃথিবীর রহস্য বিষয়ে তথাগত বুদ্ধ সহজে উপস্থাপন করেছিলেন- এ সংসার আদি অন্ত বিরহিত। সংক্ষিপ্ত মানব জীবনে এর রহস্যের পেছনে ছুটলে পুরো জীবনই চলে যাবে তথাপি রহস্য রহস্যই থেকে যাবে। সুতরাং ঐ দিকে কালক্ষেপন না করে বর্তমানকে নিয়ে স্বীয় স্বীয় করণী সম্প্রদন কর।
পৃথিবী এমন কোন ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র বস্তুও অবশিষ্ট নেই যা হেতু ছাড়া সৃজন, উতপ্তি বা সংঘটিত হয়েছে।
অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-(মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮)
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।
প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে- ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে বুদ্ধ যদি পুনজন্ম বিশ্বাস করে তাহলে জন্মচক্রে প্রবেশের পূর্বে সত্ত্বার বা প্রাণীর অবস্থান কেমন ছিল। ভবচক্রে সর্বপ্রথম সে আসল কি ভাবে। আদিতে এই সত্ত্বার কিরূপ স্বরূপ ছিল। ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এসেই যায়। আবার অন্যদিকে যারা ঈশ্বরের বিশ্বাসী, প্রভু বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তারা জটপট করে উত্তর করেন- আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টি ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এখন যদি তাকে আবার দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হয় ; ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্কে কে সৃষ্টি করল। এর উত্তরেও আপনি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না প্রকৃত পক্ষে। সবদিকেই কিন্তু, কেন, এরূপ চলতেই থাকবে।
বুদ্ধের সমকালীন সময়েও বুদ্ধকে এরূপ উভয়কটিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ত্রিবেদজ্ঞ চতুরবেদজ্ঞ ব্রাম্মণরাই বুদ্ধের সাথে এরূপ তার্কিক যুদ্ধে আগ্রহী হতেন। ত্রিপিটকের বিভিন্ন সূত্রে তা পরিলক্ষিত হয়।
জগত - সৃষ্টি - জন্মতত্ত্ব বিষয়ে বুদ্ধের কেমন বিচার ধারণা বা সিদ্ধান্ত ছিল তা
আমরা বুদ্ধের বিভিন্ন দেশনায় দেখতে পাই।
এছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম মতে, অন্যান্য ধর্মের god অর্থাৎ generator, operator, destructor। অর্থাৎ ঈশ্বর এই কাজ করে থাকে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর নাই। তাই এই কাজগুলো কিভাবে সংঘটিত হবে? তাদের মতে এগুলো স্বয়ংক্রিয় একটি ‘নির্ভরশীলতা বা আপেক্ষিক’ একটি
পদ্ধতির মাধ্যমে হয়ে থাকে। এই
স্বয়ংক্রিয়
পদ্বতিকে ‘বিশ্বজনীন
নীতি’ বা ‘Cosmological Laws’ বলা যায়। বৌদ্ধ ধর্মে যদি সৃষ্টিকর্তা,
ধ্বংসকর্তা, পরিচালনকর্তা রূপে কাউকে বসানো একান্ত প্রয়োজন হয়
তাহলে এই নীতি বসান যায়। সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম (Rules of Physics or matter)
খ. চিত্ত নিয়ম (Rules of Mind or citta)
গ. বীজ নিয়ম (Rules of Germinal order)
ঘ. কর্ম নিয়ম (Rules of Karma ) এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম ( Rules of Dharma)।
এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।
Ven. S. Dhammika তার good question good answer গ্রন্থে চমকপ্রদ আলোকপাত করেছেন।
এ সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান এবং বুদ্ধের ব্যাখ্যা অভিন্ন। "অগ্গঞা সূত্রে" বুদ্ধের ব্যাখ্যা হলো, লক্ষ লক্ষ বছরের দীর্ঘ সময় ব্যাপী প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় সৌরমন্ডল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় সৌরমন্ডলের বর্তমান ঘূর্ণায়মান অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বপ্রকৃতির প্রথম প্রাণীর সৃষ্টি হয় জলে, এককোষী প্রাণী হিসেবে। পরবর্তী পর্যায়ে বিবর্তনের মাধ্যমে এককোষী প্রাণী বহুকোষী যৌগিক প্রাণীতে রুপান্তরীত হয়। প্রাকৃতিক কার্য-কারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রুপান্তর ঘটেছে, যা বুদ্ধের "প্রতীত্য সমুৎপাদ সূত্রে"ও দেশিত হয়েছে।
আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমরা মানুষের অপরিমেয় শক্তিতে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষ মূল্যবান এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে অনন্ত মেধা সুপ্ত আছে। কর্মসাধনায় প্রতিটি মানুষ বুদ্ধের মত প্রজ্ঞা লাভ করে কোন বিষয় আসলে যে রকম ঠিক সেই রকম প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করি, মনের ঈর্ষা, ক্রোধ ও ঘৃণার স্থলে করুণা, ক্ষমা ও মৈত্রীর অনূভূতিতে উজ্জিবীত হয়ে প্রতিটি মানুষ নিজ জ্ঞানশক্তির সাহায্যে জীবন জগতের সকল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। বুদ্ধ বলেছেন আমাদের অন্য কেউ রক্ষা করতে পারে না, নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হয়।
অজ্ঞতা ধূর করে জ্ঞানের আলোকে জীবনের স্বরুপ জ্ঞাত হয়ে আপন কর্মশক্তির সাহায্যে নিজ নিজ সমস্যা সমাধান করতে হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতার জ্ঞানাআলোকে বুদ্ধ স্পষ্ট ভাবে সেই পথ চলার সন্ধান দিয়েছেন।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, " যদি কোন ধর্ম আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমান
তালে চলে, তা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম।"
এদিক থেকে বৌদ্ধরা খুবই ভাগ্যবান.....
অবশ্য এই ব্যাপারে আরেক মহাপুরুষ ভেন. প্রফেসর আনন্দ কৌশল্যায়না বলেছেন, " বৌদ্ধরা এতই ভাগ্যবান যে তাদেরকে জন্মের পর
থেকেই ‘কেউনা’ নামক কোন অশরীরি শক্তির নির্দেশ, আদেশ অথবা কোন প্রেরিত বা নাজেলকৃত মতবাদকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে জীবন পরিচালনা করতে হয়না।"
ভারত বাংলা উপমহাদেশের প্রখ্যাত পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে -
“অজ্ঞানতারই অপর নাম ঈশ্বর। আমরা আমাদের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করতে লজ্জা পাই এবং তার জন্য বেশ ভারী গোছের একটা নামের আড়ালে আত্মগোপন করি। সেই ভারী গোছের আড়ালটির নামই ঈশ্বর। ঈশ্বর বিশ্বাসের আরও একটি কারণ হল বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের অপারগতা ও অসহায়ত্ব।"
বুদ্ধ ছিলেন মূলত একজন সমাজসংস্কারক, ধর্মপ্রচারক। কিন্তু অধিবিদ্যা বা আধ্যাত্মবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই ঈশ্বর, আত্মা, জগৎ প্রভৃতি বিষয়ের দার্শনিক বিচারে তাঁর কোন আগ্রহ ছিলো না।
এ বিষয়ে বুদ্ধ অতি সুন্দর উপমাসূচক দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। ব্রাহ্মণদের আত্মবাদ বিষয়ে ‘দীঘনিকায়ে’র ‘পোট্ঠপাদ সূত্তে’ বলা হয়েছে-
আত্মাকে স্বর্গসুখ ভোগ করতে কে দেখেছে? না দেখে তার অস্তিত্ব স্বীকার করা নিতান্ত উপহাস্যস্পদ। যদি কোন পুরুষ বলে যে, সে এই দেশের যে জনপদকল্যাণী (=দেশের সুন্দরতম স্ত্রী) তাকে চায়। তাতে লোকে তাকে প্রশ্ন করে, যে স্ত্রীকে সে চায় সে কি ক্ষত্রিয়াণী, ব্রাহ্মণী, বৈশ্যস্ত্রী বা শূদ্রী? অমুক নামধারী বা অমুক গোত্রধারী, লম্বা বা বেটে বা মাঝারি? এরূপ প্রশ্নে ‘না’ বললে (তাকে হয়তো নির্বোধ বা পাগল ঠাউরে) কেউ সেই বাক্যের কোন প্রমাণ চায় না। এরূপ আত্মবাদী ব্রাহ্মণবাক্যের প্রমাণ চাওয়া হয় না।
.
দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটি আরো সুন্দর। কোন ব্যক্তি প্রাসাদে আরোহণের জন্য চৌরাস্তায় সিঁড়ি বানালে লোকেরা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ওহে! তুমি যে প্রাসাদের জন্য সিঁড়ি বানাচ্ছো, তুমি কি জানো সেই প্রাসাদটি পূর্ব দিকে, দক্ষিণ দিকে, পশ্চিমদিকে বা উত্তরদিকে? উঁচু, নিচু বা মাঝারি? এই প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ বললে তাকে বলা হয় যে, যাকে তুমি জানো না, দেখোনি সেই প্রাসাদে চড়ার জন্য সিঁড়ি বানাচ্ছো? ঐদি এই প্রশ্নের উত্তরে ‘হাঁ’ বলা হয় তবে কি তার বাক্য প্রমাণশূন্য হবে না?
.
এই উদাহরণের সহায়তায় গৌতম বুদ্ধ দেখিয়েছেন যে, ব্রাহ্মণদর্শনে প্রতিপাদিত ‘আত্মা’ নামক কোন পদার্থ নেই। কেননা যখন কেউ আত্মাকে দেখেনি, শোনেনি তখন তার অস্তিত্ব কিভাবে স্বীকার করা হয়? পরলোকে সেই আত্মাকে সুখী বানাতে যে উপায় গ্রহণ করা হয় তা কি নিরর্থক নয়? কেননা যার মূল নেই তাকে সিঞ্চন করা প্রয়োজন হয় না।
মূলত বুদ্ধ একজন সমাজসংস্কারকই ছিলেন,।
.
শ্রাবস্তীর জেতবনে বিহার করার সময় মোগ্গলিপুত্ত তিস্স বুদ্ধকে দশটি প্রশ্ন করেছিলেন, যার উত্তরে বুদ্ধ নিস্পৃহ থেকেছিলেন। এগুলোকেই বুদ্ধের দশ অ-কথনীয় বলা হয়। মজ্ঝিমনিকায় অনুসারে বুদ্ধের অকথনীয় সূচিতে মাত্র দশটি বাক্য আছে, যা লোক (বিশ্ব), আত্মা এবং শরীরের ভেদাভেদ তথা মুক্ত পুরুষের গতি বিষয়ক। এই প্রশ্নগুলো হলো-
(ক) লোক বিষয়ক:
(১) লোক শাশ্বত বা নিত্য (eternal) কি-না ?
(২) লোক কি অনিত্য (non-eternal) ?
(৩) লোক কি সসীম (finite) ?
(৪) লোক কি অসীম (infinite) ?
(খ) দেহাত্মার একতা বিষয়ক:
(৫) আত্মা ও শরীর কি এক ?
(৬) আত্মা ও শরীর কি ভিন্ন ?
(গ) নির্বাণ-পরবর্তী অবস্থা বিষয়ক:
(৭) মৃত্যুর পর তথাগতের কি পুনর্জন্ম হয়েছে ?
(৮) মৃত্যুর পর কি তথাগতের পুনর্জন্ম হয় নি ?
(৯) তথাগতের পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া- উভয়ই কি সত্য ?
(১০) তথাগতের পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া- উভয়ই কি অসত্য ?
.
বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধের এ মৌনতার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা হয়েছে। কোন কোন পণ্ডিতের মতে বুদ্ধের এই নীরবতা তত্ত্ববিষয়ক অজ্ঞানের প্রতীক। কিন্তু এ মত গ্রহণযোগ্য নয় এজন্যেই যে, তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের উত্তর না জানলে তিনি ‘বুদ্ধ’ সংজ্ঞায় বিভূষিত হতেন না। বুদ্ধ শব্দের অর্থ জ্ঞানী। আবার কারো কারো মতে বুদ্ধ আত্মা, জগৎ, ঈশ্বর ইত্যাদির অস্তিত্বে সন্দিগ্ধ ছিলেন বলে এই মৌনতা তাঁর সংশয়বাদের স্বীকৃতি। কিন্তু তাঁদের এ ধারণা যে সম্পূর্ণই অর্বাচীন তার প্রমাণ হলো বুদ্ধের অনিত্যবাদ, অনাত্মবাদ, নিরীশ্বরবাদের মধ্য দিয়ে এই বহমান জগতের কোনো বস্তুকেই ধ্রুব বা নিত্য বলে স্বীকার না করা।
.
অনেক পণ্ডিত বুদ্ধের মৌন থাকাকে উদ্দেশ্যমূলক আখ্যায়িত করে বলেন, বুদ্ধ ছিলেন সর্বজ্ঞানী। তিনি তত্ত্বশাস্ত্রের প্রশ্নোত্তর জানতেন এবং মানবজ্ঞানের সীমাও জানতেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, তত্ত্বশাস্ত্রীয় যত প্রশ্ন আছে তাদের নিশ্চিতভাবে উত্তর হয় না। এরকম কোন প্রশ্নের উত্তরে দার্শনিকরাও এক মত নন। তত্ত্বশাস্ত্রের প্রশ্নে সৃষ্ট ঝঞ্ঝাট ব্যর্থ বিবাদকে প্রশ্রয় দেয়। কেননা অন্ধগণ স্পর্শ করে হাতির স্বরূপ বর্ণনা করলে সেই বর্ণনা বিরোধাত্মক ও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাই তিনি তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের প্রতি মৌন থেকে নিস্পৃহতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, সে সব প্রশ্নের উত্তর ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণে নিষ্প্রয়োজন। বুদ্ধমতে এসব অব্যাকৃত প্রশ্নে আগ্রহী হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এসব তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের উত্তরে ব্যবহার বা নীতিমার্গের কোন সমস্যার সমাধান হয় না।
.
বুদ্ধের মতে সংসার দুঃখে পরিপূর্ণ। দর্শনের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুঃখের সমাপ্তি সন্ধান। সেকারণে তিনি দুঃখের সমস্যা ও দুঃখনিরোধের উপর অধিক জোর দিয়েছেন। তাই মালুঙ্ক্যপুত্ত যখন বুদ্ধকে এই দশ অকথনীয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন- “ভগবন্ ! যদি এ বিষয়ে জানেন …তবে বলুন …না জানলে …বা যিনি জানেন না বা বোঝেন না তাঁকে সরাসরি বলে দেওয়াই যুক্তিসংগত- ‘আমি জানি না।’ …”
বুদ্ধ এর উত্তর দিতে গিয়ে বলেছেন- “…আমি একে অ-কথনীয় …বলেছি, …কারণ …এর সম্বন্ধে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভিক্ষুচর্যা বা ব্রাহ্মচর্যের জন্য যোগ্য নয়। আবার নির্বেদ-বৈরাগ্য, শান্তি …পরম-জ্ঞান ও নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যও এই অ-কথনীয়ের কোনো আবশ্যকতাই নেই; তাই আমি এদের বলেছি অবক্তব্য।”
.
বুদ্ধের মতে ভবরোগে পীড়িত জীব অধ্যাত্মবিষয় নিয়ে কী করবে ? তার কাছে তো কর্তব্য পথ জেনে চলা হচ্ছে জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। এজন্যেই বৌদ্ধধর্ম প্রারম্ভে মানুষকে নীতিশাস্ত্রে আগ্রহী করায় তা ‘নৈতিক যথার্থবাদ’ (ethical realism) নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। (বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক --রণদীপম বসু)
.
তবে কোন বদ্ধ চিন্তার পাকে আটকে না থেকে স্বাধীন চিন্তার পক্ষেই বুদ্ধের সম্মতি ও উপদেশ পরিলক্ষিত হয়। যেমন (মজ্ঝিমনিকায়-১/২/৩) বুদ্ধ উপদেশ শুরু করেছিলেন এভাবে-
“ভিক্ষুগণ! আমি সেতুর মতো অতিক্রম করার জন্য তোমাদের ধর্মোপদেশ দিচ্ছি, ধরে রাখার জন্য নয়। …যেমন, একজন পুরুষ …এমন এক বিরাট নদীর ধারে উপস্থিত হলো যার এপার বিপদসঙ্কুল, ভয়পূর্ণ এবং ওপার সুখ-সমৃদ্ধিপূর্ণ তথা ভয়রহিত। অথচ সেখানে যাওয়ার জন্য কোনো তরীও নেই, নেই কোনো সেতু। …তখন সে …তৃণ-কাষ্ঠ …পত্র সংগ্রহ করে সেতু বেঁধে, তার সাহায্যে দৈহিক পরিশ্রমের দ্বারা স্বস্তিপূর্বক নদী পার হলো। …এরপর তার মনে হলো- ‘এই সেতু আমার উপকার করল, এর সাহায্যে …আমি পার হলাম; অতএব এখন একে আমি কেনই বা মাথায় করে অথবা কাঁধে তুলে… নিয়ে যাব না।’ …তবে কি …ঐ পুরুষকে সেতুটির প্রতি কর্তব্য পালনকারী ধরতে হবে? …না…। ভিক্ষুগণ! ঐ পুরুষ সেতুটি থেকে দুঃখকেই আহরণ করবে।”
.
একবার বুদ্ধকে কেশপুত্র গ্রামের কালামো নানা মতবাদে সত্য-মিথ্যা সন্দেহ করে প্রশ্ন করেছিলেন- “প্রভু! কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ কেশপুত্র গ্রামে এসে নিজ নিজ মতবাদ প্রকাশ…করেন, অন্যের মতবাদে দ্বি-মত হন, নিন্দা করেন।… অন্যেরাও…স্বীয় মতবাদ প্রকাশ করে…অন্যের মতবাদে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেন। অতএব…আমার মনে এরূপ দ্বিধা হয়- এঁদের মধ্যে…কে সত্য বলেন কেই বা মিথ্যা বলেন?’
উত্তরে বুদ্ধ বলেন- “‘কালামো! তোমার সন্দেহই…ঠিক, যেখানে প্রয়োজন সেখানেই সন্দেহ করেছ। …কালামো! তুমি শ্রুত কথার (বেদের) ভিত্তিতে কারুর কথা মেনে নিও না; তর্কের খাতিরে, বিনা যুক্তিতে, বক্তার ভব্যরূপে মুগ্ধ হয়ে, নিজের পুরনো সিদ্ধান্তের অনুকূল বলে, এই শ্রমণ আমার গুরু’ বলে মেনে না নিয়ে, নিজের বিচারে যা তুমি ধর্মসংগত, উত্তম, নির্দোষ, অনিন্দিত মনে করবে, যাকে গ্রহণ করা হিতকর ও সুখকর বলে জানবে নির্দ্বিধায় তাকে স্বীকার কর।’”
.
নশ্বর সুজয়
Sydney, Australia
( দীর্ঘ শ্রমসাধ্য একটি নাতিদীর্ঘ ভিন্নধর্মী আলোচনা)
আলোচনার শুরুতে সর্বপ্রথম তথাগত বুদ্ধের অনবধ্য একটি গাথা তুলে ধরলাম- আড়াই হাজার বছর পূর্বেও বুদ্ধ কতটুকুই বিবর্তনবাদী ছিলেন তা জানার জন্য-
এককস্সেকম্হি কপ্পম্হি পুগ্গলস্সট্ঠি সঞ্চযো,
সিযা পব্বতসমো রাসি ইতি বুত্তাং মহেসিনা
-এক কল্প কালের মধ্যে একজন মানুষ যতবারই মৃত্যু বরন করে থাকে, যদি ততবারের অস্থি সমূহ সংগ্রহ করে রাখা হয় তাহলে বিশাল বৈপুল্যপর্বত প্রমাণ স্তুপে পরিণত হবে।- বুদ্ধ ( কাযবিজ্ঞান-৮১)
বিজ্ঞানীদের দাবী -মহাবিশ্বের নানা ভূতত্ত্বীয় বিবর্তনের ফলে আজকের এই পৃথিবী নামক গ্রহটির উৎপত্তি হয়। এছাড়াও বিজ্ঞানের অনুমান আমাদের এই পৃথিবীর বয়স মহাবিশ্বের বয়সের একতৃতীয়াংশ। সৌরজগৎ উৎপত্তির আনুমানিক ১০০বিলিয়ন বছরের পরবর্তী সময়ের মধ্যে নানা সংঘর্ষের ফলে সৃজন হয় এই পৃথিবী নামক আমাদের বাসযোগ্য গ্রহটি। তাও আবার আজ থেকে ৫৪ বিলিয়ন বছর আগে। যা কিনা একটি লৌহ এবং বায়ু মন্ডলে গঠিত ছিল।
এরই মধ্যে থিয়া নামক অন্য একটি গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর বিশাল একটি সংঘর্ষ হয়, ফলে ঐ সময় ধ্বংস হয়ে যায় বায়ুমন্ডল এবং ঐ থিয়া নামক গ্রহাণুটিও। এতে করে সৃষ্টি হয় আর এক নতুন গ্রহ , যাকে আমরা বলি চাঁদ।
বিজ্ঞান মতে ঐ সময়টি লক্ষ লক্ষ বছর সময়কাল পৃথিবী খুবই উত্তপ্ত ছিল, চারিদিকে টগবগ করতে থাকে গলিত লাভা। যা কিনা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে পাথরে রূপান্তরিত হয়। এবং ঐ পাথর থেকে পানি জমতে থাকে পৃথিবীর প্রথম সাগরে। বিজ্ঞানীরা আনুমানিক ধারনা করে যে এই পানি এবং পাথরের বয়স প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন বছর।
এভাবে আরো কয়েক বিলিয়ন বছর গত হলে ঐ পানি আর পাথরের সংস্পর্শে জমানো শ্যাওলা হতে প্রথম অক্সিজেনের সৃষ্টি হয়। ঐ সময়টিতে পৃথিবীতে অক্সিজেনর মাত্রা এতোই বেশি ছিল যে তাতে উৎপন্ন সকল প্রকার ব্যাকটিরিয়া মারা যায়। এর পরবর্তী প্রায় ১ বিলিয়ন বছর সময়কাল পৃথিবীতে আর তেমন কিছু পরিবর্তন ঘটেনি, কোনো প্রকার প্রানেরও সৃজন হয়নি, এমনকি কোন প্রকার নড়াচড়াও করেনি।
এভাবে স্থির থাকতে থাকতে হঠাৎ পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠাংশ আলাদা আলাদা হতে শুরু করে, খন্ড খন্ড হতে থাকে। যাকে আমরা বলি মহাদেশ। বিজ্ঞানের ধারণা প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে মহাদেশের এমন বিভাজনটি সংগঠিত হয়। ঐ সময়টিতেও পৃথিবীতে কোনো প্রকার প্রাণের আর্বিভাব হয়নি। কারণ ঐ সময়টিতে পৃথিবী ছিল তীব্র শীতল। এতটাই শীতল ছিল যে, পুরো পৃথিবী যেন একটি বরফ গোলায় রূপান্তরিত হয়।
এরপর ধীরে ধীরে বরফ হ্রাস হওয়া কালীন পৃথিবীতে আবারো অক্সিজেন জমতে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারনা ঐ সময়টিতে পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রাণের উদ্ভব হতে থাকে।
বিজ্ঞান বলে প্রথমে এককোষী তারপর বহুকোষী প্রাণীর উৎপত্তি হয়।
এরপরও বিজ্ঞানের দাবী ঐ সময়টিতে যেসকল এককোষী ও বহুকোষী প্রাণীর উদ্ভব হয়েছিল তাদের ৯০ শতাংশ প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে প্রকৃতিক নানা কারণে। এদের মধ্যে ডায়নোসরও ছিল। আজ থেকে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে সাইবেরিয়ার বিশাল অগ্ন্যৎপাতই এর দায়ী। এরপরও পরবর্তীতে ঘটে যায় ধ্বংসাত্মক তুষারপাত সহ এই পৃথিবীতে আরো নানা বিবর্তন। তাতেও লুপ্ত হয় ৭৫ শতাংশের অধিক প্রাণীকূল।
এভাবে নানা উৎপত্তি আর বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে আমরা উপনীত হয়েছি বর্তমানের এই পৃথিবী।
যাইহোক এইত গেল পৃথিবীর ক্রম বিকাশের সংক্ষিপ্ত আলোকপাত।
চলুন এবার জানা যাক মানুষের বিবর্তনবাদের সংক্ষিপ্ত ধারনা- মানুষের বিবর্তন বিষয়ে নানা ধর্ম নানা মতবাদ ভিন্ন ভিন্ন যুক্তিও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। তবে কোনটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেনি আজ অবদি। পক্ষান্তরে এবিষয়ে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বরাবরই আলাদা। মানব বিবর্তন বিষয়ে গবেষকদের মধ্য ডারউইন অন্যতম। ডারউইনের দাবী বর্তমানে এই মানব জাতিটির আদি বংশ হচ্ছে বানর বা শিম্পাঞ্জি।
দশ বছর গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে ডারউইন উপনীত হলেও, বিশ বছর কাল সেই সত্য গোপন করতে হয়েছিল তাঁকে। কেননা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জীব যে মানুষ তাঁরই পিতৃপুরুষ শিম্পাঞ্জি কিংবা গোরিলা, এটা তৎকালীন সমাজ যে মেনে নিতে পারবে না, তা ডারউইন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ব্রুনো, কোপার্নিকাস কিংবা গ্যালিলিওর জীবনী থেকে রক্ষণশীল সমাজের এই বিরোধিতা সম্পর্কে আজ অনেকটাই আমরা ধারণা করতে পারি।
তারপরও নানা প্রশ্ন থেকে যায়- আজো কোনো বানর বা শিম্পাঞ্জিকে লেজ খসে পরে মানুষে রূপান্তরিত হতে কেউ দেখেনি। যদি তাই হতো এতো দিন বানর বা শিম্পাঞ্জি নামক প্রাণীকূলটি পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকব না। সবই মানুষ প্রজাতিতে রূপ নিত। এছাড়াও আধুনিক বিজ্ঞানীরাও এমন ঘটনার প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ দিতে পারে নি।
এত গেল সংক্ষেপে মানব বিবর্তনের বিজ্ঞানের আনুমানিক ধারনা।
চলুন এবার আলোচনায় আসি আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের ব্যাখ্যায়। ঐ সময়কালে কিন্তু বিজ্ঞানের তেমন সাক্ষর পরিলক্ষিত হয় না। তবে এ বিজ্ঞান শব্দটির জনক সেই তথাগত বুদ্ধ। বুদ্ধের প্রথম দেশনায় ধর্মচক্র সূত্রে বার বার উল্লেখিত হয়েছে বুদ্ধ কর্তৃক। যেমন- চক্ষু বিজ্ঞান, ঘ্রাণ বিজ্ঞান, রূপ বিজ্ঞান ইত্যাদি। তবে বুদ্ধের বিজ্ঞান শব্দটির ব্যাখ্যা আর বর্তমান আধুনিক সাইনচ ব বিজ্ঞান শব্দটির ব্যাখ্যা পুরো ভিন্ন।
পৃথিবীর রহস্য বিষয়ে তথাগত বুদ্ধ সহজে উপস্থাপন করেছিলেন- এ সংসার আদি অন্ত বিরহিত। সংক্ষিপ্ত মানব জীবনে এর রহস্যের পেছনে ছুটলে পুরো জীবনই চলে যাবে তথাপি রহস্য রহস্যই থেকে যাবে। সুতরাং ঐ দিকে কালক্ষেপন না করে বর্তমানকে নিয়ে স্বীয় স্বীয় করণী সম্প্রদন কর।
পৃথিবী এমন কোন ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র বস্তুও অবশিষ্ট নেই যা হেতু ছাড়া সৃজন, উতপ্তি বা সংঘটিত হয়েছে।
অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-(মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮)
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।
প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে- ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে বুদ্ধ যদি পুনজন্ম বিশ্বাস করে তাহলে জন্মচক্রে প্রবেশের পূর্বে সত্ত্বার বা প্রাণীর অবস্থান কেমন ছিল। ভবচক্রে সর্বপ্রথম সে আসল কি ভাবে। আদিতে এই সত্ত্বার কিরূপ স্বরূপ ছিল। ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এসেই যায়। আবার অন্যদিকে যারা ঈশ্বরের বিশ্বাসী, প্রভু বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তারা জটপট করে উত্তর করেন- আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টি ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এখন যদি তাকে আবার দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হয় ; ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্কে কে সৃষ্টি করল। এর উত্তরেও আপনি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না প্রকৃত পক্ষে। সবদিকেই কিন্তু, কেন, এরূপ চলতেই থাকবে।
বুদ্ধের সমকালীন সময়েও বুদ্ধকে এরূপ উভয়কটিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ত্রিবেদজ্ঞ চতুরবেদজ্ঞ ব্রাম্মণরাই বুদ্ধের সাথে এরূপ তার্কিক যুদ্ধে আগ্রহী হতেন। ত্রিপিটকের বিভিন্ন সূত্রে তা পরিলক্ষিত হয়।
জগত - সৃষ্টি - জন্মতত্ত্ব বিষয়ে বুদ্ধের কেমন বিচার ধারণা বা সিদ্ধান্ত ছিল তা
আমরা বুদ্ধের বিভিন্ন দেশনায় দেখতে পাই।
এছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম মতে, অন্যান্য ধর্মের god অর্থাৎ generator, operator, destructor। অর্থাৎ ঈশ্বর এই কাজ করে থাকে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর নাই। তাই এই কাজগুলো কিভাবে সংঘটিত হবে? তাদের মতে এগুলো স্বয়ংক্রিয় একটি ‘নির্ভরশীলতা বা আপেক্ষিক’ একটি
পদ্ধতির মাধ্যমে হয়ে থাকে। এই
স্বয়ংক্রিয়
পদ্বতিকে ‘বিশ্বজনীন
নীতি’ বা ‘Cosmological Laws’ বলা যায়। বৌদ্ধ ধর্মে যদি সৃষ্টিকর্তা,
ধ্বংসকর্তা, পরিচালনকর্তা রূপে কাউকে বসানো একান্ত প্রয়োজন হয়
তাহলে এই নীতি বসান যায়। সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম (Rules of Physics or matter)
খ. চিত্ত নিয়ম (Rules of Mind or citta)
গ. বীজ নিয়ম (Rules of Germinal order)
ঘ. কর্ম নিয়ম (Rules of Karma ) এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম ( Rules of Dharma)।
এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।
Ven. S. Dhammika তার good question good answer গ্রন্থে চমকপ্রদ আলোকপাত করেছেন।
এ সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান এবং বুদ্ধের ব্যাখ্যা অভিন্ন। "অগ্গঞা সূত্রে" বুদ্ধের ব্যাখ্যা হলো, লক্ষ লক্ষ বছরের দীর্ঘ সময় ব্যাপী প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় সৌরমন্ডল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় সৌরমন্ডলের বর্তমান ঘূর্ণায়মান অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বপ্রকৃতির প্রথম প্রাণীর সৃষ্টি হয় জলে, এককোষী প্রাণী হিসেবে। পরবর্তী পর্যায়ে বিবর্তনের মাধ্যমে এককোষী প্রাণী বহুকোষী যৌগিক প্রাণীতে রুপান্তরীত হয়। প্রাকৃতিক কার্য-কারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রুপান্তর ঘটেছে, যা বুদ্ধের "প্রতীত্য সমুৎপাদ সূত্রে"ও দেশিত হয়েছে।
আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমরা মানুষের অপরিমেয় শক্তিতে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষ মূল্যবান এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে অনন্ত মেধা সুপ্ত আছে। কর্মসাধনায় প্রতিটি মানুষ বুদ্ধের মত প্রজ্ঞা লাভ করে কোন বিষয় আসলে যে রকম ঠিক সেই রকম প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করি, মনের ঈর্ষা, ক্রোধ ও ঘৃণার স্থলে করুণা, ক্ষমা ও মৈত্রীর অনূভূতিতে উজ্জিবীত হয়ে প্রতিটি মানুষ নিজ জ্ঞানশক্তির সাহায্যে জীবন জগতের সকল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। বুদ্ধ বলেছেন আমাদের অন্য কেউ রক্ষা করতে পারে না, নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হয়।
অজ্ঞতা ধূর করে জ্ঞানের আলোকে জীবনের স্বরুপ জ্ঞাত হয়ে আপন কর্মশক্তির সাহায্যে নিজ নিজ সমস্যা সমাধান করতে হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতার জ্ঞানাআলোকে বুদ্ধ স্পষ্ট ভাবে সেই পথ চলার সন্ধান দিয়েছেন।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, " যদি কোন ধর্ম আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমান
তালে চলে, তা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম।"
এদিক থেকে বৌদ্ধরা খুবই ভাগ্যবান.....
অবশ্য এই ব্যাপারে আরেক মহাপুরুষ ভেন. প্রফেসর আনন্দ কৌশল্যায়না বলেছেন, " বৌদ্ধরা এতই ভাগ্যবান যে তাদেরকে জন্মের পর
থেকেই ‘কেউনা’ নামক কোন অশরীরি শক্তির নির্দেশ, আদেশ অথবা কোন প্রেরিত বা নাজেলকৃত মতবাদকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে জীবন পরিচালনা করতে হয়না।"
ভারত বাংলা উপমহাদেশের প্রখ্যাত পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে -
“অজ্ঞানতারই অপর নাম ঈশ্বর। আমরা আমাদের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করতে লজ্জা পাই এবং তার জন্য বেশ ভারী গোছের একটা নামের আড়ালে আত্মগোপন করি। সেই ভারী গোছের আড়ালটির নামই ঈশ্বর। ঈশ্বর বিশ্বাসের আরও একটি কারণ হল বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের অপারগতা ও অসহায়ত্ব।"
বুদ্ধ ছিলেন মূলত একজন সমাজসংস্কারক, ধর্মপ্রচারক। কিন্তু অধিবিদ্যা বা আধ্যাত্মবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই ঈশ্বর, আত্মা, জগৎ প্রভৃতি বিষয়ের দার্শনিক বিচারে তাঁর কোন আগ্রহ ছিলো না।
এ বিষয়ে বুদ্ধ অতি সুন্দর উপমাসূচক দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। ব্রাহ্মণদের আত্মবাদ বিষয়ে ‘দীঘনিকায়ে’র ‘পোট্ঠপাদ সূত্তে’ বলা হয়েছে-
আত্মাকে স্বর্গসুখ ভোগ করতে কে দেখেছে? না দেখে তার অস্তিত্ব স্বীকার করা নিতান্ত উপহাস্যস্পদ। যদি কোন পুরুষ বলে যে, সে এই দেশের যে জনপদকল্যাণী (=দেশের সুন্দরতম স্ত্রী) তাকে চায়। তাতে লোকে তাকে প্রশ্ন করে, যে স্ত্রীকে সে চায় সে কি ক্ষত্রিয়াণী, ব্রাহ্মণী, বৈশ্যস্ত্রী বা শূদ্রী? অমুক নামধারী বা অমুক গোত্রধারী, লম্বা বা বেটে বা মাঝারি? এরূপ প্রশ্নে ‘না’ বললে (তাকে হয়তো নির্বোধ বা পাগল ঠাউরে) কেউ সেই বাক্যের কোন প্রমাণ চায় না। এরূপ আত্মবাদী ব্রাহ্মণবাক্যের প্রমাণ চাওয়া হয় না।
.
দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটি আরো সুন্দর। কোন ব্যক্তি প্রাসাদে আরোহণের জন্য চৌরাস্তায় সিঁড়ি বানালে লোকেরা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ওহে! তুমি যে প্রাসাদের জন্য সিঁড়ি বানাচ্ছো, তুমি কি জানো সেই প্রাসাদটি পূর্ব দিকে, দক্ষিণ দিকে, পশ্চিমদিকে বা উত্তরদিকে? উঁচু, নিচু বা মাঝারি? এই প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ বললে তাকে বলা হয় যে, যাকে তুমি জানো না, দেখোনি সেই প্রাসাদে চড়ার জন্য সিঁড়ি বানাচ্ছো? ঐদি এই প্রশ্নের উত্তরে ‘হাঁ’ বলা হয় তবে কি তার বাক্য প্রমাণশূন্য হবে না?
.
এই উদাহরণের সহায়তায় গৌতম বুদ্ধ দেখিয়েছেন যে, ব্রাহ্মণদর্শনে প্রতিপাদিত ‘আত্মা’ নামক কোন পদার্থ নেই। কেননা যখন কেউ আত্মাকে দেখেনি, শোনেনি তখন তার অস্তিত্ব কিভাবে স্বীকার করা হয়? পরলোকে সেই আত্মাকে সুখী বানাতে যে উপায় গ্রহণ করা হয় তা কি নিরর্থক নয়? কেননা যার মূল নেই তাকে সিঞ্চন করা প্রয়োজন হয় না।
মূলত বুদ্ধ একজন সমাজসংস্কারকই ছিলেন,।
.
শ্রাবস্তীর জেতবনে বিহার করার সময় মোগ্গলিপুত্ত তিস্স বুদ্ধকে দশটি প্রশ্ন করেছিলেন, যার উত্তরে বুদ্ধ নিস্পৃহ থেকেছিলেন। এগুলোকেই বুদ্ধের দশ অ-কথনীয় বলা হয়। মজ্ঝিমনিকায় অনুসারে বুদ্ধের অকথনীয় সূচিতে মাত্র দশটি বাক্য আছে, যা লোক (বিশ্ব), আত্মা এবং শরীরের ভেদাভেদ তথা মুক্ত পুরুষের গতি বিষয়ক। এই প্রশ্নগুলো হলো-
(ক) লোক বিষয়ক:
(১) লোক শাশ্বত বা নিত্য (eternal) কি-না ?
(২) লোক কি অনিত্য (non-eternal) ?
(৩) লোক কি সসীম (finite) ?
(৪) লোক কি অসীম (infinite) ?
(খ) দেহাত্মার একতা বিষয়ক:
(৫) আত্মা ও শরীর কি এক ?
(৬) আত্মা ও শরীর কি ভিন্ন ?
(গ) নির্বাণ-পরবর্তী অবস্থা বিষয়ক:
(৭) মৃত্যুর পর তথাগতের কি পুনর্জন্ম হয়েছে ?
(৮) মৃত্যুর পর কি তথাগতের পুনর্জন্ম হয় নি ?
(৯) তথাগতের পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া- উভয়ই কি সত্য ?
(১০) তথাগতের পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া- উভয়ই কি অসত্য ?
.
বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধের এ মৌনতার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা হয়েছে। কোন কোন পণ্ডিতের মতে বুদ্ধের এই নীরবতা তত্ত্ববিষয়ক অজ্ঞানের প্রতীক। কিন্তু এ মত গ্রহণযোগ্য নয় এজন্যেই যে, তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের উত্তর না জানলে তিনি ‘বুদ্ধ’ সংজ্ঞায় বিভূষিত হতেন না। বুদ্ধ শব্দের অর্থ জ্ঞানী। আবার কারো কারো মতে বুদ্ধ আত্মা, জগৎ, ঈশ্বর ইত্যাদির অস্তিত্বে সন্দিগ্ধ ছিলেন বলে এই মৌনতা তাঁর সংশয়বাদের স্বীকৃতি। কিন্তু তাঁদের এ ধারণা যে সম্পূর্ণই অর্বাচীন তার প্রমাণ হলো বুদ্ধের অনিত্যবাদ, অনাত্মবাদ, নিরীশ্বরবাদের মধ্য দিয়ে এই বহমান জগতের কোনো বস্তুকেই ধ্রুব বা নিত্য বলে স্বীকার না করা।
.
অনেক পণ্ডিত বুদ্ধের মৌন থাকাকে উদ্দেশ্যমূলক আখ্যায়িত করে বলেন, বুদ্ধ ছিলেন সর্বজ্ঞানী। তিনি তত্ত্বশাস্ত্রের প্রশ্নোত্তর জানতেন এবং মানবজ্ঞানের সীমাও জানতেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, তত্ত্বশাস্ত্রীয় যত প্রশ্ন আছে তাদের নিশ্চিতভাবে উত্তর হয় না। এরকম কোন প্রশ্নের উত্তরে দার্শনিকরাও এক মত নন। তত্ত্বশাস্ত্রের প্রশ্নে সৃষ্ট ঝঞ্ঝাট ব্যর্থ বিবাদকে প্রশ্রয় দেয়। কেননা অন্ধগণ স্পর্শ করে হাতির স্বরূপ বর্ণনা করলে সেই বর্ণনা বিরোধাত্মক ও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাই তিনি তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের প্রতি মৌন থেকে নিস্পৃহতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, সে সব প্রশ্নের উত্তর ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণে নিষ্প্রয়োজন। বুদ্ধমতে এসব অব্যাকৃত প্রশ্নে আগ্রহী হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এসব তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের উত্তরে ব্যবহার বা নীতিমার্গের কোন সমস্যার সমাধান হয় না।
.
বুদ্ধের মতে সংসার দুঃখে পরিপূর্ণ। দর্শনের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুঃখের সমাপ্তি সন্ধান। সেকারণে তিনি দুঃখের সমস্যা ও দুঃখনিরোধের উপর অধিক জোর দিয়েছেন। তাই মালুঙ্ক্যপুত্ত যখন বুদ্ধকে এই দশ অকথনীয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন- “ভগবন্ ! যদি এ বিষয়ে জানেন …তবে বলুন …না জানলে …বা যিনি জানেন না বা বোঝেন না তাঁকে সরাসরি বলে দেওয়াই যুক্তিসংগত- ‘আমি জানি না।’ …”
বুদ্ধ এর উত্তর দিতে গিয়ে বলেছেন- “…আমি একে অ-কথনীয় …বলেছি, …কারণ …এর সম্বন্ধে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভিক্ষুচর্যা বা ব্রাহ্মচর্যের জন্য যোগ্য নয়। আবার নির্বেদ-বৈরাগ্য, শান্তি …পরম-জ্ঞান ও নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যও এই অ-কথনীয়ের কোনো আবশ্যকতাই নেই; তাই আমি এদের বলেছি অবক্তব্য।”
.
বুদ্ধের মতে ভবরোগে পীড়িত জীব অধ্যাত্মবিষয় নিয়ে কী করবে ? তার কাছে তো কর্তব্য পথ জেনে চলা হচ্ছে জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। এজন্যেই বৌদ্ধধর্ম প্রারম্ভে মানুষকে নীতিশাস্ত্রে আগ্রহী করায় তা ‘নৈতিক যথার্থবাদ’ (ethical realism) নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। (বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক --রণদীপম বসু)
.
তবে কোন বদ্ধ চিন্তার পাকে আটকে না থেকে স্বাধীন চিন্তার পক্ষেই বুদ্ধের সম্মতি ও উপদেশ পরিলক্ষিত হয়। যেমন (মজ্ঝিমনিকায়-১/২/৩) বুদ্ধ উপদেশ শুরু করেছিলেন এভাবে-
“ভিক্ষুগণ! আমি সেতুর মতো অতিক্রম করার জন্য তোমাদের ধর্মোপদেশ দিচ্ছি, ধরে রাখার জন্য নয়। …যেমন, একজন পুরুষ …এমন এক বিরাট নদীর ধারে উপস্থিত হলো যার এপার বিপদসঙ্কুল, ভয়পূর্ণ এবং ওপার সুখ-সমৃদ্ধিপূর্ণ তথা ভয়রহিত। অথচ সেখানে যাওয়ার জন্য কোনো তরীও নেই, নেই কোনো সেতু। …তখন সে …তৃণ-কাষ্ঠ …পত্র সংগ্রহ করে সেতু বেঁধে, তার সাহায্যে দৈহিক পরিশ্রমের দ্বারা স্বস্তিপূর্বক নদী পার হলো। …এরপর তার মনে হলো- ‘এই সেতু আমার উপকার করল, এর সাহায্যে …আমি পার হলাম; অতএব এখন একে আমি কেনই বা মাথায় করে অথবা কাঁধে তুলে… নিয়ে যাব না।’ …তবে কি …ঐ পুরুষকে সেতুটির প্রতি কর্তব্য পালনকারী ধরতে হবে? …না…। ভিক্ষুগণ! ঐ পুরুষ সেতুটি থেকে দুঃখকেই আহরণ করবে।”
.
একবার বুদ্ধকে কেশপুত্র গ্রামের কালামো নানা মতবাদে সত্য-মিথ্যা সন্দেহ করে প্রশ্ন করেছিলেন- “প্রভু! কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ কেশপুত্র গ্রামে এসে নিজ নিজ মতবাদ প্রকাশ…করেন, অন্যের মতবাদে দ্বি-মত হন, নিন্দা করেন।… অন্যেরাও…স্বীয় মতবাদ প্রকাশ করে…অন্যের মতবাদে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেন। অতএব…আমার মনে এরূপ দ্বিধা হয়- এঁদের মধ্যে…কে সত্য বলেন কেই বা মিথ্যা বলেন?’
উত্তরে বুদ্ধ বলেন- “‘কালামো! তোমার সন্দেহই…ঠিক, যেখানে প্রয়োজন সেখানেই সন্দেহ করেছ। …কালামো! তুমি শ্রুত কথার (বেদের) ভিত্তিতে কারুর কথা মেনে নিও না; তর্কের খাতিরে, বিনা যুক্তিতে, বক্তার ভব্যরূপে মুগ্ধ হয়ে, নিজের পুরনো সিদ্ধান্তের অনুকূল বলে, এই শ্রমণ আমার গুরু’ বলে মেনে না নিয়ে, নিজের বিচারে যা তুমি ধর্মসংগত, উত্তম, নির্দোষ, অনিন্দিত মনে করবে, যাকে গ্রহণ করা হিতকর ও সুখকর বলে জানবে নির্দ্বিধায় তাকে স্বীকার কর।’”
.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন