মঙ্গলবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৭

ফ্যাসিবাদ।


 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে মনে করে। রাষ্ট্র হচ্ছে বর্ম, নেপথ্যে থাকে একটি সর্বগ্রাসী দল বা গোষ্ঠী, ফ্যাসিবাদ যাদের আদর্শ। ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্রের গুরুত্বের ওপর জোর দেয়া হয়। ফ্যাসিবাদ সেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বিরোধী, যে গণতন্ত্রে জাতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে বিচার করা হয়।
 #ফ্যাসিবাদ-এ ভিন্নমতের কোন ঠাঁই নেই। এ জন্য ফ্যাসিবাদে ভিন্নমতকে সহ্য না করে দমন করা হয়।
পৃথিবীতেই একটি অত্যন্ত আলোচনা, সমালোচনা ও দুশ্চিন্তার ডিসকোর্স। এটি মানুষের বিকাশের জন্য হুমকি স্বরুপ। কিন্তু ফ্যাসিবাদের চরিত্র, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য; কিভাবে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র বিরাজ করে তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারার দরুণ ব্যর্থ হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম। সমাজ ও ব্যক্তিপরিসরে গভীরভাবে প্রোথিত থাকে ফ্যাসিবাদের শর্ত ও বীজ। ফ্যাসিবাদ একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনকে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের মতবাদ। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে – সামরিক স্বৈরতন্ত্রের কোন জনসমর্থন থাকেনা, অপরদিকে ফ্যাসিবাদের বৈধতা চেতন কিংবা অবচেতনভাবে জনগণের কাছ থেকেই আসে। ফলে,একটি চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় দমন-পীড়ণ-নিপীড়ণ-শোষণে সর্বসাধারণের জীবন অতিষ্ঠ হলেও ঠিক কী উপায়ে আন্দোলন সংগঠন ও মুক্তি অর্জন সম্ভব সেই ব্যাপারে জনগণ সম্পূর্ণভাবে থাকে অন্ধকারে।এমনকি দার্শনিক ভিত্তি ছাড়াও ফ্যাসিবাদ টিকতে পারেনা। জার্মানীতিতে #হিটলার’এর আবির্ভাবের পূর্বে শোপেনহাওয়ার-নীৎসে প্রমুখ দার্শনিকরা এই মতবাদের পক্ষে সমর্থন ও প্রচারণা চালান। শোপেনহাওয়ার খুঁজছিলেন একজন ‘জিনিয়াস’; নীৎসে খুঁজছিলেন একজন ‘সুপারম্যান’। পরবর্তীতে হিটলারের মত একজন ফ্যাসিস্ট শাসক জার্মানীর রাষ্ট্র ক্ষমতায় কিভাবে আবির্ভূত হয় তা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়না। মানবেন্দ্রনাথ রায় তাঁর ‘ফ্যাসিজম’ বইটিতে ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সমাজ-রাষ্ট্রকাঠামোয় এর বিস্তারের প্রকৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এটি পাঠ করা আবশ্যক কারণ এই আজকে পর্যন্ত পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ফ্যাসিবাদ বিরাজ করছে দোর্দন্ড প্রতাপে। ফ্যাসিবাদের শর্ত ও বীজ এবং জনগণ ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে তা অনুধাবনের মধ্যেই রয়েছে ভবিষ্যতের মানবমুক্তির পথ। আমেরিকা বর্তমান পৃথিবীর ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্র এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই কেন্দ্রের মধ্যমণি। সুতরাং, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবির্ভাবের পেছনে সমগ্র বিশ্বের মানুষ কোন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে তার নির্মোহ স্বরুপ অন্বেষণ করাই মুক্তিকামী মানুষের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।]
তুলনামুলকভাবে #ফ্যাসিবাদ একটি নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ। এটি ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম ইতালিতে আবির্ভূত হয়। তখন থেকেই এটি ইউরোপের সকল দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বেশ কয়েকটিতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর সহসা আবির্ভাব এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব স্বাভাবিকভাবেই একে বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য বিষয়ে পরিণত করছে। তবে ফ্যাসিবাদ কর্তৃক সংঘটিত নৃশংসতা সমগ্র প্রগতিশীল ও মুক্তিকামী পৃথিবীকে মর্মাহত করতেও সময় নেয়নি। এর পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক লেখালেখি হচ্ছে এবং হয়েছে। যুক্তিপ্রদর্শনকারী এবং স্তুতিকারী কোনটিরই অভাব না থাকার পরেও ফ্যাসিবাদকে রাজনৈতিকভাবে পশ্চাদগামী এবং সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল পরিবর্তন বলে আখ্যায়িত করা যায়, ক্ষয়প্রাপ্ত পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার চরম প্রচেষ্টা হিশেবে একে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধবংসাত্মক প্রভাব কর্তৃক সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ফ্যাসিবাদের উৎস। জার্মানিতে এর সাফল্যের পেছনে নানা আপাতযুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা গিয়েছিলো।
তথাপি আমাদের সময়ের এই বিকট অস্বাভাবিকতাকে নিয়ে সেই অর্থে তীক্ষ্ণ অনুসন্ধান হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে এটি যুদ্ধোত্তর কোন আবির্ভাব নয়। এমন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ করেই ঘটতে পারেনা। ইতিহাসে বেশ দীর্ঘকালব্যাপী ঘটতে থাকা দার্শনিক ভাবনা বিকাশের অবধারিত ফলাফল হচ্ছে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ। যদি ফ্যাসিবাদ একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে তবে এর মতাদর্শগত ভিত্তি নিহিত রয়েছে দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয়ে থাকে ফ্যাসিবাদের কোন দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা এই প্রপঞ্চটিকে বুঝতে বাধা দেয়। সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিশেবে আবির্ভাবের পূর্বেই ফ্যাসিবাদ একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন অর্জন করে এবং তা আঠারো-ঊনিশ শতকের নানা বৈপ্লবিক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের রসদ যোগানো বৈপ্লবিক দর্শনের বিপরীত। ফ্যাসিবাদী দর্শন উত্তর-হেগেলিয়ান আদর্শের যৌক্তিক পরিণতি। অত্যাধুনিক দৃষ্টবাদ (বৈজ্ঞানিক তথ্যই জ্ঞানের ভিত্তি ও সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র নিশ্চত পথ- অগাস্ট কোঁৎ এর মতবাদ-অনুবাদক), নব্য বস্তুবাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের সেই ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ঘরানাসমূহ যা ভাববাদকে বাতিল করার দাবি করে নতুন একপ্রকারের দার্শনিক অতীন্দ্রিয়বাদের অন্বেষণ করে। সেইসব ছদ্মবেশী বা অসৎ ভাবাদর্শ সমূহ প্রয়োগবাদ ও নব্য-হেগেলিয়ানবাদে গিয়ে শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে। প্রথমটি হীন বস্তুবাদের ইন্দ্রিয়সর্বস্ব উদরপূর্তিকরণ দর্শনের সাথে ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সমন্বয় করে এবং পরেরটি জঙ্গিবাদী প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে হেগেলিয়ান যুক্তিশাস্ত্রের বৈপ্লবিক বিকৃতি ঘটায়।ফ্যাসিবাদ নৈতিকতা, ন্যায়, স্বাধীনতার সকল পার্থিব মানকে লঙ্ঘন করে ঐশ্বরিক অনুমোদন দাবি করে। ইতালীয় ফ্যাসিবাদের আনুষ্ঠানিক দার্শনিক জিওভানি জেন্টাইল প্রথম এই দাবিটিকে ত্বরান্বিত করেন। তিনি বলেন, “মানুষ প্রকৃতিগত দিক থেকেই ধার্মিক। চিন্তার অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরের গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া। যে যত চিন্তা করবে সে তত ঈশ্বরের সান্নিধ্যে নিজেকে অনুভব করবে। যেহেতু মানুষের তুলনায় ঈশ্বরই সবকিছু। মানুষ কিছুই নয়” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক পশ্চাৎপদতাকে ন্যায়সঙ্গত করার লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদী #দার্শনিক আধুনিক ইউরোপের একেবারে গোড়ার মৈলিকসত্য মানবতাবাদকে উপেক্ষা করেছেন।পার্থিব মুক্তির জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হবার পূর্বে মানুষকে পরলৌকিক অভিভাবকত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হয়েছে। তাই এই কষ্টার্জিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক সুবিধাদি থেকে মানুষকে বঞ্চিত করতে নবজাগরণের সময়কাল থেকে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক মুক্তি হতে তাকে প্রবঞ্চিত করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।ফ্যাসিবাদী দর্শন কর্তৃক প্রচারিত মানুষের অতি-ধার্মিক আত্মবিলোপ হচ্ছে ঘৃণ্য বস্তুবাদের বহি:প্রকাশ যা বৈপ্লবিক দার্শনিক বস্তুবাদকে বিরোধীতার লক্ষ্যে উত্থিত হয়। ফ্যাসিবাদী বিশ্বাস মেনে নেয়া নশ্বর মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের ধর্মতত্ত্বের সকল বশ্যতা স্বীকার করা সত্তায় পরিণত করে শুধুমাত্র ঈশ্বরের ক্রীড়ানক হিশেবে পুনরুজ্জীবিত হয়, ঈশ্বরের সংকল্প এবং কর্মপ্রক্রিয়া সকল প্রকার পার্থিব অনুশাসনের ঊর্ধে বলে ধরে নেয়। স্বর্গীয় উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কৃত এহেন বর্বরতা ও সহিংসতামূলক কর্মকান্ড যাতে করে বৈধতা পায়, মহাবিশ্বে অনুপ্রবেশ করতে পারে। চিন্তার প্রক্রিয়াকে যাতে করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাই প্রতারণামূলকভাবে এদের “ঈশ্বরের ধ্যান” হিসেবে হাজির করা হয়। এইসব কর্মকান্ড ঐশ্বরিকপন্থায় অনুপ্রাণিত করা হয়। ঈশ্বর অধ:পতিত ও দুর্দশাগ্রস্ত পুঁজিবাদের ঢাল হয়ে ওঠেন এবং কুরুচিপূর্ণ বস্তুবাদের জরাগ্রস্ত ব্যবস্থার প্রত্যেক গোঁড়া ঠিকাদার স্বর্গীয় ভাবধারায় অনুপ্রাণিত ক্রীড়ানকে পরিণত হয়। এই চাতুর্যপূর্ণ কৌশলের মাধ্যমে ঈশ্বরের ক্রীড়ানকেরা অন্যদের স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের জন্য একচ্ছত্র স্বেচ্ছাচারিতা বহাল রাখে। ফ্যাসিস্ট শাসক পরিণত হয় অতিমানবে।যাইহোক, আত্মপ্রত্যাখানের এই অতি-ধর্মীয় মতবাদ ফ্যাসিবাদের সর্বগ্রাহী দার্শনিক জেন্টাইলকে “মানুষের অন্তহীন ও অবিনশ্বর অস্তিত্ব ” আবিষ্কার করা থেকে নিরুৎসাহিত করেনা। একটি জরাগ্রস্ত সামাজিক ব্যবস্থাকে সংরক্ষণের ঐতিহাসিক অসম্ভব কাজে নিযুক্ত মানুষের এই ‘পবিত্র’ উদ্দেশ্য অবশ্যই “অন্তহীন, নি:শর্ত ও স্বার্থহীন” হতে হবে। জেন্টাইল আত্মপ্রত্যাখান ও ফ্যাসিস্ট শাসকের সর্বেসর্বাত্বের বন্দনার মতো চূড়ান্ত পরস্পর-বিরোধী দুটি মতবাদকে “দার্শনিক” ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কোন অসুবিধাবোধ করেননি। তিনি একজন নব্য-হেগেলিয়ান এবং তিনি জানেন উদ্দেশ্য চরিতার্থের লক্ষ্যে কিভাবে তর্কশাস্ত্রের বিকৃতি ঘটাতে হয়। “আধ্যাত্মবাদী” সুবিধাজনক দর্শন ও প্রয়োগবাদও এক্ষেত্রে তাঁকে সহায়তা করেছে। “ভাবনা হচ্ছে ঈশ্বরের ধ্যান” এই মতবাদে দীক্ষিত করে তিনি মূলত এমন একটি ভূমিকা পালন করেন যেটিকে তিনি যুক্তিশাস্ত্রের একটি অনবদ্য কৌশলগত অনুষঙ্গ বলে বিশ্বাস করেন।
“#ঈশ্বর এবং ভাবনা জীবনের দুই বিপরীত প্রান্তের প্রতিনিধিত্ব করে। দুটোই আবশ্যকীয় এবং অপরিহার্য তথাপি একে অন্যের বিপরীত ও পরস্পর বিরোধী” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)।
উপরন্তু, ঈশ্বর এবং মানুষকে জেন্টাইল ঘোষণা করেন, “আত্মউপলব্ধির একটি শ্বাশ্বত গতির নমনীয় ঐক্য; একটি জীবন্ত এবং সেইসূত্রে নিরন্তর ঐক্য যা সবসময় আত্মসত্তার প্রতি অসন্তুষ্ট” (পূর্বোক্ত)। হেগেলিয়ান তর্কশাস্ত্রের করুণ ব্যঙ্গাত্মক বর্ণনা এই নব্য-পান্ডিত্যচর্চা বেশ অদ্ভূতভাবেই হিন্দু অতীন্দ্রিয়বাদেরসাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অতীন্দ্রিয়বাদ কী? এটা কি এমন কোন মানসিক আত্মসংযমহীন অবস্থা যা তমসাচ্ছন্ন জ্ঞান-সংস্কৃতির উপর আস্থাশীল করে এবং পরীক্ষালব্ধভাবে প্রতিপাদ্য বৈজ্ঞানিক সত্যও যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন দার্শনিক ধারণাকে প্রত্যাখান করে দেয়? জেন্টাইল কর্তৃক ব্যাখ্যাত ফ্যাসিবাদী দর্শন মূলত অতীন্দ্রিয়বাদেরই সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা। ভাবনার অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরের উপাসনা করা। তবুও তাঁর সাথে ভাবনার সম্পর্ক বৈপরীত্য, সাংঘর্ষিক!লক্ষ্য একই হবার পরেও কিভাবে সক্রিয় বৈপরীত্যের কর্মসম্পাদনকে নিষ্ক্রিয় ধ্যানের জগতের সাথে সনাক্ত করা যেতে পারে তা বোঝা যুক্তিবাদী মনের আয়ত্তের বাইরে। কিন্তু আধ্যাত্মবাদী ধারণাও যুক্তির সীমারবাইরে। সুতরাং ভাবনাকে গভীর ধ্যানের দ্বারা চিহ্নিত করা একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক উদ্ভাবন। কোন একটি বিষয়কে নিয়ে ভেবে আমরা জ্ঞানপ্রাপ্ত হই। ধ্যান এমন কোন ফললাভের দিকে পরিচালিত করেনা। এর মানে হচ্ছে ইতোমধ্যে জ্ঞাত বিষয়ের মধ্যেই বিরাজ করা। কেউ যদি ধর্মীয় পূর্বানুমান গুলো দিয়ে শুরু করে তবে সে কেবলমাত্র ঈশ্বরের উপর আরোপিত গুণগুলোই ধ্যান করতে পারে। কিন্তু পূর্বানুমান তার ধ্যানের উদ্দেশ্যকে ভাবনা নামক মানসিক কাজ থেকে দূরে স্থাপন করে। তাই এটা স্রেফ চিন্তার একটি সম্পূর্ণ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব যা ভাবনাকে ধ্যান কর্তৃক চিহ্নিত হতে দেয়না অথবা জ্ঞানতত্ত্বের মূলনীতির একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতি সাধন।

যাইহোক, এই অতীন্দ্রিয়বাদ যতই বিশৃঙ্খলাপূর্ণ এবং তমসাচ্ছন্ন হোক না কেন এর প্রায়োগিক উপপাদন খুবই স্পষ্ট।এগুলো সম্পূর্ণ চূড়ান্ত কদর্যভাবে পুরোদস্তুর বস্তুবাদী। হেগেলিয়ান রাষ্ট্রতত্ত্ব অনুপ্রেরণা নিয়ে জেন্টাইল ফ্যাসিস্ট স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে দার্শনিক অনুমোদন হাজির করেন, “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র আলিঙ্গন ও অন্তর্ভূক্ত করে সকল আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ যার মধ্যে ধর্মও রয়েছে। … …. যে রাষ্ট্র অন্য কোন সার্বভৌম ক্ষমতাকে মেনে নেয় সেই রাষ্ট্র আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। যা আধ্যাত্মিক তাই স্বাধীন কিন্তু রাষ্ট্রের – (যা নিজেই আধ্যাত্মিক) ক্ষমতার চূড়ান্ত সীমার মধ্যে” (পূর্বোক্ত)। আধ্যাত্মিক ফ্যাসিবাদী স্বৈরতন্ত্রের স্বর্গারোহিত ক্ষমতা কোন হীন বস্তুবাদী উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত তা “ফ্যাসিবাদী চর্চা” শীর্ষক অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। বুর্জোয়ারা ফ্যাসিবাদী স্বৈরতন্ত্রের নিষ্ঠুর অনুষঙ্গ দ্বারা তাদের হ্রাসমান ক্ষমতাকে রক্ষা করতে “রাজার ঐশ্বরিক অধিকার” এই দাবির উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিতে চায়। রাজার ধারণা অতীত হতে পারে কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত হেগেলিয়ান দার্শনিক মতবাদ অনুযায়ী বিমূর্তভাবে লব্ধ রাষ্ট্রের স্বর্গীয় অনুমোদনের বিশেষ সুবিধা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধভাবে না হলেও যৌক্তিকভাবে গত হওয়া রাজার ধারণা নতুন মোড়কে রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণী দাবি করতেই পারে। “রাজা কোন ভুল করতে পারেনা”- এই মধ্যযুগীয় প্রভুত্বব্যঞ্জক উক্তিকে ফ্যাসিবাদী দার্শনিকেরা “রাষ্ট্র কোন ভুল করতে পারেনা”- এই অনুশাসনমূলক উক্তিতে রুপান্তর করেছেন।

প্রসঙ্গক্রমে এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফ্যাসিবাদের শেকড় গীতার স্বর্গীয় দর্শনে খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে বলা হয়েছে পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষমতা (বিভূতি) হচ্ছে ভগবানের ক্ষমতা। তাই দার্শনিকভাবে ফ্যাসিবাদ নতুন কোন প্রপঞ্চ নয় অথবা এটা বলাও ভুল হবে যে এর কোন দর্শন নেই। ফ্যাসিবাদ জীবনের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির অনিবার্য পরিণতি। গীতা প্রচারিত মতবাদ এবং নব্য-হেগেলিয়ান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের দার্শনিকতত্ত্বের ধারণার মধ্যে সঙ্গত যোগসূত্র খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, ফ্যাসিস্ট স্বৈরতন্ত্রের দর্শন আধুনিক অতীন্দ্রিয়বাদ ও আধ্যাত্মবাদ থেকেই উৎসারিত যা জীবনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া পর্দশন করে। এর ভারতীয় পূর্বপুরুষদের শোপেনহাওয়ারের মধ্যদিয়ে চিহ্নিত করা যায় যাঁর শিষ্য নীটশে ছিলেন ফ্যাসিবাদী দর্শনের জনক। আরও তলিয়ে দেখার পূর্বে, এই বিকট আবির্ভাবের আধ্যাত্মবাদী অবিবেচনার সাথে কিছুটা পরিচিত হওয়া যাক। “ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের একটি গভীর আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য ও যথার্থতা রয়েছে।ফ্যাসিবাদী মতবাদ নিহিত রয়েছে তার কর্মপ্রবাহে। এটা কোন বদ্ধ মতাদর্শিক ব্যবস্থা নয়। এটা একটা নতুন ধরণের ভাবনা, নতুন ধরণের জীবনব্যবস্থা।ধর্মানুভূতি হচ্ছে ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য” (জি.জে-পূর্বোক্ত)। ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য তার কর্মপ্রবাহে পরিস্কারভাবে ব্যক্ত হয়েছে যা এর দার্শনিকের মতে একটু মতবাদ হিশেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফ্যাসিবাদী আন্দোলন মোহমুক্ত পাতি-বুর্জোয়া জনতাকে একটি ধর্মোন্মাদ বাহিনী হিসেবে একত্রিত করে এবং তাদেরকে একটি কূট ধর্মযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় যা জনসাধারণের পুরনো দাসত্বের শেকলেই নতুন প্রলেপ দিয়ে থাকে। ফ্যাসিবাদী শক্তি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দাসদের বিদ্রোহকে সহিংস উপায়ে দমিয়ে রাখে এবং ঘৃণ্য ভূমিকা পালনে একে পৃষ্ঠপোষকতা করে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াতন্ত্র। ফলে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচারী ক্ষমতা লাভে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। ফ্যাসিবাদের “দৃঢ়মূল আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য” প্রত্যক্ষ করা যায় বহু বছর ধরে সংঘটিত অসংখ্য সহিংসতার মধ্যে। এর সবটাই প্রয়োগের দিক থেকে কুরুচিপূর্ণ বস্তুবাদ তথা পুঁজিবাদকে রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব হিশেবে কৃত। এই ধরণের কাজ কিভাবে “দৃঢ় আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যের” সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়? ফ্যাসিস্ট দার্শনিক এর জবাব দেন: ফ্যাসিবাদের কোন নীতি নেই। এটি কোন যৌক্তিক মতাদর্শের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। আধ্যাত্মবাদের কোন কারণ জানা নেই; এর মধ্যে যুক্তির কোন স্থান নেই। ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যের বহি:প্রকাশ ঘটে এর স্বেচ্ছাচারিতায়। পুঁজিবাদী আধিপত্যের উপযোগিতা এই আধ্যাত্মবাদের উন্মত্ত আবির্ভাবের একমাত্র নীতি। ফ্যাসিবাদ নিজেকে প্রকৃত দার্শনিক তত্ত্ব ও যৌক্তিক নীতির বলয়ে জড়াতে চায়না।এটি পুঁজিবাদী সভ্যতার হীন বস্তুবাদ থেকে সমাজের মুক্তির চেষ্টায় রত শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত ধর্মযুদ্ধে যেকোন বর্ম ব্যবহারের ইচ্ছাপোষণ করে। একটি রহস্যজনক স্বর্গীয় ইচ্ছা, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য, ধর্মানুভূতির মতবাদ পার্থিব ক্ষমতার অবাধ স্বেচ্ছাচারিতায় খুবই কাজে আসে যেন একটি অতিমানবিক উদ্দেশ্যের নির্দেশ পালন করা যার কোন অনুশাসন নেই; যার কাছে মানবসৃষ্ট বিধি-বিধানের কোন বৈধতা নেই। তথাপি,জেন্টাইলের মতে, ফ্যাসিবাদ “প্রত্যেকটি বিমূর্ত, যৌক্তিক, অধর্মীয় চিন্তা, এমনকি অপ্রকৃত উদারনীতিবাদ এবং প্রকৃত বস্তুবাদী বন্ধনহীন নির্মাণশৈলীর প্রথা ও ব্যবস্থার” ঘোষিত শত্রু। এখানে আমরা আধ্যাত্মবাদকে তার প্রকৃত তাৎপর্য সমেত নগ্নরুপে পাই। ফ্যাসিবাদ ধর্মসম্বন্ধীয়; তাই এটি যুক্তিবাদকে অনিষ্ট এবং উদারনীতিবাদকে অপ্রকৃত ঘোষণা করে। এটি দার্শনিক বস্তুবাদের বিরুদ্ধে কারণ তা ঘৃণ্য বস্তুবাদী চর্চার সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব। এটি ধর্মের রক্ষাকারী কারণ বিশ্বাস অজ্ঞতার পারিতোষিক বরাদ্দ করে যা গণমানুষকে সহজেই শোষণ উপযোগী করে তোলে।

বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম।

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম
** সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম যে কোন ব্যক্তি, পরিবার তথা সমাজ ও রাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে অপরিহার্য নীতি আলোচনা কর?

উত্তর ঃ সুচনা ঃ সুত্তপিটকের অর্ন্তগত দীর্ঘনিকায়ের অর্থকথা সুমঙ্গল বিলাসীনি গ্রন্থে পূরাণ বর্জ্জিদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ভগবান যখন গৃধ্রকুট পর্বতে অবস্থান করতে ছিলেন। তখন রাজা অজাতশত্রু কর্তৃক প্রেরিত বর্ষকার মন্ত্রীর উক্তিকে বুদ্ধ বর্জ্জিদের সম্পকে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম সম্পর্কে অবগত করেছিলেন। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হল ঃ

সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম ঃ ভগবান বুদ্ধ বৈশালীর সারন্দদ চৈত্যে অবস্থান করার সময় বৃজিদের জাতীয় কল্যাণে যে সাতটি উপদেশ প্রদান করেছিলেন সে গুলোকে বৌদ্ধ সাহিত্যে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মরুপে আখ্যায়িত। এই সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মের মধ্যে নিহিত রয়েছে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপন করার অমূল্য উপদেশ। যে কোন ব্যক্তি বা পরিবার তথা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি এতে নিহিত রয়েছে। সে গুলো হল ঃ
১.    তাঁরা যেন সদা সর্বদা অভিন্ন হৃদয়ে সাধারণ সভায় সম্মিলিত হয়। অথার্ৎ বর্জ্জিগণ সর্বদা সম্মিলিত হন; সর্বদা সুম্মিলিত হতে অথার্ৎ গতকল্য সম্মিলিত হয়েছি পরশু ও পূনঃ অদ্য কেন সম্মিলিত হব, তারা এরুপ বলে না। এভাবে একতা ও সংহতি নিহিত আছে।
২.    তাঁরা যেন সকলে একমত হয়ে সংঘবদ্ধ ভাবে সভায় উপস্থিত হয় ও সভা ত্যাগ এবং একমতে সাধারণ কর্তব্য কার্য সম্পাদন করে। অর্থাৎ- বর্জ্জিগণ সম্মিলিত হওয়ার সংকেত পেলে তাদের মধ্যে কেউ এখনতো আমার কাজ আছে বা আমি তো মাঙ্গলিক কাজে ব্যাপৃত আছি এরুপ কোন আপত্তি না করে যে যেভাবে থাকুক না কেন যথা সময়ে সকলে সম্মিলিত হয়ে থাকেন ও কার্য্যাদি সকলে একমত হয়ে সম্পাদন করতঃ এক সঙ্গে বৈঠক হতে উঠে থাকেন এবং এক জনের রোগ, দুঃখ অভাবাদি ঘটলে সকলে মিলিত হয়ে তা প্রতিকার করেন। একের কার্য হলেও তা সকলে সম্পাদন করেন। এখানেও ঐক্য ও সংহতি ও সমাজ পরিচালনার নীতি নিহিত আছে।
৩.    তাঁরা যেন হঠাৎ অবিহিত বিধি ব্যবস্থা গ্রহন না করে বিহিত বিধি ব্যবস্থার উচ্ছেদ না করে এবং যথা বিহীত প্রাচীন বিধি ব্যবস্থা সমূহ পালন করেন। অর্থাৎ- বর্জ্জিগণ পূর্বে যেরুপ বিধি ধর্মতঃ ব্যবস্থাপিত হয়নি এমন কোন বিধি বর্তমানে ব্যবস্থাপিত সুনীতি গুলো ও লংঘন করেনা, পৌরানিক বজ্জীরাজ ধর্মে বিচারাদি সম্পর্কে যে রুপ ব্যবস্থা আছে তার অনুবর্তী হয়ে চলেন। এতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নিহিত আছে।
৪.    বায়োবৃদ্ধ ও জ্ঞান বৃদ্ধদের প্রতি সম্মান প্রর্দশন করে ও তাঁদের উপদেশ মেনে চলে। অর্থাৎ-বর্জ্জিগণ তাদের মধ্যে যাঁরা বৃদ্ধ তাঁদের প্রতি সৎকার গৌরব সম্মান ও পূজা করেন এবং তাঁদের হিতোপদেশ মেনে চলেন। এতে ঐক্য সংহতি ও সৎজীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।
৫.    তাঁরা যেন কুলবধ ুও কুলকমারীদের প্রতি কুব্যবহার বা কোন প্রকার জবর দস্তি না করে। অর্থাৎ, বর্জ্জিগণ কুলবধু ও কুলকুমারিদের প্রতি কুব্যবহার বা বলপূর্বক ধরে এনে স্বীয় গৃহে বাস করান না বা বলাৎকার করেন না। এতে সৎ জীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।
৬.    বর্জ্জিদেশের অভ্যন্তরে ও বর্হিভাগে বর্জ্জিদের প্রতিষ্ঠিত যত চৈত্য আছে, সেগুলো পূজার্চ্চানাদি দ্বারা সম্মান প্রর্দশন করে এবং তাদের প্রাপ্য রাজস্বাদি আতœসাৎ না করে। অর্থাৎ বর্জ্জিগণ তাঁদের স্বীয় নগরে ও বর্হিনগরে বর্জ্জীদের যে সমস্ত চৈত্য আছে তৎসমুদয় সৎকার গেীরব, সম্মান, পূজা যথাবিহিত ভাবে করে থাকেন এবং পূর্বে যে সমস্ত রাজস্ব দেশ সেবার্থে প্রদত্ত তা ফেরত নেয় না ও পূর্বকৃত ধর্ম্মত পূজার পরিহানি করে না।
৭.    তাঁরা যেন বর্জ্জি রাজ্যে অর্হৎদের রক্ষণাবেক্ষন ও ভরণ পোষনের সুব্যবস্থা করে যাতে তদ্দেশাস্থিত অর্হৎতেরা নিবিঘেœ ও শান্তিতে বসবাস করতে পারে এবং ভিন্ন দেশের অর্হৎতেরা ও তাঁদের রাজ্য আগমন করে শান্তি বাস করতে পারে। এতে সৎ জীবন যাপনের নীতি নিহিত আছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপনের জন্য অমূল্য উপদেশ। যা শিক্ষা করে আমাদের সমাজ, জাতি তথা পরিবারকে ঐক্য, সংহতি ও সৎজীবন যাপনের জন্য গড়ে তুলতে পারি। 

ভবচক্র।

বুদ্ধমতে ভবচক্রের (wheel of existence) দ্বাদশ নিদান:
.
(১) অবিদ্যা (ignorance) : অবিদ্যা হলো সকল দুঃখের মূল কারণ। অবিদ্যা মানে অজ্ঞান। এখানে অবিদ্যা অভাব-বাচক নয়, বরং বিরোধ-বাচক অর্থে প্রতিপাদন হয়েছে। অর্থাৎ অবিদ্যা মানে জ্ঞানশূন্য নয়, জ্ঞানের বিপক্ষ। যেমন যে বস্তু অবাস্তবিক তাকে বাস্তবিক ভাবা, সে বস্তু দুঃখময় তাকে সুখময় ভাবা, যে বস্তু আত্মা নয় (অনাত্মা, non-self) তাকে আত্মা ভাবা হচ্ছে অবিদ্যার প্রতীক। অবিদ্যা হলো সত্যের সম্যক জ্ঞানের অভাব। অবিদ্যার প্রভাবে আমরা অনিত্য সংসারকে নিত্য বলে মনে করি। বস্তুর যথার্থ স্বরূপকে না জানার কারণ অবিদ্যা প্রতিফলিত হয়ে সংস্কারকে উৎপন্ন করে। অর্থাৎ এই অবিদ্যাজনিত কামনা ও বাসনা থেকে উদ্ভূত হয় আমাদের সংস্কার।
.
(২) সংস্কার (impression) : সংস্কার হলো আমাদের অতীত জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ। অর্থাৎ পূর্বজন্মের কর্মাবস্থাই সংস্কার। পূর্বজন্মের কর্ম ও অনুভবের দরুন উৎপন্ন সূক্ষ্ম ও বাসনাময় বস্তু হলো সংস্কার। সংস্কারের কারণ হচ্ছে অবিদ্যা। অবিদ্যাজনিত কর্ম একপ্রকার শক্তি উৎপন্ন করে। এই শক্তি আবার কর্মের ফল সৃষ্টি করে। এক জীবনের সংস্কার পরের জীবনের চিন্তা ও কর্মকে উৎপন্ন করে। ফলে পূর্বজন্মের সংস্কার থেকেই পরজন্মের বিজ্ঞান বা চেতনা উদ্ভূত হয়।
.
(৩) চেতনা বা বিজ্ঞান (consciousness) : আমাদের বিজ্ঞান বা চেতনার কারণ হলো অতীত জীবনের সংস্কার। চেতনা থাকে বলেই এই জীবদেহ মাতৃগর্ভে দিন দিন বাড়তে থাকে, এই বিজ্ঞানের দরুনই শিশুর শরীর ও মন বিকশিত হয়। অর্থাৎ পূর্বজন্মের সংস্কার চৈতন্যরূপে মাতৃজঠরে আবির্ভূত হয় এবং জীবদেহ গঠন করে। কাজেই চেতনা থেকে উদ্ভূত হয় জীবদেহ বা নামরূপ।
বৌদ্ধদর্শন মতে এই বিজ্ঞান হচ্ছে প্রতিসন্ধি (জন্ম) স্কন্ধ। প্রতিসন্ধি ক্ষণে বা উপপত্তি ক্ষণে গর্ভস্থ পাঁচটি স্কন্ধ (রূপ, বিজ্ঞান, বেদনা, সংজ্ঞা ও সংস্কার) হচ্ছে বিজ্ঞান বা চেতনা। উল্লেখ্য, ভূতব্যতিরিক্ত অমূর্ত তত্ত্বকে বৌদ্ধগণ স্কন্ধ বলেন।
.
(৪) নামরূপ (mind body organism) : দৃশ্যমান শরীর ও মনের সংবলিত সংস্থানবিশেষ হচ্ছে নামরূপ। সোজা কথায় দেহ-মনের সংগঠন। নামরূপের কারণ হলো চেতনা বা বিজ্ঞান। এই নামরূপ থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের ষড়ায়তন বা ছয়টি ইন্দ্রিয়। ইন্দ্রিয়গুলোর নিবাস শরীরে ও মনে। পাঁচ বাহ্যেন্দ্রিয় শরীরে থাকে বলে মনে করা হয় এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মন হচ্ছে আন্তর। নামরূপের অস্তিত্ব না থাকলে এই ছয়টি ইন্দ্রিয় উদ্ভূত হতো না।
.
(৫) ষড়ায়তন (six sense organs) : ষড়ায়তন হলো বিশেষ বিশেষ বিষয়যুক্ত পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও মনের সঙ্কলন। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক হচ্ছে বাহ্য পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মন হচ্ছে আন্তর ইন্দ্রিয়। এই ছয়টি ইন্দ্রিয়ই বিষয়ের সাথে সম্পর্ক গ্রহণ করে। ইন্দ্রিয়ের প্রাদুর্ভাবকাল হতে ইন্দ্রিয়, বিষয় ও চেতনা বা বিজ্ঞানের সন্নিপাতকাল পর্যন্ত হচ্ছে ‘ষড়ায়তন’। এই ছয়টি ইন্দ্রিয় আছে বলেই স্পর্শ সম্ভব হয়। কাজেই ষড়ায়তন থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের স্পর্শ।
.
(৬) স্পর্শ (sense contact) : স্পর্শ হলো আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সাথে তাদের বিষয়ের সংযোগ। যদি বিষয়ের সাথে ইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক না হতো তবে ইন্দ্রিয়ানুভূতি (বেদনা) উদ্ভূত হতো না। সুখ-দুঃখাদির কারণ জ্ঞানের শক্তি উৎপন্ন হবার পূর্ব অবস্থা হচ্ছে স্পর্শ। এই স্পর্শ থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের অনুভূতি বা বেদনা।
.
(৭) বেদনা বা অনুভূতি (sense experience) : আমাদের বেদনা বা অনুভূতির কারণ হলো স্পর্শ। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা উৎপন্ন অনুভবই বেদনা। বুদ্ধমতে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা জীবের সুখাত্মক অনুভূতি হয় (যা জীবের তৃষ্ণাকে মৈথুনের পূর্বে যে-যাবৎ মৈথুনরাগের সমুদাচার না হয় সে-যাবৎ অবস্থা), তাকে ‘বেদনা’ সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এই বেদনা থেকেই উদ্ভূত হয় আমাদের তৃষ্ণা বা ভোগ-বাসনা।
.
(৮) তৃষ্ণা বা ভোগবাসনা (craving) : শব্দ, স্পর্শ, রূপ ইত্যাদি বিষয়ের বা ভোগ্যবস্তুকে ভোগ করার বাসনাই হলো তৃষ্ণা। অর্থাৎ তৃষ্ণা হচ্ছে বিষয়লাভের তীব্র ইচ্ছা। তৃষ্ণার কারণে জীব সাংসারিক বিষয়ের পশ্চাতে অন্ধের মতো দৌঁড়ায়। ভোগ ও মৈথুনের কামনাকারী জীবের অবস্থাই হচ্ছে তৃষ্ণা। রূপাদি কামগুণ ও মৈথুনের প্রতি রাগের সমুদাচার তৃষ্ণার অবস্থা। এর অন্ত হয় যখন এই রাগের প্রভাব থেকে জীব ভোগের পর্যেষ্টি আরম্ভ করে। এই তৃষ্ণা থেকেই উদ্ভূত হয় উপাদান বা বিষয়ের প্রতি অনুরাগ।
.
(৯) উপাদান বা বিষয়ানুরাগ (mental clinging) : উপাদান হলো জাগতিক বিষয়ের প্রতি অনুরাগ বা আসক্তি। যে জীব ভোগের পর্যেষ্টিতে দৌঁড়-ঝাঁপ করে তার সেই অবস্থা হচ্ছে উপাদান। এই উপাদানের কারণ হলো তৃষ্ণা এবং এই উপাদান থেকে উদ্ভূত হয় ভব বা পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রস্তুতি।
.
(১০) ভব (tendency to be born) : ভব কথার অর্থ হলো পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি বা ব্যাকুলতা। মানুষ বা জীবের মধ্যে জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি বিদ্যমান থাকায় তাকে জন্ম গ্রহণ করতে হয়। এই প্রবৃত্তি জীবকে জন্ম নিতে প্রেরিত করে। উপাদানবশে জীব কর্ম করে, যার ফল হচ্ছে অনাগত ভব। ‘ভব’ হচ্ছে কর্ম যার দরুন জন্ম হয়। এ হচ্ছে কর্মভাব। যে অবস্থায় জীব কর্ম করে তা হচ্ছে ভব। যেহেতু ভব থেকে উদ্ভূত হয় জাতি বা জন্ম, কাজেই পুনর্জন্মের কারণ হলো ভব।
.
(১১) জাতি (rebirth) : জাতি শব্দের অর্থ হচ্ছে জন্ম। এ হচ্ছে পুনঃ প্রতিসন্ধি (জন্ম), অর্থাৎ পুনর্জন্ম। মরণান্তর প্রতিসন্ধি কালে পঞ্চস্কন্ধ হচ্ছে জাতি। প্রত্যুৎপন্নভবের আলোচনায় যে অঙ্গকে ‘বিজ্ঞান বা চেতনা’ নাম দেয়া হয় তাকে অনাগত ভবের সমীক্ষায় ‘জাতি’ বলা হয়। (সংশ্লিষ্ট দার্শনিক পরিভাষায় বিষয়টা অনুধাবনে যে জটিল আকার ধারণ করে বাস্তবে তা এতো জটিল নয়; প্রথম আর্যসত্য দ্রষ্টব্য)। সোজা কথায়, জীব যদি জন্মগ্রহণ না করতো বা শরীর ধারণ না করতো তাহলে তাকে জরামরণের অধীন হতে হতো না। কাজেই জীবের জরামরণের কারণ হলো জাতি বা জন্ম।
.
(১২) জরামরণ (old age and death) : জরামরণ মানে জরা ও মরণ। আক্ষরিক অর্থে বার্ধক্য ও মৃত্যু। বৌদ্ধদর্শনে ‘জরামরণ’ বলতে রোগ, শোক, নিরাশা ইত্যাদি সাংসারিক সমস্ত দুঃখকেই বুঝানো হয়েছে। জীবের জরামরণ উদ্ভূত হয় তার জাতি বা জন্মের কারণে। তাই জরামরণাদি হলো সকল দুঃখের কারণ।
 .
এই বারোটি নিদানের মধ্যে প্রথম দুটি পূর্ববর্তী জীবনে, পরের আটটি বর্তমান জীবনে এবং শেষ দুটি ভবিষ্যৎ জীবনে কার্যকরী হয়। এখানে মূল কারণ অবিদ্যা। অবিদ্যার কারণে জীব বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না বলে তৃষ্ণা থেকে মুক্ত হতে পারে না এবং বার বার জন্মচক্রে পতিত হয়ে দুঃখ থেকেও মুক্ত হতে পারে না। এই অবিদ্যা থেকেই অন্য নিদানগুলি আবির্ভূত হয়ে ‘ভবচক্র’ অর্থাৎ অস্তিত্বের বৃত্তকে বারবার আবর্তিত করছে। তাই এই চক্রটির আবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে-
 .
[ অতীত জীবন বা পূর্বজন্ম ]
> ১.অবিদ্যা > ২.সংস্কার >
[ বর্তমান জীবন বা এ জন্ম ]
> ৩.চেতনা বা বিজ্ঞান > ৪.নামরূপ > ৫.ষড়ায়তন > ৬.স্পর্শ > ৭.বেদনা > ৮.তৃষ্ণা > ৯.উপাদান >
[ ভবিষ্যৎ জীবন বা পরজন্ম ]
> ১০.ভব > ১১.জাতি > ১২.জরামরণ > (১.অবিদ্যা)
.
উপরিউক্ত কারণ শৃঙ্খল থেকে বোঝা যায় যে, কার্যের দিক থেকে যেমন দুঃখ সর্বশেষ উৎপন্ন কার্য, তেমনি কারণের দিক থেকে অবিদ্যা সর্বপ্রথম কারণ।
সংগ্রহে : ভদন্ত জ্ঞানবংশ স্থবির।

সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৭

জাতি,জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয়তাবাদী।


ইংরেজি ভাষায় যেমন নেশনেলিজম বলতে আইডলজি অফ নেশনহুড বুঝায় [১]  তেমনি বাংলা ভাষায় জাতীয়তাবাদ কথাটা (জাতি+ঈয় = জাতীয়) ‘জাতি সম্মন্ধীয়’ মতবাদকে বুঝায়। [২] কোন ব্যক্তি বা সমষ্টির আত্ম-পরিচয়কে বাদ দিয়ে যেমন তাদের আত্ম-স্বার্থ ঠিক করা যায় না, তেমনি কোন জাতীয়তাবাদ তার জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থ চিন্তাকে বাদ দিয়ে গড়ে উঠতে পারে না। এই জন্য জাতীয়তাবাদীদের জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থকে শান দিয়ে আগে বাড়তে দেখা যায়।

১.২. জাতি ও নেশন

বাংলা ভাষায় জাতীয়তাবাদের মত জাতি শব্দটা কিন্তু কেবল তৎসম বা খাস সংস্কৃত থেকে নেওয়া নয়; এর একটা আলাদা ফারসি শিকড়ও আছে। সংস্কৃতে জাতি (জন্ [জনন, উৎপত্তি] + তি = জাতি) হল ‘জন্মগত ভাবে ভিন্ন প্রানী’ [৩] বা ইংরেজিতে যাকে বলে স্পিসিস। আর এই অর্থে বর্নাশ্রম ধর্মের চতুর্বর্ন ও তাদের নানা উপ-বর্নের প্রত্যেকটা মানব গোষ্ঠিকে জাতি বলা হয়। অন্যদিকে ফারসিতে জাতি (জাত + বি = জাতি) হল জন্ম নয়, ‘গুন কিংবা কর্মবিভাগ হেতু মনুষ্যবিভাগ’। [৪] যেমন, হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, ইহুদি, ইংরেজ, রাশিয়ান ইত্যাদি। বাংলা জবানে সংস্কৃত ও ফারসি এই দুই অর্থেই জাত ও জাতি কথা দুটার ব্যবহার রয়েছে। [৫] বাংলাভাষিদের মধ্যে নেশনের তরজমা রুপে জাতি কথাটাকে এই দুই আলাদা অর্থে পড়া হয়ে থাকে। বুঝে কিংবা না বুঝে কে কোন অর্থে পড়বেন তা মূলত নির্ভর করে তার কসমোলজি বা জগতদৃষ্টি ও আত্ম-পরিচয়ের উপর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ইংরেজী ঐ (নেশন) শব্দের দ্বারা যে অর্থ প্রকাশ করা হয় সে অর্থ ইহার আগে আমরা ব্যবহার করি নাই।’ এই ব্যবহারিক বোধির হেরফের এড়াবার জন্য যদিও তিনি ‘নেশন কথাটাকে তর্জমা না করিয়া ব্যবহার করাই ভাল’ বলে মত দেন, কিন্তু নেশন কি তা বর্ননা করতে গিয়ে নিজেই আবার বলেন, ‘যাদের মধ্যে জন্মগত বন্ধনের ঐক্য আছে তাহারাই নেশন।’ [৬] আরও পরে তিনিই আবার ‘মহাজাতি সদনের নামকরনের মাধ্যমে সর্বভারতীয় জাতীয় ঐক্যের দ্যোতক “মহাজাতি” শব্দটি আমাদের দিয়ে গেছেন।’ [৭] রবীন্দ্রনাথের এই ঘুরপাক উপরে উল্লেখ করা জাতি-পরিচয় ও জাতি-স্বার্থকে শান দিয়ে আগে বাড়ার জাতীয়তাবাদী প্রবনতার নমুনা মাত্র।

বাংলা ভাষায় দুই ভাবে জাতি কথাটাকে বুঝার কিংবা নেশনের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঘুরপাকের কারন যাই হউক না কেন, এখানে খেয়াল করার ব্যাপার হল ফারসির মত ইংরেজিতেও জন্মগত বন্ধনের ঐক্যের বাইরে নেশন রুপি একটা সংহত মানব গোষ্ঠির ধারনার চল এবং অন্যখানে একই লেবল আটা মানব গোষ্ঠির বেলায় নেশন কথাটার ব্যবহারিক অর্থ বদলে যাওয়া অসম্ভব নয়।

১.৩. নেশনের ধারনা

শুরুতে ইংরেজিতে লেটিন ক্রিয়াপদ নাসসি (Naci) থেকে নেশন কথাটা আসে। এটা শুধু মাত্র অন্য আরেকটা অপরিচিত এলাকার লোকদের বেলায় ব্যবহার করা হত। বিশেষ করে মধ্য যুগের শেষ দিকে ইউরোপের নানা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসা এক একটা অপরিচিত রাজ্য কিংবা অঞ্চলের ছাত্রদের বেলায় তা ব্যবহার করা হত। [৮] অন্যদিকে ১৮ শতকের শেষ দিকে ফ্রান্সে ডালাও ভাবে দেশের সব মানুষকে বুঝাতে নেশন কথাটার ব্যবহার শুরু হয়। নবুলমেন ও যাজক শ্রেনির আর্থিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য মূলক প্রাধান্য দূর করে দেশের শাসন ব্যবস্থাকে ‘যুক্তি ভিত্তিক’ করে সমাজকে ‘আধুনিক’ করতে চান এমন ‘লিবারেল রিপাবলিকানগন’ নেশন কথাটার এই নয়া অর্থ চালু করেন। ফরাসি বিপ্লব ও পহেলা মহা যুদ্ধের মাঝের সময়টাতে ইউরোপের প্রায় সব রাজ বংশের পতন ঘটলে নেশনের নয়া ও পুরানা অর্থ দুইটা এক হয়ে আপন ও অপর উভয়ের বেলায় ব্যবহার হতে থাকে এবং অনেক রাষ্ট্রের নাগরিকগন তথা নেশনকে সভারিন বা সার্বভৌম বলে ঘোষনা করা হয়। [৯]

প্রায় একই সময়ে পশ্চিম ইউরোপের ওই ‘গনতান্ত্রিকক বিপ্লব’-এর পাশাপাশি আরেকটা লিবারেল রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়। এতে দাবি করা হয়, আদতে সারা দুনিয়া নানা নেশনে ভাগ হয়ে আছে এবং বাইরের বাধাবিঘ্ন ছাড়া প্রত্যেক নেশনের নিজ ‘অন্তরাত্মার’ আইন মত চলার ও রাষ্ট্র গড়ার অধিকার রয়েছে। একমাত্র এই অধিকারকে মানার ভিতর দিয়ে দুনিয়ায় শান্তি আসতে পারে। [১০] আর এভাবে বিশেষ করে আন্ত-রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পরিভাষায় নেশন ও স্টেইট কথা দুইটার অর্থ একাকার হয়ে যায়; হাইফেন ওয়ালা নেশন-স্টেইট কথাটার ব্যবহার চালু হয়। কিন্তু শব্দ দুইটার অর্থকে আলাদা না রাখলে নেশোনেলিজমকে বুঝা যাবে না। [১১] কারন, নিজেদের রাষ্ট্র্র গড়ার ইচ্ছা ও তৎপরতার ভিতর দিয়ে বেশির ভাগ নেশোনেলিজমের উৎপত্তি, উদ্ভাবনা ও বিকাশ ঘটে।

এই ব্যাপারে আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার। যেহেতু নেশনের ধারনা, প্রত্যেকটা নেশনের সহজাত সার্বভৌমত্ব ও আজাদ হওয়ার অধিকারের মতবাদের জন্ম আধুনিক যুগে, তাই সত্তা হিসাবে নেশন ও নেশোনেলিজম উভয়কে মডার্ননিটি বা আধুনিকতার সংগে জড়িয়ে ফেলার এক ধরনের অনৈতিহাসিক ও ইউরোসেন্ট্রিক [১২] ঝোক দেখা যায়।

ধারনা হিসাবে নেশন ও নেশোনেলিজমের উৎপত্তি আধুনিক যুগের পশ্চিম ইউরোপে হলেও, সামাজিক, রাজনৈতিক সত্তা হিসাবে তাদেরকে আধুনিক কিংবা পশ্চিম ইউরোপিয়ান মনে করা যায় না। যা নতুন তা হল মধ্য যুগের দুনিয়া জুড়ে ডায়নেস্টিক স্টেইটস-এর প্রাধান্যের জায়গায় আধুনিক যুগের ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে নেশন-স্টেইটস-এর ধারনাগত প্রাধান্য।    
 ১.৪. এথনি, ধর্ম, ভাষা, কৃষ্টি ও নেশন

নেশোনেলিজমের স্কলারদের প্রায় সবাই একমত যে, নেশন হল মূলত অনাত্মীয় কিন্তু দড় সংহতিধারি একটা তুলনা মূলক ভাবে বড় মানব গোষ্ঠি। [১৩] প্রশ্ন হল, নেশন যদি একটা সংহত মানব গোষ্ঠি হয়, তা হলে পরিবার, গোত্র, বর্ন, ধর্ম, কৃষ্টি, ভাষা, এথনি [১৪] কিংবা ইচ্ছা ভিত্তিক এসোসিয়েশনের আওতাধীন মানব সমষ্টির সংগে নেশনের তফাতটা কোথায়?

জায়গা বিশেষে ধর্মীয়, ভাষাভাষিক কিংবা এথনিক মানব গোষ্ঠির মত বড় না হলেও, অন্যান্য সংহত মানব সমষ্টির চেয়ে নেশন সাধারনত আকারে অনেক বড় হয়ে থাকে। তাছাড়া, তুলনা মূলক ভাবে নেশনের একটা সবল ‘সম্মিলিত ইতিহাস চেতনা’ থাকে। আর এই চেতনা থেকে তারা আশে পাশের অন্যান্য মানব গোষ্ঠি থেকে নিজেদের আলাদা মনে করে। [১৫] এই সচেতনতা ও স্বাতন্ত্রত্বোধ আবার তাদের সমষ্টিগত স্বার্থ নির্ধারন করে। ইতিহাস সচেতনতা, স্বাতন্ত্রত্বোধ ও স্বার্থের ভেদাভেদ আশে পাশের নেশনের সাথে এক ধরনের আবছা বিরুপতা, রেষারেষি ও বিরুদ্ধতারই শুধু জন্ম দেয় না, সময় সময় সরাসরি যুদ্ধ ফসাদ সৃষ্টি করতে পারে। [১৬] ফরাসি বিপ্লবের পরে ইউরোপে রাজায় রাজায় যুদ্ধের জায়গায় মানব গোষ্ঠিতে মানব গোষ্ঠিতে যুদ্ধের যে উৎপত্তি হয়, [১৭] তা এর একটা বড় আলামত।

যেহেতু এই আমরা/ওরা আবেগময় বাচবিচার ও রেষারেষি ছাড়া নেশন হয় না, তাই অন্য মানব গোষ্ঠি থেকে বিচ্ছিন্ন ও যোগাযোগশূন্য কোন মানব গোষ্ঠির নেশন হওয়ার নজির মিলে না। [১৮]

কিন্তু বড় লোকবল ও মিলিত ইতিহাস চেতনা নেশন হওয়ার জন্য জরুরি হলেও, পর্যাপ্ত নয়। নেশন হওয়ার জন্য সবচে বড় যে উপাদানের দরকার হয় তা হল, একটা আলাদা কিংবা আলগ করার মত ভূখন্ড; যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ, স্বকীয়তা ও অস্থিত্ব বজায় রাখতে পারার মত রাষ্ট্র গড়েছে কিংবা গড়তে পারে। [১৯]
খেয়াল করার বিষয়, এই শেষ উপাদানটা নেশনকে এথনি থেকে আলাদা বিশিষ্টতা দেয়। এদিক থেকে নেশনকে যেমন বিশেষ ভূখন্ডে একত্রিত এথনি, [২০] অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক কমিউনিটিও [২১] বলা যেতে পারে।

১.৫. নেশন ও নেশোনেলিটি

দুনিয়া জুড়ে যেমন বহু নেশেন রয়েছে, তেমনি আত্ম-সচেতনতা, স্বার্থের হেরফের ও স্বাতন্ত্রবোধ রয়েছে, অথচ সভারিন রাষ্ট্র গড়ার মত পর্যাপ্ত লোকবল কিংবা আলগ করার মত ভূখন্ড ছাড়া অনেক মানব গোষ্ঠি দুনিয়ার প্রায় সব খানে রয়েছে। নেশন-স্টেইটের তাত্বিক ছকের মধ্যে এরকম মানব গোষ্ঠির অস্থিত্বকে কবুল করার ও তাদের জন্য কোন রাজনৈতিক স্পেইস বরাদ্দ করার সুযোগ নাই। কিন্তু ধারনাগত বাধা বাস্তবতাকে এড়াতে পারে না।

বাংলাদেশ হওয়ার কয়েক মাসের ভিতর বের হওয়া একটা গবেষনা রিপোটে দেখা যায় জাতিসংঘের তখনকার ১৩৫ টা তথাকথিত নেশন-স্টেইটের শতকরা ৮৮ টাই খাস নেশন ছাড়াও এক বা একাধিক সংখ্যালঘু এথনি অথবা ধর্মীয় কিংবা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠি নিয়ে গঠিত। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যায় ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯২ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ২০টিরও কম নেশন-স্টেইট। [২২] একই বাস্তবতা বাংলাদেশেরও। এখানেও একাধিক সংখ্যালঘু এথনি অথবা ধর্মীয় কিংবা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠি রয়েছে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা এসব নেশন-স্টেইটের আওতাধীন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠিকে হয় এথনিক মাইনরিটি বা মাইনরিটি অথবা সাব নেশোনেলিটি বা নেশোনেলিটি বলে থাকেন।

উপরে বলা হয়েছে নেশনের প্রাথমিক বুনিয়াদ হল দড় সংহতিবোধ। প্রশ্ন উঠবে, এই সংহতি বোধের মূলে কি কোন বিশেষ ধরনের অবজেকটিভ ফেক্টার বা বাস্তত উপাদান কাজ করে?

সাধারনত ভাষা ও ধর্মের মত ফেক্টারকে নেশনের সংহতির বড় রকমের মাধ্যম মনে করা হয়। এই ব্যাপারে কেবল লিবারেল স্কলারগনই নন, এংগেলস ও লেলিনের মত আদি মার্কসিস্ট তাত্বিকরাও [২৩] এক মত। যদিও পরে স্টেলিন জাতি গঠনে ধর্মের ভূমিকাকে পুরাপুরি অবান্তর বলে মত দেন, [২৪] ‘বহু মার্কসিস্ট প্রিন্সিপুলের মত এটাও তখনকার রাজনৈতিক অবস্থার সাথে অংগাংগিভাবে জড়িত ছিল।’ এর পিছনে তার বড় উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার বামপহ্নী বুন্ড দলের আলাদা জুইশ নেশোনেলিটির যৌক্তিকতা ও স্বায়ত্বশাসনের দাবিকে প্রতিহত করা। [২৫]
সে যাই হউক, বাস্তবে দেখা যায় ভাষা কিংবা ধর্ম বহু জায়গায় সংহতির বড় বাহন হলেও, আরও অনেক অনেক জায়গায় হয় নাই। [২৬] আসলে আগে থেকে ঠিক করা এক বা একাধিক সংহতি গড়ার উপাদানের ভিত্তিতে নেশনকে চিহ্নিত করা অসম্ভব। [২৭] কারন, কোথায় নেশনের কোন কোন সংহতির উপাদান গুরুত্ব পাবে, তা মূলত নির্ভর করে নেশোনেলিস্টদের ‘আমরা/ওরা’র ‘ওরা’ রুপি মানব গোষ্ঠির পরিচয়ের বাস্তব কিংবা বানোয়াট তফাতের দাবির উপর।

এই জন্য হালে স্কলারদের মধ্যে নেশনকে অবজেকটিভ নয়, সোসিয়েলি কন্সট্রাকটেড সাবজেকটিভ সত্তা রুপে দেখার একটা চল শুরু হয়েছে। এসব স্কলারদের বিবেচনায় নেশন হল এক ধরনের কল্পনা আশ্রয়ী ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’। [২৮] আগে যেখানে নানা রকম হাছামিছা মিথের সাহায্যে কালচার ও কিংডমকে সাবুদ করা হত, আজকাল তেমনি কোন বিশেষ মানব গোষ্ঠির জাতিগত মর্যাদা ও ভূখন্ডের উপর কর্তৃত্বের দাবিকে জাইজ কিংবা নাজাইজ করার জন্য হাছামিছা মিথ ব্যবহার করা হয়। [২৯] মশহুর মার্কসিস্ট স্কলার এরিক হবসবাম (Eric Hobsbawm)-এর জবানিতে নেশন হল এই ধরনের ‘বানোয়াট ট্রেডিশনগুলার’ মধ্যে সবচে বড়। [৩০]

১.৫. নেশোনেলিজম ও নেশোনেলিস্টস

মোটকথা, নেশনের উদ্ভব, উদ্ভাবনায় সহায়ক সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার দরকার হলেও নেশোনেলিস্টস অর্থাত নেশোনেলিজমের আইডলগদের প্রচেষ্টা ছাড়া সেই সম্ভাবনা বাস্তব রুপ নিতে পারে না। [৩১] অন্যদিকে, নোশোনেলিস্টদের গোষ্ঠি, শ্রেনি কিংবা অন্যান্য পরিচয়, স্বার্থ ও অভিজ্ঞতা জনিত প্রতিক্রিয়া তাদের নেশোনেলিজমের চরিত্র ও প্রকৃতি ঠিক করতে বড় রকমের ভূমিকা রাখে।

সালো ব্যারন (Salo Baron) দেখিয়েছেন, প্রটেস্টানটইজম, কথোলিসিজম, অর্থডক্স সিজারও-পাপালইজম ও জুডাইজম পশ্চিম ইউরোপের নানা দেশের নোশোনেলিস্টদের চিন্তা চেতনার রুপ দেয়। দেখতে সেখানকার নোশোনেলিস্ট মতবাদ গুলা যতই সেকুলার রুপ নিয়ে থাকুক না কেন, ঐসব ধর্মীয় বুনিয়াদের কথা বাদ দিয়ে তাদের চরিত্র ও প্রকৃতির বাস্তব ব্যবধানকে বুঝা যাবে না। [৩২]
অন্যদিকে হিউ ট্রেভর-রুপার (Hugh Trevor-Roper) হবসবার্গ সাম্রাজ্যের চেক, পোলিশ ও জুইশ ‘দুসরা ধারার’ নোশোনেলিস্টদের জামআন, ইতালিয়ান ও হাংগেরিয়ান ‘মূল ধারার’ নেশোনেলিজমের ধ্যান, ধারনা ও পদ্ধতি থেকে ধার নেওয়ার ও অনুকরন করার বিষয়টা তুলে ধরেছেন। যেখানে মূল ধারার নোশোনেলিস্টদের উদ্দেশ্য ছিল তাদের অনুমিত একই ভাষাভাষী পাশাপাশি প্রিন্সিপালিটি গুলাকে এক করা, সেখানে  দুসরা ধারার নেশোনেলিজমের লক্ষ্য হয় পড়ে ভাষা ও কালচারের ব্যবধানের ভিত্তিতে বড় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেংগে দিয়ে আলাদা হওয়া। [৩৩]

একই ভাবে এরিক হবসবাম নেশোনেলিজমকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একদিকে ফরাসি বিপ্লব অনুসারী সিভিক, গনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক এবং অন্যদিকে জারমান রোমান্টিক ধারার এথনিক, ভাষা ও কালচার ভিত্তিক নেশোনেলিজম। পহেলটার উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে ১৮৩০-৭০ সালের মধ্যে। লক্ষ্য ছিল জনগনকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের মাঝে জড় করে বাড়ন্ত অর্থনীতির পরিপূরক বড় বাজার তৈরি করা। অন্যদিকে অপরটার উৎপত্তি ও বিকাশ হয় ১৮৭০-১৯১৪ সালের মধ্যে। এর প্রকৃতি, প্রবনতা ছিল বড় রাজনৈতিক ইউনিটকে এথনিক ও ভাষাগত ব্যবধানের ভিত্তিতে ভেংগে দিয়ে বাড়ন্ত পুজিবাদি অর্থনীতির ইঞ্জিন নতুন টেকনোলজি ও উৎপাদন ব্যবস্থার আঘাত থেকে নিজেদের ট্রেডিশনেল কমিউনিটির জন্য স্বস্তি পাওয়ার পথ করা। এখানে এলিনেইটেড বা বিরাগী বুদ্ধিজীবিরাই হন এথনো-লিংগুস্টিক নেশোনেলিজমের বড় উমেদদার। [৩৪]

এলি কেদৌরি (Elie Kedourie) পশ্চিম ইউরোপে জাতীয়তাবাদী ধ্যান ধারনার শিকড় নির্দেশ করেছেন একদিকে ডেস্কাট থেকে কান্ট ও ফিক্টের দার্শনিক ঐতিহ্য ও ফিওরের জওয়াসিম, ফ্রান্সিসকান স্পিরুচিয়েলস ও মুনস্টারের এনাবেপ্টিস্টদের হেটেরোডক্স খৃশ্চিয়ান মিলেনিয়েলিজমের আর অন্যদিকে জার্মান ভাষাভাষী বুদ্ধিজীবিদের এলিনেশনের মাঝে। ফরাসি বিপ্লব এবং জার্মান রোমান্টিক্সদের আদর্শ ভেংগে পড়া ট্রেডিশনেল কমিউনিটির বিরাগী তরুনদের সবল কমিউনিটি অন্বেষী মনে দাগ কাটে এবং তারা পরিতৃপ্তি খুজে নেশনের নয়া সংহতি ও সহমর্মিতার মাঝে।

অন্যদিকে এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিগুলাতে পাশ্চাত্যের অনুকরনের সাথে তাদেরকে পাশ্চাত্যের সামাজিক ভাবে বর্জন জনিত রাগ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবিদের নেশোনেলিজমের মূল নিয়ামক হয়ে উঠে। কিন্তু নিজেদের ‘কাল্ট অফ দ্যা ডার্ক গডস’-এ ফিরে গেলেও, তারা ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবিদের হিস্টোরিসিজমকেই শুধু নয়, এমন কি তাদের নিখুত দুনিয়া গড়ার সাম্ভাব্যতায় (যার শিকড় খৃশ্চিয়ান মিলেনিয়েলিজম-এর মাঝে পুতা) বিশ্বাসের অনুকরন করে চলেন। [৩৫]

পশ্চিম ইউরোপের নেশোনেলিস্টদের কর্মকান্ডের পটভূমি ছিল প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে রাজতন্ত্রের ও সুবিধাভোগী নবুলমেন ও যাজক শ্রেনির উৎখাত করে গনতান্ত্রিক বিপ্লব ও আম মানুষের ইচ্ছা মাফিক শাসন কায়েম ও সামাজিক অগ্রগতির পথ করা। এসব নোশোনেলিস্টরা ছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেনির লোক। অন্যদিকে পুর্ব ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিয়েল শাসনের অধীন দেশ গুলাতে নোশোনেলিস্টরা হন মূলত পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত অথচ পুরানা সুবিধাভোগী শ্রেনির লোক। এই ব্যবধানের কারনে সেখানে নেশনের ধারনা ও নেশোনেলিজমের প্রকৃতি আলাদা রুপ নেওয়া অস্বাভাবিক ছিল না; এবং আদতে তাই হয়েছে। [৩৬]
১.৬. নেশোনেলিজমের প্রকৃতি বিভাগ

যেহেতু প্রত্যেকটা নেশোনেলিজম স্থান, কাল ও নেশোনেলিস্ট আইডলগ নির্ভর, তাই যে কোন নেশোনেলিজমকে বুঝতে হলে এক মাত্র ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা ও পর্যালোচনা করা ছাড়া আর কোন পথ নাই। অন্যদিকে নেশোনেলিজমকে যদি গবেষকের বানানো ধারনা মনে না করে জড়িত মানুষজনের প্রচেষ্টা ও সমর্থনের ফসল বলে মেনে নেওয়া হয়, তা হলে স্থান ও কাল নির্ভর প্রত্যেকটা নেশোনেলিজমের গতি প্রকৃতি থেকে নেশোনেলিজমের একটা স্থান কাল উত্তীর্ন ধারনা কিংবা চরিত্র প্রকৃতি ঠিক করা যাবে না। ফলে, ধারনা হিসাবে নেশোনেলিজমের পর্যাপ্ত ও সর্বসম্মত ডেফিনেশন মিলবে না। [৩৭] এতে নেশোনেলিজম কথাটা বর্তমান রাজনৈতিক ও বিশ্লেষন ধর্মী চিন্তার ব্যাপারে ব্যবহার করা সবচে আবছা ও ডিলাডেলা ধারনা গুলার মধ্যে অন্যতম [৩৮] রয়ে যাবে।

এই আন্ধাগলি থেকে বের হওয়ার জন্য দরকার নেশেনেলিজমের একটা পর্যাপ্ত অথচ সুনিদ্রিষ্ট ডেফিনেশন ঠিক করা এবং যে কোন নেশোনেলিজকে তুলনামূলক দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করার মত এই ডেফিনেশন থেকে সরাসরি বের করা একটা প্রকৃতি বিভাগ নিয়ে নানা নেশোনেলিজমের চরিত্র ও প্রকৃতির বিশ্লেষনের কাজ শুরু করা।

আদর্শ চরিত্র-প্রকৃতির ব্যবধানের ভিত্তিতে নেশোনেলিজমের একটা প্রকৃতি বিভাগ সম্ভবত পহেলা কার্লটন হেইজ (Carlton Hayes) বানান। এই গুলা ছিল মানবিক, ট্রেডিশনেল, জেকোবিন, লিবারেল এবং ইকোনমিক ও ইনট্রিগেল নেশোনেলিজম। [৩৯] যদিও হেইজের প্রকৃতি বিভাগ নেশোনেলিস্ট আদর্শের জটিলতা তুলে ধরতে সহায়ক, এর পটভূমিতে এক ধরনের ভাল মন্দের বাচ বিচারের উপস্থিতি রয়েছে, যা বস্তুনিষ্ট বিচার বিশ্লেষনের জন্য কাম্য নয়। [৪০]

তিন যুগেরও বেশি পরে একই আদর্শ চরিত্র-প্রকৃতির বিবেচনায় হ্যান্স কুন (Hans Kohn) নেশোনেলিজমকে দুই ভাগে ভাগ করেন, যথা পশ্চিমা ঐচ্ছিক (উপ-বিভাগ: ব্যক্তিবাদি ও সমষ্টিবাদি) ও পূবের অর্গেনিক টাইপ। [৪১] নৈতিক উদ্বেগ ছাড়াও, তার নিজের অন্যান্য লেখায় [৪২] তার প্রকৃতি বিভাগের ঘাটতি ধরা পড়ে। উদাহরন হিসাবে বলা যায়, তিনি যেখানে নেশন ও নেশোনেলিজমকে পুরাপুরি আধুনিক ব্যাপার বলে মনে করেন, সেখানে তার নিজের লেখায় প্রাক আধুনিক মটিফ এবং নেশোনেল আবেগ অনুভূতি ও চেতনার ভূমিকা বের হয়ে আসে। [৪৩]

লুই স্নাইডার (Louis Snyder) তার পহেলা দিকের লেখায় নেশোনেলিজমের সময় অনুক্রমিক পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিয়ে চারটা টাইপ নির্দেশ করেন। এগুলা হল ইনট্রিগেটিভ (১৮১৫-১৮৭১), ডিজরাপটিভ (১৮৭১-১৯০০), এগ্রেসিভ (১৯০০-১৯৪৫) ও কন্টেম্পরারি (১৯৪৫-?)। [৪৪] তিনি তার পরের লেখায় একটা ভূগোল ভিত্তিক প্রকৃতি বিভাগও পেশ করেন। এগুলা হল ফিসিফরাস ইউরোপিয়ান, রেসিয়েল বণ্ঢ্যাক আফ্রিকান, পলিটো-রিলিজিয়াস মিডুল ইস্টার্ন, মেসিয়ানিক রাশিয়ান, মার্কিন মেলটিং পট, এশিয়ান এনটি-কলোনিয়েল ও লেটিন আমেরিকান পপুলিস্ট নেশোনেলিজম । [৪৫] তার এই প্রকৃতি বিভাগ নেশোনেলিজমকে যতটা না, তারচে বেশি এর দুনিয়া জুড়ে প্রসারকে বুঝতে সহায়ক। তা সত্বেও, এটা ছিল আগেকার ইউরোসেন্ট্রিক প্রকৃতি বিভাগ এড়াবার একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

হালে বহুল ব্যবহৃত একটা প্রকৃতি বিভাগ হল হিউ সিটন-ওয়াটসন (Hugh Seton-Watson)-এর ওল্ড কন্টিনিউয়াস ও নিউ নেশনস (উপ-বিভাগ সেসেশনিস্ট, ইররিডেন্টিশ ও নেশন-বিলডিং) নেশোনেলিজম। এর খেয়াল করার মত দিকটা হল, আইডোলজির বদলে প্রক্রিয়ার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া। [৪৬]

অন্যদিকে জন ব্রুইলি (John Breuilly) নেশোনেলিজমকে মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যবধানের পটভূমিকায় গড়ে উঠা রাজনৈতিক বিরোধীতা রুপে দেখে নেশোনেলিস্ট বিরোধীতাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলা হল, সেসেশন, ইউনিফিকেশন এবং রিফর্ম মুভমেন্ট। এদের প্রত্যেকটা আবার পুরানা সাম্রাজ্য কিংবা তাদের কলোনিতে অথবা নেশন স্টেইট কিংবা নেশন স্টেইট দাবি না করা রাষ্ট্রে পাওয়া যেতে পারে। [৪৭]

এই ধারার আরেকটা প্রকৃতি বিভাগ পেশ করেছেন মাইকেল হেক্টার (Michael Hechter)। তার বিভাগ গুলা হল, পেরি-ফেরিয়েল, ইররিডেন্টিশ ও ইউনিফিকেশন নেশোনেলিজম। [৪৮]

উপরের পর্যালোচনার আলোকে আমরা বলতে পারি;

১.         নেশন বা জাতি বলতে বুঝায় এমন একটা মানব গোষ্ঠি যারা

(ক) অনাত্মীয় হলেও সংহত ও (খ) আশেপাশের অন্য মানব গোষ্ঠির চেয়ে আলাদা সম্মিলিত ইতিহাস সচেতনতা, স্বতন্ত্রতা ও স্বার্থজ্ঞান সম্পন্ন এবং যাদের (গ) নিজেদের সমষ্টি স্বার্থ, স্বকীয়তা ও অস্থিত্ব বজায় রাখার আকুতি (ঘ) আর তার জন্য স্বশাসিত রাষ্ট্র গড়ার মত ভূখন্ড ও (ঙ ) পর্যাপ্ত লোকবল রয়েছে। অন্য কথায় নেশন এমন একটা এথনি বা স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র্য সম্পন্ন জনগোষ্ঠি যার স্বশাসিত রাষ্ট্র পাওয়ার তাগিদই শুধু নয়, তা গড়ার মত ভূখন্ড ও জনবল রয়েছে।

২.        নেশোনেলিটি বা মাইনোরিটি কমিউনিটি বলতে বুঝবো কোন রাষ্ট্রে বসবাস রত এথনি যারা চাইলেও স্বশাসিত রাষ্ট্র গড়ার মত ভূখন্ড নাই।

৩.        নেশোনেলিজম বলতে বুঝবো কোন মানব গোষ্ঠির তরফ থেকে স্বাদেশিকতার স্বক্রিয় মতবাদকে।

৪.         নেশোনেলিস্ট বলতে বুঝবো নেশোনেলিজমের প্রবক্তা ও প্রয়াসীদেরকে।

বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

বাংলার বৌদ্ধদের ইতিহাস।


নশ্বর সুজয়

  আমরা আজ যে অবস্থায় বুদ্ধের ধর্মকে পেয়েছি তার ইতিহাস বিশাল ও ব্যপক। পৃথিবীর বুকে আর অন্যকোন ধর্ম নেই এমন ইতিহাস বহুল। এ ইতিহাস শুধু উত্ত্বানের নয় , পতনেরও। যুগে যুগে কালে কালে বুদ্ধ ও বৌদ্ধ সভ্যতার ধন আত্মসাৎ করে ধন্য হয়েছে নানা অকৃতজ্ঞ জনেরাই।তার বিনিময়ে দিয়েছি নানা অকৃতজ্ঞার পরিচয়। মাটি নিচেই সেই সাক্ষ্য সুপ্ত হয়ে আছে,  যা হাজার বছর কাল বৌদ্ধদের গৌরবগাথা বহন করে চলছে।
আজ থেকে ২০০ বছর আগের ইতিহাস দেখুন তো বড়ুয়া জাতিটি কোন সংজ্ঞায়  আত্ম পরিচয় বহন করত?
আমরা নিজেদেরকে বৌদ্ধ বৌদ্ধ বলে যে শোল্গান দিচ্ছি তার মূলে কে?
ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধ ও বৌদ্ধধমর্ের হাজারো উত্থান পত্তনের মধে্যও কে বৌদ্ধধর্মকে এ পর্যন্ত বহন করে এনেছে?
সিংহল বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস -"শাসনবংশ"গ্রন্থটি পড়লে বিবেকবাণ মাত্রই একবার উপলব্ধি করতে পারবেন কিভাবে ভিক্ষুরা বৌদ্ধধর্মকে প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করেছিলেন।
খ্রিস্টীয় একাদশ শতক থেকে বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিষ্ঠুর অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্বীয় প্রাণ ও ধর্ম রক্ষার্থে আরাকান শাসনাধীন চট্টগ্রামে এসে শেষ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তার কারণ ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকানের বৌদ্ধ রাজাগণ চট্টগ্রাম শাসন করেছেন।

যদিও বুদ্ধ ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন। অশোকের শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। দিকে দিকে শুধু বুদ্ধেরই জয়ধ্বনী হয়েছিল।  তবে কালক্রমে এমন আনুকূল্য বেশিদিন টিকেনি, আর শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমল থেকে শাসনযন্ত্র ধীরে ধীরে হিন্দুত্বের প্রভাবে ফিরে যায়। পঞ্চম শতাব্দির চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক ও তীর্থযাত্রী ফেক্সিয়ান ভারত সফরের সময় স্থানীয় মহায়ন বৌদ্ধ-তত্ত্বে মৌলিক দুর্বলতা দেখতে পান। সেখানে বুদ্ধাদর্শ বজ্জিত ব্রাম্মণরা ঈশ্বররূপী বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বগণের নাম মিলিয়ে যাগযজ্ঞ দিয়ে প্রচার করত মহাবিশ্বের অগণিত স্তরগুলোতে তারা বসবাসরত, দান যজ্ঞের মাধ্যমে তাদের সান্নিধ্য লাভ
সম্ভব। – ঐ হিন্দু ব্রাম্মণ তত্ত্বগুলো বৌদ্ধ তত্ত্বের এতটাই কাছাকাছি ছিল যে অনেকেই এই দু’ধর্মের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পেতেন না।
প্রথম সহস্রাব্দীর দ্বিতীয় অংশে বৌদ্ধদের অবস্থা সম্পর্কে আমরা যা জানি তা মূলত এসেছে সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক বৌদ্ধ পদব্রাজক হিউয়েন সাং ভ্রমনবৃত্তান্ত থেকে। যদিও কিছু জায়গাতে বৌদ্ধদের সমৃদ্ধ হতে দেখেছেন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি বৌদ্ধবাদকে দেখেছেন জৈন ও ব্রাহ্মণ শক্তির কাছে পরাভূত মৃতপ্রায় সত্তা হিসেবে। বিহারে (প্রাচীন মগধ – বুদ্ধের মৃত্যুস্থান) কয়েকটি বিশেষ বৌদ্ধ স্থানে তিনি মারাত্মকভাবে ক্ষয়িষ্ণু হাতেগোনা কিছু ভক্ত দেখেছেন – ঐদিকে আবার দেখেছেন হিন্দু ও জৈনদের রমরমা অবস্থা। বাংলা, কামরূপ ও আসামেও তিনি অপেক্ষাকৃত স্বল্প সংখ্যক বৌদ্ধ দেখেছেন; কন্যাধাতে কোনো বৌদ্ধ পাননি, আর তামিল, গুজরাট ও রাজস্থানে দেখছেন গুটিকয়েক বৌদ্ধ। চালুক্যদের রাজত্বকালে হিউয়েন সাং লিখেছেন, চালুক্যদের শাসনামলে অন্ধ্র আর পল্লব শাসকদের অনুকুল্যে গড়ে ওঠা অনেক বৌদ্ধ স্তুপ মন্দির পরিত্যাক্ত কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই অঞ্চলগুলো বৈষ্ণব-পূর্ব চালুক্যদের শাসনাধীনে আসে, যারা বৌদ্ধদের প্রতি বৈরী ছিলেন। সাং এর বাংলা ভ্রমণকালে গোঁড়া হিন্দু শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার শাসক। তিনি শশাঙ্ককে একজন “বিষাক্ত গৌড় সাপ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন – যিনি বাংলার বৌদ্ধ স্তুপ -মন্দিরগুলো ধ্বংস করেন আর তার রাজ্যের একেক বৌদ্ধ সন্তদের মাথার জন্যে একশ স্বর্ণমুদ্রা করে পুরস্কার ঘোষণা করেন। হিউয়েন সাং-সহ অনেক বৌদ্ধ সূত্রগুলোতে থানেসরের বৌদ্ধ রাজা রাজ্যবর্ধনের হত্যার জন্যে শশাঙ্ককে দায়ী করা হয়। হিউয়েন সাং লিখেছেন, বোধ গোয়ার বোধি বৃক্ষ কাটা ছাড়াও ওখানকার বৌদ্ধ মূর্তিগুলোকে শিবলিঙ্গ দ্বারা প্রতিস্থাপন করেন।

অন্যদিকে নানা পথ ও মতের সমন্বয়ের চেষ্টায় রত হিন্দুত্বের সর্বদেবতার আলয়ে গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে আত্মস্থ করে নেয়া হয়। হিন্দু ধর্মের মধ্যে থেকেই তাই একজন ভক্ত বুদ্ধকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতে পারত। হিন্দুধর্ম তাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো – “নানা মতের বিশ্বাসীদের জন্যে আস্থা ও সন্তুষ্টির কেন্দ্র।”
অষ্টম শতকের বিখ্যাত হিন্দু দার্শনিক শঙ্কর বুদ্ধকে জনতার শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি নিজেই বৌদ্ধবাদের আদলেই আশ্রম বিধি জারি করেন আর বৌদ্ধ ধর্ম থেকে অনেক দর্শন ধার করেন। বৌদ্ধ সংঘের আদলে শঙ্কর যখন অষ্টম শতকে সন্যাস ও আশ্রম বিধি জারি করেন – ঠিক তখনই বৌদ্ধ বৈরী প্রচারণাও ছিল উত্তুঙ্গে। তাকে বৌদ্ধবাদের কড়া সমালোচক হিসেবে যেমনভাবে অভিনন্দিত করা হয় – ঠিক তেমনিভাবে তাকেই ভারতবর্ষে বৌদ্ধবাদের অবলুপ্তির প্রধান কারিগর হিসেবেও দেখা হয়। একই সময়ে তাকে ছদ্মবেশী বৌদ্ধ হিসেবেও দেখা হয়।

সে সময় নিপীড়িত পলাতক ভিক্ষুদের অধিকাংশ আশ্রয় নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য এক বিহার হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে।
চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ত্রয়োদশ শতকে সেনরাজবংশের শাসনামলে (১১০০-১২৬০ খ্রিস্টাব্দে)। এ সময়কালে বাংলায় বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো নানা রাজনৈতিক দুর্যোগের কারণে ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সেন ও বর্মন রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিরূপ। তাদের শাসনামলে বৌদ্ধদের উপহাস ও বিদ্রুপ করা হতো এবং ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদেরকে পাষণ্ডী ও নাস্তিক বলে নিন্দা করতো। বৌদ্ধ বিহারগুলোতে বুদ্ধ মূর্তি সরিয়ে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘শংকর বিজয় ও শুন্য পুরাণ’ গ্রন্থে ব্রাহ্মণদের বৌদ্ধ নির্যাতনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। শুন্য পুরাণ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের বিষয় সম্পত্তি কেড়ে নিত এবং তাদের সর্বদা অত্যাচার নির্যাতন করত। বৌদ্ধ বিহারগুলো হিন্দু ব্রাহ্মণদের দখলে চলে যায় এবং বিপুল সংখ্যক বৌদ্ধ হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এছাড়া অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু দেশ ত্যাগ করে তিব্বত, নেপাল, উড়িষ্যা, কামরূপ, আরাকান ইত্যাদি অঞ্চলের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। এ সমস্ত কারণে বৌদ্ধধর্ম ত্রয়োদশ শতকের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বলতে গেলে বাংলায় তখন সেনবংশের নিয়ন্ত্রণাধীন হিন্দু রাজত্বের রমরমা অবস্থা।
লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী বাংলা আক্রমণ করেন। এ আক্রমণে বাংলায় অবশিষ্ট বৌদ্ধ সভ্যতার যা ছিল তাও সমূলে উৎপাটন হয়ে গেল। ভাগ্যান্বেষণে আগত তুর্কীবীর বখতিয়ার বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মনে করেছিলেন ব্রাহ্মণদের দুর্গ। এ ভ্রান্ত ধারণায় বাংলার বৌদ্ধবিহার, সংঘারাম ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বখতিয়ারের তরবারি ও অশ্বক্ষুরের আঘাতে একের পর এক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বিহারভিত্তিক বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরী মহাবিহারগুলো একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, নিহত হল অধিকাংশ বৌদ্ধ ভিক্ষু। বিহারে রক্ষিত ধন-সম্পদ লুট করা হল। আগুনে পুড়ে সবকিছুই ছাই হয়ে যাবার পর বখতিয়ার খিলজী জানতে পারলেন এগুলো ব্রাহ্মণদের দুর্গ নয়, এগুলো সুসমৃদ্ধ বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়। এভাবে তুর্কী সৈন্যদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেল বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপনা।

এ প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন ণ্ডযাঁরা তুর্কী বীরদের অস্ত্রাঘাত হতে কোনরকমে প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হলেন তাঁরা অতিকষ্টে হাতের কাছে পাওয়া কয়েকটি পুথি, ছোট ছোট মূর্তি প্রতিমা এবং সূত্রোৎকীর্ণ মাটি বা শিলাফলক নিয়ে পালিয়ে গেলেন তিব্বত, নেপাল, উড়িষ্যা, কামরূপ, আরাকান, পেঁগু, পগান বা আরও দূরদেশে। একই প্রসঙ্গে নলিনীনাথ দাশগুপ্ত লিখেছেনণ্ডমগধের বিহারগুলোতে তুর্কীদের এরূপ জঘন্যতম অত্যাচার কাহিনী শুনে বাংলার সোমপুর, জগদ্দল প্রভৃতি বিহারবাসী শ্রমণগণ অত্যাবশ্যকীয় কিছু পুথিপত্র সঙ্গে নিয়ে আত্মরক্ষার্থে যে যেদিকে পারে পালিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন ণ্ড দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণে প্রথমে মগধ ও পরে ভারতের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাংলার বৌদ্ধবিহার ও সংঘরামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৌদ্ধধর্ম গ্রাস করার ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণে প্রতিকূল শক্তির মোকাবেলায় বিধ্বস্ত বৌদ্ধধর্ম বাংলা থেকে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেল।
বাংলার সুলতানী আমলে ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে ফখর উদ্দিন মোবারক শাহ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয় এবং চট্টগ্রামে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তখন থেকে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে জামাল খাঁ পন্নীর সময়কাল চট্টগ্রামে মুসলিম শাসন বলবৎ ছিল। সুলতানী আমলে চট্টগ্রাম মুসলিম অধিকারে চলে আসলে চট্টগ্রামেও বৌদ্ধরা নির্যাতিত হতে থাকে। হয়তো এ সময়ে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহারও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি এবং এ সময়েই চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার থেকে ভিক্ষুরা দলে দলে তিব্বত, নেপালের দিকে ছুটে যেতে থাকে। পরবর্তীতে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগলরা আরাকান রাজকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। চট্টগ্রাম দখলের এ ভয়াবহ যুদ্ধে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় বলে ধারণা করা যায়। এ যুদ্ধে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার ধ্বংস, ধর্মগ্রন্থ বিনষ্ট, বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ নিহত হন বা পলায়ন করেন। চট্টগ্রাম থেকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা (মগরা) পালিয়ে আরাকানে আশ্রয় নেয়। অবশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর নেমে আসে অমানিশার যুগ। মোগল সম্রাট বা শাসকরা এদেশে বৌদ্ধধর্ম নামে কোন ধর্ম ছিল, মনে হয় তা জানতেনই না। কারণ মোগল শাসনামলের কোন পুথিপত্র বা গ্রন্থে বৌদ্ধধর্ম বা বৌদ্ধদের কোন কথা পাওয়া যায় না। সত্যিকার অর্থে তখন বাংলায় বৌদ্ধদের কোন অস্তিত্বই ছিল না।
শিহাব উদ্দিন তালিশ বিরচিত ‘ফতিয়া-ই-ইব্রিয়া’ গ্রন্থে, দেয়াঙ পাহাড়স্থ প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দর, দেয়াঙ কারাগার, বদরশাহের দরগাহসহ মোগল-আরাকানীদের ভয়াবহ যুদ্ধের বর্ণনা থাকলেও পণ্ডিতবিহার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তাতে ধারণা করা হয় যে, পণ্ডিতবিহারের সেই জৌলুস তখন ছিল না।

চট্টগ্রামের কৃতীসন্তান পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাস ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে কয়েকবার তিব্বতে গিয়ে প্রাচীন পুঁথিপত্র এনে ব্যাপক গবেষণা করেও চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহারের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারেন নি। তবে তিনি চট্টগ্রাম শহরের দেবপাহাড় এলাকায় এর অবস্থান ছিল বলে মনে করেন।

 চলবে..-...
* কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি লেখাটিতে যেসকল ইতিহাসবিদগণের শ্রমের সহযোগিতা নিয়েছি।

মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭

কালামের হাতে হেসেছিলেন বুদ্ধ।

১১ মে, ১৯৯৮৷ বাতাসে আপেক্ষিক আদ্রতা সেদিন একটু বেশীই ছিল বোধহয়৷ দেশের অন্তরেও জমছিল উদ্বেগ৷  ১৯৭৪-এর পর সেই আবার দেশের পরমাণু শক্তির পরীক্ষা হবে৷ শুধু তো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি নয়, ছিল রাজনৈতিক ঘূর্ণিপাকও৷ সে সব সামলে নিয়েই সেবার দেশের শক্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা গিয়েছিল৷ কিন্তু সর্বক্ষণ চলছে আমেরিকান উপগ্রহের নজরদারি৷ তা এড়িয়েই বিশ্বের কাছে দেশীয় পারমাণবিক শক্তির বার্তা দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল যাঁর উপর, তিনি ডঃ এপিজে আব্দুল কালাম৷ বুদ্ধ পূর্ণিমার রাত ছিল সেদিন৷ সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে, আমেরিকার নজরদারি এড়িয়ে, পরমাণু পরীক্ষায়  সাফল্য পৌঁছেছিলেন ডঃ কালাম৷১৯৯২ থেকে ৯৯ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিজ্ঞান উপদেষ্টার পদে নিযুক্ত ছিলেন ডঃ কালাম৷  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ১৯৯৬ সালেই  পরমাণু শক্তির পরীক্ষার কথা ভেবেছিলেন৷ কিন্তু রাজনৈতির চাপের কাছে নতিস্বীকার করেন৷ ১৯৯৮-এ আর পিছু ফিরে তাকাননি৷ প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে সবুজ সংকেত গিয়েছিল ডঃ কালামের কাছে৷ পোখরান-২ পরমাণু পরীক্ষার সুপারভাইজারের দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর উপর৷ সফলভাবে পাঁচটি পরমাণু বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছিল৷ তারমধ্যে চারটি ছিল ফিসন বোম, একটিই ফিউশন বোম৷ মোট ৫৮ জন ইঞ্জিনিয়ারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল সে কাজের জন্য৷
গোপনীয়তা ছিল চরম মাত্রায়৷ এল সাফল্য৷ পরমাণু শক্তি হিসেবে সেদিন নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছিল ভারত৷ আর পুরো প্রক্রিয়াটির নেপথ্য নায়ক ছিলেন ডঃ কালাম৷ প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সেদিন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আমেরিকার উপগ্রহের নজরদারি এড়ানো৷ ডঃ কালামের পরিকল্পনামতোই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সময়ের হেরফেরে বোকা বানাতে পেরেছিল উপগ্রহটিকে৷ সফল হয়েছিল দেশের পরমাণু পরীক্ষা৷ ১৯৯৮-এর এই পরীক্ষার সাফল্যকে সিআইএ-র ( সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্সি এজেন্সি, আমেরিকা) সবথেকে ব্যর্থতা বলেও ধরা হয়৷ ভাবা অ্যাটোমিক রিসার্চ সেন্টারের তরফ থেকে ডঃ কালামকে একটি স্মারক সম্মান দেওয়া হয়, যেখানে বুদ্ধ মূর্তির নীচে লিখে দেওয়া হয়েছিল, ‘দ্য বুদ্ধ হ্যাজ স্মাইলড’৷ বস্তুত গোটা দেশই সেদিন স্বস্তির হাসি হেসেছিল৷

শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৭

মানবের পরাজয়ের কারণ

মানব জীবনে পরাজয়ের কারণ কি?
=========================

ভগবান গৌতম বুদ্ধ দায়কদের বলেছেন:-

০১| যে ব্যক্তি অজ্ঞানী ও অধার্মিক তাঁর পরাজয় হয়৷

০২| যে ব্যক্তি অসৎ ব্যক্তিকে প্রিয় ও  সৎ ব্যক্তিকে অপ্রিয়  মনে করে এবং মিথ্যাদৃষ্টির আশ্রয় গ্রহণ করে তাঁর পরাজয় হয়৷

০৩| যে ব্যক্তি অলস, নিদ্রালু, উদ্যমহীন ও ক্রোধী এবং বাজে গল্পে সময় নষ্ট করে তাঁর পরাজয় হয়৷

০৪| যে ব্যক্তি সক্ষম হয়েও মাতাপিতার ভরণ পোষন করেনা সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৫| যে ব্যক্তি নিষ্পাপ ভান্তে, শ্রামণ কিংবা যাচককে মিথ্যা কথায় প্রবঞ্চনা করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৬| যে ব্যক্তি প্রভূত বিষয় সম্পত্তির অধিকারী হয়েও অন্যেকে দান করেনা সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৭| যে ব্যক্তি জাতি, ধন, গোত্র, বিষয়ে অহংঙ্কারী এবং গরীব আত্মীয়দের ঘৃনা করে সে ব্যক্তি পরাজয় হয়৷

০৮| যে ব্যক্তি পরস্ত্রীতে আসক্ত, সুরাপায়ী ও জুয়ারি যার ফলে অর্জিত ধন সম্পত্তি নষ্ট করে ফেলে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

০৯| যে স্বীয় স্ত্রীতে অসন্তুুষ্ট এবং গণিকা ও পরদ্বারে আসক্ত সে ব্যক্তি পরাজয় হয়৷

১০| যে ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে তরুনী ভার্যা বিবাহ করে, তার অক্ষমতা বিধায় তাঁর স্ত্রী বা ভার্যা ব্যভিচারে রত হয় সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

১১| যে ব্যক্তি সংসার পরিচালনার ভার প্রমত্ত ও উৎশৃংঙ্খল স্ত্রী বা পুরুষের উপর অর্পণ করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

১২| যে ব্যক্তি সামান্য সম্পদের অধিকারী রাজত্ব লাভের দূরাশা পোষণ করে সে ব্যক্তির পরাজয় হয়৷

সত্যকে জানুন, মিথ্যাকে দূর করুন৷ পড়তে উৎসাহিত হোন, বেশী বেশী লাইক,কমেন্ট, শেয়ার করে অন্যেকে পড়ার সুযোগ করে দিন এতে  আপনার এবং সবার পূণ্যে ও মঙ্গল হবে৷৷

রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বুদ্ধ ধর্মে অনুশীলনের গুরুত্ব।


সমাজে অনেকে নিজেকে পন্ডিত বলে মনে করেন। তাঁরা বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করে বা গবেষণা করে তাঁদের পন্ডিত বলে ধারণা আসতে পারে। কিন্তু বুদ্ধের সেই আসল গবেষণায় পৌঁছতে হলে বা আসল পন্ডিত হতে হলে তাঁকে অবশ্যই ব্যবহারিক জ্ঞান সহ শাস্ত্র জ্ঞানে পারদর্শী হতে হবে। তাহলেই তিনি পন্ডিত হতে পারবেন। বিদর্শন ভাবনা সঠিক আচার্যের মাধ্যমে শুদ্ধ আচরণ করলে তাঁর প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হবে। প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হরে সংস্কার নিরোধ হবে। সংস্কার নিরোধ হলে নামরূপ পরিচ্ছদ জ্ঞান ও উদয় ব্যয় জ্ঞান ইত্যাদি ষোল প্রকার জ্ঞান উৎপন্ন সহ মার্গ পথে পদার্পণ করবেন। এ বিষয়ে পরিপূণূ জ্ঞান অর্থাৎ বিদর্শন ভাবনা শুদ্ধ আচরনের মাধ্যমে মার্গ পথে বিচরণ না করে অন্য বিদর্শনাচার্যের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করলে উপবাদ অন্তরায় হতে পারে। তাই বিদর্শন জ্ঞানের নীতি সোপান তথা নির্বাণ পথের জ্ঞান হয় একমাত্র বিদর্শন ভাবনা আচরণের মাধ্যমে, শাস্ত্র গবেষণার নয়। এ প্রসংঙ্গে এখানে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যাক-
শ্রাবস্তীর দুই বন্ধু তথাগত বুদ্ধের উপদেশ শুনে ভিক্ষুব্রত গ্রহণ করেন। পাঁচ বৎসরকাল গুরুর নিকট অবস্থান করে বিবিধ কর্তব্য বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে একজন উপদিষ্ট শিক্ষায় সাধনায় সিদ্ধি লাভ করলেন। অপরজন ত্রিপিটক অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা কাজে নিযুক্ত রইলেন। চরম বিমুক্তি তাঁর অধিগত হল না বুদ্ধ এ বিষয়ে অবগত হয়ে পান্ডিত্য অপেক্ষা আচরনই বিশেষ ফলপ্রদ বলে নিম্মের গাথাদ্বয় আবৃত্তি করলেন-
“বাহুম্পি সে সহিতং ভাসমানো ন তক্করো হোতি নরো পমত্তো,
গোপো বা গাবো গমাং পায়েসং ন ভাগবা সামঞ্ঞস্স হোতি।”
-বহু শাস্ত্র জ্ঞান যার বহু অধ্যয়ন, অথচ সে শাস্ত্র মতে চলে না কখন।
শ্রামণ্য ফলের ভাগী হয় না সেজন, গোপ (রাখাল) যথা পর গাভী লাভেনা কখন।”

অপ্পম্পিচে সহিতং ভাসমানো, ধম্মস্স হোতি অনুধম্মচারি,
রাগঞ্চ দোসঞ্চ পবায মোহং সম্মপ্পজানো সুবিমুত্ত চিত্তো,
অনুপাদিসনো ইধ বা হুরং বা, স ভাগবা সামঞ্ঞস্স হোতি।
-অল্প শাস্ত্র জানে কিন্তু শাস্ত্রের মতন, পালে ধর্ম রাগ, দ্বেষ মোহ হীন জন।
সম্পজ্ঞানী মুক্তচিত্ত উপাদান ত্যাগী, উভলোক হন তিনি শ্রামণের ভাগী।
যে প্রমত্ত ব্যক্তি ধর্মচার্যের নিকট বহুল পরিমাণ বুদ্ধের ধর্ম অধ্যয়ন করেও যথাযথ আচরণে বিরত থাকেন, সে ব্যক্তি রাখালের সহিত তুলনীয় হন। অর্থাৎ রাখাল যখন সারাদিন গরুর সেবা যত্ন করেও গব্যরসের অধিকারী হতে সমর্থ হয় না, সেরূপ বুদ্ধ বচন প্রচুর আবৃত্তি করলেও সেই ধর্মের রস পানের অধিকারী হতে পারে না। অপর পক্ষে অপ্রমত্তভাবে যিনি অল্প পরিমাণেও বুদ্ধের বাণী অধ্যয়ন করেন, তারা সুন্দর রূপে আচরণ করেন, নব লোকোত্তর ধর্মের অনুকূল ধর্মার্থ অবগত হয়ে কাম প্রবৃত্তি দমন করেন এবং মনে প্রাণে মুক্তি অভিসরী হন, তিনিই বিদর্শন ভাবনা বলে কাম-দ্বেষ-মোহকে সর্বতোভাবে পরাভূত করে মুক্তি পারের সন্ধান লাভ করেন এবং কাম, দৃষ্টি, শীলব্রত ও আত্মবাদ ভেদের চারিটি উপাদান সমূলে উৎপাদিত করে অরহত্ব ফল লাভের পর ভববন্ধন মুক্ত হন। তখন তিনি ইহাকল ও পরকালের শ্রামণের ভাগী হতে পারেন। ধর্মের সত্যিকারের দায়ক নির্বাণ লাভী এবং ধর্মের ধারক ও বাহক হতে পারেন।
ভগবান বুদ্ধ অনেক গবেষণা করে নির্বাণ লাভের জন্য একটি পথই আবিষ্কার করে গেছেন আমাদের জন্য দুটি পথ নয়। আর সে পথ হলো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথে আচরণ এবং এ পথে আচরণে মুক্তি লাভ সম্ভব। অন্যভাবে আচরণ বৃথা হবে, বুদ্ধের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যায় বা উপদেশে শুধু বিমুক্তিই উদ্দেশ্যেই ভাবিত ও দেশিত হয়েছে। তাই ইহাকে মহা সমুদ্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মহাসমুদ্রের জল যেখান থেকেই নেওয়া হোক না কেন সবখানেই লোনা। তদ্রুপ বুদ্ধের ধর্ম দর্শন সবখানেই বিমুক্তি রসে পরিপূর্ণ। বুদ্ধ বলেছেন-
মগ্গষ্ঠাঙ্গিকো সটটেঠা, সচ্চানং চতুরাপদা,
বিরাগো সেটঠ ধর্মানং দ্বি পদানঞ্চ চক্ষুমা।
এসোব মগগো নত্থঞ্ঞ, দস্সনস্স বিসুদ্ধিযা
এতঞহি তুমেহ পটিপজ্জথ মারসসেতং পমোহনং।
মার্গমাঝে অষ্টাঙ্গিক, সত্য মাঝে সত্য চতুষ্টয়,
ধর্মেতে বিরাগ শ্রেষ্ট চক্ষুমান মানবে নিশ্চয়।
এ মার্গ বিনা অন্য কোন মার্গ নাই,
দর্শন শুদ্ধির তবে করতে যাচাই।
তাই এ আষ্টমার্গ সবে অনুস্মর,
এ মার্গে মার রাজ্যে সম্মোহিতে পার।

একবার বুদ্ধ ভগবান ভিক্ষু সংঘে কিছুদিন জনপদ ভ্রমণ করে পুররায় জেতবনে ফিরে এসেছেন। একদিন বুদ্ধের সঙ্গে ভ্রমণকারী সে ভিক্ষুগণ অতিথি শালায় গিয়ে তাঁদের ভ্রমণ পথের সুগমতা ও দুর্গমতা সম্বন্ধে আলোচনা করছেন। বুদ্ধ তাঁদের আলোচনা শুনে লৌকিক পথ সম্বন্ধে চিন্তা না করে আধ্যাত্মিক সাধনায় রত হয়ে আর্য মার্গের সন্ধান করতে উপদেশ দিলেন। মুক্তি লাভের জন্য যদিও অনেকে মনে করেন বিবিধ প্রকার পথের নির্দেশ আছে। আসলেই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই একমাত্র পথ।

চক্রবালের বা একত্রিশ লোকভূমির প্রাণীগণ সর্বদা মুক্তি লাভের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করে, অথচ সমস্ত কাজ মুক্তির নয়। কিছু পাপ, কিছু পুণ্য ও কিছু পরমার্থ কাজ। তন্মধ্যে পাপ কাজ ও পুণ্য কাজ বিপাক সৃষ্টি করে। কিন্তু পরমার্থ কাজের বিপাক সৃষ্টি হয় না। অধিকন্তু পরমার্থ কাজের দ্বারা জমাকৃত বিপাক কায়দ্বারে, বাক্যদ্বারে ও মনদ্বারে নিরোধ হয়। এটাই হলো বিদর্শন ভাবনা।

পাপ কাজের কর্মপথ দশটি। যেমন হত্যা, চুরি, মিথ্যা বাক্য, পিশুন বাক্য, (ভেদ বাক্য) পরুষ (কর্কশ) বাক্য, সম্প্রলাপ (অর্থহীন) বাক্য, অভিদ্যা (লোভ), ব্যাপাদ (দ্বেষ) ও ভ্রান্ত ধারণা (মিথ্যা দৃষ্টি)। এ সমস্ত কর্মপথে কাজ করলে জন্মে জন্মে চারি অপায় গমন, যেমন-তির্যক , প্রেত, অসুর ও নিরয় কুলে উৎপন্ন হয়ে অসীম দুঃখ ভোগ করতে হয়। আবার পুণ্য কাজের কর্মপথ দশটি। যেমন- দান, শীল, ভাবনা (শমথ), সেবা, সম্মান, পুণ্যদান, পুণ্যদানানুমোদন, ধর্মশ্রবণ, ধর্মদেশনা ও দৃষ্টি ঋজু কর্ম (সত্য পথ আচরণ) এ সমস্ত কর্ম পথে কাজ করলে মৃত্যুর পর সুগতি লাভ হয়। যেমন মানুষ স্বর্গ ও ব্রহ্মলোকে জন্ম প্রতিসন্ধি গ্রহণ করে সুখ লাভ করে। পাপ কর্মর্জিত দুঃখ এবং পুণ্যকর্মার্জিত দুঃখ উভয়ই অস্থায়ী। এ গুলো ভোগের পর পুনঃ প্রতিসন্ধি বা জন্ম নিতে হয়। আর জন্ম দুঃখ বলে বুদ্ধ আখ্যায়িত করেছেন। ২৫৯৭ বৎসরের মধ্যে একটি মাত্র জ্ঞানী বা ‍বুদ্ধ যিনি জীব জগতের এ দুঃখ অবলোকন করে তাহা নিরোধের জন্য মার্গ বা পথ আবিষ্কার করেছেন। তাহাই বিদর্শন ভাবনা। সে বিদর্শন ভাবনা আচরণ ক্ষেত্রে অনেকের ধারণা শমথ ভাবনা আগে করতে হবে, না হয়তো বিদর্শন ভাবনা লাভ হবে না। আবার অনেকে শমথ ভাবনা করে সরাসরি নির্বাণ লাভ হবে বলে মনে করেন, আবার অনেকে শমথ বা বিদর্শন যে কোন ভাবনা করলে নির্বাণ লাভ হবে বলে মনে করেন। এখন সে আলোচনায় আসা যাক-
“চানমার য়ৈকত ভাবনা কেন্দ্র” ইয়াঙ্গুন, মায়ানমার-এর অধ্যক্ষ সেয়াদ উ জনকাভিংসো বর্ণনা করেছেন, একবার বুদ্ধ উত্তরীয় নামক রুগ্ন ভিক্ষুকে বলেছেন “আরম্ভ যদি বিশুদ্ধ হয় হবে সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে নির্বাণ সাক্ষাৎ হবে।”

তাই বুদ্ধের এ একটি বাক্য থেকে বুঝা যায় বিদর্শন ভাবনার যদি মুক্তির একমাত্র পথ হয় তাহলে আরম্ভ শমথ ভাবনা দিয়ে করলে বিশুদ্ধভাবে আরম্ভ হলো কি? মুক্তি মার্গ বা নির্বাণ লাভ হবে কি? আবার যারা শমথ ভাবনার মাধ্যমে শুরু করে মুক্তি পেতে চান, তাঁদের জন্যও সে সময় অতীত হয়ে গেছে। অর্থাৎ পটিসম্ভিদা মার্গসহ অর্হত্ব ফলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর এক হাজার বৎসর পার হয়ে ২৫৫২ বৎসরে পৌঁছেছে। কাজের বুদ্ধের বিভিন্ন সময়ের উক্তি থেকে জানা যায় সরাসরি শমথ ভাবনা করেও নির্বাণ লাভ সম্ভব নয় এবং প্রথমে শমথ দিয়ে আরম্ভ করে পুনঃ বিদর্শনে আসা দুরুহ ব্যাপার। সে আলোচনার পরে আসা যাবে।

কুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করার পর মহর্ষি ভার্গব- এর আশ্রমে উপস্থিত হলেন। বিস্তীর্ণ বনরাজি, বিভিন্ন গাছগাছড়ার ভরা এ আশ্রম। সুনিবিড় এ একান্ত তপোবনে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন রকম শারীরিক অবস্থায় বেশ কয়েকজন অসাধারণ কষ্টে কৃচ্ছ সাধনায় ব্রত। তিনি ঘুরে ফিরে দেখলেন, কয়েক রাত অবস্থান করলেন এবং বুঝতে পারলেন এ সমস্ত আচরণে মনুষ্যে জন্মে বা স্বর্গে জন্ম গ্রহণ করা যায়। কিন্তু পুনরায় অপায়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়নি। কাজেই ইহা আচরণে দুঃখ মুক্তি স্থায়ীভাবে হচ্ছে না জেনে ঐ আশ্রম ত্যাগ করলেন। ঘুরে ঘুরে তিনি ঋষি আরাড় কালামের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। আশ্রম প্রধানের সাথে আলোচনা করে জানতে চাইলেন জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, শোক, সংক্লেশ ইত্যাদি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার স্থায়ী কোন পথ আছে কিনা। ঋষি তাঁকে সমস্ত আশ্রম ঘুরে ঘুরে দেখালেন, বুঝালেন এবং আচরণ করতে বললেন। কুমার সিদ্ধার্থ এখানে আচরণে প্রবৃত্ত হয়ে সব চাইতে উন্নততর ব্রহ্মলোকের আকিঞ্চানায়তন ধ্যান লাভ করলেন। এ আকিঞ্চানায়তন থেকে চ্যুত হয়ে পুনরায় কর্মপ্রবাহে প্রতিসন্ধি হবে তাই তিনি তাঁর এ লদ্ধ ধর্ম জ্ঞানে তৃপ্তি লাভ করতে পারলেন না। কেননা ইহা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অতীত কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে না মানুষকে। তিনি বুঝতে পারলেন এ ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞাতার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। তাই তিনি অনাসক্তভাবে আশ্রম থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ক্রমে তিনি কোশল রাজ্যের রাজধানী শ্রাবস্তীতে এসে পড়লেন। সেখানে ঋষি রামপুত্র রুদ্রকের কথা জানতে পেরে তাঁর আশ্রমে উপস্থিত হলেন এ আশ্রমে যা কিছু কর্মকান্ড আছে সবই তিনি ধীরে ধীরে আয়ত্ব করে নিলেন। তারপর ঋষির নিকট জিজ্ঞাসা করেলেন আর আছে কিনা। ঋষি বললেন এর অধিক কিছু নেই। এখানে সব চাইতে বেশী কিছু লাভ হল একত্রিশ লোকভূমির সর্বোপরি স্থান, আনেঞ্জা সংস্কার, ৮৪ হাজার কল্পকাল সুখ ভোগকারী আরূপ ব্রহ্মলোকের “নৈবসংজ্ঞানাসজ্ঞায়তন”। তার উপরে অধিক সুখ ভোখকারী অন্যা কোন স্থান চক্রবালে আর নেই। অথচ সে অরূপব্রহ্মলোক থেকে চ্যুত হয়ে আবরও অপায়ে প্রতিসন্ধি যোগ আছে। এখন রাজ কুমার সিদ্ধার্থ জানতে পারলেন যে, এখানে (নৈবসংজ্ঞানাসজ্ঞায়তন) ও উপধি নির্মূল হয় না, তা যতই সুক্ষ্ণ হোক না কেন উপধি থাকলেই তা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অধীন হবে। সুতরাং এ ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞাতার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। কাজেই এখানে থেকেই কোন লাভ নেই। তাই তিনি রামপুত্র রুদ্রকের আশ্রম থেকে বেড়িয়ে পড়লেন নির্বাণ লাভের পথ অম্বেষণে।

রাজকুমার সিদ্ধার্থ শমথ ভাবনা আচরণ করে বুঝতে পারলেন যে, এ সমস্ত আচরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখলে জন্মতা বিফলে যাবে। কৃচ্ছ সাধন ও শমথ ভাবনা আচরণে নিজের শরীর এবং সময় নষ্ট হয়ে গেল অনুভব করে আসল দুঃখ মুক্তির পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। এখানে শমথ ভাবনা কি এবং তার আচরণটা কি রকম তা একটু আলোচনা করা যাক।
শমথ ভাবনা চল্লিশ প্রকার, যথা, দশ প্রকার কৃৎস্ন, দশ অশুভ, দশ অনুস্মৃতি, চারি অপ্রমেয়, এক সংজ্ঞা, এক ব্যবস্থান এবং চারি অরূপ ধ্যান স্তর।

দশ কৃৎস্ন- পৃথিবী কৃৎস্ন, আপ কৃৎস্ন, তেজ কৃৎস্ন, বায়ু কৃৎস্ন, নীল কৃৎস্ন, পীত কৃৎস্ন, লোহিত কৃৎস্ন, অবদাত কৃৎস্ন, আকাশ কৃৎস্নও আলোক কৃৎস্ন।
দশ অশুভ- উদ্ধস্ফীত, বিনীলক, পূঁজপূর্ণ, ছিদ্রীকৃত, বিখাদিত, বিক্ষিপ্ত, কর্তিত-বিক্ষিপ্ত, রক্তাক্ত, কীটপূর্ণ ও অস্তিপূঞ্জ।
দশ অনুস্মৃতি- বৃদ্ধানুস্মৃতি, ধর্ম্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি, উপশমানুস্মৃতি, মরনানুস্মৃতি, কায়গতানুস্মৃতি ও আনাপান স্মৃতি (শ্বাস প্রশ্বাস)।
চারি অপ্রমেয়- মৈত্রী, করুণা, মুদিতাও উপেক্ষা।
এক সংজ্ঞা- ভক্ষ্য দ্রব্যের ঘৃণাকর পরিণতি সম্বন্ধে জ্ঞান।
এক ব্যবস্থান- দেহস্থ কঠিন, তরল, উষ্ণ ও বায়বীয় সম্বন্ধে জ্ঞান ও অশুচি ভাবনা।
চারি অরূপ- আকাশানান্তায়তন, বিজ্ঞানান্তয়াতন, অকিঞ্চানায়তন ও নৈবসংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন।
এরূপে চল্লিশ প্রকার শমথ ভাবনার চল্লিশটি কর্ম্মস্থান। চল্লিশটি কর্ম্মস্থানের মধ্যে চরিত ভেদে বিভিন্ন কর্ম্মস্থানের উপযোগিত বিদ্যমান। যেমন-
() রাগ চরিত পক্ষে- দশ অশুভ ও কায়গতানুস্মৃতি নামক কোষ্ঠাংশ ভাবনা।
() দ্বেষ চরিতের পক্ষে- নীলাদি চারিবর্ণ, কৃৎস্ন এবং চারি অপ্রমেয়।
() মোহ চরিত ও বিতর্ক চরিতের পক্ষে- আনাপান স্মৃতি।
() শ্রদ্ধা চরিতের পক্ষে- বুদ্ধানুস্মৃতি ইত্যাদি ছয় অনুস্মৃতি।
() বুদ্ধি চরিতের পক্ষে- মরনানু, উপশমানু, সংজ্ঞা, ব্যবস্থানাদি অনুকুল ভাবনা।
() মোহ চরিত ও ক্ষুদ্রাকার বিতর্ক চরিতের পক্ষে- কৃৎস্ন মন্ডলের নির্বাচনে পৃথুল (স্থুল) উপযোগী।
অবশিষ্ট কর্ম্মস্থান সকলের পক্ষে উপযোগী।
চল্লিশটি কর্ম্মস্থানে পরিকর্ম ভাবনা লাভ করা যায়। বৃদ্ধানুস্মৃতি, ধর্ম্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি, উপশমানুস্মৃতি, মরনানুস্মৃতি, আহার অশুভ সংজ্ঞা এবং ধাতু ব্যবস্থান এই দশটি কর্মস্থানে উপাচার ভাবনা লাভ করা যায়। অবশিষ্ট ত্রিংশ কর্মস্থানে অর্পনা ভাবনা লাভ করা যায়।
আবার দশ অশুভ ও কায়গতানুস্মৃতি ভাবনা দ্বারা প্রথম ধ্যান লাভ হয়।
মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা দ্বারা চতুর্থ ধ্যান লাভ হয়।
দশ কৃৎস্ন, আনাপান ও উপেক্ষা ভাবনা দ্বারা পঞ্চম ধ্যান লাভ হয়।
চারি অরূপ ধ্যান ও দশ উপাচার ধ্যান ব্যতীত বাকী ছাব্বিশটি কর্মস্থান রূপলোকের ধ্যান উৎপন্ন করে। এ সমস্ত গুলি শমথ ধ্যানের লাভ, নিবৃত্তি বা নির্বাণের লাভ এতে নেই।
যদি কেহ শমথ ভাবনার মাধ্যমে শুরু করে নির্বাণ লাভ করতে চেষ্টা করেন তবে উপরোক্ত ত্রিংশ কর্মস্থানের যে কোন একটা কর্মস্থানে ভাবনার দ্বারা প্রথম থেকে পঞ্চম ধ্যানিক কর্মস্থানের কাজ সমাপনান্তে পুনরায় বিদর্শন ভাবনার নিমজ্জিত হও। ভাবনার দ্বারা হয়ত অরহত নয়তোবা অনাগামী লাভ হয়। যার নাম প্রতিসম্ভিদা মার্গ যা বর্তমানে লাভ সম্ভব নয়। প্রতিসম্ভিদা জ্ঞান লাভ হয় বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর এক হাজার (১০০০) বৎসর পর্যন্ত। বর্তমানে বুদ্ধের পরিনির্বাণ হয়েছে আড়াই হাজার (২৫০০) বৎসর অতীত হয়ে গেছে। সে হিসেবে বুদ্ধের নিয়মে তৃষ্ণা ক্ষয় করে মার্গফল লাভ করার যথেষ্ট সুযোগ বিদ্যমান।
ভগবান বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর প্রথম বারাণসীর নিকটবর্তী ঋষিপতন মৃগদাবে পঞ্চ বর্গীয় শিষ্য কৌন্ডিণ্য , বপ্প, ভদ্দিয়, মহানাম ও অশ্বজিতকে উপদেশ সহকারে দেশনার বলেছিলেন,হে ভিক্ষুগণ নির্বাণকামী ব্রতচারী দুই অন্তের অনুশীলন করবে না, প্রথম কাজে কম সুখোদ্রেকের প্রতি অনুরক্তি, যা হীন, গ্রাম্য, ইতর সাধারণের সেবা, অনার্য জনোচিত ও অনর্থকর, দ্বিতীয়/ আত্ম নিগ্রহে অনুরক্তি যা দুঃখ দায়ক, নিকৃষ্ট ও অনর্থকর। এ দুই অন্ত বর্জন করে তথাগত মধ্যম প্রতিপদ বা মধ্যমপন্থা, অভিসম্ভোদি জ্ঞান লাভ করেছেন যা চক্ষুকরনী ও জ্ঞান করনী এবং যা উপশমা অভিজ্ঞ, সম্ভোদি ও নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গিই সে মধ্যম প্রতিপদ। যথা সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি।
এ দেশনার পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের মধ্যে কৌন্ডিণ্য ধর্ম চক্ষু লাভ করেন। অর্থাৎ মার্গফল লাভ করেন, জগতে প্রথম স্রোতাপন্ন মানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সে দেশনায় আঠার কোটি দেব, ব্রহ্মা ধর্ম চক্ষু লাভ করেন। মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাতে অন্য কিছুই প্রয়োজন হয়নি। এখনও এরকম মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। আবার অন্তিম সময়ে অর্থাৎ বুদ্ধের পরিনির্বাণের সময় কুশীনগরে মল্লদের শালবনে পরিব্রাজক সুভদ্রকে বললেন, হে সুভদ্র! যে ধর্ম বিনয়ে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গেই উপলদ্ধি নেই (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নেই) প্রথম শ্রমণও তথায় নেই, দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমণও তথায় নেই, এবং থাকতে পারেনা। সুভদ্র! যে ধর্ম বিনয়ে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের উপলদ্ধি আছে, (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ আছে) প্রথম শ্রমণও তথায় আছে, তথায় দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রমণও আছে, তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমণও আছে, চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমণও আছে। হে সুভদ্র! ঊনত্রিশ বৎসর বয়সে আমি সর্বজ্ঞাতা জ্ঞান লাভ করার জন্য প্রব্রজিত হয়েছিলাম। যখন আমি প্রব্রজিত হই, সেদিন হতে এখন পর্যন্ত ৫১ বৎসর পর্যন্ত আমি আর্য মার্গ ধর্মের প্রদেশে বিদর্শন মার্গ প্রবর্তন করেছি। ইহার মধ্যে প্রথম শ্রমণ (স্রোতপন্ন) আছে, ‍দ্বিতীয় শ্রমণ (সকৃদাগামী) আছে, তৃতীয় শ্রমণ (অনাগামী) আছে এবং চতুর্থ শ্রমণ (অর্হৎ) আছে। ভগবান বুদ্ধের এ অন্তিম বাণীতেই আছে যে, ‍বিদর্শন মার্গ ছাড়া অন্য কোন মার্গ নেই মুক্তি লাভের জন্য। তাহলে আমরা কেন অন্য পথে যাওয়ার চেষ্টা করব? বুদ্ধত্ব লাভ করার পূর্বে সিদ্ধার্থ কৃচ্ছ সাধন, শমথ ভাবনা ইত্যাদি অনেক কিছু দেখেছেন ও আচরণ করেছেন। তা সবই ত্যাগ করে নির্বাণ লাভ করার পথ আবিস্কার করেছেন। প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রেও পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন একমাত্র আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথের নির্বাণ লাভ হবে। অন্য কোন বিকল্প পথ নেই। ইহা ছাড়া বুদ্ধের ধর্ম আচরণ করা, ধর্মে উন্নত হওয়া ও সাফল্য অর্জন করা- স্থান, কাল, পাত্রভেদে অকালিক।

রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৭

is Buddhism is religion?

In a religion, the main characteristic is that
there is a Creator God. But in Buddhism there is
no Creator God. In that sense Buddhism is not a
religion. The devout followers of all religions in
the world believe that there is a substance (permanent
entity) called atman or soul. But in Buddhism
there is no permanent entity called soul.
In that sense too Buddhism is not a religion. On
the contrary, in religion there should be some
organized institutions like churches and temples
and there are also some mediators such as
reverend fathers, monks and nuns to conduct
pujas and prayers etc. On this ground we can say
that in Buddhism too there are such institutions,
monks and nuns.
Simply because there are institutions, monks,
nuns and some sort of performances and offerings
and some pujas for the worldly pleasure of
the followers, one cannot say that Buddhism is also a religion. As there are no
major characteristics of religion in Buddhism, it is not a religion. Some say that
it is a philosophy. But it is neither a sheer philosophy. Of course in Buddhism
too, there is epistemology, psychology, metaphysics, logic and ethics, which
consists in a philosophy. But I should say that it is neither a religion nor a philosophy.
But it is a way of life which could be applied in our daily life. To be
exact, this way is nothing but practising and developing one's mind through
meditation.............

শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৭

ধর্ম এবং বিজ্ঞান।


০১
লিখেছেন – বাবলু মুৎসুদ্দী

সব ধর্মই কার্য – কারনেই হয় অকারনে কোন কিছু হয় না এবং হওয়া সম্ভবও নয়। কার্য – কারনে মন বা ধর্ম উদয় হয় (Genesis) কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়ে (Static development )আরেক চিত্ত (আগাম নতুন ধর্ম) উৎপন্ন হওয়ার কারন রেখে বিলীন (Desolution)হয়ে যায় । মন বা ধর্ম (চিত্ত) উৎপন্ন হয়ে বিলীন হতে যে সময় লাগে তাকে ০১ (এক) চিত্তক্ষণ (হাতে দুই আঙ্গুলে তুরি ফোঁটাতে সে সময়) বলে। আর ১৭ চিত্তক্ষণে ১ চিত্তবীথি (One Thought Process) হয় ।
বুদ্ধ বলেছেন প্রতিটি চিত্ত,(Psychic Life) ১৭ চিত্তক্ষণ বা এক চিত্তবীথি স্থায়ী বা ঠিকে থাকে। এবং নতুন কোন চিত্ত বা কর্ম সৃষ্টি করে বিলীন হয়ে যায় ।  বিজ্ঞানী আর্লবাট আনস্টাইন E=mc2 সূত্রানুসারে দেখতে পান পদার্থ শক্তিতে আর শক্তি পদার্থে রূপান্তুর হয় অতএব পদার্থ অভিনশ্বর ।
আর বিজ্ঞানী মহলে হিংসা বিদ্বেষের ছড়াছড়ি। সবাই তো আর আনস্টাইনের মত ভাবতে পারে নি ।   কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী Fred Holly পদার্থ , পরমাণু, শক্তি অভিনশ্বতার বিরোধিতা করে বলেন পদার্থ, পরমাণু, শক্তি নশ্বর, তিনি বলেন পরমাণু তার নিউক্লিয়াসের বহিঃস্থ ইলেকট্রন হারায় এবং তৎক্ষণাত বায়ু বা অন্য কোন পদার্থ হতে ইলেক্ট্রন গ্রহন করে তার হারানো ইলেক্ট্রন লাভ করে। পরমাণু নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে নতুন নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং নতুন পরমাণু সৃষ্টি হয় । এভাবে পদার্থের জীবন প্রক্রিয়া চলতে থাকে । এক সময় ইলেক্ট্রন ও নিউক্লিয়াস (প্রোটন ও নিউট্রন) দূর্বল থেকে দূর্বলতর হয়ে বন্ধন ক্ষমতা নষ্ট হলে পদার্থ ভেঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায় ।
ব্যাপারটা অনেক হাস্যকর ।
একমাত্র বিজ্ঞানী আনস্টাইন মনে হয় (সঠিক কিনা জানি না) গৌতম বুদ্ধের (Good Teacher/ First Enlighten Man ) সাথে একমত হতে পেরেছেন ।
বুদ্ধ সেই সুপ্রাচীন কালে্ কী সুন্দর নিখুত ব্যাখা প্রদান করেছেন তা আমি ভেবে বার বার অবাক হই। বুদ্ধ বলছেন পদার্থের মধ্যে এমন গুন বা ধর্ম  আছে যার দ্বারা তাদের মধ্যে সম্মিলনের বা বন্ধন ক্ষমতার ফলে অন্য পদার্থ সৃষ্টি হয় যা আধুনিক রসায়ন স্বীকার করে । বুদ্ধ বলেছেন চারটি ভুত রূপই পদার্থ যেমন মাটি, পানি, বায়ু, তেজ যেমন - মাটির কঠিনতা ও কোমলতা স্বভাব, পানির নিবদ্ধ ও নিঃসরন স্বভাব, বায়ুর সংকোচন ও প্রসারণ স্বভাব, তেজের (তাপমাত্রা) ঠান্ডা এবং গরম স্বভাব অর্থাৎ ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রনে অনুতে অনুতে আনবিক বন্ধন ক্ষমতার মাধ্যমে পুঃণ পুঃণ নতুন শক্তিতে রূপান্তর হয়ে থাকে । আবার প্রত্যেকটি ভূত রূপের মধ্যে উক্ত চারটি গুনই থাকে । যেমন হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মিলিত হয়ে পানি তৈরি করে আবার পানিতেই উক্ত মৌলগুলোই পাওয়া যায় এবং সেই পানি নতুন কোন পদার্থেরে সাথে মিশ্রিত হলে যে ফলাফল পাওয়া যাবে সেখানে একই মৌল বিদ্যমান থাকবে ।
তার মানে, ক্ষয় নাই ওরে…. তোর ক্ষয় নাই।

- ভূলত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থী

সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

বুদ্ধ দর্শন ও বিজ্ঞান!


নশ্বর সুজয়
(সংক্ষেপে)

মানুষ মাত্রই একটি কৌতুহলী প্রাণী। বস্তুত বিজ্ঞান বলে আমরা যা বুঝি তাও কৌতুহলের মাপকাঠিতে চলে। এই কৌতুহলের উপর নির্ভর হয়ে বিজ্ঞান অনেক অনেক অজানা বিষয়ের সমাধানে তৎপর। বর্তমানে এই যান্ত্রিকবিশ্বই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এই বিজ্ঞান শুধুই মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয় গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারচেয়েও বহুধাপ এগিয়ে। ঈশ্বর গড সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়েও এদের বিরাম নাই। তারা পৃথিবীর রহস্যময় সৃষ্টি তত্ত্বে এমনটাই সিদ্ধান্তে উপনীত যে-তাদের দাবী সমগ্র মহাকাশের যাবতীয় বস্তু দাড়িয়ে আছে periodic নামক টেবিলের উপর। যা ১০২ টা মোল দ্বারা গঠিত। মহাবিশ্বের এমন কোন ক্ষুদ্র বা বৃহৎ বস্তুও অবশিষ্ট নেই যা এই মোল ছাড়া গঠিত নয় । গ্রহ, তাঁরা, মাটি, আকাশ, জল সব কিছু হতে এই মোলগুলোর বন্ধন লাগবেই লাগবে । এমনকি  আমাদের শরীরও এই দিয়ে তৈরি । যদি ঈশ্বরের কোন আকার থাকে বা ঈশ্বর যদি কোন রূপে থাকেন তাহলে এই মোলগুলো দিয়েই তাকে রূপ ধারণ করতে হবে । বিশ্বের প্রায় ধর্ম গ্রন্থেও লেখা আছে ঈশ্বর বিরাজমান সমস্ত জীব আর বস্তুর মধ্যে ।
তাহলে ঈশ্বর গড বলতে আমরা কি বুঝব ?  এই হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম, বোরন, কার্বন ইত্যাদি হল গড ঈশ্বর ভগবানের অস্তিত্ব ? কিন্তু কিভাবে ?

বেশকিছু ধর্ম বা ধর্ম গ্রন্থের দাবী পৃথিবীর বাইরে সাতটা আকাশ আছে। যাকে ওরা বলে সাত আসমান।
কিন্তু বিজ্ঞানের দাবী ভিন্ন। বিজ্ঞান বলে পৃথিবীর বাহিরেও অসংখ্য আকাশ রয়েছে। পৃথিবী থেকে কোটি গুনে বৃহৎ গ্রহ, নক্ষত্র রয়েছে। এবং এদের সংখ্যাও কোটি কোটি । অগণিত , ধারনার বাইরে।
উইকিপিডিয়া সুত্র বলছে- সারা মহাবিশ্বের টোটাল শক্তির মধ্যে মহাবিশ্বের প্রায় ৫০ হাজার গ্যালাক্সি এর সমস্ত তারা , গ্রহ এবং প্রাণীকুল মাত্র ৫% শক্তি দ্বারা গঠিত । বাকি শক্তির ৬৮% এখনও উন্মুক্তই হয়নি , যাকে বিজ্ঞানে বলছে dark energy । আর বাকি dark matter ( ২৭%)  হল এই অন্ধকারের উৎস ।

তথ্যটি সম্পূর্ণ নয় কিন্তু বিষয় হল পুরো শক্তির নগণ্য শতাংশ শক্তি দিয়ে তৈরি এই পৃথিবীর মধ্যে আমরা বিভিন্ন বিভিন্ন শক্তির যে উপাসনা করি তার মুল শক্তি কি অন্য ? যেমন ধরুন ভগবানগুলো হিন্দুদের দায়িত্ব নিয়ে আছে , আল্লা মুসলিমদের , গড খ্রিস্টানদের, এরকম আরও আছে এদের কন্ট্রোল করে তবে কে ?  যদি এটা মিথ্যে হয় তবে সত্যটা কি ? সব ধর্মের দাবী তারাই সত্য তবে বাকিরা মিথ্যে প্রমাণিত হয় না কেন ?
১০২ টা মোলের জন্ম নেই মৃত্যু নেই । আছে শুধু সংযুক্তিকরণ আর বিচ্ছেদ । পৃথিবীর শুরু সেই মোলের সংযুক্তি ছিল আর কেয়ামত বা প্রলয় হবে সেই মোলগুলোর বিচ্ছুরণ । আবার তারা অন্য রাসায়নিক প্রক্রিয়া করে অন্য পৃথিবী বানাবে তবে তিন দিন কি সাত দিনে কিনা জানি না । তবে এই মোলগুলোর সৃষ্টিকর্তা কে তা জানতে না পারা অব্দি মোলগুলোকেই ঈশ্বর মানা যুক্তিপূর্ণ নয় কি ? বিভিন্ন ঈশ্বরের নামে লড়ার চেয়ে ঈশ্বর নিজের মধ্যে আছে মনে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি ? ধর্মকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মিথ্যা বেলুন না বানিয়ে নিজের আত্মার মধ্যে আত্মস্থ করা প্রকৃত ধার্মিকের কাজ নয় কি ?

পরিশেষে একটি কথা বলি- আপনি যদি সতি্যই সতি্যই প্রকৃত বুদ্ধ দর্শন বিষয়ে ধারণা রাখেন তাহলে এতোক্ষণ যা যা আলোচনা করলাম তার পুরোটাই মিলিয়ে নিতে পারবেন এ বুদ্ধদর্শনে।

কারণ বৌদ্ধ দর্শনে ঈশ্বরকে স্বীকার করে না। তারা জানে এই পৃথিবীর সবকিছু আমি তুমি পশুপক্ষী লতাগুম্ম সবই প্রকৃতির সৃজন মাত্র।

সুত্তপিটকের রতনসুত্তে উল্লেখ্ আছে শতসহস্র কোটি চক্রবালের কথা। সেখানেও অশরীরী প্রাণের অস্তিত্বের কথাও বুদ্ধ স্বীকার করেছিলেন।
এছাড়াও মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮) উল্লেখ্ আছে-
অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।
( প্রতিত্যসমুদ্পাদ  )

প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে-  ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।

এছাড়াও বিজ্ঞানের মোল বিষয়টিকে আপনি বুদ্ধদর্শনের সৃষ্টিতত্ত্বের এই নীতি সাহায্যে মিলিয়ে নিতে পারবেন- সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম
খ. চিত্ত নিয়ম
গ. বীজ নিয়ম
ঘ. কর্ম নিয়ম এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম

এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।

রবিবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৭

বৌদ্ধ সৃস্টকর্তা।


--প্রথমে বুঝতে হবে ঈশ্বর কি। কারন অন্য ধর্ম গুলোতে ঈশ্বরকে ব্যাক্তি (Person) হিসেবে নেওয়া হয় আর ঈশ্বর এর অর্থ ওদের কাছে ; Generator (সৃষ্টিকারী), Operator (পরিচালনাকারী) and Destructor (ধ্বংসকারী) সংক্ষেপে GOD। যা একটা being বা person। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মে Generator operator and Destructor হচ্ছে পাঁচটা Universal Rules বা Cosmic order যার দ্বারা এই universe পরিচালিত হয় আর এ ক্ষেত্রে এটি কোন ব্যাক্তি বা সত্ত্বা নয়। আর বুদ্ধ Hindu and other religion এর God এর explanation দীর্ঘ নিকায় এর কেবট্ট সূত্রতে বর্ণনা করেছেন। যেটি পড়লে জানা যায়- হিন্দুদের ঈশ্বরের (God) অস্থিত্ব বৌদ্ধ ধর্মে রয়েছে। ঐ সূত্রতে বুদ্ধ বলেছেন-Hindu and other Religion এ যাকে ঈশ্বর হিসেবে মান্য করা হয় তিনি স্বর্গ সমূহের উপরের একটি স্পেসে অবস্থান করেন। তাদের God হল বুদ্ধের ভাষায়- “মহাব্রম্মা”। যদিও ওনি খুব Supernormal power এর অধিকারি কিন্তু ওনি Generator, operator and destructor না....। অর্থাৎ জগতের সৃষ্টি, পরিচালন এবং ধ্বংস এই ত্রিকাজ তিনি করতে পারেন না। কিন্তু হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মালম্বীরা ভাবেন তিনিই এই কাজ ত্রয় করেন। তাই বৌদ্ধ ধর্মে, মহাব্রহ্মা (যাকে অন্য ধর্মসমূহে ঈশ্বর হিসেবে গন্য করা হয়) GOD নন। যেহেতু তিনি ঐ ত্রিকাজ করতে পারেন না। বৌদ্ধ ধর্ম বলছে সৃষ্টি, পরিচালন এবং ধ্বংস এই ত্রিকাজ কোন ব্যাক্তি করেন না। এগুলো স্বয়ংক্রিয় একটি ‘নির্ভরশীলতা বা আপেক্ষিক’ একটি পদ্ধতির মা্ধ্যমে হয়ে থাকে। এই স্বয়ংক্রিয় পদ্বতিকে আমরা ‘বিশ্বজনীন নীতি’ বা ‘Cosmological Laws’ বলতে পারি। কারো যদি সৃষ্টিকর্তা, ধ্বংসকর্তা, পরিচালনকর্তা রূপে কাউকে বসানো একান্ত প্রয়োজন হয় ধর্মে তাহলে এই নীতিগুলো বসান। বুদ্ধের এই নীতি সমূহ এত সুগভীর যে কোন ব্যাক্তি ঈশ্বর (যেমন: মহাব্রহ্মা) যদি সতি্যই থাকেন দেখা যাবে তিনি নিজেও এই নীতি সমূহে আটকা যদিও তিনি হয়তো অনেক উর্দ্ধতন সত্ত্বা। এবার আসা যাক, সেই স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? কি? যেগুলোর দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম (Rules of Physics or matter)
খ. চিত্ত নিয়ম (Rules of Mind or citta)
গ. বীজ নিয়ম (Rules of Germinal order)
ঘ. কর্ম নিয়ম (Rules of Karma ) এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম ( Rules of Dharma)।
এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী, ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন কিছুকে আমরা ধরে নেই তবে বৌদ্ধ ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা। Personal God (God as Being) বুদ্ধ এই জন্য স্বীকার করেন নাই কারন ওনি যদি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বা universe কে create করেন তার একটা উদ্দেশ্য থাকবে। উদ্দেশ্য থাকলে তার একটা তৃষ্ণা থাকবে। তৃষ্ণা থাকলে ওনি নিজেও মুক্ত নন..। আর যেখানে বুদ্ধ মুক্ত পুরুষ সেখানে Creator যদি মুক্ত না হন তবে তা যে সম্পূর্ণ ভুল একটা concept তার প্রমান দেয়।
এখন আরেকটি প্রশ্ন উঠতে পারে তা হলো কে এই বিশ্বজনীন নীতিকে পরিচালন করে? বা কিভাবে এই নীতি সমূহ পরিচালিত হয়? এই প্রশ্নসমূহের উত্তর বৌদ্ধ ধর্মে দিচ্ছে দুটি আলাদা তত্ত্ব দিয়ে। যথা:
১. প্রতীত্য সমুৎপাদ বা নির্ভরশীলতা তত্ত্ব (Depended origination)এবং
২. পট্ঠান (Conditional Relations)।
এগুলো ব্যতীত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি, পরিচালন এবং ধ্বংস হয় না। এখানে একটা আরেকটার সাথে যুক্ত। অনেক বুদ্ধধর্মলম্বীরা মনে করেন সব কর্মের কারণে হয়। সব কর্মফল। এটা সঠিক নয়। সব কর্মের কারণ না। বাকি নিয়মসমূহ ছাড়া কর্মফল একা কিছু করতে পাবে না। যেমন রুপ আমাদের body and এই earth, galaxy (যার origin physical element থেকে) এইগুলো যদি উৎপন্ন নাই হয় আমরা কর্মফল ভোগ করবো কিভাবে? “শূণ্য কল্প” ' যার অর্থ স্বরূপ বৌদ্ধ ধর্মে বলা হয়েছে- 'gap between the begin and end of the universe' এই সময়ে কি কর্মফল ভোগ করবে? তার উত্তর হলো না...। কারণ লোক বা জগৎ (রূপ) ছাড়া কর্মফল ভোগ করা যাবে না। আবার রূপ থাকলেও যদি চিত্ত না থাকে তবে এই ক্ষেত্রেও কর্মফল কাজ দিবে না। চিত্ত ছাড়া সত্ত্বগণ রোবট তুল্য। কারণ যদি চিত্ত না থাকে অনুভব করবে কে? কর্মফল যে পাচ্ছে তা বুঝবে কে? কেউ যদি তবুও প্রশ্ন করেন তাহলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড
ে কিভাবে সৃষ্টি, চালন এবং ধ্বংস হয় যদি ব্যাক্তিরূপ কোন ঈশ্বর না থাকেন। তাহলে শেষবারের উত্তর হচ্ছে- প্রধান পাঁচটি, সহকারী ২টি এবং অন্যান্য কিছু নির্ভরশীল তত্ত্বের মাধ্যমেই ঐ কাজ ত্রয় বৌদ্ধ ধর্মে GOD এর কাজ করে থাকে তাদের নিজস্ব স্বভাবের মধ্য দিয়ে। আশাকরি আপনারা বুঝেছেন।

লাভ জিহাদ।

What is the meaning of love jihad?
Love Jihad is the term given to the alleged conversion of non-Muslim women to Islam by Muslim boys and men under the pretense of love.
#লাভ জিহাদ কি ?

#লাভ জিহাদ হচ্ছে বৌদ্ধ মেয়ে হয়ে অন্য অবৌদ্ধ ছেলের সাথে প্রেম করা , অথবা বৌদ্ধ ছেলে হয়ে অন্য অবৌদ্ধ মেয়ের সাথে প্রেম করা , শেষে প্রেম করে নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করে ধর্মান্তরিত হওয়াকে লাভ জিহাদ বলে।

#লাভ জিহাদ এবং বৌদ্ধ বোনদের জন্য সতর্কবার্তাঃ

#অতি স¤প্রতি সিলেটের একটি ঘটনা দেশের ছোট বড় প্রায় সবকটি পত্র পত্রিকায় নিউজ হিসেবে ছাপিয়েছে। নিউজটি হল একজন সিলেটের ডাক্তার তার স্ত্রীকে তালাবদ্ধ অবস্থায় বন্দি করে হজ পালন করতে সৌদি আরব গেছেন।
বলা বাহুল্য, তালাবদ্ধ অবস্থায় বন্দিনী স্ত্রীলোকটি এককালে হিন্দু ছিলেন এবং তিনিও পেশায় ডাক্তার। লাভ জিহাদীদের খপ্পরে পড়ে নিজ পিতৃ ধর্ম পরিত্যাগ ও ভালবাসার টানে অতি আশা করে মুসলিম ডাক্তারের ঘরণী হয়েছে, আর এর চরম মূল্য কি করে দিচ্ছেন, তা আমরা সকলে পত্র পত্রিকা খুললেই দেখা যায়।

#এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বহু পুরাতন ও ধারাবাহিক ঘটনার একটি মাত্র। প্রায় প্রত্যেকটি ধর্মান্তরিত বিয়ের পর ধর্মান্তরিত মেয়েদের ক্ষেত্রে এমনই হয়। কারণ মূল কারণ হলো যে ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়েটা করলেন, ঐ ধর্ম দর্শনে একজন পূরুষের ৪ এর অনধিক বিয়ে করার অধিকার এবং ভাল না লাগলে দেন মোহরের টাকা দিয়ে বিদেয় করার বিধান সংরক্ষিত করা আছে। বৌদ্ধ মেয়েদের ধর্মান্তরিত হয়ে বিবাহ ও পরবর্তী পরিনতি হল স্বামীহারা হয়ে আবার অন্যে ব্যাক্তিকে স্বামী হিসেবে গ্রহন করা, নয়তো অন্যের বাড়ীতে ঝিগিরী করা, নয়তো শেষে পতিতালয়ে গমন করে যৌনদাসী হওয়া।

#কিন্তু এই মেয়েটি বুদ্ধের ছায়াতলে স্বাধীন মুক্তপাখি ছিল।

#এইভাবে ফাঁদে ফেলে জিহাদিরা মেয়েটাকে প্রথমে নাস্তিক বানায় তারপর বিয়ে করবে তারপর ধর্মান্তরিত করে তারপর ওদের কাজ শেষ । গাছের ফুল ঘ্রাণ নেওয়ার পর ওটাকে ফেলে দেওয়া ছাড়া কোন কাজ থাকে না।

#জিহাদের জন্ম সূরা নিসা আয়াত ৩ - #তোমরা মহিলাদের মধ্যে থেকে তোমাদের পছন্দনুযায়ী দুই-দুই , তিন- তিন , চার- চার জনকে বিয়ে করে নাও।

#তাহলে শিকারের ফাঁদ পাততে অসুবিধা কোথায় ?

জিহাদিরা মালাউন মহিলাদের উপর কু-নজর বেশি কারণ - সূরা নিসা আয়াত -২৪ #বিবাহিত পরস্ত্রী তোমাদের কাছে নিষিদ্ধ যে সব বিবাহিত অমুসলিমদের তোমরা জিহাদে ধরে এনেছো তারা তোমাদের জন্য বৈধ । গণিমতের মাল হিসাবে তাদের ভোগ করা যায়।

#বৌদ্ধধর্মের অনেক নারীরা মৌলবাদিদের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন সাবধান হয়ে যান ।

#মডেল তারকা শ্রাবস্তি দত্ত তিন্নি - ভালোবেসে বিয়ে করেছিল আরেক মডেল হিল্লোলকে দেড় বছর সংসার করেছেন একটা মেয়ে সন্তানও হয়েছে পরে বাইন তালাক। তারপর তিন্নির ঠিকানা হয়েছে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে এখন মায়ের বাসায় থাকেন কিন্তু সুস্হ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি ।
#এখন সম্প্রতি অপু বিশ্বাস সবকিছু ছেড়ে এসেও কিভাবে হেনস্হার স্বীকার হচ্ছে তা করো অজানা নয়।

#এখন এইসব জিহাদি আরেক নামিদামী মডেলকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে , সংসার করে । কিছু দিন পর হয়তো নতুন কাউকে ধরবে। যেমন , বেশ্যালয়ের একেক দিন একেক ঘরে গমন করে খরিদ্দার।

#দৈনিক কালের কন্ঠ প্রকাশিত ২৪ সেপ্টম্বর ২০১৩ ধামরাইয়ে শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিত হয়ে উলঙ্গ অবস্হায় অন্য বাড়িতে আশ্রয় নেয় ধর্মান্তরিত হিন্দু মেয়ে সাগরিকা সূত্রধর । সে এখন তালাক প্রাপ্ত । হয়তো এখন কোন আবাসিক হোটেলে প্রতিতা বৃত্তিতে আছেন।

#যারা ভিক্ষা, ঝিগিরী বা পতিতালয়ে যেতে পারে নি এমন অনেক মেয়ে আছে যারা লাভ জিহাদের স্বীকার হয়ে , পারছে না মরতে পারছে না জন্ম দেওয়া মা বাবার কাছে মুখ দেখাতে । রাতে চোখের জ্বলে বালিশ ভিজালেও দেখার কেউ নাই ।

#এইসব দিদিদের জানা উচিত ভালোবেসে ঘর করা যায় তবে মা বাবার আশীর্বাদ ছাড়া অল্পদিনও সুখে শান্তিতে ঘর করতে পারে না ।

#তাই লাভ জিহাদিদের সাথে প্রেম করার চিন্তা বাদ দিয়ে নিজে সতর্ক হোন অন্যকে সতর্ক করুন।

#ত্রিপিটকের  জ্ঞান যার মধ্যে আছে বা মা-বার কাছ থেকে জেনেছেন তারা কখনও লাভ জিহাদের খপ্পরে পরে না বরং তাদের দিকে থুঃ থুঃ ছুড়ে মারেন।

সুতরাং সময় থাকতে সাবধান হোক হে ভাই ভগ্নি।

বৌদ্ধ দর্শনে যুক্তি।


ড: নীরুকুমার চাকমা [ অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ]
বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা-ধারনা ও বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলো অভিজ্ঞতালব্ধ ও প্রমাণ সাপেক্ষ; এবং এ কারণে অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে সত্য বলে অপ্রমাণিত কোন কিছুকেই আধুনিক মানুষ সহজে জানতে বা গ্রহণ করতে নারাজ। শিক্ষিত সমাজের কাছে তাই ধর্মের আবেদন নগণ্য। ধর্মীয় মতবাদকে সাধারনত মনে করা হয় অবৈজ্ঞানিক, অন্ধবিশ্বাসভিত্তিক অযৌক্তিক। অন্যান্য ধর্মের উপর এ অভিযোগ চাপানো গেলেও বুদ্ধ ধর্মের উপর চাপানো কিন্তু যুক্তি-সজ্ঞত বলে মনে হয় না। খ্রিষ্ট জম্মের সেই ষষ্ট শতাব্দিতে উৎপত্তি হলেও বুদ্ধধর্ম আসলে একটি আধুনিক ধর্ম, বৈজ্ঞানিক ধর্ম, যুক্তির ধর্ম। বুদ্ধের সুমহান উপদেশ, বানী ও চিন্তাধারাই বুদ্ধদর্শনের উৎস ও ভিত্তি। অন্য কথায়, বুদ্ধের ধর্মই আসলে বুদ্ধ দর্শন। বুদ্ধ দর্শনের প্রধান বৈশিষ্টই হচ্ছে স্বাধীন চিন্তা। স্বাধীন চিন্তার এ গতিধারা যুগে যুগে বিকশিত হয়েছে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। ধর্মের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস এ দর্শনকে কলুষিত করতে পারেনি কোনদিন। অতিজাগতিক বা অতীন্দ্রিয় ব্রহ্ম বা ইশ্বরের অন্ধবিশ্বাস এ দর্শনে থাঁই পাইনি কনোদিন।যুক্তির স্বচ্ছতা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এ দর্শনের প্রাণ।
হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম, ও ইসলামধর্মের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস, কিন্তু বুদ্ধ ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি। বুদ্ধের বানী ও উপদেশকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করলে বা নির্বিচারে গ্রহণ করলে বুদ্ধ ধর্মকে বুঝা যাবে না। একমাত্র যুক্তির মাধ্যমে বুদ্ধ ধর্মকে জানা বা বুঝা সম্ভব। বুদ্ধ যীশু খ্রিষ্টের মতো ঈশ্বরের সন্তান নন, শ্রীকৃষ্ণের মতো ভগবান নন, হযরত মুহম্মদের (দঃ) মতো পয়গম্বরও নন। রাজপুত্র হলেও তিনি ছিলেন আমাদের মতই রক্ত মাংসের মানুষ যিনি নিজের সাধনাবলে বুদ্ধত্ব লাভ করে ইতিহাসে মহামানব বলে পরিচিত হবার গৌ্রব অর্জন করেন। অন্যান্য ধর্ম প্রচারকরা যেখানে নিজেদের বানীগুলোকেই এক মাত্র পরম সত্য বলে দাবী করেন এবং এগুলোকেই অন্ধভাবে ও নির্বিচারে গ্রহণ করার জন্যে আহ্বান জানান, বুদ্ধ সেখানে তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আমি যা বলছি তা তোমরা নির্বিচারে মেনে নিওনা, আমার কথাকে তোমরা নিজেরা পরিক্ষা করে দেখ।’ এত বড় কথা যুক্তিবাদী ছাড়া আর কে বলতে পারে?
এ জীবন ও জগতকে বুদ্ধ বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলদ্ধি করেছেন, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ দ্বারা বিচার করেছেন, যুক্তি দিয়ে বুঝাবার চেষ্টা করেছে। অন্যান্য ধর্ম যেখানে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দিয়েছে, বুদ্ধ ধর্ম সেখানে প্রাধান্য দিয়েছে বুদ্ধিকে, যুক্তিকে এবং এ জীবন ও জগতের সব জিনিসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন। বুদ্ধের মতে জগতের প্রত্যেক্তি জিনিস কার্যকারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। কোন বস্তুই স্বয়ং উৎপন্ন হইনা একটি ঘটনা অন্য একটি ঘটনা থেকে সঞ্জাত। সবকিছুই উৎপত্তি হয় ঘটনা থেকে। বুদ্ধ দর্শনে এ তত্ত্বকে বলা হয় ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’। এ তত্ত্বানুসারে আমাদের জীবন দুঃখময় , এ দুঃখের কারণ আছে, এ দঃখ থেকে মুক্তিও পাওয়া যায়। জীবন যে দুঃখময় তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বুদ্ধ নিত্য, অপরিবর্তনশীল, চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর বলে কোন জিনিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করেন না। তাঁর মতে জগতের সবকিছু পরিবর্তনশীল, সারা বিশ্বে চলেছে বস্তুর বিরামহীন পরিবর্তন ও রূপান্তর। আমাদের জীবন হচ্ছে এক অবিরাম প্রবাহ-আবির্ভাব ও তিরোভাব এক অন্তহীন স্রোত, এ জগতে শাশ্বত সত্তা বলতে কোন জিনিস নেই।বুদ্ধ দর্শনের এ বৈজ্ঞানিকমত পরবর্তীকালে মার্ক্স ও এঙ্গলকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। অধিবিদ্যায় বা শুদ্ধ তত্ত্ব জিজ্ঞাসায় বুদ্ধ কোনদিন আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর দর্শন ছিল সম্পূর্ণভাবে জীবন মুখী। জীবন সমস্যা সমাধানে যে জিনিস কোন প্রয়োজনে আসে না, বুদ্ধ সে জিনিসকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছেন. বুদ্ধের মতে, জগত কি নিত্য না অনিত্য, সসীম না অসীম, ঈশ্বর আছে কি নেই এ ধরণের তত্ত্ব বিচারে আত্ত্বনিয়োগ করা অর্থহীন এবং সময়ের অপচয় মাত্র, কারণ এতে দুঃখের নিবৃত্তি হয় না, জিবনের লক্ষ্য অর্জিত হয় না। বুদ্ধ দর্শনের বৈশিষ্ট্য তাই শুদ্ধ তত্ত্ব বিচার নয়,দুঃখ থেকে মুক্তিলাভের চেস্তা করা। এ মুক্তির প্রশ্নে বুদ্ধ ধর্ম যে মত পোষণ করে তা নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী.

বৌদ্ধ শাস্ত্রে মারের দর্শন।

---------------------------------------
‘মার’ শব্দটি ত্রিপিটক সাহিত্যের বহুল প্রচলিত নাম। মার বলতে একটি রুপক অর্থে বুঝায়। মারের স্থায়ী কোন আকার, আকৃতি, অস্তিত্ব ও অবস্থা আমাদের দৃষ্টিগোচর নয়। সত্ত্বের চিন্তা-চেতনা ও কাজকর্মের উপর প্রভাব বিস্তারই এর স্বভাব। আমরা বৌদ্ধ সাহিত্য অধ্যয়ন করলে দেখতে পাই, সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনের প্রথম থেকেই বুদ্ধত্ব লাভ করা পর্যনন্ত এমনকি বুদ্ধত্ব লাভ করার পর থেকে মহাপরিনির্বাণের পর মুর্হুত মারের অশুভ শক্তি লক্ষ্য করা যায়। তার শিষ্যমন্ডলীদের জীবন কাহিনীতেও এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও মারের একটি অশুভ শক্তি লক্ষ্য করা যায়। মানুষ একটি শুভ কাজে অগ্রসর হলে অখবা ধ্যান সমাধিতে নিবিষ্ট হলে মার বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনে দেখতে পাই, মার বলতে সকল প্রকার অশুভ শক্তির অধার, উন্নতির অন্তরায়, সাফল্যের প্রতিবন্ধক এবং মুক্ত, সুস্থ ও সুন্দর চিন্তা বিরোধক শক্তি। মারের শক্তি দুর্দমনীয় ও পরাক্রমশালী। আভিধানিক অর্থে মার হল অকুশল মনোবৃত্তি কিংবা রিপুসমূহের অপশক্তি। ত্রিপিটক সাহিত্য উল্লেখ আছে, রতি, আরতি তৃষ্ণা নামে তিন কন্যা এবং কাম, ক্ষুধা, পিপাসা, প্রভৃতি কার অগণিত সৈন্য সামন্ত ছিল। মানুষ কল্যাণ পথে অথবা ধ্যান ও মার্গ পথে অগ্রসর হলেই প্রথমে যে মারসেনা আক্রমন করে তা হল কাম ভোগের বাসনা। সাধক যদি এই ধাপকে অতিক্রম করে সম্মুখ অগ্রসর হয় তারপরে আত্ক্রমন করে আরতি সেনা। পর্যাযক্রমিক ক্ষুধা-পিপাসা সেনা, বাসনা বা তৃষ্ণা সেনা, তন্দ্রা ও আলস্য সেনা, ভয়-ভীতি সেনা, সংশয় বা সন্দেহ সেনা, মান-অভিমান, লাভ-সৎকার, পূজা প্রভৃতি সেনা একটির পর একটি এসে উপস্থিত হয়। এই সেনারা সাধককে পরাস্ত করতে সর্ব অশুভ শক্তি নিয়োগ করে। এসব মার সেনাকে অতিক্রম করতে না পারলে বোধি বা বুদ্ধত্ব লাল কখনও সম্ভব নয়। কুমার সিদ্ধার্থ এ সকল মারসেনাকে পরাজিত করে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়েছিলেন।
আমরা বুদ্ধ বলতে মহাজ্ঞানী সর্বোত্তম জ্ঞানের অধিকারীকে বুঝি। যিনি সকল বন্ধনহীন এবং দুঃখ, দুঃখ কারণ, দুঃখ নিরোধ, দুঃখ নিরোধের উপায় –এই চতুরার্য সত্য আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামক শ্রেষ্ঠ মার্গ অনুশীলন করে বিশুদ্ধ জীবন যাপন করেন। ‘যার জয়-পরাজয় পর্যবসিত হয়না, যার জয় রিপু জগতে কিছুমাত্র অনুসরণ করেনা, সেই রিপুজয়ী সর্বদর্শী বুদ্ধকে তোমরা কোন উপায়ে বিচলিত করবে’? ভগবান বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভ করে একসময় নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থ বৃক্ষের ছায়ায় বসে মুক্তির নির্মল আনন্দ অনুভব করেছিলেন। এমনি সময় তার চিত্তে অন্য এক চেতনা জাগ্রত হল তার মনে হল এই মুক্তি হয়ত সত্যিকারের মুক্তি নয়। বিশুদ্ধ মুক্তি ও পরিশুদ্ধ জীবন যাপনের জন্য এ পথ পরিত্যাগ করা উচিত৤ এই চেতনা প্রবাহের সূচনাতেই বুদ্ধ উপলব্দি করলেন আমি অশুভ শক্তির ছায়ামুক্ত হয়ে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়েছে, হে মার! তুমি আমার চিত্ত বিভ্রান্তি ঘটাতে পারবেনা। আমি তোমাকে চিনেছি এই পাপমতি মার।
বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য পাচ ধরণের মারের কথা বলা হয়েছে।
১. ক্লেশমার,
২. অভিসংস্কার বা ভোগ-চেতনা মার,
৩.দেবপুত্র মার,
৪, স্কন্ধ মার,
৫. মৃত্যূমার
১. ক্লেশমারঃ ক্লেশ পালি কিলেস শব্দের অর্থ দাঁড়ায় চিত্তের কালিমা৤ আমরা জানি চিত্ত বা মন স্বভাবতঃ স্বচ্ছ আযনার মত নিরমল। স্বচ্ছ আয়না যেমন ধুলো-বালি দ্বারা আচ্ছন্ন হয় সেরুপ চিত্ত বা মনও লোভ, দ্বেষ,মোহনামক কালিমা দ্বারা আবৃত হয়। চিত্তে বা মনে ক্লেশ উৎপন্ন হলে মানুষ শুভাশুভ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে৤ মানুষ ক্লেশের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সর্বদা বিভিন্ন প্রকার পাপকর্মে লিপ্ত হয়।
২. অভিসংস্কার মারঃ এই মারকে ভোগ-চেতনা মারও বলে। অভিসংস্কার মারকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।
ক) পুঞ্ঞাভিসঙ্খারা,
খ) অপুঞ্ঞাভিসঙ্খারা,
গ) আনঞ্ঞভিসঙ্খারা
আমরা জানি জন্মের কারণ হচ্ছে সংস্কার। এজন্য সংস্কারকে জন্মের হেতু সৃষ্টিকারী বলে। এ মারও মানুষকে ভূল পথে পরিচালিত করে নিবার্ণ লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পুঞ্ঞাভিসঙ্খারা দ্বারা সত্ত্বগণ কামলোক, রুপলোক ও অরুপলোকে জন্মগ্রহন করে। কিন্তু সত্ত্বগণ সমূলে তৃষ্ণা ক্ষয় করতে না পারলে ভব থেকে ভবান্তরে বারবার জন্মগ্রহন করে। সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনে রামপুত্র রুদ্রক এর নিকট অবগত হয়েছিলেন অরুপ ধ্যানভূমি থেকেও সত্ত্বগণ পুনরায় গর্ভাশয়ে জন্মগ্রহন করেন। অন্যদিকে সত্ত্বগণ যেন পুণ্যকর্মদ্বারা পুণ্য সঞ্চয় করে মাররাজ্যে অতিক্রম না করতে পারে সেজন্য অপুঞ্ঞাভিসঙ্খারা মারের প্রভাব সত্ত্বগণের মধ্যে বিদ্যামান থাকে। এ মারের প্রভাবে সত্ত্বগণ জন্মজন্মান্তরব্যাপী দুঃখ ভোগ করে। তারা এ মারের প্রভাবে প্রভাবিত হয় বলে নিবার্ণ লাভে সমর্থ হয়না। অন্যদিকে আনঞ্ঞভিসঙ্খারা হল উৎপন্ন সংস্কারসমূহকে চিত্তের মধ্যে বদ্ধমূল স্থায়ী করে নেওয়া। বৌদ্ধধর্মে ও দশর্নে কোন ব্যক্তি বা মানুষকে চিরমুক্তি পেতে হলে পুণ্য ও অপুণ্যের অতীত হতে হবে। অথার্ৎ সংস্কার যাতে তাকে স্পর্শ করতে না পারে। যাদের পুরাতণ বীজ ক্ষীণ হয়েছে, নুতন কর্ম উৎপাদনের হেতু বিদ্যমান নেই এবং যাদের ভবিষ্যৎ জন্মের আসক্তিও নেই সেই কর্মবীজ ক্ষয়প্রাপ্ত সৎপুরুষগণ নির্বাপিত প্রদীপের ন্যায় নিবার্ণপ্রাপ্ত হন।
৩. দেবপুত্র মারঃ বৌদ্ধ দর্শনে ৩১ প্রকার লোকভূমি রয়েছে। এর মধ্যে চার অপায় ভূমি যেমনঃ তির্য্যক, প্রেত, অসুর, নিরয়। এখানে সত্ত্বগণ জন্ম হয় লোভ, দ্বেষ, মোহ কারণে। সত্ত্বের চিত্তে লোভ উৎপন্ন হলে প্রেত যোনিতে, দ্বেষ উৎপন্ন হলে নিরয়ে, মোহ উৎপন্ন হলে তির্য্যককুলে এবং ক্রোধ উৎপন্ন হলে অসুরকূলে সত্ত্বগণ জন্মগ্রহন করে। অপায় ভূমির উর্দ্ধে হল মনুষ্য ভূমি। মনুষ্য জন্ম লাভ করা অতীব দুলর্ভ। তবে ধ্যান সমাধি করার জন্য মনুষ্যলোকই উত্তম। তাই সিদ্ধার্থ মনুষ্য ভুমিতে আর্বিভূত হয়ে বুদ্ধত্ব লাভ করেন।
এই মনুষ্যভূমি উর্দ্ধে ছয়টি স্বর্গভূমি যথাঃ চর্তুমহারাজিক, ত্রয়তিংশ, যাম, তুষিত, নিমার্ণরতি ও পরিনির্মিত বশবর্তী। এরপর ষোলটি রুপভূমি রয়েছে। ব্রহ্ম পারিষদ, ব্রহ্মপুরোহিত, মহাব্রহ্মা, পরিত্তাভ, অপ্রমাণাভ, আভাস্বর, পরিত্তশুভ, অপ্রমাণশুভ, শুভাকীর্ণ, বৃহৎফল, অসঞ্জসত্ত্ব, অবহা, অতপ্ত, সুদর্শন, সুদর্শী, আকনিষ্ঠ। অরুপ ভূমি চারটি যথা আকাশানন্তায়ন, বিজ্ঞানানন্তায়ন, আকিঞ্চনায়তন ও নৈব সংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন। দেবলোকে অবস্থানরত দেবপুত্রগণের অনেক অলৌকিক ঋদ্ধিশক্তির কথা ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে। তারা মারের আবেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আকারের রুপ ধারন করে। পরনির্ম্মিত বশবর্তী দেবলোকের দেবপুত্রগণ মাররুপে আর্বিভূত হয়ে নানান অলৌকিক শক্তির কার্য সম্পাদন করে। দেবপুত্র মারগণ সাধকদের জন্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়ায়। পরনির্ম্মিত বশবর্তী দেবপুত্র মার সম্রাট অশোকের ৩য় সংগীতিতে অকুশল শক্তি প্রয়োগ করেছিল। সেজন্য দেবপুত্র মারকে দমন করার জন্য অহর্ৎ উপগুপ্তকে সংঘ দায়িত্ব দিয়েছিল। উপগুপ্ত স্থবির বিভিন্ন প্রকার ঋদ্ধিশক্তির সাহায্যে মারের উপদ্রব বন্ধ করেন।
৪ স্কন্ধ মারঃ পঞ্চস্কন্ধ সমন্বয়ে জীবের জীবন গঠিত৤ সেই পঞ্চস্কন্ধ হল রুপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান। পঞ্চস্কন্ধ প্রধানত নাম ও রুপ নিয়ে বিভক্ত৤ বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান হল নাম৤ আর রুপ হল ৩২ প্রকার অশুচি পদার্থ। লোম, নখ, দন্ত, ত্বক প্রভৃতি। এই পঞ্চস্কন্ধ সমন্বিত দেহ অনিত্য দুঃখ ও অনাত্ন। মিথ্যাদৃষ্টিবশতঃ আমরা এই দেহকে কত গর্ব করি। অথচ এই দেহে নিত্য সারবস্তু বলতে কিছুই নেই। অবিদ্যার কারণে সত্ত্বগণ জীবজগতে কিংবা এই সংসারে বারবার আসা যাওয়া করছে। অনুপাদিসেস নিবার্ণ লাভের মাধ্যমে মানুষের পঞ্চস্কন্ধ দেহমার ধ্বংস হয়। সোপাদিসেস নিবার্ণ প্রাপ্তির মাধ্যমে সিদ্ধার্থ গৌতম তৃষ্ণা লোভ, দ্বেষ, মোহরুপ মারকে পরাস্ত করলেও স্কন্ধ মার বিদ্যমান ছিল। বুদ্ধত্বলাভের পর আশি বছর বয়সে তিনি অনুপাদিসেস নিবার্ণের মাধ্যমে ক্লেশমারকে ধ্বংস করেন।
৫. মৃত্যুমারঃ পঞ্চস্কন্ধ দেহধারী জীবমাত্রই মৃত্যুর অধীন। অর্থাৎ সংস্কার মাত্রই অনিত্য। মৃত্যু কারো কাম্য নয়। তবুও জীবের মৃত্যু আসে। চ্যুতি চিত্তের বা মনের উদয়ে পঞ্চস্কন্ধ বা নাম-রুপ বা দেহ-মনের বিচ্ছিন্নতাকে বৌদ্ধদর্শনে মৃত্যু বলে। কালমৃত্যু ও অকালমৃত্যু ভেদে দুপ্রকার। দেহ মনের পরিবর্তনশীলতাকে কালমৃত্যু। ভববন্ধনে আবদ্ধ প্রাণির মৃত্যু অকালমৃত্যু। আর বন্ধনছিন্নকারীর মৃত্যু হল সমুচ্ছেদ মৃত্যু। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, মুর্খ-পন্ডিত ভেদাভেদ রীতিনীতি মৃত্যুতে নেই। সুতরাং, মার সর্বদা সজাগ সজীব ও তৎপর থাকে। অথার্ৎ সত্য সুন্দর ও পবিত্রতার পরিপস্থি এক অশুভ মায়াময় প্রভাবই মারের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। একমাত্র ধ্যান, সমাধি প্রজ্ঞা ও স্মৃতি অনুশীলনের ‍মাধ্যমেই এই মায়াচ্ছন্ন আবেশ হতে কিংবা জগত হতে মানুষ মুক্ত হতে পারেন।

সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকীকরণ।


বাংলাদেশে বর্তমানে সবকিছুরই সাম্প্রদায়িকীকরণ সম্পন্ন হয়েছে। কি রাজনীতি,কি অর্থনীতি,কি সমাজনীতি,কি শিক্ষানীতি।বর্তমান প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত যে পাঠ্যপুস্তক রয়েছে সেগুলো পড়ে যদি একটি ছেলে বা মেয়ে বড় হয়,তাহলে তাকে আর জোড় করে মুসলিম বানাতে হবে না,সে আপনা-আপনিই মুসলিম মানসিকতা সম্পন্ন হয়ে উঠবে।দেশের যে অনুসঙ্গটিকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত মনে করা হত তা হল সংস্কৃতি।কিন্তু বিগত দু'দশক থেকে সেখানেও ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়েছে।বাংলাদের সবচেয়ে প্রবীণ জীবিত কবি আল মাহমুদ একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ,তাঁর সৃস্টিও ধর্মীয় উপাদানে ভরা।আর নাটকে এবং চলচিত্রে ধর্মের মাত্রারিক্ত ব্যবহার তো আছেই।এই রকম সাংস্কৃতির মাধ্যমে একটি ধর্মকে হেয় প্রতিপন্য করার একটি উদ্দেশ্যমূলক মিউজিক ভিডিও নিয়ে আজকে আলোচনা করব।
। শর্ট টেলিফ্লিম দুরবীন এ তাহসানের
মোমের দেয়ালের মিউজিক ভিডিওটি দেখুন।
হিন্দু পুজো পাট করা মেয়ে নন্দিতা কিভাবে,
নামাজি- রোজাদার রাশেদেরর প্রেমে পড়ে। কিভাবে
সেক্যুলার  সেজে নামাজি রাশেদ(তাহসান) নন্দিতার
পুজোর পায়েস খায়। অনেকেই মনে করবেন এতে দোষের কি আছে।প্রেমে ও পড়তেই পারে।আমার মতেই দোষের কিছুই নেই।কিন্তু যখন মোমের দেওয়াল বলা হয় সমস্যাটি এখানেই।এখানে মোমের দেওয়াল বলতে আসলে নন্দিতা মানে হিন্দু মেয়েটির ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে বুঝানো হয়েছে কৌশলে,কেননা মোমের দেওয়াল যেমন ক্ষণস্হায়ী এবং ঠুনকো,তেমনি  হিন্দু মেয়েটির ধর্ম বিশ্বাসও ঠুনকো।আর রাসেদ( তাহসান) সেই
দেয়াল বা নন্দিতা নামে হিন্দু মেয়েটির ধর্ম  বিশ্বাস টুনকো আর
তাহসান সেই মোমের দেয়াল ভাঙ্গতে চায়।
ভিডিওটি দেখুন পরিষ্কার হয়ে যাবে
কিভাবে রোমান্টিক গান ও রোমান্টিক
কাপলের প্রেমের কেমিষ্ট্রির মাধ্যমে হিন্দু
বিশ্বাস মানে মোমের দেয়াল মানে টুনকো
বিশ্বাস মুসলিম প্রেমিক তাহসান ভাঙ্গছে।
যা আরো প্ররোচনা দিবে অমুসলিম মেয়েদের
মুসলিম ছেলেদের সাথে প্রেমে জড়াতে।
এখানে এক পর্যায়ে দেখা যায় নন্দিতা দেবতার
নৈবধ্য ও ধুপের ধুয়ো দেবতার বিশ্বাস হতে,পতিদেবতা তাহসানের বিশ্বাসের
দিকে ধাবিত হচ্ছে।তার মানে তাহসান
তাকিয়ার প্রেমের মাধ্যমে হিন্দু নন্দিতার
মোমের দেয়াল কে ভেঙ্গে দিচ্ছে।এখানে
মোমের দেয়াল যে হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস তা
বুঝতে অনেক বড়ো পন্ডিত হবার প্রয়োজন
নেই।
এখন শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে ও এক ধর্মের কাছে আরেক ধর্মের পরাজয়ের কাহিনী দেখানো হচ্ছে। হিন্দু ধর্মকে ছোট করা হয়েছে।
গানের নাম ঃ মোমের দেয়াল শিল্পি।এর প্রভাব হচ্ছে দুই ধরনের অন্যধর্মের ছেলে মেয়েরা নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে হিনমন্যতায় ভুগবে,তারা ভাববে তাদের ধর্মতা এবং সামাজিক প্রথাগুলো কুসংস্কার। দ্বীতিয়ত, নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসকে ভাববে ঠুনকো,ইসলামী বিশ্বাসের প্রতি আকৃস্ট হবে।এ ছাড়াও এর দ্বারা পুরুষতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী নারীর অসহায় আত্নসমর্পণের চিত্রও অঙ্কিত হয়েছে।

বিবর্তনবাদ ও বুদ্ধ দর্শন।

বিবর্তনবাদে বিজ্ঞানের পৃথিবীতে বুদ্ধ
নশ্বর সুজয়
Sydney, Australia
( দীর্ঘ শ্রমসাধ্য একটি নাতিদীর্ঘ ভিন্নধর্মী আলোচনা)

আলোচনার শুরুতে সর্বপ্রথম তথাগত বুদ্ধের অনবধ্য একটি গাথা তুলে ধরলাম- আড়াই হাজার বছর পূর্বেও বুদ্ধ কতটুকুই বিবর্তনবাদী ছিলেন তা জানার জন্য-
এককস্সেকম্হি কপ্পম্হি পুগ্গলস্সট্ঠি সঞ্চযো,
সিযা পব্বতসমো রাসি ইতি বুত্তাং মহেসিনা
-এক কল্প কালের মধ্যে একজন মানুষ যতবারই মৃত্যু বরন করে থাকে, যদি ততবারের অস্থি সমূহ সংগ্রহ করে রাখা হয় তাহলে বিশাল বৈপুল্যপর্বত প্রমাণ স্তুপে পরিণত হবে।- বুদ্ধ  ( কাযবিজ্ঞান-৮১)

বিজ্ঞানীদের দাবী -মহাবিশ্বের নানা ভূতত্ত্বীয় বিবর্তনের ফলে আজকের এই পৃথিবী নামক গ্রহটির উৎপত্তি হয়। এছাড়াও বিজ্ঞানের অনুমান আমাদের এই পৃথিবীর বয়স মহাবিশ্বের বয়সের একতৃতীয়াংশ। সৌরজগৎ উৎপত্তির আনুমানিক ১০০বিলিয়ন বছরের পরবর্তী সময়ের মধ্যে নানা সংঘর্ষের ফলে সৃজন হয় এই পৃথিবী নামক আমাদের বাসযোগ্য গ্রহটি। তাও আবার আজ থেকে ৫৪ বিলিয়ন বছর আগে। যা কিনা একটি লৌহ এবং বায়ু মন্ডলে গঠিত ছিল।
এরই মধ্যে থিয়া নামক অন্য একটি গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর বিশাল একটি সংঘর্ষ হয়, ফলে ঐ সময় ধ্বংস হয়ে যায় বায়ুমন্ডল এবং ঐ থিয়া নামক গ্রহাণুটিও। এতে করে সৃষ্টি হয় আর এক নতুন গ্রহ , যাকে আমরা বলি চাঁদ।
বিজ্ঞান মতে ঐ সময়টি লক্ষ লক্ষ বছর সময়কাল পৃথিবী খুবই উত্তপ্ত ছিল, চারিদিকে টগবগ করতে থাকে গলিত লাভা। যা কিনা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে পাথরে রূপান্তরিত হয়। এবং ঐ পাথর থেকে পানি জমতে থাকে পৃথিবীর প্রথম সাগরে। বিজ্ঞানীরা আনুমানিক ধারনা করে যে এই পানি এবং পাথরের বয়স প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন বছর।
এভাবে আরো কয়েক বিলিয়ন বছর গত হলে ঐ পানি আর পাথরের সংস্পর্শে জমানো শ্যাওলা হতে প্রথম অক্সিজেনের সৃষ্টি হয়। ঐ সময়টিতে পৃথিবীতে অক্সিজেনর মাত্রা এতোই বেশি ছিল যে তাতে উৎপন্ন সকল প্রকার ব্যাকটিরিয়া মারা যায়। এর পরবর্তী প্রায় ১ বিলিয়ন বছর সময়কাল পৃথিবীতে আর তেমন কিছু পরিবর্তন ঘটেনি, কোনো প্রকার প্রানেরও সৃজন হয়নি, এমনকি কোন প্রকার নড়াচড়াও করেনি।
এভাবে স্থির থাকতে থাকতে হঠাৎ পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠাংশ আলাদা আলাদা হতে শুরু করে, খন্ড খন্ড হতে থাকে। যাকে আমরা বলি মহাদেশ। বিজ্ঞানের ধারণা প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে মহাদেশের এমন বিভাজনটি সংগঠিত হয়। ঐ সময়টিতেও পৃথিবীতে কোনো প্রকার প্রাণের আর্বিভাব হয়নি। কারণ ঐ সময়টিতে পৃথিবী ছিল তীব্র শীতল। এতটাই শীতল ছিল যে, পুরো পৃথিবী যেন একটি বরফ গোলায় রূপান্তরিত হয়।
এরপর ধীরে ধীরে বরফ হ্রাস হওয়া কালীন পৃথিবীতে আবারো অক্সিজেন জমতে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারনা ঐ সময়টিতে পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রাণের উদ্ভব হতে থাকে।
বিজ্ঞান বলে প্রথমে এককোষী তারপর বহুকোষী প্রাণীর উৎপত্তি হয়।
এরপরও বিজ্ঞানের দাবী ঐ সময়টিতে যেসকল এককোষী  ও বহুকোষী প্রাণীর  উদ্ভব হয়েছিল তাদের ৯০ শতাংশ প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে প্রকৃতিক নানা কারণে। এদের মধ্যে ডায়নোসরও ছিল। আজ থেকে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে সাইবেরিয়ার বিশাল অগ্ন্যৎপাতই এর দায়ী। এরপরও পরবর্তীতে ঘটে যায় ধ্বংসাত্মক তুষারপাত সহ এই পৃথিবীতে আরো নানা বিবর্তন। তাতেও লুপ্ত হয় ৭৫ শতাংশের অধিক প্রাণীকূল।
এভাবে নানা উৎপত্তি আর বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে আমরা উপনীত হয়েছি বর্তমানের এই পৃথিবী।
যাইহোক এইত গেল পৃথিবীর ক্রম বিকাশের সংক্ষিপ্ত আলোকপাত।
চলুন এবার জানা যাক মানুষের বিবর্তনবাদের সংক্ষিপ্ত ধারনা- মানুষের বিবর্তন বিষয়ে নানা ধর্ম নানা মতবাদ ভিন্ন ভিন্ন যুক্তিও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। তবে কোনটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেনি আজ অবদি। পক্ষান্তরে এবিষয়ে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বরাবরই আলাদা। মানব বিবর্তন বিষয়ে গবেষকদের মধ্য ডারউইন অন্যতম। ডারউইনের দাবী বর্তমানে এই মানব জাতিটির আদি বংশ হচ্ছে বানর বা শিম্পাঞ্জি।
দশ বছর গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে ডারউইন উপনীত হলেও, বিশ বছর কাল সেই সত্য গোপন করতে হয়েছিল তাঁকে। কেননা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জীব যে মানুষ তাঁরই পিতৃপুরুষ শিম্পাঞ্জি কিংবা গোরিলা, এটা তৎকালীন সমাজ যে মেনে নিতে পারবে না, তা ডারউইন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ব্রুনো, কোপার্নিকাস কিংবা গ্যালিলিওর জীবনী থেকে রক্ষণশীল সমাজের এই বিরোধিতা সম্পর্কে আজ অনেকটাই আমরা ধারণা করতে পারি।
তারপরও নানা প্রশ্ন থেকে যায়- আজো কোনো বানর বা শিম্পাঞ্জিকে লেজ খসে পরে মানুষে রূপান্তরিত হতে কেউ দেখেনি। যদি তাই হতো এতো দিন বানর বা শিম্পাঞ্জি নামক প্রাণীকূলটি পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকব না। সবই মানুষ প্রজাতিতে রূপ নিত। এছাড়াও আধুনিক বিজ্ঞানীরাও এমন ঘটনার প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ দিতে পারে নি।
এত গেল সংক্ষেপে মানব বিবর্তনের বিজ্ঞানের আনুমানিক ধারনা।
চলুন এবার আলোচনায় আসি আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের ব্যাখ্যায়। ঐ সময়কালে কিন্তু বিজ্ঞানের তেমন সাক্ষর পরিলক্ষিত হয় না। তবে এ বিজ্ঞান শব্দটির জনক সেই তথাগত বুদ্ধ। বুদ্ধের প্রথম দেশনায় ধর্মচক্র সূত্রে  বার বার উল্লেখিত হয়েছে বুদ্ধ কর্তৃক। যেমন- চক্ষু বিজ্ঞান, ঘ্রাণ বিজ্ঞান, রূপ বিজ্ঞান ইত্যাদি। তবে বুদ্ধের বিজ্ঞান শব্দটির ব্যাখ্যা আর বর্তমান আধুনিক সাইনচ ব বিজ্ঞান শব্দটির ব্যাখ্যা পুরো ভিন্ন।
পৃথিবীর রহস্য বিষয়ে তথাগত বুদ্ধ সহজে উপস্থাপন করেছিলেন- এ সংসার আদি অন্ত বিরহিত। সংক্ষিপ্ত মানব জীবনে এর রহস্যের পেছনে ছুটলে পুরো জীবনই চলে যাবে তথাপি রহস্য রহস্যই থেকে যাবে। সুতরাং ঐ দিকে কালক্ষেপন না করে বর্তমানকে নিয়ে স্বীয় স্বীয় করণী সম্প্রদন কর।
পৃথিবী এমন কোন ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র বস্তুও অবশিষ্ট নেই যা হেতু ছাড়া সৃজন, উতপ্তি বা সংঘটিত হয়েছে।
অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-(মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮)
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।

প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে-  ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বুদ্ধ  যদি পুনজন্ম বিশ্বাস করে তাহলে জন্মচক্রে প্রবেশের পূর্বে সত্ত্বার বা প্রাণীর অবস্থান কেমন ছিল। ভবচক্রে সর্বপ্রথম সে আসল কি ভাবে। আদিতে এই সত্ত্বার কিরূপ স্বরূপ ছিল। ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এসেই যায়। আবার অন্যদিকে যারা ঈশ্বরের বিশ্বাসী, প্রভু বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তারা জটপট করে উত্তর করেন- আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টি ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এখন যদি তাকে আবার দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হয় ; ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্কে কে সৃষ্টি করল। এর উত্তরেও আপনি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না প্রকৃত পক্ষে। সবদিকেই কিন্তু, কেন, এরূপ চলতেই থাকবে।

বুদ্ধের সমকালীন সময়েও বুদ্ধকে এরূপ উভয়কটিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ত্রিবেদজ্ঞ চতুরবেদজ্ঞ ব্রাম্মণরাই বুদ্ধের সাথে এরূপ তার্কিক যুদ্ধে আগ্রহী হতেন। ত্রিপিটকের বিভিন্ন সূত্রে তা পরিলক্ষিত হয়।

জগত - সৃষ্টি - জন্মতত্ত্ব বিষয়ে বুদ্ধের কেমন বিচার ধারণা বা সিদ্ধান্ত ছিল তা
 আমরা বুদ্ধের বিভিন্ন দেশনায় দেখতে পাই।

এছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম মতে, অন্যান্য ধর্মের god অর্থাৎ generator, operator, destructor। অর্থাৎ ঈশ্বর এই কাজ করে থাকে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর নাই। তাই এই কাজগুলো কিভাবে সংঘটিত হবে? তাদের মতে এগুলো স্বয়ংক্রিয় একটি ‘নির্ভরশীলতা বা আপেক্ষিক’ একটি
পদ্ধতির মাধ্যমে হয়ে থাকে। এই
স্বয়ংক্রিয়
 পদ্বতিকে ‘বিশ্বজনীন
নীতি’ বা ‘Cosmological Laws’ বলা যায়। বৌদ্ধ ধর্মে যদি সৃষ্টিকর্তা,
ধ্বংসকর্তা, পরিচালনকর্তা রূপে কাউকে বসানো একান্ত প্রয়োজন হয়
তাহলে এই নীতি বসান যায়। সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম (Rules of Physics or matter)
খ. চিত্ত নিয়ম (Rules of Mind or citta)
গ. বীজ নিয়ম (Rules of Germinal order)
ঘ. কর্ম নিয়ম (Rules of Karma ) এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম ( Rules of Dharma)।

এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।
Ven. S. Dhammika তার good question good answer গ্রন্থে চমকপ্রদ আলোকপাত করেছেন।
এ সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান এবং বুদ্ধের ব্যাখ্যা অভিন্ন। "অগ্গঞা সূত্রে" বুদ্ধের ব্যাখ্যা হলো, লক্ষ লক্ষ বছরের দীর্ঘ সময় ব্যাপী প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় সৌরমন্ডল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় সৌরমন্ডলের বর্তমান ঘূর্ণায়মান অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বপ্রকৃতির প্রথম প্রাণীর সৃষ্টি হয় জলে, এককোষী প্রাণী হিসেবে। পরবর্তী পর্যায়ে বিবর্তনের মাধ্যমে এককোষী প্রাণী বহুকোষী যৌগিক প্রাণীতে রুপান্তরীত হয়। প্রাকৃতিক কার্য-কারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রুপান্তর ঘটেছে, যা বুদ্ধের "প্রতীত্য সমুৎপাদ সূত্রে"ও দেশিত হয়েছে।
আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমরা মানুষের অপরিমেয় শক্তিতে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষ মূল্যবান এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে অনন্ত মেধা সুপ্ত আছে। কর্মসাধনায় প্রতিটি মানুষ বুদ্ধের মত প্রজ্ঞা লাভ করে কোন বিষয় আসলে যে রকম  ঠিক সেই রকম প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করি, মনের ঈর্ষা, ক্রোধ ও ঘৃণার স্থলে করুণা, ক্ষমা ও মৈত্রীর অনূভূতিতে উজ্জিবীত হয়ে প্রতিটি মানুষ নিজ জ্ঞানশক্তির সাহায্যে জীবন জগতের সকল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। বুদ্ধ বলেছেন আমাদের অন্য কেউ রক্ষা করতে পারে না, নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হয়।
অজ্ঞতা ধূর করে জ্ঞানের আলোকে জীবনের স্বরুপ জ্ঞাত হয়ে আপন কর্মশক্তির সাহায্যে নিজ নিজ সমস্যা সমাধান করতে হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতার জ্ঞানাআলোকে বুদ্ধ স্পষ্ট ভাবে সেই পথ চলার সন্ধান দিয়েছেন।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, " যদি কোন ধর্ম আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমান
তালে চলে, তা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম।"

এদিক থেকে বৌদ্ধরা খুবই ভাগ্যবান.....

অবশ্য এই ব্যাপারে আরেক মহাপুরুষ ভেন. প্রফেসর আনন্দ কৌশল্যায়না বলেছেন, " বৌদ্ধরা এতই ভাগ্যবান যে তাদেরকে জন্মের পর
থেকেই ‘কেউনা’ নামক কোন অশরীরি শক্তির নির্দেশ, আদেশ অথবা কোন প্রেরিত বা নাজেলকৃত মতবাদকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে জীবন পরিচালনা করতে হয়না।"
ভারত বাংলা উপমহাদেশের প্রখ্যাত পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে -
“অজ্ঞানতারই অপর নাম ঈশ্বর। আমরা আমাদের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করতে লজ্জা পাই এবং তার জন্য বেশ ভারী গোছের একটা নামের আড়ালে আত্মগোপন করি। সেই ভারী গোছের আড়ালটির নামই ঈশ্বর। ঈশ্বর বিশ্বাসের আরও একটি কারণ হল বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের অপারগতা ও অসহায়ত্ব।"

বুদ্ধ ছিলেন মূলত একজন সমাজসংস্কারক, ধর্মপ্রচারক। কিন্তু অধিবিদ্যা বা আধ্যাত্মবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই ঈশ্বর, আত্মা, জগৎ প্রভৃতি বিষয়ের দার্শনিক বিচারে তাঁর কোন আগ্রহ ছিলো না।
এ বিষয়ে বুদ্ধ অতি সুন্দর উপমাসূচক দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। ব্রাহ্মণদের আত্মবাদ বিষয়ে ‘দীঘনিকায়ে’র ‘পোট্ঠপাদ সূত্তে’ বলা হয়েছে-
আত্মাকে স্বর্গসুখ ভোগ করতে কে দেখেছে? না দেখে তার অস্তিত্ব স্বীকার করা নিতান্ত উপহাস্যস্পদ। যদি কোন পুরুষ বলে যে, সে এই দেশের যে জনপদকল্যাণী (=দেশের সুন্দরতম স্ত্রী) তাকে চায়। তাতে লোকে তাকে প্রশ্ন করে, যে স্ত্রীকে সে চায় সে কি ক্ষত্রিয়াণী, ব্রাহ্মণী, বৈশ্যস্ত্রী বা শূদ্রী? অমুক নামধারী বা অমুক গোত্রধারী, লম্বা বা বেটে বা মাঝারি? এরূপ প্রশ্নে ‘না’ বললে (তাকে হয়তো নির্বোধ বা পাগল ঠাউরে) কেউ সেই বাক্যের কোন প্রমাণ চায় না। এরূপ আত্মবাদী ব্রাহ্মণবাক্যের প্রমাণ চাওয়া হয় না।
.
দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটি আরো সুন্দর। কোন ব্যক্তি প্রাসাদে আরোহণের জন্য চৌরাস্তায় সিঁড়ি বানালে লোকেরা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ওহে! তুমি যে প্রাসাদের জন্য সিঁড়ি বানাচ্ছো, তুমি কি জানো সেই প্রাসাদটি পূর্ব দিকে, দক্ষিণ দিকে, পশ্চিমদিকে বা উত্তরদিকে? উঁচু, নিচু বা মাঝারি? এই প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ বললে তাকে বলা হয় যে, যাকে তুমি জানো না, দেখোনি সেই প্রাসাদে চড়ার জন্য সিঁড়ি বানাচ্ছো? ঐদি এই প্রশ্নের উত্তরে ‘হাঁ’ বলা হয় তবে কি তার বাক্য প্রমাণশূন্য হবে না?
.
এই উদাহরণের সহায়তায় গৌতম বুদ্ধ দেখিয়েছেন যে, ব্রাহ্মণদর্শনে প্রতিপাদিত ‘আত্মা’ নামক কোন পদার্থ নেই। কেননা যখন কেউ আত্মাকে দেখেনি, শোনেনি তখন তার অস্তিত্ব কিভাবে স্বীকার করা হয়? পরলোকে সেই আত্মাকে সুখী বানাতে যে উপায় গ্রহণ করা হয় তা কি নিরর্থক নয়? কেননা যার মূল নেই তাকে সিঞ্চন করা প্রয়োজন হয় না।
মূলত বুদ্ধ একজন সমাজসংস্কারকই ছিলেন,।
.
শ্রাবস্তীর জেতবনে বিহার করার সময় মোগ্গলিপুত্ত তিস্স বুদ্ধকে দশটি প্রশ্ন করেছিলেন, যার উত্তরে বুদ্ধ নিস্পৃহ থেকেছিলেন। এগুলোকেই বুদ্ধের দশ অ-কথনীয় বলা হয়। মজ্ঝিমনিকায় অনুসারে বুদ্ধের অকথনীয় সূচিতে মাত্র দশটি বাক্য আছে, যা লোক (বিশ্ব), আত্মা এবং শরীরের ভেদাভেদ তথা মুক্ত পুরুষের গতি বিষয়ক। এই প্রশ্নগুলো হলো-
(ক) লোক বিষয়ক:
(১) লোক শাশ্বত বা নিত্য (eternal) কি-না ?
(২) লোক কি অনিত্য (non-eternal) ?
(৩) লোক কি সসীম (finite) ?
(৪) লোক কি অসীম (infinite) ?
(খ) দেহাত্মার একতা বিষয়ক:
(৫) আত্মা ও শরীর কি এক ?
(৬) আত্মা ও শরীর কি ভিন্ন ?
(গ) নির্বাণ-পরবর্তী অবস্থা বিষয়ক:
(৭) মৃত্যুর পর তথাগতের কি পুনর্জন্ম হয়েছে ?
(৮) মৃত্যুর পর কি তথাগতের পুনর্জন্ম হয় নি ?
(৯) তথাগতের পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া- উভয়ই কি সত্য ?
(১০) তথাগতের পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া- উভয়ই কি অসত্য ?
.
বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধের এ মৌনতার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা হয়েছে। কোন কোন পণ্ডিতের মতে বুদ্ধের এই নীরবতা তত্ত্ববিষয়ক অজ্ঞানের প্রতীক। কিন্তু এ মত গ্রহণযোগ্য নয় এজন্যেই যে, তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের উত্তর না জানলে তিনি ‘বুদ্ধ’ সংজ্ঞায় বিভূষিত হতেন না। বুদ্ধ শব্দের অর্থ জ্ঞানী। আবার কারো কারো মতে বুদ্ধ আত্মা, জগৎ, ঈশ্বর ইত্যাদির অস্তিত্বে সন্দিগ্ধ ছিলেন বলে এই মৌনতা তাঁর সংশয়বাদের স্বীকৃতি। কিন্তু তাঁদের এ ধারণা যে সম্পূর্ণই অর্বাচীন তার প্রমাণ হলো বুদ্ধের অনিত্যবাদ, অনাত্মবাদ, নিরীশ্বরবাদের মধ্য দিয়ে এই বহমান জগতের কোনো বস্তুকেই ধ্রুব বা নিত্য বলে স্বীকার না করা।
.
অনেক পণ্ডিত বুদ্ধের মৌন থাকাকে উদ্দেশ্যমূলক আখ্যায়িত করে বলেন, বুদ্ধ ছিলেন সর্বজ্ঞানী। তিনি তত্ত্বশাস্ত্রের প্রশ্নোত্তর জানতেন এবং মানবজ্ঞানের সীমাও জানতেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, তত্ত্বশাস্ত্রীয় যত প্রশ্ন আছে তাদের নিশ্চিতভাবে উত্তর হয় না। এরকম কোন প্রশ্নের উত্তরে দার্শনিকরাও এক মত নন। তত্ত্বশাস্ত্রের প্রশ্নে সৃষ্ট ঝঞ্ঝাট ব্যর্থ বিবাদকে প্রশ্রয় দেয়। কেননা অন্ধগণ স্পর্শ করে হাতির স্বরূপ বর্ণনা করলে সেই বর্ণনা বিরোধাত্মক ও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাই তিনি তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের প্রতি মৌন থেকে নিস্পৃহতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, সে সব প্রশ্নের উত্তর ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণে নিষ্প্রয়োজন। বুদ্ধমতে এসব অব্যাকৃত প্রশ্নে আগ্রহী হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এসব তত্ত্বশাস্ত্রীয় প্রশ্নের উত্তরে ব্যবহার বা নীতিমার্গের কোন সমস্যার সমাধান হয় না।
.
বুদ্ধের মতে সংসার দুঃখে পরিপূর্ণ। দর্শনের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুঃখের সমাপ্তি সন্ধান। সেকারণে তিনি দুঃখের সমস্যা ও দুঃখনিরোধের উপর অধিক জোর দিয়েছেন। তাই মালুঙ্ক্যপুত্ত যখন বুদ্ধকে এই দশ অকথনীয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন- “ভগবন্ ! যদি এ বিষয়ে জানেন …তবে বলুন …না জানলে …বা যিনি জানেন না বা বোঝেন না তাঁকে সরাসরি বলে দেওয়াই যুক্তিসংগত- ‘আমি জানি না।’ …”
বুদ্ধ এর উত্তর দিতে গিয়ে বলেছেন- “…আমি একে অ-কথনীয় …বলেছি, …কারণ …এর সম্বন্ধে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভিক্ষুচর্যা বা ব্রাহ্মচর্যের জন্য যোগ্য নয়। আবার নির্বেদ-বৈরাগ্য, শান্তি …পরম-জ্ঞান ও নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যও এই অ-কথনীয়ের কোনো আবশ্যকতাই নেই; তাই আমি এদের বলেছি অবক্তব্য।”
.
বুদ্ধের মতে ভবরোগে পীড়িত জীব অধ্যাত্মবিষয় নিয়ে কী করবে ? তার কাছে তো কর্তব্য পথ জেনে চলা হচ্ছে জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। এজন্যেই বৌদ্ধধর্ম প্রারম্ভে মানুষকে নীতিশাস্ত্রে আগ্রহী করায় তা ‘নৈতিক যথার্থবাদ’ (ethical realism) নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। (বিশিষ্ট লেখক ও  গবেষক --রণদীপম বসু)

.
তবে কোন বদ্ধ চিন্তার পাকে আটকে না থেকে স্বাধীন চিন্তার পক্ষেই বুদ্ধের সম্মতি ও উপদেশ পরিলক্ষিত হয়। যেমন (মজ্ঝিমনিকায়-১/২/৩) বুদ্ধ উপদেশ শুরু করেছিলেন এভাবে-
“ভিক্ষুগণ! আমি সেতুর মতো অতিক্রম করার জন্য তোমাদের ধর্মোপদেশ দিচ্ছি, ধরে রাখার জন্য নয়। …যেমন, একজন পুরুষ …এমন এক বিরাট নদীর ধারে উপস্থিত হলো যার এপার বিপদসঙ্কুল, ভয়পূর্ণ এবং ওপার সুখ-সমৃদ্ধিপূর্ণ তথা ভয়রহিত। অথচ সেখানে যাওয়ার জন্য কোনো তরীও নেই, নেই কোনো সেতু। …তখন সে …তৃণ-কাষ্ঠ …পত্র সংগ্রহ করে সেতু বেঁধে, তার সাহায্যে দৈহিক পরিশ্রমের দ্বারা স্বস্তিপূর্বক নদী পার হলো। …এরপর তার মনে হলো- ‘এই সেতু আমার উপকার করল, এর সাহায্যে …আমি পার হলাম; অতএব এখন একে আমি কেনই বা মাথায় করে অথবা কাঁধে তুলে… নিয়ে যাব না।’ …তবে কি …ঐ পুরুষকে সেতুটির প্রতি কর্তব্য পালনকারী ধরতে হবে? …না…। ভিক্ষুগণ! ঐ পুরুষ সেতুটি থেকে দুঃখকেই আহরণ করবে।”
.
একবার বুদ্ধকে কেশপুত্র গ্রামের কালামো নানা মতবাদে সত্য-মিথ্যা সন্দেহ করে প্রশ্ন করেছিলেন- “প্রভু! কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ কেশপুত্র গ্রামে এসে নিজ নিজ মতবাদ প্রকাশ…করেন, অন্যের মতবাদে দ্বি-মত হন, নিন্দা করেন।… অন্যেরাও…স্বীয় মতবাদ প্রকাশ করে…অন্যের মতবাদে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেন। অতএব…আমার মনে এরূপ দ্বিধা হয়- এঁদের মধ্যে…কে সত্য বলেন কেই বা মিথ্যা বলেন?’
উত্তরে বুদ্ধ বলেন- “‘কালামো! তোমার সন্দেহই…ঠিক, যেখানে প্রয়োজন সেখানেই সন্দেহ করেছ। …কালামো! তুমি শ্রুত কথার (বেদের) ভিত্তিতে কারুর কথা মেনে নিও না; তর্কের খাতিরে, বিনা যুক্তিতে, বক্তার ভব্যরূপে মুগ্ধ হয়ে, নিজের পুরনো সিদ্ধান্তের অনুকূল বলে, এই শ্রমণ আমার গুরু’ বলে মেনে না নিয়ে, নিজের বিচারে যা তুমি ধর্মসংগত, উত্তম, নির্দোষ, অনিন্দিত মনে করবে, যাকে গ্রহণ করা হিতকর ও সুখকর বলে জানবে নির্দ্বিধায় তাকে স্বীকার কর।’”
.

ফ্যাসিবাদ।

 ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে...